কেমনজা কেমনজা

অমরেন্দ্র চক্রবর্তী

বাচ্চা পাখিরা দুষ্টুমি করলে, কথা না-শুনলে যখন-তখন এটা চাই ওটা চাই বলে কিচিরমিচির জুড়লে, মা-পাখিরা কী বলে তাদের ভয় দেখায় জানো? ‘উর্জাজ যায়, উর্জাজ আয়, মোর ছা নে, মোর ছা নে।’ তার মানে, উড়োজাহাজকে ডেকে বলে, আমার ছানাটাকে নিয়ে যা তো রে!

পাখিরা কিনা উড়োজাহাজকে ভয় পায়। অতো বড়ো ডানাওলা জিনিষটাকে আকাশে উড়তে দেখলে ভয় পাবারই কথা। তারা তো আর বোকা নয় যে উড়োজাহাজকেও পাখি বলে ভাববে। আগে বড়ো পাখিরাও খুব ভয় পেতো, অনেক দিন দেখে-দেখে তাদের সয়ে গেছে। বাচ্চা পাখিরা কিন্তু উড়োজাহাজকে এখনো খুব ভয় পায়। ‘উর্জাজ যায়, উর্জাজ আয়’ শুনেই তারা বায়না থামিয়ে চোখ বুজে ছোট্ট মাথাটা গায়ের পালকের মধ্যে যতোটা পারে গুঁজে দেয়।

আমাদের লেবুগাছে একসঙ্গে অনেকগুলো পাখি কাছাকাছি বাসা বেঁধে বাস করে। প্রতি বছর বৈশাখ মাসে আমি সারাদিন গাছতলায় বসে বাচ্চাদের নানান বায়নাক্কা শুনি। একদিন শুনলাম একটা বাচ্চা পাখি চিঁ চিঁ করে তার মাকে বলছে, ‘কেঁচো না, কেঁচো না, চা-পোকা, চা-পোকা।’ কেঁচো খাবে না, খাবে চা গাছের পোকা। তার মা তাকে কত করে বোঝাচ্ছে, ‘কেঁচো খা, খা খোকা। কাল খাস চা-পোকা। কই হাঁ, দেখি হাঁ।’ হাঁ করতে বললে কী হবে, বাচ্চা কিছুতেই ঠোঁট খোলে না।

আরেক দিন শুনি একটা বাচ্চা জেদ ধরেছে, এখনই তাকে কুঁচ ফল এনে দিতে হবে। ‘কুঁচ কই, কুঁচ নাল, কুঁচ কই, কুঁচ নাল’ বলে বাড়ি মাথায় করবার জোগাড়। নাল কাকে বলে জানো? লালকে।

পাখিরা ডায়মন্ডহারবারকে বলে টানমন্বার। একদিন, সেদিন খুব জ্যোৎস্না, অতো জ্যোৎস্নায় কি কারো ঘরে থাকতে ভালো লাগে! আমি বাইরে এসে দেখি লেবুগাছটা চিকচিক করছে, জ্যোৎস্নায় একেবারে অন্যরকম দেখাচ্ছে। চুপি-চুপি গাছটার খুব কাছে এসে দেখলাম, কোনো সাড়াশব্দ নেই। পাখিরা তো সন্ধ্যে হতেই ঘুমিয়ে পড়ে। আমি লেবুগাছের সামনে দাঁড়িয়ে আলো-চিকচিক চারদিক দেখতে থাকি।

একটু পরেই শুনি, বাচ্চা একটা পাখি বলছে, ‘টানমন্বার যাই, কেমনজা কেমনজা, টানমন্বার যাই।’ কেমনজা মানে কী মজা। এতো রাত্তিরে অতোটুকু বাচ্চা ডায়মন্ডহারবার যাবার তোড়জোড় করছে, সখ তো কম নয়। বার-বার ‘কেমনজা, কেমনজা’ শুনে কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় তার মা ভারি বিরক্ত হয়ে ধমকে দিলো, ‘চুপ যা, ঘুম যা!’ বাচ্চা পাখিটা ধমক কানেই তুললো না, সে খালি বলে, ‘কেমনজা, কেমনজা।’ তার মা এবার আরো রেগে বললো, ‘পাজি ছা, আজই যা।’ বাচ্চাটা কিন্তু সত্যি-সত্যি যাবার নামই করে না, শুধু ‘কেমনজা, কেমনজা’ করতে থাকে। মা-পাখিটা এবার ভীষণ রেগে তার মাথায় ঠোঁট দিয়ে একটা ঠোক্কর দিলো। বাচ্চাটা ঘুম ভেঙে ধড়ফড় করে উঠে বসে কিচিরমিচির কান্না জুড়লো। এতোক্ষণ সে ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিল, স্বপ্নে ডায়মন্ডহারবার যাবার মজাটা মাঠে মারা গেলো দেখে কিছুতেই তার আর কান্না থামে না। তারপর তার মা যেই বলেছে ‘উজার্জ যায়, উজার্জ আয়’ অমনি সে কান্নাটান্না ভুলে পালকের মধ্যে মুখ লুকলো।

সেই থেকে আমি প্রায় রোজই সন্ধ্যেবেলা লেবুতলায় এসে দাঁড়িয়ে থাকি যদি পাখিদের স্বপ্নের কথা শোনা যায়।