পাত্রের মাতা বরুণার পাত্রের পিতার ওপর একেবারে আস্থা নেই। বলল—“দেনা-পাওনা ঠিক করা সে তোমার কর্ম নয়, বাবার হাতে ছেড়ে দাও।”
কর্মী বলে খুব আত্মবিশ্বাস মহীনেরও নেই বোধ হয়, সেইজন্য আপত্তি করাটা আরও প্রয়োজন মনে করে থাকবে; বলল—“আবার তাঁকে এর মধ্যে জড়ানো কেন?”
“অপদার্থ জামাই করেছেন যে।”
এ-খোঁটাটা চলছে কদিন থেকে, চলবে কিছুদিন এখন। কিছুদিন আগে মেয়ের বিবাহে লেনদেনের ব্যাপারটা বড় কাঁচিয়ে ফেলেছিল, অনেকগুলি টাকা বের করে দিতে হয়েছে। তবু কথায় হার মেনে নেওয়া চলে না ত; মহীন বলল—“তিনি ধার্মিক বিজ্ঞ মানুষ, ভুল করতে যাবেন কি—জেনে-শুনে?”
“করেছেন; এর চেয়ে বড় ভুল কেউ করে না…”
“বোধ হয় ভেবে দেখলেন—এ যা মেয়ে এর জন্যে এই জামাই-ই…”
বরুণাই চোখটা নাচিয়ে পূরণ করে দিল—“ঠিক—এই ত?…তা বেশ ঠিক জামাই যা ঠিক মনে করেন করুন, মেয়ে আর এর মধ্যে…”
বলতে বলতেই ঘুরেছে, মহীন ধরে ফেলল বাঁ হাতটা, বলল—“আহা তা বলে একেবারে ত্যাগ করে কি বাবার ভুলটা মেয়ে শোধরাবে? শোন না। বলছিলাম তিনি নেন হাতে, তার চেয়ে বড় কথা কি আছে? কিন্তু বুড়ো মানুষ এই জষ্টিমাসের রোদ মাথায় করে সেই কোথা আসানসোল সেখান থেকে আনান… প্রায়শ্চিত্তের বহরটা…নিজের মেয়ের পক্ষে…”
“সে-আক্কেল আছে মেয়ের”—টেম্পারেচারটা নামিয়ে এনে বলতে একটু দেরিই হ’ল। মহীন একটু যেন উৎফুল্ল হয়ে উঠল; বলল—“আক্কেল আছে শুনলে সত্যিই বড় আনন্দ হয়।…কি?”
হেসে ফেলতে হ’ল বলেও একটু দেরি হ’ল তারপর বরুণা বলল—“নিজেই ও টিকিট কিনে রেখেছ, মনে নেই। শনিবারে চ্যারিটি ম্যাচ না? বাবা ত আসছেনই। এদের বুধবার দিন আসতে মানা করে দিয়ে ঐদিনে আসতে বলো।”
“এই ত চমৎকার পরামর্শ।…শ্বশুরমশাই তাহলে নিশ্চয় ভেবেছিলেন—মেয়ে আমার পরশপাথর, জামাইকে সোনা করে নেবে।”
বরুণা হাসিটা ঠোঁটে চেপে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে বলল—“হয়েছে।”
ঐ ঠিক হ’ল। একটা চিঠিও লিখে দেওয়া হবে।
শনিবার দিন সকালে প্রিয়নাথ এসে উপস্থিত হলেন। মোটাসোটা গৌরবর্ণ সদানন্দ পুরুষ, বয়স ষাট পেরিয়ে গেছে, মাথায় একগাছি কাঁচা চুল নেই। ট্যাক্সি থেকে নেমেই জামাইকে প্রথম প্রশ্ন—“টিকিটটা তাহলে হয়ে গেছে কেনা? কি রকম প্রস্পেক্ট দেখছ এবার?”
মহীন একটু লজ্জিতভাবে বলল—“সবাই ত বলছে এদেরই চান্স্—নাকি ফরম্টা এবারে খুবই ভালো…”
“নাকি—নয়, ভালোই; বেশ ভালো; বরাবর ফলো করে আসছি ত…”
চৌকাঠের ওপর দাঁড়িয়ে গেছেন।
“তা যদি বললে ত ফরম্ সেই নাইন্টিন ইলেভ্ন থেকেই কোনবারে খারাপ নয়—দোষ হয়েছে ঐখানে—নতুন এক্সপেরিমেণ্ট করব। আরে কী (Key) ম্যাচগুলোতে এক্সপেরিমেণ্ট চলে?…কোথায় চললে তুমি হঠাৎ ওরকম করে?”
মহীন বলল—“টাক্সিটাকে বিদায় করে…”
“ও! ঠিক ত। তা তুমি দেবে!…বাপ ডেঁড়েমুশে নিয়েছিল, তুমি একটু ট্যাক্সি ভাড়া দিয়ে তার কতটুকু শুধবে বাবাজী?…হাঃ হাঃ, হাঃ…”
ব্যাগ খুলে ভাড়াটা দিয়ে—পূর্ব প্রসঙ্গের জের ধরেই গল্প করতে করতে ভেতরে চলে গেলেন। জামা-জুতা ছাড়া, হাত পা ধোওয়া, চা-জলযোগ—সবটুকুর মধ্যে দিয়ে ঐ আলোচনাই চলল—প্রায় এক তরফা অবশ্য। কোন্ বারে কি রকম চান্স্ ছিল, কি করে নষ্ট করেছে—রেফারির একচোখামিতে, কি নিজেদের অপরিণাম-দর্শিতায়—সেই এগারো সালের পর থেকে—তার মধ্যেও যেগুলা আবার গৌরবের বৎসর—কখনও রাগ, অভিশাপ, কখনও উৎফুল্লতা, আশীর্বাদ—এক নাগাড়ে বকে চলেছেন প্রিয়নাথ। মেয়ে মুখে একটু হাসি নিয়ে নিজের কাজে ঘুরছে ফিরছে; বসতেও হচ্ছে এসে মাঝে মাঝে। বাপ চায় না এর মধ্যে অন্য কথা এসে পড়ুক, মেয়েও চায় না এই অনাবিল আনন্দ-প্রস্রবণে কোন বাধা দিতে। সেই এক কথা, একভাবে বল—জ্ঞান হয়ে অবধি শুনে আসছে, তবু এসে বসে—অনেক নাম জানা, বাবার “হীরো” সব; অনেক ঘটনা মুখস্থ, মাঝে মাঝে এনেও ফেলে তার এক আধটা আনন্দের স্রোতে একটা আলোড়ন ওঠে, প্রিয়নাথ জামাইকে উদ্দেশ করে বলেন—“ঐ শোন, বোরু পর্যন্ত জানে সেসব! সেন্সেশন্যাল ব্যাপার সে! সারা বাংলাদেশ জুড়ে ঐ কথা তখন!”
আহারের আগে পর্যন্ত অন্য কথা তোলা গেল না। শেষ হ’লে গড়গড়ার নলটা হাতে দিয়ে বরুণ বলল—“বাবা আজ সময়ের বিয়ের কথাবার্তাটা পাকা করতে আসবেন ওঁরা; চিঠিটা ত পেয়েছ?”
প্রিয়নাথ নলটা মুখ থেকে সরিয়ে নিয়ে বললেন—“সেই কথাই ত বলব বলব করছি তখন থেকে। তা হবে, আমি কোথায় ভাবলাম ম্যাচটা না হয় দেখে আসি…”
মহীনের দিকে মুখটা ঘুরিয়ে বললেন—“তোমরা আর একটা ম্যাচ আমার ঘাড়ে তুলে দিয়ে বসে আছি এদিকে! এ দায়িত্ব আমি…”
বরুণ বলল—“তোমার দায়িত্ব তুমি না নিলে কে নেবে বাবা? একটা দায়িত্ব ঠেলে দিয়েছিলে—তা দেখলে ত কি টাকার ছরকোটটা হ’ল?”
একটু কটাক্ষ হানন স্বামীর দিকে চেয়ে। প্রিয়নাথ বললেন—“ওটুকু ধরিস নি মা। কিছু বেশী গেলে মেয়ে যদি শ্বশুর শাশুড়ীর আশীর্বাদ মাথায় করে বাড়িতে পা দেয় ত সে কথা আর ধরতে আছে?…ছেলেটি মনের মতন হলেই হ’ল। আমিই যে সাধ্যের অতীত করে তোর শ্বশুরকে দিলাম, ছেলে মনের মতন পেলাম বলেই ত…”
স্বামী এবার স্ত্রীর কটাক্ষটা সুদে-আসলে ফিরিয়ে দিল। বরুণা যতটা সম্ভব বাঁচিয়ে উত্তর করল—“নিশ্চয় ভেবেছিলে তাই। তা, সে কথা যাক্। এখন কথা হচ্ছে যেমন বেরিয়ে গেছে টাকা তেমনি যখন জো পেলাম সেই টাকাকে আবার সিন্ধুকে ফিরিয়ে আনতে হবে ত বাবা? সংসারের ত এই নিয়ম। নইলে তোমার তিনটি নাতনী—একটানা বেরিয়ে যাক যা-কিছু পুঁজি আছে…”
প্রিয়নাথ বললেন—“সে-কথা তুই একশ বার বলতে পারিস। আমরা জো পেয়েছি আমরাই বা ছাড়ব কেন? গেরস্তুকে আবার দু’দিকই দেখতে হবে।…কি বল মহীন?”
মহীন ঘাড়টা নীচু করে বলল—“আজ্ঞে হ্যাঁ তা দেখতে হবে না?”
প্রিয়নাথ বাঁ হাতটা উল্টে একটু বাড়িয়ে ধরে বললেন—“কৈ, একটা ফিরিস্তি করে রেখেছ?…না রেখে থাক ত বোস’ কাগজ-কলম নিয়ে; তুইও বোস্ বোরু; ওটা একটি একটি আইটেম ধরে তোয়ের থাকা চাই, নাকের সামনে ফেলে দিতে হবে—এই এই বাবদ এই এই দরকার আমাদের মশাই, পারেন, এগুন, নৈলে…কৈ, করেছ ফিরিস্তি একটা?”
বরুণা ক্যাশবাক্স খুলে বেশ ভালো করে ভাঁজ করা একটা তালিকা দু’বার কপালে ঠেকিয়ে বাপের হাতে দিল। প্রিয়নাথ এক হাতে খোলবার একটু চেষ্টা করে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন—“তুই-ই পড়, শুনি।”
বরুণা পড়ে যেতে লাগল
ওঁ সিদ্ধি
১। নগদ দুই হাজার
২। বরাভরণ—এক হাজার
৩। গহনা—ত্রিশ ভরি—সাড়ে তিন হাজার
৪। শয্যাদ্রব্য ইত্যাদি…
প্রিয়নাথ গড়গড়ার নলটা মুখ থেকে বের কবে উঁচিয়ে ধরলেন, বললেন–“আস্তে, অত তড়িঘড়ি করে পড়ে গেলে চলে? ভেবে দেখতে হবে ত।… নগদ তিন হাজার, বরাভরণ এক হাজার পাঁচ শ’, গহনা পঁয়ত্রিশ ভরি…ছেলে মানুষের মতন ফিরিস্তি হয়েছে যে, অবিশ্যি দুনিয়াকে চেনবার আর সময় পেলে কৈ?…তুমি তিন হাজার চাইলে তারা হাতে-পায়ে ধরবে না? তার জন্যে ঐ হাজারখানেক বেশী ধরা রইল। টানাটানি করতে করতে শ’পাচেক আরও এসে যায় ভালোই, নৈলে হকের তিন হাজারটা ত বজায় রইল।”
জামাইয়ের দিকে ঘাড়টা উল্টে একটু হেসে বললেন—“এই হচ্ছে নিয়ম।”
কন্যা পিতৃগৌরবে একটু রাঙাই হয়ে উঠেছিল, স্বামীর দিক থেকে চকিত দৃষ্টিটা ঘুরিয়ে এনে বলল—“এইজন্যেই ত বললাম বাবা যে তুমি যখন আসছই শনিবার, সেইদিনই কথাবার্তা কওয়া হোক! আর যা ফিরিস্তি হয়েছে তাই আদায় করবার ক্ষমতা আছে নাকি? না বিশ্বাস হয় তুমি হাতে দিয়ে সরে দাঁড়িয়ে তামাসাটা দেখ না।”
প্রিয়নাথ শুধু একটু হাসলেন। একুনে ন’হাজার ধরা হয়েছিল সেটাকে সাড়ে এগার হাজার করা হ’ল। টানা-ছেঁড়া করেও হাজার দশেক ঘরে উঠবে এমন আশা করা যায়।
শুভ কাজ, দুটো থেকে সময় ঠিক হয়েছে পাঁজি দেখে। প্রিয়নাথ একটু আরাম করে নিতে গেলেন।
কন্যার পিতা নিখিলনাথ দুটোর সময়ই এসে বৈঠকখানায় মহীনের সঙ্গে গল্প-গুজব করছিলেন। শ্বশুর দৈবাৎ এসে পড়েছেন, আসল কথাটা তার সাক্ষাতেই হওয়া বাঞ্ছনীয় বলে ঠেকিয়ে রেখেছে মহীন। ভদ্রলোক মহীনের প্রায় সমবয়সী। একে কন্যার পিতা, তায় স্বভাবতই একটু নরম ধাতের মানুষ, সমবয়সী ভাবী বেহাইয়ের সঙ্গে তবু এতদিন এক রকম চালিয়ে যাচ্ছিলেন, কথাবার্তার মধ্যে শ্বশুর নামছেন শুনে বেশ একটু দমে গেছেন।
প্রায় আড়াইটার সময় ছোঁড়া চাকরটা গড়গড়া সেজে ইজি চেয়ারটার পাশে রেখে গেল, নলটা চেয়ারের হাতলে লটকে দিয়ে। তার পরেই প্রিয়নাথ মন্থর গতিতে এসে উপস্থিত হলেন। একে ভারী মুখ তায় দিবা-নিদ্রার পর আরও থমথমে হয়ে উঠেছে, দেখেই নিখিলনাথের বুকটা যেন এক ধাপ ধসে গেল। উঠে নমস্কার করতে প্রিয়নাথ অপাঙ্গে চেয়ে মৃদু হেসে মাথাটা একটু ঝোঁকালেন, তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে নলটা তুলে নিয়ে প্রশ্ন করলেন—“আপনিই তাহলে মেয়ের বাপ? মহীনেরই বয়সী দেখছি ত। বেশ, বেশ হবে।”
নিখিলনাথ হাত দুটো জোড় করে একটু বিনয়ের হাসি হেসে বললেন—“যোগাযোগ এখন ত আপনারই হাতে।…আমায় ‘আপনি’ বলবেন না। মহীনবাবুর চেয়ে যাহাতক ছোটই হব একটু। সম্বন্ধে ত বটেই…”
প্রিয়নাথ একটু হেসে নলটা সরিয়ে নিলেন মুখ থেকে। বললেন—“তা কি হয়? আপনি হলেন দাতা, মহীন হ’ল গ্রহীতা। গ্রহীতা দাতার চেয়ে কি বড় হয়েছে কখনও? আপনিই বলুন না। আর যোগাযোগের কথা,—সেও ত আপনারই হাতে, নয় কি?”
‘তুমি’ না বলার জন্য যেন আরও বেশী করে ‘আপনি’র ওপর জোর দিলেন দুবার। নিখিলনাথ একটু অপ্রতিভ হাসি হেসে মাথাটা নীচু করলেন।…যেন একটু থাবাই খেলেন বেশী আত্মীয়তা করতে গিয়ে। বুকটা আরও একটু গেল নেমে। প্রিয়নাথ জামাইকে প্রশ্ন করলেন—“নিখিলনাথবাবুকে ফর্দটা দেখিয়েছ মহীন?”
“না, এই নিয়ে আসি”—বলে মহীন ভেতরে চলে গেল। বরুণা পর্দার পাশেই হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, দেরি হ’ল না। শ্বশুরের হাতে দিতে যাচ্ছিল, প্রিয়নাথ বললেন—“ওঁকে দাও, এখন ত ওঁরই হাতে।”
ফর্দ হাতে করে নিখিলনাথ একেবারে কাঠ হয়ে গেলেন। অনেক চেষ্টা করে তবুও যে নিষ্প্রভ হাসিটুকু বাঁচিয়ে রেখেছিলেন—কথাবার্তায় প্রয়োজন বলে, সেটুকু পর্যন্ত নিবে গিয়ে মুখটা যেন অন্ধকার হয়ে গেল। ঠায় ফর্দটার দিকে দৃষ্টি নামিয়ে চুপ করে বসে রইলেন। সমস্ত ঘরটায় এক গড়গড়ার আওয়াজ ভিন্ন অন্য কোন আওয়াজ নেই।
বেশ অনেকক্ষণই কেটে গেল। নিখিলনাথ যে কি ক’বে কোথা থেকে আরম্ভ করবেন যেন বুঝে উঠতে পারছেন না। প্রিয়নাথের গড়গড়া একটু অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে; টানটা ক্রমেই যাচ্ছে দ্রুত হয়ে।
অবশেষে তিনিই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করলেন—
“মহীন, একবার দেখো ভিতরে গিয়ে, নিখিলনাথবাবুর চায়ের ব্যবস্থাটুকু হ’ল কিনা…”
নিখিলনাথ মুখ তুলতে তাকেই বললেন—“আমায় আবার একটু বেরুতে হবে; বুড়ো বসে একটু পাগলামি আছে…”
মহীন ভেবে চলে গেল।
ঘুরিয়ে একটু তাগাদাই ত, কি একটা বলতে গিয়ে মুখের দিকে চাইতেই নিখিলনাথ যেন একটু আশ্চর্য হয়ে গেলেন, মনে হ’ল অমন যে গম্ভীর নির্বিকার মুখ তাতে হঠাৎ যেন কি একটা ফুটে উঠেছে—অল্প একটু হাসির রেখা যেন; ভিতরে হঠাৎ একটা আনন্দের জোয়ার এলে সেটা নিঃসাড়ে ধীরে ধীরে ওঠে ফুঠে। খুব অস্পষ্ট, কিন্তু চোখে পড়ে।…পা দুটো একটু একটু দুলছে। একটু ধাঁধা খেয়ে কি বলতে যাচ্ছিলেন গুলিয়ে ফেলেছেন নিখিলনাথ; প্রিয়নাথ ভেতর দিকেই মাথাটা সামান্য ঘুরিয়ে নিয়ে প্রশ্ন করলেন—“কি অফ্টা (kick off) কখন্ রেখেছে মহীন আজ?”
মহীন বোধ হয় ভেতরের দিকে গিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে কিছু কথা কইছিল, নিখিলনাথই বললেন—“আজকের চ্যারিটির কথা বলছেন?—চারটে পঁয়তাল্লিশ।”
ভাবটা আর একটু বদলাল প্রিয়নাথের, নলটা মুখ থেকে সরিয়ে একটু কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করলেন—“আপনি রাখেন নাকি খবর?”
নিখিলনাথ কুণ্ঠিতভাবে মুখটা একটু তুলে বললেন—“আজ্ঞে, আছে একটু ইণ্টারেষ্ট্।”
প্রিয়নাথ একেবারে সোজা হয়ে বসলেন—“মানে?…কোন সাইডে?”
মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠে তখনই কিন্তু যেন একটু নিবে গেল; প্রশ্নের গায়েই প্রশ্ন করে উঠলেন—“ইয়ে, আপনাদের বাড়ি খরিদপুরে না?…মহীন লিখেছিল তার চিঠিতে।”
নিখিলনাথ কি ভেবে একটু হেসেই ফেললেন, তাঁরও যেন ঠিক সেই দীন ভাবটা আর নেই; বললেন—“আজ্ঞে তাতে কি হয়েছে? খেলা খেলাই। আর আমাদের ত দু’পুরুষ কেটেও গেল কলকাতায়।”
বেশ যেন সোজাসুজি কথা কইবার যুক্তিটাও এসে গেছে মনে; হেসে, হয়তো একটু ইঙ্গিত করেই বললেন—“আর তা যদি বলছেন ত মোহনবাগানের অনেক বড় বড় নামকরা খেলোয়াড়ই ত আমাদের ওদিকেরই—ওদিকে ধরুন অভিলাষ, রাজেন, এদিকে এসে…”
“তাহলে আপনি মোহনবাগানের দিকে। মাই গড়!…তা’হলে বোধ হয় আপনিও যাচ্ছেন দেখতে…টিকিট…”
নলটা বের করে নিয়েছেন, রীতিমত কাঁপছে হাত।
নিখিলনাথ বললেন—“যেতেই হবে।… টিকিটের বখেরা নেই ত, একটা পাশ পাই; ভাগ্নে খেলছে কিনা…”
প্রিয়নাথের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠেছে, সামনে যেন কি এক অপূর্ব জিনিস দেখছেন, বিশ্বাসই করতে পারছেন না। কিছুক্ষণ একেবারে স্তব্ধ হয়েই। তারপর বেশ চেঁচিয়েই ডেকে উঠলেন—“ওহে মহীন, শোন শোন কি আশ্চর্য যোগাযোগ! তোমার বেহাইও মোহনবাগানের দিকে।…”
মহীন আর বরুণা ঘরের মধ্যে এসে দুর্যোগ গুণছিল, মহীন—“তাই নাকি?” বলে একটু নিষ্প্রভভাবে বেরিয়ে এল।
প্রিয়নাথ ঘুরে চেয়ে বললেন—“তুমি ঐটুকুতেই আশ্চর্য হচ্ছ? আমাদের নিখিলের ভাগ্নে—আমাদের সমরের যে সম্বন্ধী হ’ল আর কি—সে মোহনবাগানের প্লেয়ার—আজ খেলছে!!…এ রকম যোগাযোগ ভাবতে পার?…কতদিন থেকে তোমায় মোহনবাগানের সঙ্গে কনেক্শন নিখিল?…আমার সে রকম বলতে ডিরেক্ট কনেক্শন নেই কোন, তবে…”
নিখিলনাথ বললেন—“আজ্ঞে, এবার ত হ’ল…”
সে মানুষই নয় আর, হাসিতে মুখটা একেবারে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, কোথায় গেল সে ‘আপনি’, কোথায় গেল সে সন্ত্রম, প্রিয়নাথ মহীনকে সম্বোধন করে বললেন—“শোন একবার নিখিলের কথা, বলে কনেকশন হ’ল—মোহনবাগানের সঙ্গে…তা মিছেই বা বলছে কি? নাতীর সম্বন্ধী খেলছে…”
মহীন একটু লজ্জিতভাবে হেসে বলল—“বরং সম্বন্ধটা আরও মিষ্টিই দাঁড়াল।”
“তা দাঁড়াল—তা দাঁড়াল বৈকি…”
—আনন্দে যেন শিশু হয়ে গেছেন। কি বলবেন, কি করবেন যে ভেবে উঠতে পারছেন না। বার দুই তিন মুখ থেকে নলটা টেনে নিলেন, কিন্তু কোন কথাই বের হ’ল না, শুধু শিশুর মতোই একটা অবোধ হাসি লেগে রইল মুখে।
তারপর আরম্ভ হ’ল সেই উনিশ শ’ এগারো থেকে সমস্ত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। কবে কি করে সুযোগ এগিয়ে এল, কি করে কার ভুলে, কার একচোখোমিতে নষ্ট হ’ল…আর, সে-সব কী টিম! সে সব কী খেলা!…গর্ডন্রা হেডে হেডে নিয়ে গিয়ে একেবারে গোলের ভেতর—ডারহাম্ বাবাজীরা ত কুপোকাত হয়েছিলেন বম্বে রোভার্সের ফাইনালে—এক পশলা বৃষ্টি না হয়ে গেলে…
প্রিয়নাথ মুখটা বিকৃত করে ওঠেন—কার যেন ছেলেমানুষী আব্দারের নকল ক’রে চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন—‘আমরা ওয়েট গ্রাউণ্ডে খেলতে পারি না!’… তোমরা কচি খোকা?…কেন, আজ ত সেই বুট পরে খেলছিস…যদি গোড়া থেকে আরম্ভ করতিস ত এই কেলেঙ্কারির ওপর কেলেঙ্কারি ত করতে হ’ত না!…
খুব জমে ওঠে গল্প, এত আর মহীন আর বরুণা নয় যে এক তরফা চলবে। নিখিলনাথ সমানে জোগান দিয়ে যাচ্ছেন—খুব ইণ্টারেষ্ট, অনেক জানেন, অনেক দেখছেন, বছর-বছরের খুঁটিনাটি তথ্য দিয়ে যোগান দিয়ে যাচ্ছেন; একই রকম মত দু’জনের, যদিই বা কোনখানে কিছু প্রভেদ থাকেই ত মিলিয়ে দিয়েই যাচ্ছেন।
বরুণা দুর্যোগ গুণছে দোরের পেছনে দাঁড়িয়ে। বার তিনেক কড়া নাড়তে মহীন ভেতরে চলে গেল। ফিরে এসে গল্পের তোড়ের মুখে বার দুয়েক কিছুই বের করতে পারল না মুখ দিয়ে। তৃতীয় বার যখন এল তখন মোহনবাগান চুয়ান্ন সালের শীল্ড জয় করে রোভার্সটাও তুলে নিয়েছে। দু’জনে বালকের মতো প্রাণখুলে সেই বাসি আনন্দের হাসি হেসে যাচ্ছেন। মহীন কুণ্ঠিতভাবে বসতে বসতে বলল—“ও বলছে, আপনারা আবার এখুনি বেরুবেন ত; এদিককার কথাটা তাহলে?”
“ঠিক কথাই ত?”—প্রিয়নাথ সচকিত হয়ে উঠলেন; নিখিলনাথের হাতঘড়ির দিকে চেয়ে প্রশ্ন করলেন—“ক’টা বাজল?” তারপর মুখের দিকে চেয়ে বললেন—“মোহনবাগানের কথা উঠলো ত তোমার দেখছি…”
হাসিই আছে, তবে তারই মধ্যে মনে হ’ল যেন একটু ব্যঙ্গও লেগে আছে কোথায়। নিখিলনাথ একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাতটা উল্টে দেখে বললেন—“হয়েছে তিনটে বিয়াল্লিশ।…আজ্ঞে হ্যাঁ তাহলে ফর্দটা…”
প্রিয়নাথ সোজা হয়ে বসেই সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়লেন। মহীনকেই বললেন—“তিনটে বিয়াল্লিশ হয়ে গেছে। তাহলে আর সময় কোথায়? কি করছিলে তোমরা এতক্ষণ?…নাও ওঠো নিখিল, আর সময় কোথায় তা’হলে? বোরু চাদরটা আমার…না হয় বেরুলিই সামনে, আর ত সম্বন্ধ হয়ে গেল। ফর্দর জন্যে বিয়ে আটকেছে কখনও?—আর এমন যোগাযোগ!…”
না, তা আর আটকাবে না। তবে আর নগদ তিন হাজার ত নয়ই, দু’হাজারও নয়, কাছাকাছিও নয় দু’হাজারের। একুনে এগারো হাজারের জায়গায় পাঁচটি হাজারও হয় কি না হয়।
বরুণা চাদরটা এনে পর্দার বাইরে হাতটা বাড়িয়ে ধরেছিল। এত নিরাশার মধ্যেও মহীন কি একটা বিজয়ের কটাক্ষই হানল তার দিকে চেয়ে?