পাখির রামায়ণ

অমরেন্দ্র চক্রবর্তী

বর্ধমানের বার্নপুরে নেহরু পার্ক বলে একটা পার্ক আছে। আসল নাম লামার পার্ক। লামার নামে এক জার্মান সাহেব ওটা বানিয়েছিলেন। দামোদরের পাড়ে গোটা একটা গ্রামের মতন অনেকখানি জায়গা জুড়ে কী বিরাট আর কী সুন্দর ওই পার্ক। কতোরকম গাছ-গাছালি। পাথর দিয়ে বানানো ছোট-ছোট পাহাড়। কোথাও হ্রদ। কোথাও ফুলের মেলা। ঘুরতে ঘুরতে একবার মনে হয় কাশ্মীরে এলাম, একটু এগিয়েই মনে হয়- আরে, এ তো রাজস্থান! পার্কের এক-এক দিকে এক-একরকম।

দু-চোখ ভরে দেখে বেড়াচ্ছি, হঠাৎ শুনি, বুড়ো মতন একটা পাখি কান্না-কান্না গলায় বলে চলেছে, ‘হা রাম, হা লক্ষ্মণ! হা রাম, হা লক্ষ্মণ!’

মাথার ওপরে তাকিয়ে দেখি, একই ডালে অনেকগুলো পাখি ভিড় করে বসে আছে। এগুলো কী পাখি? আগে কখনো দেখি নি তো। একটা পাখি বললো- ‘কোথা যাস বাপ? বনবাসে বাপ? বনবাসে সাপ। বনবাসে তাপ।’

শুনে ছোট-ছোট দুটো পাখি ডাল ছেড়ে অল্প একটু উড়ে গিয়ে বললো, ‘পঞ্চকূট ওই, পঞ্চকূট ওই।’

আরেকটা পাখি, সে-ও ছোট্ট, বলে উঠলো, ‘তিনজনে যাই, ভিন বনে যাই।’

আমি এতোক্ষণে সব বুঝতে পারলাম। এ তো রামায়ণের গল্প! ওই বুড়ো পাখিটা দশরথ, আর ছোট তিনজন নিশ্চয়ই রাম লক্ষ্মণ সীতা! কিন্তু পাখিরা এসব জানলো কী করে? পাখি কখনো বই পড়তে পারে? তবে কি রামায়ণের রাম লক্ষ্মণ সীতা দশরথ সবাই এ-জন্মে পাখি হয়ে জন্মেছে?

ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখি, যে পাখিটা ‘কোথায় যাস বাপ?’ বলছিল, সে বলছে, ‘যাবি যদি, খাবি কী? যাবি যদি, খাবি কী?’

আরেকটা পাখি তার কথায় সায় দিয়ে বললো, ‘ফুল নাই, ফল নাই, পঞ্চকূটে পোকা নাই।’

ডালের শেষ মাথায় কুঁজো মতন, বিচ্ছিরি চেহারার একটা পাখি বসেছিল, বলে উঠলো- ‘কামরাঙা করমচা। কত আছে ফড়িং-ছা। যা না বাছা, আজই যা।’

এ নিশ্চয়ই কুঁজি-বুড়ি মন্থরা! এর জন্যেই তো রামকে বনবাসে যেতে হয়েছিল। দেখলাম, মন্থরার কথা শুনে এক সঙ্গে অনেক পাখি ‘না না, না না’- বলতে লাগলো, আর বুড়ো পাখিটা ঠোঁট দিয়ে নিজের বুক ঠোকরাতে-ঠোকরাতে শুধু হায়-হায় করতে লাগলো।

আমি তো অবাক। রামায়ণ কি তাহলে পাখিদেরই কাহিনী। বাল্ভমীকি পাখিদের এইসব ঘটনা দেখেই কি রামায়ণ লিখেছিলেন?

মাথার ওপর ডানা ঝাপটানোর শব্দে মুখ তুলে দেখি, তিনটে পাখি দামোদরের ওপারের দিকে উড়ে যাচ্ছে। সেখানে বিরাট একটা পাহাড় ঝাপসা নীল। এত দূর থেকে মনে হয় যেন কুয়াশার মধ্যে বিরাট একটা হাতি দাঁড়িয়ে আছে। আমার পাশ দিয়ে একটা মালী যাচ্ছিল। আমি বললাম- ‘ওটা কী পাহাড়?’

—‘ও তো পঞ্চকূট!’ বলে সে তার কাজে চলে গেল।

পঞ্চকূট? রামেরা তো চিত্রকূট পাহাড়ে গিয়েছিল। আর পঞ্চবটী বনে। রামায়ণ যদি আসলে পাখিদেরই গল্প, তাহলে ওই তিনটে পাখি পঞ্চকূটের দিকে উড়ে যাচ্ছে কেন? আর এই জায়গাটার নামও তো কই অযোধ্যা নয়, এ তো বর্ধমানের বার্নপুর!

পাখিদের রামায়ণ দেখে মানুষের রামায়ণ লিখতে বসে বাল্ভমীকি নিশ্চয়ই জায়গার নাম-টাম একটু-আধটু বদলে দিয়েছিলেন। এটা যে আসলে পাখিদেরই গল্প, পাছে কেউ বুঝতে পেরে যায়!