পাখীর গল্প

মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়

এক বুড়ির এক পাখী ছিল। পাখীটা এমনি পোষা যে তাকে খাঁচা থেকে ছেড়ে দিলেও সে উড়ে পালাত না। বুড়ি তাকে রোজ সকাল সন্ধ্যায় একবার করে ছেড়ে দেয়। সে মনের সুখে নীল আকাশে উড়ে যায় ও বনে গিয়ে ফল খায়; আর ফিরবার সময় বুড়ির জন্যে ঠোঁটে করে একটি পাকা ফল, কিংবা একটি রাঙা ফুল নিয়ে আসে। চোরের ভয়ে বুড়ি রাতের বেলা তাকে খাঁচা-বন্ধ রেখে দেয়।

সেই পাড়ায় এক ধোপানী ছিল। সে ভারি রাগী আর হিংসুটে। একদিন সে কাপড় কাঁচবার ক্ষার রোদে দিয়েছে, এমন সময় পাখীটা কোথা থেকে উড়ে এসে সেই ক্ষার টুপটুপ করে খেতে আরম্ভ করল। ধোপানী ছিল ঘরের ভিতরে, বাইরে এসে দেখে এই ব্যাপার! চটে আগুন! ছুড়ে মারল একটা গামলা। একটা ডানায় যা লাগল!

মানুষের উপর পাখীর ভারি অভিমান হল! জখম ডানাটা নিয়ে মনের দুঃখে সে বনের মধ্যে উড়ে গেল, আর বুড়ির কাছে ফিরল না।

বুড়ি বসে বসে ভাবছে—এই পাখী এল, এই পাখী এল। কিন্তু পাখী আর আসে না।

সন্ধ্যা গিয়ে রাত হল, বুড়ি ভাবল—কী হল? পাখী কেন আসে না? খুট করে একটু শব্দ হয়, বুড়ি মনে করে—ওই এল! মুখে বলে, কই রে এলি?

হুস করে একটু বাতাস বয়ে যায়। বুড়ি ভাবে এইবার ঠিক এসেছে। অমনি ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, কিন্তু দেখে, পাখী নেই। এমনি করে সমস্ত রাত বুড়ি ঘর আর বার করল—চোখে ঘুম নেই। সকাল হয়ে এল। তবু পাখীর দেখা নেই। বুড়ি তখন বুড়োকে ডেকে বলল, ওগো চলো, একবার বনের মধ্যে পাখীটার খোঁজ করি।

বুড়ো ভালো করে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। লাঠির উপর ভর দিয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সে বেরোল। বুড়ি তার পিছু পিছু চলল। গ্রাম ছাড়িয়ে মাঠ, মাঠ ছাড়িয়ে নদী, নদী পেরিয়ে বন। তারা দুজনে হেঁটে হেঁটে সেই বনের মধ্যে এসে পৌঁছল।

বনের মধ্যে বড় বড় কত গাছ, গাছের আগডালে পাখীর কত বাসা। কোন খোপে তাদের পাখীটি লুকিয়ে আছে কে জানে! বনের মধ্যে যাকে দেখে, তাকেই বুড়ি জিজ্ঞেস করে, হ্যাঁ গা, বলতে পার আমার পাখীটা এদিকে এসেছে? সকলে বলে, কই বাপু, দেখিনি তো!

বুড়ো-বুড়ি খুঁজে খুঁজে হয়রান। পাখীর কোনো খবরই নেই। দুজনে তখন এক গাছতলায় গিয়ে বসল। সেই গাছের মাথায় পাখীদের একটা প্ৰকাণ্ড বাসা। সে যেন মস্ত একখানা বাড়ী। তার ভিতরে হাজার হাজার পাখী কলকল করছে। বুড়িকে ডেকে বুড়ো বলল, এত বড় প্রকাণ্ড বন—লাখো লাখো পাখী। তার মধ্যে তোমার পাখী কোথায় কে জানে? চলো ঘরে ফিরি।

বুড়ি বলল, পাখী না নিয়ে ফিরছি না!

বুড়ো তখন কী করে? বুড়িকে বলল, তবে তুমি বসো—আমি একটু খুঁজে আসি।

এই বলে বুড়ো লাঠি নিয়ে উঠল। মনে ভাবল, এ বনের মাঝে তো এত পাখী, তার একটা পাখী কোনো রকম করে ধরে বুড়িকে গিয়ে বলব, এই নাও তোমার পাখী! বুড়ি চোখে ভালো দেখে না—ঠাহর করতে পারবে না।

এক জায়গায় কতকগুলো ছানা-পাখী মাটি থেকে খুঁটে কী খাচ্ছিল। বুড়ো খপ করে গিয়ে তাদের একটাকে ধরে ফেলল। অন্য পাখীরা উড়ে গেল—কেবল একটা ছোট ছানা-পাখী বুড়োর হাতের ভিতর থেকে ট্যাঁ ট্যাঁ করে চ্যাঁচাতে লাগল।

সেই ছানা-পাখীর যে মা সে সেই সময় সেখান দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল, বাচ্চাকে মানুষের মুঠোর মধ্যে থেকে চ্যাঁচাতে দেখে সে আর স্থির থাকতে পারল না। বুড়োর কাছে তাড়াতাড়ি উড়ে এসে বলল, বাছাকে আমার ছেড়ে দাও; যা চাইবে তাই দেব।

বুড়ো বলল, হ্যাঁ? আচ্ছা, তবে আমাদের পোষা পাখীর বাসাটা দেখিয়ে দাও দিকি।

পাখী বলল, চলো।

বুড়ো পথের মধ্যে থেকে বুড়িকে ডেকে নিয়ে বলল, ওগো এসো, পাখীর খোঁজ পেয়েছি।

বুড়ো-বুড়ি চলল। পাখী পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। যেতে যেতে, যেতে যেতে, তারা শেষে পাখীর বাসায় এসে হাজির হল।

বুড়ো-বুড়ি দেখলে, বাসাটি বেশ ঝকঝাক তকতক করছে! কতরকম লতা, তাতে কত রঙের ফুল ফুটেছে তাই দিয়ে বাসাটি বাঁধা। তার উপর সবুজ পাতার ছাউনি।

বুড়ো-বুড়িকে দেখে পাখীর আনন্দ ধরে না! বন থেকে ঠোঁটে করে বয়ে একরাশ মিষ্টি ফল এনে দিল, ডানায় করে জল আনল। সেই ফল আর জল খেয়ে বুড়ো-বুড়ির প্রাণ ঠাণ্ডা হল।

পাখীর সব ছেলেপুলে নাতি-নাতনিরা বুড়ো-বুড়িকে ঘিরে কেউ নাচতে লাগল, কেউ গাইতে লাগল। তাদের সে আহ্লাদ দেখে কে! বুড়ি তাদের সকলকে আদর করে চুমু খেয়ে গায়ে হাত বুলিয়ে দিল। তারা আনন্দে ডানাগুলো ঝুটপুট করে নাড়তে লাগল।

বুড়ি পাখীকে বলল, চলো এইবার আমাদের সঙ্গে। পাখী বলল, আর না মা! মানুষের দেশে আর যাচ্ছি না। একটা সামান্য কারণে তারা রেগে যায়!

বুড়ি তো সব কথা জানে না! সে বলল, কী হয়েছে? কী হয়েছে?

পাখী তাকে তখন সব কথা খুলে বলল। বুড়ি শুনে বলল, ওমা তাই নাকি! তা তো জানতুম না! ধোপানীর এই কাজ! তার জন্যে আমরা এত করি—সে তোমার এই দশা করল। না বাছা, তুমি এইখানেই থাকো। আমি আর তোমাকে নিয়ে যাব না—কোনোদিন কে তোমার কী ভালোমন্দ করবে!

তারপর বুড়ি বলল, এখন তবে আসি?

পাখী বলল, সে কী কথা মা, এরই মধ্যে যাবে? আরও একটু বসো, জিরিয়ে নাও।

তারপর বুড়ো-বুড়ি যখন বাড়ী ফেরবার জন্যে উঠে দাঁড়াল, তখন পাখী বলল, শুধু হাতে তোমাদের ফিরতে দেব না। আমার বাড়ী যখন পায়ের ধুলো দিয়েছ তখন আমার কাছ থেকে কিছু প্ৰণামীও নিতে হবে। এই বলে পাখী বুড়ো-বুড়িকে সঙ্গে নিয়ে এক অজগর বনের মধ্যে প্ৰবেশ করলে।

বন ভারি অন্ধকার। সূর্যের আলো তার ভিতর যায় না। সেখানকার দিন কালো রাতের মতন অন্ধকার। সেখানে জনমানুষ নেই, বাতাস বয় না, খুট করে শব্দটি পর্যন্ত ওঠে না—সব নিস্তব্ধ! সারি সারি ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া গাছ যেন বড় বড় দৈত্য, পাথরের মতো অসাড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে— একটু কাঁপে না, হেলে না, নড়ে না।

সেই বনের মধ্যে গাছপালার ভিতরে লুকোনো পাথরে তৈরী একটা প্ৰকাণ্ড রাজবাড়ী। বাড়ীটা ভেঙে পড়েছে। পাখীটা তারই মধ্যে বুড়োবুড়িকে নিয়ে গেল। একটা ঘরে তোরঙ্গ ঠাসা—সে যে কত রকমের তার ঠিক নেই। কোনোটা চার-কোনা, কোনোটা আট-কোনা, কোনোটা পঁচিশ-কোনা, কোনোটা গোল, কোনোটা চৌকো, কোনোটা চ্যাপটা। কোনোটা ছোট, কোনোটা বড়। কোনোটা লোহার, কোনোটা কাঠের। কোনোটা বাঁশের, কোনোটা বেতের। কোনোটা লাল, কোনোটা নীল।

পাখী বলল, যেটা খুশি নাও।

বুড়ো-বুড়ি বলল, আমরা বুড়ো মানুষ; বড় বোঝা, ভারি বোঝা বইতে পারব না।

এই বলে দুজনে দুটো ছোট বেতের বাক্স পিঠে করে নিল।

বাড়ী এসে দেখে, বাক্স ভরা মোহর। যত তোলে ফুরোয় না—ভর্তিই থাকে।

পাখীর বাসা থেকে বুড়ো-বুড়ি সিন্ধুক-ভরা মোহর এনেছে, এই কথা যখন শুনল তখন সেই ধোপানীর ভারি হিংসে হল। সে তখন বুড়ির কাছে গেল, গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁ গা, পাখীর বাসাটা কোথা?

বুড়ি বলল, ওই বনের ভিতর। উত্তর-মুখে বরাবর গিয়ে ডানহাতি। ধোপানী তখনই চলল। গিয়ে গিয়ে পাখীর বাসায় হাজির ৷ যেমন তাকে দেখা অমনি পাখীরা সব উড়ে গিয়ে একেবারে গাছের আগডালে বসল। ধোপানী যত বলে—নেমে আয়, নেমে আয়, কেউ সেকথা শোনে না। ধোপানী ধান ছড়াল, চাল ছড়াল, তবু একটাও পাখী নেমে এল না। ধোপানী তখন বিনিয়ে বিনিয়ে কত কথা বলতে লাগল। বলল, বাছা, রাগের মাথায় একটা কাজ করে ফেলেছি, তার কি ক্ষমা নেই? আহা, বাছার ডানায় কতই লেগেছে! এসো বাছা, ডানায় একটু হাত বুলিয়ে দিই, একটু ওষুধ লাগিয়ে দিই,—আহা বাছা আমার কত কষ্টই পাচ্ছে!

ধোপানীর কথায় পাখীর মন গলে গেল। সে আগডাল থেকে নেমে এসে ধোপানীকে বসাল, খেতে দিল। ধোপানী ভাণ করে পাখীকে কত আদরই করল। তারপর ফিরে যাবার সময় বলল,—হ্যাঁ গা, আমায় কিছু দেবে না?

পাখী বলল, চলো-দিচ্ছি।

এই বলে তাকে সেই বনের মধ্যে সেই রাজবাড়ীর ভিতর নিয়ে গেল। নিয়ে গিয়ে বলল, এই দেখো কত তোরঙ্গ, যেটা খুশি নাও।

ধোপানী বেছে বেছে একটা ভারী দেখে প্ৰকাণ্ড তোরঙ্গ তুলে নিল। মনে ভাবল, এত বড় তোরঙ্গটার ভিতর না-জানি কত মোহর আছে! মাথায় করে বয়ে, সে অনেক কষ্টে সেই ভারী তোরঙ্গ বাড়ী নিয়ে এল। যেমন তার ডালা খোলা অমনি বড় বড় বিকটাকার কতগুলো দৈত্য তাকে ছিড়ে খেয়ে ফেলে আর কী! এমন সময় বুড়ো-বুড়ি এসে হাজির।

তাদের দেখে দৈত্যগুলো ভয়ে কেঁচো হয়ে সুড়সুড় করে তোরঙ্গের ভিতর ঢুকে পড়ল। বুড়ো-বুড়ি তাড়াতাড়ি তেরঙ্গের ডালা বন্ধ করে দিল। ধোপানীর প্রাণ বাঁচল। সেইসঙ্গে তার ঘাড় থেকে রাগ ও হিংসে নেমে গেল।