কার্জন পার্ক

বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

ট্রাম ছাড়িয়ে পূর্বদিক থেকে কার্জন পার্কে প্রবেশ করতেই ডাইনে একটা কংক্রিটের বেঞ্চ পাওয়া যাবে। সন্ধ্যার পর, কলকাতার কাজ সারা হয়ে গেলে মাঝে মাঝে সেটাতে গিয়ে বসি।

কার্জন পার্কের আর সে-চেহারা নেই। প্রথমতঃ, বাংলার মতই সে দ্বিখণ্ডিত; অর্ধেকেরও বেশী ট্রাম কোম্পানিকে ছেড়ে দিতে হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ, যেটুকু আছে তারও নেই আর পার্কের মর্যাদা। তার জন্য কিন্তু কার্জন পার্ককে দুঃখ করতে মানা করি; কলকাতায় আর কোন পার্কেরই মর্যাদা নেই। পার্ক যা আছে, কলকাতার গায়ে তা এখন বেমানান। কলকাতার রাগিণীতে পার্ক এখন বিসম্বাদী। তবুও গিয়ে বসি। এখনও এই সময়টা খোলা ময়দানের ওপর দিয়ে দক্ষিণা বাতাস বয়ে এসে কার্জন পার্কের ওপর তার শেষ উচ্ছ্বাসটা ছড়িয়ে দেয়। সে শুচি-শ্যামল দুর্বাঘাসের আস্তরণ নেই, সে যত্নলালিত ফুলের বেড নেই, সৌন্দর্যের প্রতি সে সভয় সমীহ নেই। সারা পার্কটায় কদর্যতার ভিড়, “ঝালচানা চাই? চীনাবাদাম?”…তেলের শিশির গোছা হাতে ঝুলিয়ে “লক্ষ্ণৌকা নাই” হাঁকে—“মালিস! মালিস?”…ওদিককার একটা ছোট দলের মধ্যে থেকে হয়ত একটা কুৎসিত বেনারসী বিদ্রূপই ভেসে এল অট্টহাস্যের সঙ্গে। যদি ফুটবলের সময় হ’ল ত কিছু বাঙালীর ছেলেও থাকে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে—কার্জন পার্কের চলতি বুলির সঙ্গে মিশে যায়—ইষ্টবেঙ্গল, রাজস্থান, মোহনবাগান, মহমিডেন স্পোর্টিং…এসব আমার ডানদিকে, আমার বেঞ্চ থেকে খানিকটা তফাতে; আমার বেঞ্চটা একটু সরে পড়ে, ট্রামডিপোর আলোর মধ্যে, সুতরাং একটু নিরিবিলিতে।

নিরিবিলি অবশ্য সে অর্থে নয়। বেঞ্চটিতে লোক থাকে আমি ছাড়া দু’জন—কখনও বা তিনজনও; আসছে-যাচ্ছে খালি থাকতে দেখিনি কখনও।

আমার ডান দিকে এই। তারও ওদিকটায় কলকাতা আস্তে আস্তে গেছে মিলিয়ে। অন্ধকারে নয়, যদিও আলো। এদিকের চেয়ে ওদিকে স্তিমিত,—মিলিয়ে গেছে দূরত্বে;—লাটভবনের উদ্যান, ক্যালকাটা মাঠ, ফোর্ট উইলিয়াম, গঙ্গা… ওদিককার কলকাতায় যেন ধীরে ধীরে সব তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে আসছে।

একেবারে উল্টো আমার বাঁ দিকে। ভিড়ে বোঝাই ট্রামগাড়ি একটার পিঠে একটা সর্পিল গতিতে কপালে চোখ জ্বেলে আসছে, চলে যাচ্ছে। তার ওদিকে চৌরঙ্গী-আলোর মালায় ঝলমল; ট্রাম-বাস-মোটরে মাখামাখি, ভিড়ের জন্যে ফুটপাথে পা দেওয়া যায় না।

পেছনে আমার এস‍্‍প্ল্যানেডের রাস্তাটা; প্রায় তথৈবচ।

এই জটিল পরিবেশের মধ্যে আমার চিন্তারও কোন বাঁধুনি থাকে না। কখনও মনটা গঙ্গার ধারে গিয়ে ঝিঁমিয়ে পড়ে থাকে; কখনও চৌরঙ্গী এস‍্‍প্ল্যানেডের আবর্তে পড়ে হাবুডুবু খায়।

এই জায়গাটাকে বুঝলাম না আজ পর্যন্ত। বাংলার বুকের মাঝখানে থেকেও এ কখনও বাঙালী হতে পারল না। সেদিনকার চৌরঙ্গী, কলকাতার ফ্যাশানস্বর্গ; শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সারি সারি বিলাতী দোকান, হোয়াইটওয়ে—হল-এণ্ডারসন—আর্মি-নেভী, কলকাতার বাছা-বাছা বিলাতী হোটেল—গ্র্যাণ্ড—ফারপো—সব বিলাতী হাতেই—মালিক বিলাতী, ক্রেতা বিলাতী। কলেজের প্রথম যুগের কথা মনে আছে, একটা জাগ্রত দেবতার মন্দিরে ঢুকতে যেমন ধুকপুকুনি হোত বুকের, চৌরঙ্গীর একটা দোকানে ঢুকতে তার চেয়ে হাত ঢের বেশী; যেখানেই দেখ, লালমুখ, ফুটপাথে পা দিতে পর্যন্ত সঙ্কোচ হোত, মনে হোত যেন অনধিকার প্রবেশ করছি।

চৌরঙ্গী ছিল বাংলার মাটির ওপর, কিন্তু বিলাতের যে কোন বড় শহরে মাঝখানে বসিয়ে দিলেও বেমানান হোত না।

আছেও বাংলার মাটির ওপরই আজ, বিলাতীরাও বিলাত চলে গেছে; আজও কিন্তু চৌরঙ্গী বাঙালী হতে পারল না—কেন এমনটা হয়?

আমার বেঞ্চটায় আগন্তুকদের যাওয়া আসা লেগে থাকে। কেউ আমার মত নিজের চিন্তা নিয়ে বসে থাকে, কেউ আবার একটু আলাপচারী, গল্প জমিয়ে তোলে। সেদিন একজন এই গোছের বৃদ্ধ এসে পাশে বসলেন, এবং আমার মনট। চৌরঙ্গী-রহস্য নিয়ে পড়েছিল বলে, কখন কিভাবে আলাপটা ঐ পথ ধরেই অগ্রসর হ’ল।

বৃদ্ধ বললেন—“আপনি এমনভাবে বলছেন, যেন চৌরঙ্গীর ওপর পুরাকালের কোন মুণি-ঋষির শাপ আছে—তুই ঘরে থেকেও কখনও ঘরের জিনিস হতে পারবি নি, যেমন নাকি শোনা যায় কোন কোন পাহাড়, নদী, সাগর, হ্রদের ওপর থাকত। আসল কথা ত তা নয়, বাঙালী ওকে বাংলার রূপ দেবে না, করে নেবে না ঘরের জিনিস ত চৌরঙ্গী করবে কি? স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে একটা মস্ত বড় সুযোগ ত এসেছিল, কিন্তু বাঙালী যদি সে সুযোগটা না নিতে চায় ত চৌরঙ্গীর দোষ কি? তাকে যে এসে নিজের সাজে সাজাতে চেয়েছে তার সাজেই সেজেছে।”

আমি অবশ্য মুণি-ঋষির শাপের কথা ভেবে নিশ্চিন্ত ছিলাম না, তবু ভদ্রলোককে একটু বেশী রকম প্রাদেশিক ভাবাপন্ন মনে হওয়ায়, ইন্ধন না জুগিয়ে বললাম—“তবু একটা সান্ত্বনা ত থেকেই যায় সে ভারতীয় রূপ ত নিয়েছেই।”

বললেন—“বাঙালী হলে ভারতীয় হোত না বলতে চান?”

বললাম—“তা কেন বলব?—তবে রাজস্থানী, বোম্বাই, কিম্বা পাঞ্জাবী—যে রূপই নিক, সেটা ভারতীয় রূপই। হয়ত এই করে—অর্থাৎ বাংলায় বম্বের রূপ এসে পড়ে, মাদ্রাজে পাঞ্জাবের রূপের খানিকটা গিয়ে পড়ে, আসামে খানিকটা মাদ্রাজের রূপ আমদানি হয়ে…”

“আপনার বক্তব্যটা বোধ হয় বুঝেছি”—একটু অসহিষ্ণু হয়েই আমায় থামিয়ে দিলেন বৃদ্ধ—“আপনি বোধ হয় বলতে চান এই করে সারা ভারতের এক সময় একটা নূতন রূপ ফুটে উঠবে, সেটা হবে খাঁটি ভারতীয় রূপ। বেশ ভাল কথা। কিন্তু তাহলে বম্বে বা মাদ্রাজে অথবা পাঞ্জাবে বাংলার রূপও ত খানিকটা ফোটা দরকার। নাম করুন কোনও জায়গার কোনও একটুখানি কোণ—আহমেদাবাদ—মাদুবা—বাঙ্গালোর—কানপুর—অমৃতসর—যোধপুর— নাম করুন…”

বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন। উনি যে উদ্দেশ্য নিয়ে বলেছেন, সে হিসাবে হলেও হয়ত নাম করা যায় দু’একটা; কিন্তু তাতে কিছু ফল হবে না। শুধু তর্কের ভাবটা এসে পড়ে ও উত্তেজনাটা বেড়ে যাবে মাত্র। উনিও নিশ্চয় আমারই মত কাৰ্জন পার্কের মুক্ত দক্ষিণা হাওয়ার লোভে এসে বসেছেন, সুতরাং এটাকে উত্তপ্ত করে না তুলে আমি আলাপের গতিটা ওরই অনুকূল করে দেওয়ার জন্য বললাম—“আপনি নিশ্চয় বাঙালীর ব্যবসা-বিমুখতার কথা বলছেন।”

বললেন—“আমার অভিযোগটা আরও ব্যাপক। বাঙালী যে নিজেকে রক্ষা করতে পারছে না, কোন দিক দিয়েই আত্ম প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না, তার আসল কারণ ব্যবসা-বিমুখতা বলার চেয়ে শ্রমবিমুখতা বলাই ঠিক। চৌরঙ্গী-এসপ্ল্যানেড কান-পার্কের এই কেন্দ্রটুকুর কথাই ধরা যাক না—এখানকার এই বিশিষ্ট রূপটি যারা ফুটিয়েছে তারা শুধু ব্যবসা দিয়েই ফোটায় নি। অত ডিটেলের দিকে যাব না, যাওয়ার দরকারও নেই। এই পার্কের মধ্যে যারা বসে, গড়িয়ে, আড্ডা দিচ্ছে, কি পায়চারি করে বেড়াচ্ছে—একা একা বা দল বেঁধে—স্বীকার করি ভ্যাগাবণ্ডও আছে—কিন্তু যদি খোঁজ নেন ত দেখবেন তারা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিভিন্ন প্রকারের পরিশ্রম করে—সে ক্ষেত্রের মধ্যে গঙ্গা আছে, ময়দান আছে, চৌরঙ্গী আছে, রাজভবন আছে—খালাসী আছে, কুলি আছে, কনডাক্টার আছে, ঝালচানাওলা আছে। একটু ভাল করে খুঁজে-পেতে দেখলে দু’একজন ভাটিয়া স্পেকুলেটারও হয়ত পেতে পারেন। বাঙালীর ছেলেও আছে—থাকে এই সময়টা ছড়িয়ে কিছু কিছু—চায়না বা সোভিয়েটের খবর দেবে শুধু তাই বা বলি কেন?—স্পেকুলেটারও পাবেন—লীগটা কে নেবে এবার, ছক‍্‍কেটে বলে দেবে আপনাকে…”

আবার উত্তেজিত হয়ে উঠেন। বললাম—“হ্যাঁ, শ্রমবিমুখতাই বৈকি। নানা সমস্যার মধ্যে পড়ে, বিশেষ করে দেশের যুবসম্প্রদায় যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছে—একটা নৈরাশ্য একটা সেন্স অফ ফ্রাসট্রেশান (sense of frustration) … কোন্ দিকে যাবে, কি করবে…”

এত উত্তেজিত হয়ে পড়লেন হঠাৎ, যে আমায় ধমক দিয়েই উঠলেন—“ঐ বুলিগুলো থামান্ দিকিন মশাই আপনার প্রৌঢ়-বৃদ্ধ সম্প্রদায়রা—ঐ সব বুলি আউড়ে আপনারা আস্কারা দিয়ে ওদের আরও মাথা খাচ্ছেন। শুধু ওদেরই বলি কেন-সমস্ত জাতটারই সবল সুস্থ চিন্তাধারাকে নষ্ট করে দিচ্ছেন আপনারা। থামান ও বুলি গুলো।…কেন Frustration-এর কারণ আর কোন জাতের হয় নি? জাপান সামলে উঠছে; জার্মানি একবার সামলে উঠে বিশ্ব-ত্রাস হয়ে উঠেছিল, আবার কি হয়ে উঠবে বলা যায় না—এবার ত আবার দুটো Frustration-এর অভিজ্ঞতা। কেন, এই ভারতবর্ষেই আর কোনও জাতের Frustration-এর দশা উপস্থিত হয় নি?—পাঞ্জাব, সিন্ধু। আর সব কথা বাদ দিলেও শুধু পার্টিশনের প্রিসিপ্লেই ত সিন্ধুর খানিকটা জায়গা পাওয়া উচিত ছিল—কিন্তু Frustration-এর মুখে থাপ্পড় মেরে এরা আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে দেখুন।

বললাম—“হ্যা শক্তির পরিচয় দিচ্ছে বৈকি…”

“দেবেই। প্রাণ শক্তি রয়েছে যে।…কেন, আপনাদের জাতীয় জীবনেও কি দুর্দিন এই প্রথম এল? একটা জাতের কাছে যা শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য—তার ধর্ম, তার সমাজ—যেতে বসেছিল না অতলে তলিয়ে?—বিপদ একভাবেই যে দেখা দেবে তার মানে কি?—Frustration-এর করাল রূপই ত, ভয় পেয়ে দিশেহারাই হয়েছিল কি বাঙালী? বলুন।”

বললাম—“ঐতিহাসিক সত্য, অস্বীকার করি কি করে? এ কথাও মানতেই হয় যে আমরা বড়রাও ছেলেদের পথ দেখাতে পারছি না। হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছি না। শ্রমবিমুখতাই যে আমাদের…” একটু নরম হলেন মনে হ’ল। পকেট থেকে একটা টিনের কৌটো বের ক’রে একটা বিড়ি ধরাচ্ছিলেন, ঠোঁটে চেপে আমার কথায় বাধা দিয়ে বললে—“ভেবে দেখেছি, বলি দাঁড়ান।”

ভাল করে দুটো টান দিয়ে বললেন—“সেও ভেবে দেখেছি। শ্রমবিমুখতাই মূল দোষ না, কিন্তু কোনও একটা বিশেষ কালে জাতির শ্ৰমটাকে কোন্ দিকে বিশেষ করে চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে সেটা ভেবে ঠিক করার ওপরই সব কিছু নির্ভর করে। যুগটা বৈশ্য যুগ, আর অনেক গুলি কারণেই বাংলা এখন সমস্ত উত্তর পূর্ব ভারতের বৈশ্যকেন্দ্র—এখন জাতের উদ্ধারের পথ, উন্নতির পথ একমাত্র ব্যবসা—জীবনের আর সব চলুক সঙ্গে সঙ্গে, কিন্তু ব্যবসাটা যেন হয় আমাদের মূলমন্ত্র।”

বললাম—“মুশকিল হয়েছে—সমস্ত জাতটা একেবারে নিঃস্ব। কিছু রাজ জমিদার ছিল…”

“গেছে, তাই দুঃখ?—তারাও বেঁচেছে বিশেষ করে তাদের বংশধরেরা বেঁচে গেল। আপনি বোধ হয় মূলধনের কথা বলছিলেন। Fssential নয়, বিড়লার পুর্বপুরুষের দরকার হয় নি। বিড়ির দোকান করুক, মুড়ি ফেরি করে মুলধন করুক—করেছে, এই বাংলাতেই। একটি ছোট্ট উপাখ্যান বলি—সত্যিই, তবে উপাখ্যান কেন বলছি শুনলেই বুঝতে পাবেন। এই বিড়ি কৌটোটা দেখছেন; পাড়ায় একটি ছেলেকে বসিয়েছিলাম—সেই খালি হ’লে ভর্তি করে দেয়। বছর তিনেক হয়েছে—এখন সে ও তল্লাটাটার বিড়ি কিং…ক্রমে অন্য দিকে নজর দেওয়ার অবস্থা হয়ে আসছে। এই সেদিন আমি কৌটোটা পাঠিয়ে দিতে, ওটা রেখে দিয়ে একটা গোণ্ড ফ্লেকে’র টিন পাঠিয়ে দিলে। বলে পাঠালে এবার থেকে রোজ একটিন সকালেই দেবে পাঠিয়ে—নিজেই চলে গেলাম, বললাম—সিগারেট সেই স্বদেশী যুগে ছেড়েছি। আবার না হয় ধরব, কেননা ছেড়েছি বটে, তবে প্রতিজ্ঞা করে নয়, ওটা করি না আমি। তবে ধরব যখন তোমার নিজের সিগারেট ফ্যাক্টারি হবে…”

আর সেই উত্তেজনার ভাবটা মোটেই নেই। আমার দিকে চেয়ে বলছেন, মুখটাতে একটা প্রসন্নতার আলো ফুটে উঠেছে, তার ওপর ট্রাম ডিপোর আলো পড়ে আরও দেখাচ্ছে অদ্ভুত। একটু যেন লজ্জিতও, কেন ঠিক বুঝলাম না, আমার দিকে একটা বিড়ি বাড়িয়ে ধরে বললেন—“দেখবেন? করছেও বেশ ভাল।”

নিয়ে কপালে ঠেকালাম, বললাম—“আমার আশীর্বাদটাও তাকে দেবেন—অর্থাৎ যেন আপনার আশীর্বাদটা ফলে তার জীবনে।”

আমার আজকের কাজন পার্কের রাত্রিটি যদি এইখানে শেষ হ’ত ত ভালই হ’ত; কিন্তু তা হ’ল না।

আমার বেঞ্চে আর কেউ ছিল না। একটি যুবক একটু দূরে ঘাসের উপর উল্টো দিকে মুখ করে বসে সিগারেট টানছিল, ভদ্রলোক উঠে গেলে একটু সঙ্কুচিতভাবে উঠে এসে যুক্ত কর কপালে ঠেকিয়ে নমস্কার করল—সিগারেট-সুদ্ধই করতে যাচ্ছিল, কি ভেবে ফেলেই দিল সেটা, তারপর আস্তে আস্তে একটু দুরত্ব রেখে বেঞ্চটাতে বসা। বছর কুড়ি-একুশ বয়স হবে, চেহারাটা একটু পাকাটে হলেও ভদ্রতার ছাপ আছে। তবে মুখের বুলি…তার নমুনাই নীচে পাওয়া যাবে কতক কতক।

ভাবটা যেন একটু চনমনে, মস্কারও করল সমীহ করে, এরপর বার দুই ঘাড়টা ঘুরিয়ে চাইলেও দেখে আমি প্রশ্ন করলাম—“কিছু কি বলবে আমায়?”

“নাঃ, এমন আর কি?…”

তারপর একটু বিরতি দিয়ে নিজে হতেই বলল—“উনি যে ব্যবসা করার কথা বলছিলেন স্যার, আর আপনিও যে হাত ধরে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বললেন…”

“চাও নাকি ব্যবসা করতে?”—বেশ একটু উৎসাহিত হয়েই প্রশ্নটা করলাম, ঐ আলোচনাই সদ্য হয়ে গেল ত।

“ব্যবসার কথাই ভাবছিলাম স্যার, আমি আর আমার ফ্রেণ্ড মিলে—এই চৌরঙ্গীতেই—ব্রিষ্টলের গায়েই একটা ছোট্ট ষ্টল আছে—সিগারেট, সিজার; আমরা তার সঙ্গে বিড়িও রাখব, সব রকম খদ্দের আছে ত—একটা ভাটিয়ার দোকান, সে গুডউইল বেছে দিতে চায়—বাবা মোটে টাকা দিতে চান না…”

“তার ইচ্ছে নয় যে তুমি ব্যবসা করো?”

“ব্যবসা ছাড়া অন্য কিছু করতেই দেবেন না আমায়, আমাদের নিজেদের ব্যবসা আছে কিনা…”

“তাতে তোমায় নেন না?”—বিস্মিতভাবেই প্রশ্ন করলাম, দৃষ্টিটাও আমার যেন আপনা হতেই ওর চেহারার ওপর বুলিয়ে গেল। ছোকরা বেশ সহজভাবেই বলল—“নেবেন না কি বলছেন আপনি?—অন্য ব্যবসা করতেই দেবেন না। আমাদের হচ্ছে গালাব ব্যবসা—হেড অফিস কলকাতাতেই—তবে কালেকশন ত বাইরেই—জঙ্গলে, পাহাড়ে—এদানি গুলটিতে একটা ডিপো খুলেছেন। বলেছেন, তুই সেখানে যা…”

প্রশ্ন করলাম—“চাওনা যেতে?”

“হাজারিবাগ থেকে বিশ মাইল! অঙ্গনের মধ্যে নয় যদিও, গ্রামই, কালেক্ট করে জমা করবে সেখানে, কিন্তু সে অজ পাড়াগাঁ, সিনেমা বায়স্কোপের কথা ছেড়ে দিন, একটা যে…”

“আর এখানে একেবারে পাশেই মেট্রো, মাথার ওপরই হোটেল কি বল?”

একটু হকচকিয়ে গেল, তখনই সামলে নিয়ে বলল —“কি বলছেন আপনি স্যার, হাতে একটা ব্যবসা নিয়েছি, আর মেট্রোয় অষ্টপ্রহর পড়ে থাকব!…তা দেখুন, বাবা কোনমতেই টাকা ছাড়বেন না। তাই—আপনি ঐ যে বলছিলেন—পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া—যদি একটু সাহায্য করতেন…”

“পুঁজি দিয়ে?”

জিহ্বা আর তালু দিয়ে চকচক করে দুটো আওয়াজ করে বলল—“এমন অসম্ভব আবদার করব কেন স্যার, আপনি কেন পুঁজি দিতে যাবেন?…আজই আমাতে আর আমার ফ্রেণ্ডে এক মতলব বের করেছি—আপনাদের মতন কেউ যদি মাঝখানে দাঁড়াতেন ত পুঁজিটা আপসে বেরিয়ে আসত বাবার হাত থেকে। ও ব্যাটা হাজার তিনেক চাইছে, বেশী নয়…”

“মতলবটা কি তা জানতে পারি?”

“চুরিও নয়, চামারিও নয়, স্যার; মনের অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে এমন কিছু মিথ্যা কথাও নয়। ঠিক করেছি নিরুদ্দেশ হব।”

“খাসা মতলব। তারপর?”

“বাবা তাতেও গলবে না জানি—কি ভয়ঙ্কর ধড়িবাজ জানেন না ত।”

একটু হেসে বললাম—“ছেলে দেখেও আন্দাজ হবে না?”

একটু লজ্জিত হতে গিয়ে তখনি আবার সামলে নিয়ে বলে চলল— “ভরসা-মা। মা বাবাকে অতিষ্ট করে তুলবে।…ফল, বিজ্ঞাপন—দুলাল, ফিরে এস, তোমার মা শয্যাধরা। অন্নজল ত্যাগ করেছেন।…চুপচাপ; বুঝছি ত, ভাওতা…”

“সত্যি হওয়াই বেশী সম্ভব নয় কি?

“তাহলে ত আরও ভাল স্যার, সঙ্গে সঙ্গে কেল্লা ফতে। পরের বিজ্ঞাপনেই বাবার থার্মোমিটার সঙ্গে সঙ্গে নেমে যাবে—বাবা দুলাল, তুমি যা চাইছ পাবে।… এই সময় আপনার মতন একজন ভদ্রলোকের দরকার হবে।”

“কেন?”

“একজনকে মধ্যস্থ হয়ে টাকাটা হাতে করে নিতে হবে ত। বাবা যে একটা চাল দিচ্ছে না, কে জানে বলুন?…”

একবার আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিয়ে বলল—“আপনার বয়স হয়েছে, আর কি যে বলে, সামাজিক মর্যাদা আছে বলে মনে হচ্ছে…”

বললাম—“সম্ভব-অসম্ভবের কথা বাদ দিলাম; কিন্তু মর্যাদার মতন কাজটা হবে মনে করো?”

একেবারে হকচকিয়ে গিয়ে মুখের দিকে ফ্যালফেলিয়ে চেয়ে রইল এবার।

রাগের চেয়ে দয়াই হয় বেশী, কতবড় সম্ভাবনা আর কোন্ পথ ধরে চলেছে। ভাবলাম, কম বয়স, বুঝিয়েই বলি, যদি হয় কিছু ফল। আরম্ভই করতে যাচ্ছি। এমন সময় ঐ বয়সেরই একটি ছোকরা, যেন খুঁজছিল, হঠাৎ দেখতে পেয়ে এগিয়ে এল—

“আরে, তুই এখানে বসে হাওয়া খাচ্ছিস! আমি এদিকে গোরু-খোঁজা করে বেড়াচ্ছি। ওঠ। ক’টা বেজেছে খোঁজ রাখিস?”

ছোকরা হন্তদন্ত হয়েই উঠে পড়ল, যেন কী একটা প্রকাণ্ড ভুল হয়ে যাচ্ছিল। দু’জনে চৌরঙ্গীর দিকে এগুল, গতি বেশ ক্ষিপ্র।

“কি হচ্ছিল কথা রে লোকটার সঙ্গে?”

“দুৎ, বোগাস। শুধু মুখের ফুটানি—এই করব, সেই করব…”

একবার ঘুরেও চাইল। তারপর একটা ট্রাম এসে পড়তে আড়াল পড়ে গেল।