দর্শনাতীত

সৈয়দ মুজতবা আলী

ছন্নের মত ছন্নের মত ঘুরে বেড়াচ্ছি বিরাট বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে। সবে এসেছি ‘দ্যাশ’ থেকে—হাইকোর্টটি দেখিয়ে দেখিয়ে দেবার মতো কোন খাটাশকে পাচ্ছি নে। কিন্তু রমণীজাতি দয়াশীলা—বেদরদীরা বলে হরবকৎ শিকার-সন্ধানী—আমার সঙ্গে কথা কইলে নিজের থেকে। আমি তখন বিবর্ণ বিস্বাদ বদখদ কোন এক মাংস, ততধিক বিজাতীয় হর্স-ক্যাবেজ (সচরাচর এ বস্তু ঘোড়া ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের দেওয়া হয়) খাবার চেষ্টা করছি, চোখের জলে নাকের জলে। সব শুনে বললে, ‘দর্শন? তাহলে শ্মিটকে মিস্‌ করো না; বুড়ার বয়স আশী পেরিয়ে গেছে, কখন যে পটল তুলবে (জর্মনে বলে ‘আপজেগ্‌লেন’) ঠিক নেই।’

পোড়ার দেশে লেকচার-রুমে সীট রিজার্ভ করতে হয়। প্রাগুক্ত যুবতীটি ধানীলংকার মত এফিশেণ্ট। সাত দিন পরে প্রথম লেকচারে গিয়ে দেখি, একদম পয়লা কাতারে পাশাপাশি দু’খানা চেয়ার রিজার্ভ করে বসে আছে প্রফেসারের চেয়ার থেকে হাত আষ্টেক দূরে।

অধ্যাপক এলেন ঘণ্টা পড়ার মিনিট পাঁচেক পরে। বয়েস আশী না, মনে হবে সোয়া-শো—যেভাবে আস্তে আস্তে পা ফেলে ফেলে ঘরে ঢুকলেন। ইয়া বিরাট লাশ। ফ্রলাইন উরজুল লাফ দিয়ে গেলেন তাঁর দিকে। বুড়ো রোষকষায়িত লোচনে তাঁর দিকে তাকিয়ে হাত দু’খানা অল্প তুলে ধরলেন। উরজুল এক দিকের ওভারকোটটা তাঁর দেহ থেকে মুক্ত করার পর তিনি অতি কষ্টে শরীরে একটু মোচড় দিলেন। এই গুহ্যতম তান্ত্রিক মুষ্টিযোগ প্রসাদাৎ তিনি তাঁর ওভারকোটের নাগপাশ থেকে মুক্তিলাভ করলেন। শেষনাগকেও বোধ হয় তাঁর বাৎসরিক খোলস থেকে মুক্ত হতে এতখানি মেহন্নৎ বরদাস্ত করতে হয় না।

‘ফেনসিঙের। সিনেমাতে দেখ নি, লম্বা সরু লিকলিকে তলওয়ার দিয়ে একে অন্যের কলিজা ফুটো করার পাঁয়তারা কষে? পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তলওয়ার নাকের কাছে এলেও ইনি পিছু-পা তো হনই নি, মাথাটা পর্যন্ত পিছনের দিকে ঠেলে দেন নি। প্রত্যেকটি কাটতে ক’টা ষ্টিচ লেগেছিল ওঁকে শুধোতে পারো।’

আমি বললুম, ‘উনি না দর্শনের অধ্যাপক!’

‘হ্যাঁ, কিন্তু ওঁর বাপ-পিতামো ছিলেন কট্টর প্রাশান ঐতিহ্যের পাঁড় জেনারেল গুষ্টি। তাঁদের বর্মের মত শক্ত হৃদয় ভেঙে ইনি দর্শনের অধ্যাপক হয়ে গেলেন। কৈশোরে বোধ হয় সে মতলব ছিল না। তাই দুঁদে দুঁদে ফেনসারদের চেলেঞ্জ করে এসব অস্ত্র-খেলার কলেক্‌শ্‌ন্‌ আপন মুখে নিয়ে বাকী জীবন দর্শন পড়াচ্ছেন। তাইতে বাপ-দাদার ততোধিক মনস্তাপ যে, এমন পয়রানম্বরী তলওয়ারবাজ হয়ে গেল মেনিমুখো মেষ্টার-মেলের একজন।’

আমি বললুম, ‘পেন্‌ ইজ মাইচিয়ার দেন সর্ড!’

‘ছোঃ! ভদ্রলোক জীবনে এক বর্ণ কাগজে কলমে লেখেন নি—সাত ভলুমি কেতাব দূরে থাক, এক কলমের প্রবন্ধ পর্যন্ত না। কলমই ওর নেই। বোধ হয় টিপসই দিয়ে—’

অধ্যাপক ছাদ-ছোঁয়া গ্যালারির উপর-নিচ ডান-বাঁ’র উপর চোখ বুলিয়ে আরম্ভ করলেন—ওঃ, সে কি গলা! যেন নাভিকুণ্ডলী থেকে প্রণবনাদ বেরুচ্ছে, মাইনে ডামেন্‌ উন্‌ট্‌ হেরেন্‌।’—‘আমার মহিলা ও মহোদয়গণ!’ তার পর গলা নামিয়ে বিড়বিড় করে বললেও সমস্ত ক্লাসই শুনতে পেল—‘আস্ত একটা গাধা—’

আমার তো আক্কেল গুড়ুম। রেকটর যিনি কিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বময় কর্তা, তাঁকে গর্দভ বলে উল্লেখ করা—তা সে বিড়বিড় করেই হোক আর রাসভকণ্ঠেই হোক—এ যে অবিশ্বাস্য!

অধ্যাপক বলে যেতে লাগলেন, ‘রেকটরকে আমি অনুরোধ জানালুম, আমাকে এই টার্ম থেকে নিষ্কৃতি দিতে। অর্বাচীন বলে কিনা, আমাকে না হলে তার চলবে না। এ উত্তর আমি ইতিপূর্বেও শুনেছি। তার পূর্বের রেকটর—’ আবার বিড়বিড় করলেন, ‘বলদ, বলদ! স্রেফ বলদ—তাকেও আমি একই অনুরোধ করেছিলুম, এবং একই উত্তর পেয়েছিলুম। তার পূর্বের রেকটর—কিন্তু কাহিনী সম্প্রসারিত করার প্রয়োজন নেই—এবং তার পূর্বেরও সবাই একই উত্তর দেয়। বস্তুত, মাইনে ডামেন্ উন্‌ট্‌ হেরেন্, গত বাইশটি বৎসর ধরে আমি এই একই উত্তর শুনে আসছি। মনে হচ্ছে, অরিজিনালিটি রেকটর সম্প্রদায়কে এড়িয়ে চলেন। তা সে যাক, তাদের বক্তব্য, আমাকে ছাড়া চলবে না, আমি ইনডেস্‌পেন্‌সিবল!’

এবারে তিনি স্বয়ং সিন্ধী বলদের মত ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘তবে কি সাতিশয় সন্তাপের সঙ্গে স্বীকার করতে হবে, জার্মানি এমনই চরম অবস্থায় পৌঁছেছে যে, এদেশে আর দার্শনিক নেই? কিন্তু এই আমার শেষ টার্ম। আমি মনস্থির করে ফেলেছি। তারপর চোখ বন্ধ করে খুব সম্ভব প্রথম বক্তৃতায় প্রথম কি বস্তু দিয়ে আরম্ভ করবেন তার চিন্তা করতে লাগলেন। উরজুল আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিস্‌ফিস্‌ করে বললেন, ‘তাঁর শেস টার্ম! এ ভয় তিনি নিদেন পঁচিশ বচ্ছর ধরে দেখাচ্ছেন—প্রতি টার্মের গোড়ায়।’ বুড়ার চোখ বন্ধ হলে কি হয়, কান দিব্য সজাগ। চোখ খুলে বললেন, ‘নো, আবার নো। এই আমার শেষ টার্ম—কেউ ঠেকাতে পারবে না।’

তার পর গ্রীক দর্শন নিয়ে আরম্ভ করলেন। তাঁর পড়াবার পদ্ধতি অনুকরণ করা অসম্ভব। কারণ, তাঁর পড়ানোটা সম্পূর্ণ নির্ভর করতো তাঁর স্মৃতিশক্তির উপর। যে স্মৃতিশক্তি বিধিদত্ত। কোন্‌ সালের কোন্‌ বইয়ের, কোন্‌ অধ্যায়ে, এমন কি মাঝে মাঝে কোন্‌ পাতায় কি তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে সেণ্টেন্স স্বয়ংসম্পূর্ণ। ভাষা সরল। এবং মাঝে মাঝে প্লাতো, আরিস্ততল বোঝাতে গিয়ে হঠাৎ মারেন দু’হাজার বছরের ডুব-সাঁতার। এ যুগের কে তার সর্বোত্তম ব্যাখ্যা করেছেন, কোথায়, কোন্ পরিচ্ছেদে—তার সবিশদ বর্ণন। আমি হতভম্ব।

ঘণ্টা পড়তে আস্তে আস্তে উঠলেন। ফ্রলাইন উরজুল তাঁকে পুনরায় ওভারকোট পরিয়ে দিলেন। ধীরে মন্থরে করিডরে নামলেন।

আমি উরুজুলকে বললুম, ‘এ কী কাণ্ড! গণ্ডাখানেক রেকটরকে ইনি গাধা-বলদের সঙ্গে—?’

‘ওঃ! এরা সবাই এসব জানেন। এঁরা সবাই তাঁর ছাত্র।’

‘ওঁকে ছুটি দেয় না কেন?’

‘সক্কলেরই বিশ্বাস, সঙ্গে সঙ্গে তিনি পটল তুলবেন বলে। মাধ্যাকর্ষণ নয়, দর্শনাকর্ষণ তাঁকে ইহলোকে আটকে রেখেছে।’…

এখানে রোল-কল হয় না। টার্মের গোড়াতে ও শেষে আপন আপন ‘ষ্টুডেণ্টস বুকে’ অধ্যাপকের নাম দু’বার সই করিয়ে নিতে হয়।

গোড়ার দিকে ভিড় ছিল বলে হাল্কা হলে পর আমি আমার ‘বুক” নিয়ে পাতলুম। এযাবৎ অন্য কারো সঙ্গে তিনি বাক্যবিনিময় করেন নি। আমাকে দেখে চেয়ারে আরামসে হেলান দিয়ে বললেন, ‘আঃ! বাঃ বাঃ! তার পর? আচ্ছা। বলুন তো আপনি কি জর্মন বেশ বুঝতে পারেন?’

আমি বললুম, ‘অল্প, অল্প।’

‘বেশ, বেশ। তা—তা, আপনি কোন্‌ দেশ থেকে এসেছেন?’

‘ইণ্ডিয়া।’

কেন যে এতখানি তাজ্জব হয়ে তাকালেন বুঝতে পারলুম না। বললেন, ‘ইণ্ডিয়া? কিন্তু ইণ্ডিয়াই তো দর্শনের দেশ। আপনি এখানে এলেন কেন?’

সবিনয় বললুম, ‘নিশ্চয়, কিন্তু আধুনিক দর্শনে জর্মনির সেবা ও দান তো অবহেলার বিষয় নয়।’

কী আনন্দে, কী গর্বে অধ্যাপকের সেই কাটাকুটি-ভরা মুখ যে প্রসন্ন হাস্যে ভরে গেল, সেটি অবর্ণনীয়। শুধু মাথা দোলান আর বলেন, ‘বস্তুত তাই, প্রকৃতপক্ষে তাই।’

এবারেও যখন তিনি ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করলেন তখন আমি যেন ‘তুমি’ শুনতে পেলুম। তাঁর বিরাট সাদা মাথাটা আমার দিকে ঠেলে কাছে এনে বেদনা-ভরা গলায় বললেন, ‘কিন্তু জানো, ভারতীয় দর্শন—অবশ্য সব দর্শনই দর্শন—শেখবার সুযোগ আমি পাই না। ব্যাপারটা হয়েছে কি, আমার যৌবনে ভারতীয় দর্শনের জর্মন-ইংরেজি অনুবাদ পড়তে গিয়ে দেখি সব পরস্পরবিরোধী বাক্যে পরিপূর্ণ। আমি বললুম, “এ কখনই হতে পারে না। ভারতের জ্ঞানী ব্যক্তিরা এরকম কথা বলতে পারেন না। যাঁরা অনুবাদ করেছেন তাঁরা কতখানি জর্মন জানেন জানি নে, কিন্তু দর্শন জানেন অত্যল্প, এবং ভারতীয় দর্শনে তাঁদের অপরিচিত যে দৃষ্টিভঙ্গি, দৃষ্টিকোন সেটা আদৌ বুঝতে পারেন নি।” ছেড়ে দিলুম পড়া, বিরক্তিতে। কিন্তু জানো, বছর দশেক পূর্বে আমার ছাত্র—তিনি রেকটরের নাম করলেন—‘অমুক—ভারী ব্রিলিয়াণ্ট ছেলে—আমাকে বললে, এখন নাকি কম্পিটেণ্ট অনুবাদ বেরুচ্ছে। কিন্তু ততদিনে আমি বড্ড বুড়িয়ে গিয়েছি। নূতন করে নূতন “স্কুলে” যাবার শক্তি নেই। বড় দুঃখ রয়ে গেল।’

আমি একটু ভেবে যেন সান্ত্বনা দিয়ে বললুম, ‘তার জন্য আর অত ভাবনা কিসের, স্যর? হিন্দুরা পরজন্মে বিশ্বাস করে। আপনি এবারে জন্ম নেবেন কাশীর কোন দার্শনিকের ঘরে।’

এবারে তাঁর যে কী প্রসন্ন অট্টহাস্য! শুধু বলেন, ‘ঐ তো! এ তো! বাঃ, বাঃ! বেশ, বেশ! যাক, শেষ দুশ্চিন্তা গেল।’

তারপর শুধালেন, ‘বক্তৃতা সব বুঝতে পারো তো?’

আমি বললুম, ‘আজ্ঞে, জর্মন ভালো জানি নে বলে মাঝে মাঝে বুঝতে অসুবিধে হয়।’

অধ্যাপক বললেন, ‘তখন হাত তুলো; আমি সব ভালো করে বুঝিয়ে বলবো।’

আমি কাঁচু-মাঁচু হয়ে বললুম, ‘আমার জর্মন জ্ঞানের অভাববশত সমস্ত ক্লাস সাফার করবে—এটা কেমন যেন—’

গুরু গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বললেন—প্রত্যেকটি শব্দ যেন আমার বুকের উপর হাতুড়ি দিয়ে ঠুকে ঠুকে—‘আমি একশজনকে পড়াবো না একজনকে পড়াবো, কাকে পড়াবো আর কাকে পড়াবো না, সেটা স্থির করি একমাত্র আমি।’

আমার দুর্ভাগ্য, আমি খুব বেশী দিন তাঁর কাছ থেকে শিক্ষালাভের সুযোগ পাই নি। পরের টার্মেই ওপারে চলে যান।

তারপর প্রায় ৩৫ বৎসর কেটে গিয়েছে।

আমার ব্যক্তিগত সংস্কার যে, সৃষ্টিকর্তা মানুষকে পৃথিবী নামক জায়গাটিতে একবারের বেশী দু’বার পাঠান না। একই নিষ্ঠুর স্থলে একাধিক-বার পাঠিয়ে একই দণ্ড দেওয়ার মধ্যে কোন বৈদগ্ধ্য (রিফাইনমেন্ট) নেই। তবু যখন কোনো যুবাজনের মুখে ভারতীয় দর্শন সম্বন্ধে আলোচনা শুনে মনে হয়, এ-তরুণ এর কিছুটা গভীরে ঢুকতে পেরেছে, তখন আপন অজান্তে তার চেহারায় জর্মনগুরুর বিরাট কাটাকুটি-ভরা, হাঁড়াপানা চেহারার সাদৃশ্য খুঁজি।