পাখি নাকি কথা বলে না? সব পাখিই কথা বলে। ওই যে টুঁই-টুঁই-টুঁই-ট্ট, কিঁও-কিঁউ-কিঁও, নুপুর-নুপ নুপুর-নুপ করে শব্দ করে ওগুলো তবে কী? ওগুলোই ওদের কথা। ওদের ভাষা আমরা বুঝতে পারি না বলে আমরা সবজান্তার মতন বলি, পাখিরা কিচিরমিচির লাগিয়েছে। তুমি কি মাদ্রাজের লোকেদের কথা বুঝতে পারো? দুটো গ্রীক ছেলে মার্বেল গুলি নিয়ে ঝগড়া করলে তুমি কি তা বুঝতে পারবে? অতো দূরে যাবারই বা দরকার কী। চার-পাঁচজন চাটগাঁর লোক নিজেদের মধ্যে মনের খুশিতে কথা বলছেন, তাও কি বুঝতে পারবে?
পাখিদের কথা লিখে-লিখে আমার বলে একটা খাতাই ভরে গেছে। কত রকম পাখির কত কথা আমি শুনেছি। এই তো সেদিন, আমি সকালবেলা টগরফুল তুলছি, দেখি ডালে একটা পাখি বলছে, ‘উচ্চিংড়ে কই? উচ্চিংড়ে নেই!’ শুনে ওপরের ডাল থেকে আরেকটা পাখি বললো, ‘খুঁজে দেখ, বুঝে দেখ!’ নিচের ডালের পাখিটা একটু নেচে-নেচে এডাল-ওডাল করে বললো, ‘খুঁজেছি, বুঝেছি। উচ্চিংড়ে কই? উচ্চিংড়ে নেই!’ ওপরের পাখিটা ‘কী জ্বালা, কী জ্বালা’ বলতে-বলতে ডানা ঝটপটিয়ে উড়ে গেল।
আরেকদিন, গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে, দেখি একটা রাধাচূড়াগাছের ডালে বসে একটা পাখি আরেকটা পাখিকে বলছে, ‘খোল ছাতা, গোল ছাতা!’ যাকে বলছে তার গায়েও তো বৃষ্টি লাগছে, সে একটু বিরক্ত হয়ে বললো, ‘মুই ক্যান, তুই আন, গোল ছাতা, মান পাতা।’ মান পাতা মানে জানো তো? মানকচুপাতা। ওইটুকু পাখি, অতো বড়ো পাতা বয়ে আনা কি তার কাজ। সে-ও এবার রেগে গিয়ে বললো, ‘ঝি না কি? ঝি না কি?’ দুজনে যখন ওরকম ঝগড়া করছে, তখন ওদের বাচ্চা পাখিটা মায়ের ডানার নিচে আরো ঘেঁষে এসে মাকে বললো, ‘কী এতা? কী এতা?’ কী এতা মানে এটা কোন দেশ? ও এখনো দেশ বলতে শেখেনি তো, আর খুব ছোট বলে ‘এটা’ কে বলে এতা। মা তো বৃষ্টিতে বিরক্ত হয়েই ছিল, বললো, ‘কলকাতা। ছাইছাতা!’ এরকম কত কথাই যে বলে পাখিরা।
‘বউ কথা কও, বউ কথা কও’ তুমি শোনোনি? চৈত্রমাসে গ্রামের পুকুর-দীঘি, মাঠ-ঘাট সব যখন শুকিয়ে খটখট করছে তখন তৃষ্ণার্ত চাতক পাখি ‘মেঘ হ, জল দে’ বলে-বলে গলা শুকিয়ে ফেলছে, তুমি নিশ্চয়ই শুনেছো? আর জ্যোৎস্নারাতে চোখ-গেল-পাখি ‘চোখ গেল, চোখ গেল, চোখ গেল’ বলতে-বলতে যখন দূরের দিকে উড়ে যায় তখন আমার বুকের মধ্যে কী-যে কষ্ট হয়! জ্যোৎস্নায় ওদের চোখের কষ্ট অতো কেন বাড়ে সেটা আমি এখনো ভেবে পাইনি।