চাঁদনী

মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়

কোনো গাঁয়ে এক ব্ৰাহ্মণ আর এক ব্ৰাহ্মণী ছিলেন। দীঘির ধারে তাদের বাড়ী ছিল। গোয়ালে দুধেল গোরু ছিল, গোলায় ধান ছিল, পুকুরে মাছ ছিল। সবই ছিল। কিন্তু তবুও তাঁদের মনে সুখ ছিল না। কারণ তাঁদের একটিও ছেলে নেই।

ব্ৰাহ্মণী অনেকরকম ব্রত করলেন—যেসব ব্রত করলে কার্তিক গণেশের মতো ছেলে পায়, যাতে রাজার মা হয়, ছেলে হাতি-ঘোড়া চড়ে, সোনার খাট-পালঙ্কে বসে—কিন্তু ব্ৰাহ্মণীর সকল ব্ৰতই বিফল হল।

শেষে এক সাধুর কথামতো চন্দ্ৰায়ণ করে পূর্ণিমা রাতে এক সোনার চাঁদ মেয়ে হল। তার নাম রাখলেন চাঁদনী।

পাড়ার লোক দেখে বলল—মেয়ে নয় তো, চাঁদের কণা; চাঁদনীকে কোলে পেয়ে ব্ৰাহ্মণ-ব্ৰাহ্মণীর আনন্দের সীমা রইল না। ব্ৰাহ্মণী চাঁদনীকে বড় আদরে, বড় যত্নে মানুষ করতে লাগলেন।

চাঁদনী যখন খুব ছোট, যখন সে ভালো করে চলতে শেখেনি, যখন সে ভালো করে বলতে শেখেনি, কচি মুখে মিষ্টি কথা আধো-আধো ফুটেছে, সেই সময় আকাশে চাঁদ উঠলেই চাঁদনী বড়ই চঞ্চল হয়ে উঠত, আর হাতে পাবার জন্যে বায়না করত।

চাঁদনীর মা তাকে কিছুতেই আর ঘরে রাখতে পারতেন না—চাঁদনীকে কোলে নিয়ে ছাদের উপর এসে চাঁদের আলোয় ঘুম পাড়াতেন।

চাঁদনী চাঁদ দেখতে দেখতে মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়ত আর ঘুমের ঘোরে বলত—“চাঁদ, চাঁদ!”

মা বলতেন—

‘চাঁদ কোথা পাব বাছা জাদুমণি!

মাটির চাঁদ নয় গড়ে দেব,

গাছের চাঁদ নয় পেড়ে দেব,

তুই চাঁদের শিরোমণি,

ঘুমো রে আমার খুকুমণি৷”

চাঁদনী চাঁদামামার গান শুনতে শুনতে অকাতরে ঘুমিয়ে পড়ত। তার চাঁদ-মুখে চাঁদের আলো পড়ত, মনে হত যেন ঠিক ফুলের উপর চাঁদের আলো পড়েছে।

তারপর চাঁদনী যখন এদিক ওদিক ছুটে বেড়াতে শিখল, তখন প্রতিদিন চাঁদনী তার মায়ের হাত ধরে দীঘির ধারে যেত। মা গা ধুতে জলে নামতেন, চাঁদনী ঘাটে বসে দেখত দীঘির কালো জলে চাঁদের ছায়া ভাসছে —যেন একখানা রূপোর থালা। চাঁদনী বলত—“মা মা, ওই চাঁদ ধরে দে।”

মা বলতেন—

‘চাঁদ কোথা পাব বাছা জাদুমণি!

গাছের চাঁদ নয় পেড়ে দেব,

তুই চাঁদের শিরোমণি।

ঘরে চ আমার খুকুমণি৷’

বলতে বলতে চাঁদনীর হাত ধরে দীঘির ধার দিয়ে ঘরে ফিরতেন। চাঁদের আলো চাঁদনীর চাঁদ-মুখে পড়ত ঝাউবনের আড়াল দিয়ে, খেজুর পাতার ফাঁক দিয়ে।

ক্ৰমে চাঁদনীর বয়স হল, ব্ৰাহ্মণ-ব্ৰাহ্মণী তার বিয়ের জন্যে ভাবতে লাগলেন। মনের মতো বর—কোথাও পাওয়া গেল না। ব্ৰাহ্মণী কাঁদতে লাগলেন, ব্ৰাহ্মণ বরের সন্ধান করতে লাগলেন।

শেষে এক বর জুটল, তার অনেক পয়সা কিন্তু দেখতে কালো; ব্রাহ্মণ পয়সার লোভে সে কালো বরের সঙ্গে চাঁদনীর বিয়ে স্থির করলেন। চাঁদনীর মা মেয়ের গলা জড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন, কাঁদতে কাঁদতে অনেক রাত্রে ঘুমুলেন।

চাঁদনী সেই রাত্রে খানিক বাদে উঠে চুপিচুপি ঘর ছেড়ে বনে চলে গেল। সকালেও তার সন্ধান পাওয়া গেল না।

ব্ৰাহ্মণ-ব্ৰাহ্মণী চতুর্দিকে চাঁদনীকে খুঁজে—কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ফিরে এলেন। রাতে ব্ৰাহ্মণ স্বপ্ন দেখলেন—যে এক জটাজুটধারী ঋষি এসে বলছেন, ব্রাহ্মণী তুই কাঁদিসনে। চাঁদনী চাঁদের মেয়ে, আমার শাপে মানুষ হয়েছিল। এখন সে চন্দ্ৰলোকে গেছে, সেখানে এক রাজপুত্র তাকে বিয়ে করেছে। সে সুখে আছে।

ব্ৰাহ্মণী হাতজোড় করে বললেন, ঠাকুর, দয়া করে আমার মেয়েকে একবার দেখাও, আমার বুকটা একটু ঠাণ্ডা হোক৷

ঋষি বললেন, আজ থেকে এক বৎসর পরে ও প্রতি বৎসর কোজাগর পূৰ্ণিমায় দীঘির ধারে মেয়েকে দেখতে পাবে।

ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী সেই এক বৎসর শুদ্ধাচারে কাটালেন, পূর্ণিমা ফিরে এল।

ব্ৰাহ্মণ-ব্ৰাহ্মণী দীঘির ধারে গেলেন। দেখলেন পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে— আকাশে চাঁদ-দীঘির জলে চাঁদের ছায়া, ঘাসের উপর গাছের উপর মেঘের গায়ে চাঁদের আলো, একটি পদ্মের উপরে চাঁদনী ভেসে আসছে, কোলে তার একটি মেয়ে, যেন ফুটন্ত গোলাপ। সেই মেয়ে আধো-আধো স্বরে কচি হাতটি নেড়ে ডাকছে— ‘‘আয় চাঁদ, আয়।”

চাঁদনী বলছে—

‘চাঁদ কোথা পাব বাছা জাদুমণি!

মাটির চাঁদ নয় গড়ে দেব,

গাছের চাঁদ নয় পেড়ে দেব,

তুই চাঁদের শিরোমণি,

ঘুমো রে আমার শিরোমণি৷”

আদর করে বলতে বলতে পদ্মফুলটি কিনারায় এল। ব্ৰাহ্মণী আদর করে বুকে তুলে নিয়ে বুক জুড়োলেন। মায়েতে মেয়েতে মিলন হল। ব্ৰাহ্মণ চাঁদনীর মেয়েকে আদর করলেন, হাসিতে কান্নাতে রাত ফুরিয়ে এল; তখন চাঁদ থেকে চাঁদপানা বর এসে চাঁদনীকে নিয়ে চন্দ্ৰলোকে চলে গেল।

ব্ৰাহ্মণ-ব্ৰাহ্মণী শূন্য মনে ঘরে ফিরে এলেন। তারপর অনেক দিন—এক বৎসর পরে চাঁদনী পদ্মফুলে ভাসতে ভাসতে এসে ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণীকে নিয়ে চন্দ্ৰলোকে চলে গেল।

দেশের লোক ভাবল ব্ৰাহ্মণ-ব্ৰাহ্মণী মেয়ের শোকে সন্ন্যাসী হয়ে চলে গেল। চাঁদনী এখন চন্দ্ৰলোকে নাতি-নাতনী নিয়ে গল্প করে আর যখন কাছে কেউ না থাকে তখন আপন মনে চরকা কাটে। পূর্ণিমার চাঁদ উঠলে তোমরা দেখতে পাবে চাঁদনীবুড়ি চরকা কাটছে।