ঝিনুকপুরের গল্প

মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়

দুই রাজপুত্র। বড় হলেন ঝলককুমার, ছোট হলেন ঝিলিককুমার। বড়কুমার রেগেই আছেন। কাছে যায় কার সাধ্য— যেন আগুনের ঝলক। আর ছোটকুমারের রাগ পলকে মিলায়— যেন আকাশের ঝিলিক।

ঝলককুমার মাছ ধরতে ভারি পটু। আর ঝিলিককুমার বড় শিকারী। ঝলককুমারের ছিপ জলে পড়লে সমুদ্র যেন শুকিয়ে যায়— আপনি এসে মাছ ধরা দেয়। আর ঝিলিককুমারের তীর বিদ্যুতের মতো ছোটে, তার তলোয়ার বজ্রের মতো হানে। আকাশের পাখী, বনের বাঘ, কারও রক্ষা নেই।

রাজা-রাণী ছোট ছেলেটিকে বেশি ভালোবাসেন, সেইজন্যে ঝলককুমার ছোট ভাইয়ের উপর খুব চটা।

ঝিলিককুমার দাদার কাছে রোজ বকুনি খান, মার খান, কিছু বলেন না; দাদার হাতে-পায়ে ধরে বলেন, রাগ কোরো না, আমায় মাপ করো।

দাদা রোজ বড় বড় মাছ ধরে আনেন দেখে ঝিলিককুমারের একদিন মাছ ধরার ভারি ইচ্ছা হল। দাদাকে গিয়ে বললেন, দাদা বনের পশু মেরে মেরে আমার অরুচি জন্মে গেছে। আজ আমার মাছ ধরবার শখ হয়েছে, তোমার ছিপটা একবার দাও না, দাদা।

ঝলককুমার এই কথা শুনে রেগে উঠে বললেন, যা যা, তোর আর মাছ ধরতে হবে না— আমার ছিপ খারাপ করে ফেলবি।

ঝিলিককুমারের অনেক সাধ্যসাধনার পর কী জানি কেন সেদিন ঝলককুমারের মনটা একটু নরম হয়ে এল। তিনি ছোট ভাইকে মাছ ধরতে নিজের ছিপগাছটি দিলেন। ঝিলিককুমার জাল, দড়া, টোপ, বড়শি নিয়ে রাত থাকতে গিয়ে সমুদ্রে ছিপ ফেলেছেন।

দেখতে দেখতে খটখটে রোদ উঠল। ঝিলিককুমার একদৃষ্টিতে ফাতনার দিকে চেয়ে বসে আছেন আর চার ফেলছেন, চারের গন্ধে মাছ ভুরভুর করছে, কিন্তু একটাও টোপ গিলছে না।

এমনি করে বেলা যায়, সকাল গিয়ে দুপুরের রোদ আগুন হয়ে উঠছে। এই রোদ মাথায় লেগে ঝিলিককুমারের রক্ত তেতে আগুন হয়ে উঠল। রাজবাড়ি থেকে কত লোক ছোট রাজকুমারকে খাবার জন্য ডাকতে এল, তিনি তাদের সকলকে হাঁকিয়ে দিয়ে বললেন, মাছ না ধরে আমি জলস্পর্শ করব না।

রাজা ডেকে পাঠালেন, রাণী বলে পাঠালেন, তবুও রাজপুত্র উঠলেন না; ছিপ হাতে গোঁ ধরে বসে রইলেন। রোদ পড়ে গেল— সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, চোখে আর কিছু দেখা যায় না, তবুও রাজপুত্র ওঠেন না। এমন সময় একটা মাছ এসে ঠুক করে একবার ঠোকরালে। রাজকুমার ছিপটা একটু শক্ত করে ধরে বসলেন; সময় বুঝে এক টান। কিন্তু যেমন টান মারা, মাছটার ল্যাজের এক ঝাপটায় ডোরশুদ্ধ বড়শি ছিঁড়ে নিয়ে দৌড়।

এত রাতে শুধু হাতে বাড়ি ফিরতে দেখে ঝলককুমার ছোট ভাইকে ঠাট্টা করে বললেন, দে আমার ছিপ! মাছ ধরা কি তোর কর্ম?— বুনো কোথাকার!

তারপর যখন ছিপ হাতে নিয়ে ঝলককুমার দেখেন বড়শি নেই, তখন আর যায় কোথায়? একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠে গালমন্দ দিয়ে বললেন, যেখান থেকে পারিস আমার বড়শি এনে দে! নইলে আজ তোরই একদিন, কী আমারই একদিন!

সমস্ত দিন না খেয়ে, না দেয়ে একটাও মাছ ধরতে না পেরে ঝিলিককুমারের মন বড় খারাপ ছিল, তার উপর দাদার বকুনিতে তার মনে ভারি রাগ হল; মনের ক্ষোভে নিজের শখের তলোয়ারখানা বার করে হাতুড়ির ঘায়ে চুরমার করে ফেললেন। তারপর সেই ইস্পাতের টুকরো নিয়ে তাতে পাঁচশো বড়শি গড়িয়ে দাদাকে দিতে গেল।

ঝলককুমারের তাতে রাগ পড়ল না। ঝিলিককুমারের গালে এক চাপড় বসিয়ে দিয়ে বললেন, পাঁচশো বড়শি চাইনে, আমার সেই একটা বড়শিই এনে দে।

দাদা রাগ করেছেন, ঝিলিককুমারের প্রাণে আর তখন রাগ নেই— তিনি দাদাকে ভোলাবার জন্য পাঁচশো বড়শির জায়গায় হাজার বড়শি তৈরী করে এনে বললেন, দাদা তোমার দুটি পায়ে পড়ি, আমার উপর রাগ করে থেকো না। এই নাও তোমার জন্যে ভালো ইস্পাত দিয়ে নিজের হাতে গড়া হাজার বড়শি এনেছি।

ঝলককুমার সেগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললেন, এ আমি চাইনে। যে বড়শি হারিয়েছিস তাই এনে দে!

ঝিলিককুমার আর কী করেন! সমুদ্রের কোন মাছ সেই বড়শি নিয়ে অগাধ জলের কোন্‌খানে লুকিয়ে আছে, তিনি কেমন করে তা এনে দেন? রোজ দাদার কাছে বকুনি খান, মার খান, অমন শখের শিকার ঘুচে গেছে, মনের দুঃখেই আছেন।

একদিন দাদার কাছে খুব ধমকানি খেয়ে মনে ভারি দুঃখ হয়েছে; বুক ফেটে কান্না আসছে। সমুদ্রের কিনারায় কেউ কোথাও নেই, সেখানে একলা বসে হাপুস নয়নে কাঁদছেন, এমন সময়ে কোথা থেকে এক সন্ন্যাসী তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন। জিজ্ঞেস করলেন, রাজকুমার কাঁদছ কেন? কী হয়েছে?

ঝিলিককুমার সন্ন্যাসীকে বড়শি হারানোর কথা বললেন, দাদা সেই হারানো বড়শিটি চান, তা এখন তাঁকে কোথা থেকে এনে দিই?

সন্ন্যাসী বললেন, এসো, আমি উপায় করে দিচ্ছি। এই বলে তাকে সঙ্গে নিয়ে সমুদ্রের জলে যেখানে একটা জেলে-ডিঙি ভাসছে, সেখানে আনলেন।

সন্ন্যাসী বললেন, রাজকুমার! এই ডিঙিতে ওঠো। কোনো ভয় নেই। সমুদ্র এখন বেশ ঠাণ্ডা। খুব আরামে যেতে পারবে। এই উত্তর মুখ বরাবর বেয়ে যাও। যেতে যেতে দেখতে পাবে ঠিক সামনেই ঝিনুক-বাঁধানো এক প্রকাণ্ড রাজবাড়ি। সেখানে এই সমুদ্রের মালিক শঙ্খরাজ থাকেন। ওই ঝিনুকপুরের সামনে একটা কুয়ো আছে। তারই ধারে একটা বড় মুক্তোলতার গাছ। তুমি ডিঙি থেকে নেমে সেই গাছের মাথায় চড়ে বসে থেকো, তাহলেই তোমার মনের ইচ্ছা পূর্ণ হবে।

ঝিলিককুমার তাই করলেন। সন্ন্যাসী যা যা বলে দিয়েছেন, সবই ঠিক মিলল। খানিক দূরে গিয়েই দেখলেন ধবধবে ঝিনুকপুর; ফটকের সামনে কুয়ো; তার পাশেই সেই প্রকাণ্ড মুক্তোলতার গাছ।

ডিঙি থেকে তাড়াতাড়ি নেমে ঝিলিককুমার সেই গাছের উপরে উঠে বসলেন। কতক্ষণ এমনি করে কেটে গেল।

মুক্তকেশী রাজকন্যার দাসীরা সোনার কলসী কাঁখে সেই কুয়োর জল নিতে এসেছে; দেখে ফটিকের মত সাদা জল, তার উপর একটা কালো ছায়া। কীসের ছায়া? উপর দিকে চেয়ে দেখে, মুক্তোলতার গাছে বসে একটি চাঁদপানা ছেলে।

রাজপুত্র দাসীদের দেখে বললেন, আমার বড় তেষ্টা পেয়েছে; তোমরা কেউ আমাকে একটু জল দাও।

এক দাসী সোনার কলসী থেকে ফটিকের মত জল গড়িয়ে সোনার ঘটি ঝিলিককুমারের হাতে তুলে দিল। রাজকুমার সেই সোনার ঘটি নিয়ে ডান হাত মুখের কাছে ধরে, বাঁ হাতে গলার মুক্তার মালা থেকে বড় দেখে একটা মুক্তা ছিঁড়ে নিয়ে সেই ঘটিতে টপ করে ফেলে দিলেন। মুক্তাশুদ্ধু সোনার ঘটি দাসীরা মুক্তকেশী রাজকন্যার কাছে নিয়ে গেল।

রাজকন্যা সেই মুক্তা দেখে বললেন,— এ মুক্তা কোথায় পেলি? — কার গলা থেকে নিয়ে এলি? এ যে মানুষ মানুষ গন্ধ করে! সমুদ্রের মাঝে ঝিনুকপুর— এখানে কি মানুষ এল?

দাসীরা বলল, আজ সকালে জল আনতে গিয়েছিলুম, কুয়োর ভিতরে চেয়ে দেখি, ধবধবে সাদা জলে কালো ছায়া! — এদিকে দেখি, সেদিকে দেখি, নীচে চাই, উপরে চাই, সাদা জল কালো হল কীসে?

ওমা! চেয়ে দেখি না, কুয়োর পাশে মুক্তোলতার গাছ, তার উপর বসে এক রাজকুমার। মানুষের মত ধরণ, বিদ্যুতের প্রায় বরণ, মেঘের মতো কেশ, মণি-মুক্তার বেশ— হীরের মত দাঁত, চুনির মত ঠোঁট, ঝিনুকের মত নখ! জল খেতে চাইলেন, কিন্তু জল খেলেন না। গলার মালা থেকে মুক্তো ছিঁড়ে ঘটিতে ফেলে দিলেন।

মুক্তোকেশী রাজকন্যা দাসীকে বললেন, চল, আমায় নিয়ে চল। কেমন সে রাজকুমার একবার দেখে আসি।

মুক্তোকেশী রাজকন্যা খিড়কির দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে রাজকুমারকে দেখছেন। তাঁর গা থেকে জ্যোছনার মতো আভা এসে ঝিলিককুমারের মুখে পড়ল। রাজকুমার চমকে উঠে খিড়কির দিকে চেয়ে দেখলেন; চার চোখের মিলন হল। মুক্তাকুমারী লজ্জা পেয়ে সরে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে রাজকুমারের মুখের উপর থেকে জ্যোছনার আভাও মিলিয়ে গেল। ঝিলিককুমারের মুখ মলিন হল।

শঙ্খরাজের কাছে খবর গেল—ঝিনুকপুরে মানুষের দেশ থেকে এক রাজপুত্র এসেছেন। তিনি তাড়াতাড়ি এসে ঝিলিককুমারকে ঝিনুকপুরের মধ্যে আদর করে নিয়ে গেলেন, মখমলের মতো নরম পদ্মপাতার আসনে বসালেন; ঝিনুকের বাসনে সমুদ্রের মাছ খাওয়ালেন। হাঁসের ডিমের মতো একছড়া মুক্তার মালা ভেট দিলেন।

ঝিলিককুমারকে দেখা অবধি মুক্তাকুমারীর কী হয়েছে— খান না, দান না,— আনমনে সবসময় কী ভাবেন। মৎস্যরাণীর এই এক মেয়ে। তাঁর বড় ভাবনা হল! কত হাকিম এল, বদ্যি এল, কত ওষুধপত্র দিয়ে গেল, কিন্তু কিছুতে কিছু হল না, মুক্তকন্যা দিন-দিন ক্ষীণ হতে লাগলেন।

রাজকুমার মুক্তকন্যাকে সেই খিড়কির আড়ালে চকিতের মত একবার দেখেছেন, আর তাঁর দেখা পাননি। মুক্তাকুমারীকে দেখবার জন্য তাঁর মন ছটফট করে, কিন্তু দেখা আর হয় না।

একদিন শঙ্খরাজ সভায় এসে বসেছেন, মুখটা ভার, মনটা আনচান।

ঝিলিককুমার জিজ্ঞেস করলেন, মহারাজ, আজ আপনার মুখ শুকনো দেখছি কেন?

শঙ্খরাজ বললেন,—রাজকুমার! আমার একটি মাত্র মেয়ে, সে আজ কদিন থেকে কী-এক অসুখে ভুগছে। কেউ কিছু করতে পারছে না! মা আমার দিনে-দিনে চাঁদের মতো ক্ষয়ে যাচ্ছেন!

রাজকুমারীকে দেখবার এই একটা সুযোগ বুঝে ঝিলিককুমার বললেন, মহারাজ! যদি হুকুম দেন, আমি রাজকন্যাকে একবার দেখি—যদি আরাম করতে পারি।

ঝিলিককুমার মুক্তাকুমারীকে দেখতে গেলেন। তাঁকে দেখেই রাজকন্যার অর্ধেক অসুখ তখনি সেরে গেল।

রোজ দুবেলা ঝিলিককুমার মুক্তাকন্যাকে দেখতে যান—তার সঙ্গে মানুষের দেশের কত গল্প করেন, মুক্তাকন্যা অবাক হয়ে শোনেন।

এমনি করে কিছুদিন যায়, মুক্তাকুমারী একেবারে সেরে উঠলেন। তখন শঙ্খরাজের ভারি আনন্দ হল। তিনি খুশি হয়ে বললেন, রাজপুত্র আমার মেয়ের প্রাণ দিয়েছেন, তাঁর সঙ্গেই মুক্তাকুমারীর বিয়ে দেব।

হাঙর-কুমীরের জুড়ি, ঝিনুকের গাড়ি চড়ে বর, আর কচ্ছপ-কাঁকড়ার পিঠে চড়ে বরযাত্রীরা বেরোল। ব্যাঙ মশায় সানায়ে পোঁ ধরলেন, হাঁসপঙ্খীতে মাছের নাচের সঙ্গে সঙ্গে চলল।

মুক্তাকন্যাকে বিয়ে করে রাজকুমার ঝিনুকপুরে সুখে আছেন। হঠাৎ একদিন বাড়ীর কথা মনে পড়ল। ঝিলিককুমার এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কী দুঃখ স্বামীর বুকের ভিতর পোষা আছে? তা দূর করবার কি কোনো উপায় নেই? এই মনে করে মুক্তাকুমারী জিজ্ঞেস করলেন, রাজকুমার! তোমার দুঃখ কীসের, আমায় বলো!

রাজকুমার বললেন, অনেক দিন দেশ-ছাড়া, একবার দেশে যাবার ইচ্ছে হয়েছে।

মুক্তাকুমারী বললেন, তার আর ভাবনা কী? তুমি এখনি যাও না।

ঝিলিককুমার স্ত্রীকে তখন দাদার সেই বড়শি হারানোর কথা সব বললেন, দাদার সেই বড়শিটি নিয়ে যেতে না পারলে তিনি আমায় আস্ত রাখবেন না।

শঙ্খরাজের কানে এই কথা উঠল। তিনি সমুদ্রের সব মাছকে তলব করে পাঠালেন। কে সেই বড়শি নিয়েছে খোঁজ খোঁজ পড়ে গেল।

সিন্ধুঘোটকের পিঠে চড়ে দূতের সর্দার তিমি মাঝ সমুদ্র থেকে খবর এনে বললেন, মহারাজ! ‘তাই’ মাছের বুড়িদিদিমা আজ তিন বছর থেকে গলায় কী আটকে আছে, আটকে আছে করছে; ভালো করে খেতে পারে না; গলায় ব্যথা, খুকধুক করে কাশে। তার গলাটা একবার খোঁজ করুন।

তাই বুড়ি একে বুড়ো বয়সে জ্বরে থরথর করে কাঁপে, তার উপর রাজা ডেকে পাঠিয়েছেন; সে আরও কাঁপতে কাঁপতে শঙ্খরাজের সামনে এসে হাজির হল। বলল,—দোহাই মহারাজ! আমি কিছু জানি না!

শঙ্খরাজ রাজবৈদ্য ডেকে পাঠালেন। তিনি এসে তাই বুড়ির গলাটা ভালো করে দেখে, সোন্না দিয়ে একটা রক্তমাখা বড়শি টেনে বার করে আনলেন। ঝিলিককুমার দেখেই চিনলেন—এ দাদার সেই বড়শি!

রাজপুত্র দেশে যাবার উদ্যোগ করছেন, এমন সময় শঙ্খরাজ এসে বললেন, দেখো রাজকুমার! দেশে যাচ্ছ, সাবধানে থেকো। তোমার দাদা যখন একটা বড়শির জন্যে তোমাকে এত কষ্ট দিতে পারেন, তখন তিনি সব করতে পারেন। তুমি এই দুটো মুক্তা নাও—এটার নাম জোয়ারী-মুক্তা, এটার নাম ভাটাই-মুক্তা। যখন দেখবে দাদা রাগ করে তোমায় মারতে আসছেন, তখন এই জোয়ারী-মুক্ত হাতে করে তুলে ধোরো, অমনি সমুদ্র থেকে জোয়ারের জল গিয়ে তাঁকে ডুবিয়ে দেবে; তাতে ভয় পেয়ে তিনি যদি মাপ চান, তাহলে এই ভাটাই-মুক্তা তুলে ধোরো, অমনি সে জল ভাটার টানে সমুদ্রে গিয়ে পড়বে।

সাত নৌকোয় ভরা সাত হাজার ঝিনুক, সেই ঝিনুকের ভিতর সাত লক্ষ মুক্তা, তাই নিয়ে ঝিলিককুমার দেশে ফিরলেন।

রাজা রাণী ছেলে শোকে কেঁদে কেঁদে অন্ধ হয়ে পড়েছিলেন; ছেলের মুখ দেখে তাঁদের চোখে দৃষ্টি এল, মুখে হাসি ফুটল। রাজ্য যেন এতদিন দুঃখে ভরা ছিল, এখন ঘরে ঘরে আনন্দ। রাজা গরীব-দুঃখীকে অর্থ বিলোলেন, রাণী দেবতার পুজো দিলেন।

ঝিলিককুমার যেখানে যান, সেখানেই আদর পান; রাজা আদর করেন, রাণী আদর করেন, বাড়ীর যে-যেখানে সকলে আদর করে।

পথে-ঘাটে সব জায়গায় ঝিলিককুমারের কথা। ঝিলিককুমার যে ঝিনুকপুর থেকে সাত লক্ষ হাঁসের ডিমের মতো মুক্তা এনেছেন, সেকথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। দেশবিদেশ থেকে সেই মুক্তা দেখবার জন্যে লোক ভেঙে পড়তে লাগল।

এইসব দেখেশুনে ঝলককুমারের বুক রাগে ফেটে যেতে লাগল।

ঝলককুমার ভাবলেন—সেই বড়শিটার জন্যে ঝিলিককুমারকে তো দেশছাড়া করেছিলুম, আবার আপদ এসে জুটেছে—এবারও কেন সেই বড়শি নিয়ে তাকে জব্দ করি না!

এই না ভেবে তিনি ঝিলিককুমারের কাছে গিয়ে বললেন, দে বলছি আমার বড়শি! নইলে টের পাওয়াব!

চাইবামাত্র ঝিলিককুমার বড়শিটা বার করে দিলেন। বড়কুমার সে বড়শিটা সত্যই ফিরে পাবেন মনেও করেননি। হঠাৎ বড়শিটা দেখে থতমত খেয়ে গেলেন; কিন্তু সেটা যদি নিজের বড়শি বলে মেনে নেন, তাহলে তো ভাইকে আর জব্দ করা হয় না; তিনি তাড়াতাড়ি থতমত ভাবটা সামলে নিয়ে, খুব রাগ দেখিয়ে, খাপ থেকে তলোয়ারটা খুলে ফেলে বললেন, আমার সঙ্গে জুয়াচুরি?

তলোয়ারটা মাথার উপর পড়ে আর কী, এমন সময় ঝিলিককুমার সেই জোয়ারী-মুক্তা তুলে ধরলেন।

দেখতে দেখতে কোথা থেকে পর্বতের মতো ঢেউ নিয়ে সমুদ্রের জল এসে হাজির হল, ঝলককুমারকে ডুবিয়ে ফেলল। ঝলককুমার একটু সামলে নিয়ে ভেসে উঠলেন, সাঁতার কাটতে লাগলেন।

কিন্তু তাতেই কি রক্ষা আছে? ঢেউয়ের উপর ঢেউ তাঁকে একেবারে অস্থির করে তুলতে লাগল। নাকানি-চোবানি খেয়ে প্রাণ হাঁপাই-হাঁপাই করে উঠল। নিশ্বাস ফেলবার অবকাশ পাচ্ছেন না, প্ৰাণ যায়! ঝিলিককুমারকে ডাক দিয়ে বললেন, ভাই, রক্ষা করো, রক্ষা করো, আর এমন কাজ করব না!

ঝিলিককুমার ভাটাই-মুক্তা তুলে ধরলেন, হুস্‌ করে সমুদ্রের জল সমুদ্রে গিয়ে পড়ল। ঝলককুমার রক্ষা পেলেন।

সেইদিন থেকে জোয়ারের জলে বড়কুমারের রাগের ঝলক চিরদিনের মতো নিভে গেল। ঝিলিককুমারের সঙ্গে আর কখনো ঝগড়া হল না।