মার্জারনিধন কাব্য
বা
গূরবে কুশ তন শবই আওওয়াল
কোন্ দেবে পূজা করি কোন্ শীর্নী ধরি?
গণপতি, মৌলা-আলী, ধূর্জটি, শ্ৰীহরি?
মুশকিল্-আসান্ আর মুর্শিদ্ মস্তান্
কোম্পানী কি মহারানী, ইংরেজ, শয়তান?
হিন্দুস্থান, পাকিস্তান, যেবা আছ যথা
ইস্পাহানী, ডালমিঞা—কলির দেবতা।
সবারে স্মরণ করি সিতুমিঞা ভনে
বেদরদ বেধড়ক ভয় নাহি মনে॥
ইরান দেশের কেচ্ছা শোন সাধুজন
বেহদ্ রঙীন কেচ্ছ, বহুৎ বরণ।
এন্তার তালিম পাবে করিলে খেয়াল
রোশনী আসিবে দিলে ভাঙিয়া দেয়াল।
পুরানা যদিও কেচ্ছা তবু হর্বকৎ
সমঝাইয়া দিবে নয়া হাল হকীকৎ॥
ইরান দেশেতে ছিল যমজ তরুণী।
ইয়া রঙ, ইয়া ঢঙ, নানা গুণে গুণী।
কোথায় লায়লী লাগে কোথায় শিরীন
চোখেতে বিজলী খেলে ঠোঁটে বাজে বীণ।
ওড়না দুলায়ে যবে দুই বোন যায়
কলিজা আছাড় খায় জোড়া রাঙা পায়।
এ্যাসা পীরিতি তোলে ফকিরেরও জানে
বেহুঁশ হইয়া লোক তারীফ বাখানে।
দৌলতও আছিল বটে বিস্তরে বিস্তর
বাপ দাদা রাখি গেলা চাকর-নফর।
ধন জন ঘর বাড়ি তালাব খামার
টাকা কড়ি জওয়াহর এস্তারে এস্তার।
তাই দুই নারী চায় থাকিতে আজাদ
কলঙ্কের ভয়ে শুধু বিয়ে হৈল সাধ।
তখন সে করিল শর্ত সে বড় অদ্ভুত
সে শর্ত শুনিলে ডর পায় যমদূত।
বলে কিনা প্ৰতি ভোরে মিঞার গর্দনে
পঞ্চাশ পায়জার মারি রাখিবে শাসনে!
এ বড় তাজ্জব বাৎ বেতালা বদ্খদ্
এ শর্ত মানিবে কেবা হয় যদি মর্দ?
দুলহা বরেতে ছিল পাড়া ছয়লাপ
শর্ত শুনে পত্রপাঠ হয়ে গেল সাফ।
সিতু মিঞা বলে সাধু এ বড় কৌতুক
মন দিয়া কেচ্ছা শোনো পাবে দিলে সুখ॥
শীত গেল বর্ষা গেল আসিল বাহার
ফুলে গুলে ইস্ফাহান হৈল গুলজার।
শীরাজ তব্রীজ আর আজর বৈজান
খুশিতে ভরপুর ভেল জমিন আসমান।
শুধু দুই ভাই নাম ফিরোজ মতীন
পেটের ধান্দায় মরে দুঃখে কাটে দিন।
অবশেষে ছোট ভাই বলে ফিরোজেরে
“কি করে বাঁচিবে বলো, কি হবে আখেরে।
তার চেয়ে জুতা ভালো চলো দুই জনে
শাদী করি পেট ভরি দু মেয়ের সনে।”
দুআভুআ ফিরোজের মন মাঝে হয়
শাদীতে আয়েশ বটে জুতারও তো ভয়।
হদীসের লাগি ঘাটে কুরান পুরাণ
দীন সিতু মিঞা ভণে শুনে পুণ্যবান॥
মজলিস জৌলুস করি দুনিয়া রওশন
জোড়া শাদী হয়ে গেল খুশ ত্ৰিভুবন।
চলি গেলা দুই ভাই ভিন্ন হাবেলিতে
মগ্ন হইলা মত্ত হইলা রসের কেলিতে।
পয়জারের ভয়ে নারি করিতে বয়ান
সিতু ভণে চুপিসাড়ে শুনে পুণ্যবান।
তিন মাস পরে বুঝি খুদার কুদ্রতে
আচম্বিতে দুভায়েতে দেখা হল পথে।
কোলাকুলি গলাগলি গিনা কলিজায়
মরি মরি মেলামেলি করে দুজনায়।
“তোমার মাথায়
টাক নেই কেন?’
শুধায় ফিরোজ ভাই
মানিয়া তাজ্জব
উত্তরে মতীন
“টাক কেন বলে তাই?”
কঁচুমাচু হয়ে
পুছিল ফিরোজ
“জোরে কি মারে না চটি?”
“আরে দুত্তোর
হিম্মত কাহার
আমি কি তেমনি বটি?
বাখানিয়া বলি
শোন কান পেতে
তরতিব কাহারে কয়।
আজব দুনিয়া
আজব চিড়িয়া
মামেলা ঝামেলা ময়।
তাই বসিলাম
তলওয়ার হাতে
বীবী দিলা খানা আনি
কোর্মা পোলাও
তন্দুরী মুর্গী
ঢাকাই বাখরখানী।
খানা আইল যেই
বীবীর পেয়ারা
বিড়াল আসিল সাথে
যেই না করিল
মরমিয়া ‘ম্যাঁও’
খাপটা না তুল্যা হাতে,—
খুল্যা তলোয়ার
এক কোপে কাট্যা
ফালাইনু কল্লাডারে
তাজ্জব বীবী
আকেল গুডুম
জবানে রা’টি না কাড়ে।
গুসসা কৈরা কই
‘এসব না সই;
মেজাজ বহুৎ কড়া
বরদাস্ত নাই
বিলকুল আমার
তবিয়াৎ আগুনে গড়া।’
তার পর কার
ঘাড়ে দুইডা মাথা
করিবে যে তেড়িমেড়ি?”
সিতু মিঞা কয়
নিশ্চয় নিশ্চয়
বাঘিনী পরিল বেড়ি।
“ক্যাবাৎ”, “ক্যাবাৎ” বলি হাওয়া করি ভর
চলিলা ফিরোজ মিঞা পৌঁছি গেলা ঘর।
মিলেছে দাওয়াই আর আন্দেশা তো নাই
খুদার কুদ্রতে ছিল তালেবর ভাই।
তার পর শোনো কেচ্ছা শোনো সাধুজন
ঠাস্যা দিল সেই দাওয়া পুলকিত মন।
সে রাতে খানার ওক্তে খুল্যা তলোয়ার
কাট্যা না ফালাইল মিঞা কল্লা বিল্লিডার।
চক্ষু দুইডা রাঙ্গা কব়্যা হুঙ্কারিয়া কয়
“তবিয়াৎ আমার বুরা গর্বড় না সয়।
হুঁশিয়ার হয়ে থেকে নয় সর্বনাশ।”
সিতু মিঞা শুনে কয়, শাবাশ শাবাশ॥
হায়রে বিধির লেখা, হায়রে কিস্মৎ
জহির হইয়া গেল যা ছিল শর্বৎ।
ভোর না হইতে বীবী লয়ে পয়জার
মিঞার বুকেতে চড়ি কানে ধরি তার।
দমাদম মারে জুতো দাড়ি ছিঁড়ে কয়
“তবিয়ৎ তোমার বুরা, বরদাস্ত না হয়?
মেজাজ চড়েছে তব হয়েছ বজ্জাৎ?
শাবুদ করিব তোমা শুনে লও বাৎ
আজ হৈতে বেড়ে গেল রেশন তোমার
পঞ্চাশ হৈতে হৈল একশ’ পায়জার।”
এত বলি মারে কিল মারে কানে টান
ইয়াল্লা ফুকারে সিতু, ভাগ্যে পুণ্যবান॥
কোথায় পাগড়ি গেল কোথায় পাজামা
হোঁচট খাইয়া পড়ে কাবু দেয় হামা।
খুন ঝরে সর্ব অঙ্গে ছিড়ে গেছে দাড়ি।
ফিরোজ পৌঁছিল শেষে মতীনের বাড়ি।
কাঁদিয়া কহিল, “ভাইয়া কি দিলি দাওয়াই
লাগাইনু কামে এবে জান যায় তাই।”
বর্ণিল তাবৎ বাৎ, মতীন শুনিল
আদর করিয়া ভায়ে কোলে তুলি নিল।
বুলাইয়া হাত মাথে বুলাইয়া দেহ
“বিড়াল মেরেছে“ কয়, “নাই তো সন্দেহ।
ব্যাকরণে তবু, দাদা, কৈলা ভুল খাঁটি।
বিলকুল বরবাদ সব গুড় হৈল মাটি।
আসলে এলেমে তুমি করোনি খেয়াল
শাদীর পয়লা রাতে বধিবে বিড়াল।”
বাণীরে বন্দিয়া বন্দিয়া বান্ধিলো বয়ান
দীন সিতু মিঞা ভণে শুনে পুণ্যবান॥
মল্লিনাথস্য
স্বরাজ লাভের সাথে কালোবাজারীতে
মারনি এখন তাই হাত হানো শিরে।
মল্লিনাথস্য
শাদীর পয়লা রাতে মারিবে বিড়াল
না হলে বর্বাদ সব, তাবৎ পয়মাল॥[১]
টিকা ও মন্তব্য
- ১.↑ইরানে এ কাহিনী সবিস্তরে বলা হয় না। শুধু বলা হয়, ‘গুরবে কুশতন, শব-ই আওওয়াল’ অর্থাৎ গুরবে=বিড়াল, কুশতন=মারা, শব=রাত্রি, আওওয়াল=প্ৰথম। সোজা বাঙলার ‘পয়লা রাতেই মারবে বিড়াল।’