একবার একটা পাখি আমার যে কী উপকার করেছিল শুনলে তুমি অবাক হয়ে যাবে। যে-খাতাটায় আমি যে-পাখি যখন যা বলে সব লিখে রাখি, আমার সেই খাতাটা একদিন ঝড়ে উড়ে গেল।
সেদিন দুপুর থেকে লোডশেডিং। তার ওপর কোথাও একটু হাওয়া নেই। গাছপালা সব থম মেরে আছে। অসহ্য গরম। পাশের বাড়িতে একটা বাচ্চা গলা ছেড়ে কাঁদছে। তার মা তাকে ‘আয় পাখি ল্যাজঝোলা, খেতে দেবো দুধকলা’ এইসব বলে ভোলাবার চেষ্টা করছে, এমন সময় ওদেরই বাড়ির পাঁচিলে বসে একটা পাখি ডেকে উঠলো, ‘কান্না না কাটি না, ঝগড়া না ঝাঁটি না। চুপ খোকা, চুপ খোকা, মুখে আর রা-টি না!’ শুনে তো আমি অবাক। তক্ষুনি খাতা টেনে নিয়ে লিখতে বসে গেলাম।
পাখিদের নিয়ে অনেক ছড়া শুনেছি, আমিও দুয়েকটা বানিয়ে-বানিয়ে লিখেছি, কিন্তু পাখির মুখে কেউ কখনো ছড়া শুনেছো? দিব্যি সুর করে-করে ছড়া কাটছে আর মাঝে-মাঝে হঠাৎ একটুখানি থেমে যাচ্ছে। কী ব্যাপার? জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখি- মাঝে মাঝে ছড়া থামিয়ে ঠোঁট দিয়ে পালক পরিষ্কার করছে। এপাশ-ওপাশ ঘাড় বেঁকিয়ে শরীর গোল করে মুখটাকে একেবারে ল্যাজ অব্দি নিয়ে যাচ্ছে। লম্ব্যা ল্যাজ। তাতে গাঢ় বেগুনি রঙের পাশাপাশি হলদে আর হালকা বেগুনি। পাখিটা দেখলাম খুব মনোযোগ দিয়ে ল্যাজের পালক ঠিক করছে। মাথার ঝুঁটিতে কিন্তু কিছু করছে না। ঠোঁট দিয়ে তো আর ঝুঁটি ছোঁয়া যায় না। ধবধবে সাদা আর কুচকুচে কালো রঙের ঝুঁটিটা কী যে সুন্দর দেখাচ্ছে কী বলবো।
ছেলেটা গরমে কেঁদে চলেছে। তার মাও তাকে পাঁচিলের পাখিটা দেখিয়ে কত কী বলে ভোলাবার চেষ্টা করছে। একবার বলছে, ওই দ্যাখ ন্যাজঝোলা পাখি। ওটা নিবি? ওমা কী সুন্দর ঝুঁটি রে! আবার বলছে, আয় তো আয় ল্যাজঝোলা, খেতে দেবো দুধকলা, আমার খোকাকে নিয়ে কর খেলা। এইরকম কত কথা যে বলে যাচ্ছে তার ঠিক নেই। খোকা পাখিটাকে দেখতে দেখতে একবার একটু কান্না থামায়, তারপর আবার যে কে সেই। মা-ও আবার সুর ধরে, আয় তো আয় ল্যাজঝোলা। মায়ের কথা শুনে পাখিটাও নতুন করে ছড়া কাটে- কান্না না কাটি না, ঝগড়া না ঝাঁটি না। চুপ খোকা, চুপ খোকা, মুখে আর রা-টি না!
খোকা কিংবা খোকার মা তো আর পাখিটার কথা বুঝতে পারছে না। সবাই কি আর পাখির ভাষা বোঝে!
আমিও ওই ‘কান্না না কাটি না’, এইসব লিখে বসে বসে পাখিটার কান্ড দেখছি আর ভাবছি ছড়াটার আর দুচার লাইন কি বলবে না?
হঠাৎ দেখি বাচ্চার কান্না থেমে গেছে। হয়তো কাঁদতে-কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে। যাই হোক কান্না থামা মাত্র পাখিটা পাঁচিলের ওপর ল্যাজ বাঁচিয়ে সাবধানে দু-তিন বার নেচে নিয়ে বলে উঠলো, ন্যাজঝোলা, ঝুঁটিওলা, কই দাও দুধকলা।
কথাগুলো তক্ষুনি লিখে নিয়ে মুখ তুলে দেখি, বাচ্চাটা তার মায়ের কোলে চড়ে তাদের জানলার কাছে এসে একহাতে জানলার গ্রিল ধরে ঝুঁকে পাখিটাকে খুব দেখছে। ঘুমোয়নি তাহলে! বাচ্চারা কি পাখির ভাষা বোঝে? কে জানে! তার মা কিন্তু পাখিটা কী বলছে কিছুই বোঝেনি। পাখিটাকে দেখিয়ে বলল, ওমা, কীরকম কিচির-মিচির লাগিয়েছে দ্যাখ।
কলম রেখে এইসব দেখছি আর পাখি ও মানুষকে নিয়ে নানা কথা ভাবছি, হঠাৎ দুদ্দাড় শব্দে দারুণ ঝড়! ঝোড়ো হাওয়া ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে সব তছনছ ক’রে, যাবার সময় আমার খাতাটাকে জানলা দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে গেল।
ওই খাতায় কতদিনের কত পাখির কত লেখা আছে। সেই খাতা ঠিক একটা বড়ো পাখির মতন ফরফর করতে করতে উড়ে গেল দেখে আমি আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না। ঝড়ের মধ্যেই দরজা খুলে খাতার খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম।
ঝোড়ো হাওয়ার ঝাপটার সঙ্গে ধুলো-কাঁকর এসে চোখে বিঁধছে। ভালো করে চোখ মেলাই ভার। একে তো ঝড়-টড় হলে বিকেলটাকেই মনে হয় সন্ধে, তার ওপর খাতা খুঁজতে খুঁজতে সত্যিকার সন্ধে হয়ে গেল। ঝড়ে, অন্ধকারে, হায়, আমার সেই খাতা এখন কোথায়!
দেখতে দেখতে ঝমঝম করে বৃষ্টি। এমনিতেই খুব বৃষ্টি হলে মানুষের কেন যেন কান্না পায়। তার ওপর ওই খাতা হারিয়ে আমার মনের যে কী অবস্থা, কাউকে বলে বোঝানো যায় না।
বৃষ্টিতে একদম চান করে দৌড়তে দৌড়তে বাড়ি ফিরছি, হঠাৎ ‘খাতা নিন’ শুনে আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম।
একটা জবাফুল গাছের ডালে একটা পাখি দুপাশের ডানা মেলে আমার খাতাটাকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছে। সে-ই ‘খাতা নিন খাতা নিন’ বলে ডাকছে। কোন পাখিটা, জানো? সেই যে মাথায় ঝুঁটি ল্যাজঝোলা। পাশের বাড়ির পাঁচিলে বসে বলছিল- কান্না না কাটি না, ঝগড়া না ঝাঁটি না, সেইটা।
খাতাটা ওইভাবে ফিরে পেয়ে আমার যে সেদিন কী আনন্দ হলো কী বলবো। আর সেই পাখিটার কথা ভাবো তো। নিজে বৃষ্টিতে ভিজে আমার খাতাটাকে ওভাবে না বাঁচালে আর কি আমি পাখির গল্প লিখতে পারতাম! অতো বৃষ্টিতে খাতাটা কিন্তু একটুও ভেজেনি। ডানা দিয়ে ঢেকে রেখেছিল কিনা!