উরশিমার গল্প

মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়

উরশিমা জেলেদের ছেলে। সমুদ্রে ছিপ ফেলে মাছ ধরছিল। নীল জলের ঢেউয়ে তার নৌকাখানা হেলছে দুলছে আর উরশিমা চুপটি করে তার উপরে বসে আছে। রোজ সে এমনি করে ছিপ ফেলে মাছ ধরে। বাড়ি নিয়ে গিয়ে রেঁধে খায়। কিন্তু সেদিন হল কী? না, মাছ না উঠে বড়শির মুখে উঠল প্রকাণ্ড একটা কাছিম।

কাছিম কতদিন বাঁচে জানো? হাজার বছর।

উরশিমা একথা জানত, তাই সে কাছিমটি হাতে করে মনে মনে ভাবতে লাগল— আমার মাছ হলেও চলে, কাছিম হলেও চলে, বরং কাছিমের চেয়ে মাছটাই ভালো। এ তো হাজার বছর বাঁচে। আজ যদি একে ছেড়ে দিই, তবে বেচারা এখনও নয়শো নিরানব্বই বছর সমুদ্রের জলে সাঁতার কেটে খেলে বেড়াতে পারবে। নিজের পেট ভরাবার জন্য একে মেরে ফেলা ভালো নয়। এই কথা ভেবে উরশিমা সমুদ্রের কাছিম সমুদ্রেই ছেড়ে দিল।

কাছিমটা জলে পড়ে কোথায় মিলিয়ে গেল।

উরশিমা বসে বসে মাছ ধরছে। ধরতে ধরতে তার গা-টা কেমন এলিয়ে এল, চোখ ঢুলে পড়ল, হাত থেকে ছিপ খসে গেল। সমস্ত দিনের গরমের পর বিকেলের ফুরফুরে হাওয়া পেয়ে নৌকোর উপরে উরশিমা অকাতরে ঘুমিয়ে পড়ল।

কতক্ষণ পরে ঘুম ভেঙে হঠাৎ উরশিমা চেয়ে দেখে সামনে পাহাড়ের মতো একটা প্রকাণ্ড, কালো ঢেউ। সেই ঢেউয়ের উপরে পরীর মত এক অপরূপ সুন্দরী মেয়ে— যেন কালো মেঘের মাঝে বিদ্যুৎ! ঢেউটা ক্রমেই নৌকোর কাছে এল। মেয়েটি এসে নৌকোয় উঠল। উরশিমা অবাক হয়ে চেয়ে আছে। কোনো কথা বলতে পারছে না।

মেয়েটি তখন বলল, দেখো, এই যে সমুদ্র, এর যিনি রাজা আমি তাঁরই মেয়ে। ওই যে ওইখানে— ওই অনেক দূরে, বড় বড় ঢেউ দেখছ, ওরই ওপারে আমাদের বাড়ি; সেখানে আমার বাবা আর আমি থাকি। এই যে একটু আগে একটা কাছিম ধরেছিলে, সে কে জানো না বুঝি? আমিই— কাছিম হয়ে তোমার কাছে আসছিলুম। দেখছিলুম তুমি কেমন ছেলে, তোমার শরীরে দয়ামায়া আছে কি না,— তুমি আমায় মারো কি রাখো। বাবা তোমার কথা শুনে ভারি খুশি হয়েছেন। তোমাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যেতে বলেছেন। চলো তুমি আমার সঙ্গে। নীল ঢেউয়ের ওপারে আমাদের অজগর পুরী; সেইখানে আমরা দুজনে একসঙ্গে থাকব। আমার খেলার সঙ্গী কেউ নেই। তুমি আমার সঙ্গে খেলবে, আমার সঙ্গে বেড়াবে। আর আমায় বিয়ে কোরো,— সে বেশ হবে, না? চলো চলো আমরা যাই।

মেয়েটি এসে হাল ধরল, উরশিমা দাঁড় ধরল।

দুজনে মিলে নৌকো বাইছে। উরশিমা দাঁড়ই টানছে, দাঁড়ই টানছে, মেয়েটি হাল ধরে বসেই আছে, নৌকো ভেসেই চলেছে। এমনি করে তারা কতদূর চলে সেই অজগরপুরীর সামনে এসে থামল। সেখানে সে সমুদ্রের রাজা রাজত্ব করেন। মাছ, ব্যাঙ, কাছিম, হাঙর, কুমির, সাপ— আরও কত কী জানোয়ার তাঁর প্রজা।

উরশিমা চেয়ে দেখে, সে বড় মজার জায়গা। সেখানকার যে রাজবাড়ি তার প্রাচীর ইট-চুন-সুরকীর নয়, রগরগে প্রবাল দিয়ে তৈরী। সেখানকার গাছের পাতা ঝকঝকে হীরের। গাছের ফল ধবধবে মুক্তোর। মাছের ডানা চকচকে রূপোর। হাঙরের ল্যাজ টকটকে সোনার। পৃথিবীর মধ্যে যত ভালো ভালো সুন্দর সুন্দর জিনিস আছে, সব যেন একসঙ্গে মিলে সেই রাজপুরীটা গড়ে তুলেছে।

উরশিমা ভাবল, রাজকন্যাকে বিয়ে করলে এসব তো আমারই হবে। আনন্দে তার মন নাচতে লাগল।

রাজকন্যাকে বিয়ে করে উরশিমা সেই প্রবালের প্রাচীর-ঘেরা রাজবাড়ীর মধ্যে মনের আনন্দে আছে। সেই যে হীরের পাতা, মুক্তোর ফলগাছ, তারই তলে তলে দুজনে খেলে বেড়ায়। সোনালী রূপোলী মাছ ধরে। সোনার হাঙরের পিঠে চড়ে বেড়ায়।

এমন করে তিনটি বছর কেটে গেল।

একদিন উরশিমা স্ত্রীকে বলল, দেখো, এখানে খুব সুখে আছি বটে, কিন্তু বাপ-মা, ভাই-বোনেদের জন্য জন্যে বড় মন কেমন করছে। অনেকদিন তাদের দেখিনি। তুমি যদি ছেড়ে দাও তাহলে তাদের একবার দেখে আসি।

এই কথা শুনে তার স্ত্রী তাকে বলল, দেখো, যেতে ইচ্ছে হয় যাও। কিন্তু আমার এই ভয় হচ্ছে যে, এ জায়গা ছেড়ে গেলেই তোমার একটা বিপদ ঘটবে। তুমি বাপ-মাকে দেখে তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।

এই কথা বলে, রাজকন্যা ভাঁড়ার ঘর থেকে একটা তোরঙ্গ হাতে করে এনে বলল, এই নাও, এইটা সঙ্গে সঙ্গে রেখো, তাহলে তোমার কোনো বিপদ হবে না। কিন্তু খবরদার! এর ডালা কখনো খুলো না— তাহলেই মুশকিল। যদি খোলো, আমার কাছে আর ফিরে আসতে পারবে না কিন্তু।

উরশিমা তোরঙ্গ হাতে করে নিয়ে বলল, আচ্ছা। কক্ষনো খুলব না। আমি এখন আসি?

উরশিমা নৌকোয় উঠে নৌকো ছেড়ে দিল। রাজকন্যা উরশিমার দিকে, উরশিমা রাজকন্যার দিকে চেয়ে আছে, নৌকো ঢেউ ভেঙে ক্রমে দূরে চলেছে।

এমনি করে যেতে যেতে উরশিমা সেই পাহাড়ের মত ঢেউয়ের ওপারে চলে গেল। দুজনে দুজনকে আর দেখতে পেল না। রাজকন্যা তখন আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বাড়ি ফিরল।

আর উরশিমা তার স্ত্রীর কথা, সেই হীরের পাতা মুক্তোর ফল গাছের কথা ভাবতে ভাবতে নীল সমুদ্রের নীল নীল ঢেউ ভেঙে নৌকো চালাতে লাগল। শেষে নৌকো এসে তীরে ভিড়ল।

তীরে উঠে দেখে— এ কী ব্যাপার! সব উলট পালট। সে যেখানে থাকত, সে গ্রাম সেখানে নেই। যে কুঁড়েঘরখানিতে ঘুমোত, সেখানিও দেখা যাচ্ছে না। থাকবার মধ্যে আছে কেবল কুঁড়ের সামনে ছেলেবেলাকার সেই পাহাড়টা, আর তারই তলে সেই ছোট্ট নদীটি। আগেকার আর কিছুই নেই।

উরশিমা অবাক হয়ে গেল। কিছুই বুঝতে পারল না। এই তিন বছরের মধ্যেই কেমন করে সব বদলে গেছে, সেই কথা আশ্চর্য হয়ে ভাবতে লাগল।

দুজন অচেনা লোক সমুদ্রের তীর দিয়ে যাচ্ছিল। উরশিমা একটু এগিয়ে গিয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করল, —হ্যাঁগো, এইখানে যে উরশিমা-জেলের কুঁড়ে ছিল সেটা কী হল বলতে পার?

এই কথা শুনে লোকদুটো হো হো করে হেসে উঠে বলল, তুমি পাগল নাকি! ঠাকুরদার মুখে গল্প শুনেছি বটে যে তিন-চারশো বছর আগে উরশিমা বলে এক জেলে এখানে থাকত। একদিন সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। কোথায় গেল, কী হল, কেউ জানে না। তার বাপ-মা, ভাই-বোন, তাদের ছেলেপুলে অনেকদিন হল মারা গেছে। সে বংশের এখন আর কেউ নেই। তুমি কেমনতর লোক হে, যে সেই উরশিমার খোঁজ করো!

এই কথা শুনে উরশিমার খেয়াল হল, সেই যে দেশ, যে দেশে সেই অজগরপুরী— যার প্রাচীর প্রবালের, যেখানে হীরের পাতা, মুক্তোর ফলগাছ, সোনালী-রূপোলী মাছ, সোনার-ল্যাজ হাঙর সে দেশ কখনো মানুষের দেশ নয়, নিশ্চয় পরীর দেশ! সেখানকার একদিন হয়ত এখানকার তিনশো বছর!

উরশিমা এখন কী করে? যেখানে তার মা নেই, বাপ নেই, ভাই নেই, বোন নেই, আপনার লোক কেউ নেই, তেমন জায়গায় সে কেমন করে থাকে? আর কার কাছেই বা সে দাঁড়ায়? স্ত্রীর কাছে ফিরে যাই— এই মনে করে সে আবার নৌকোয় উঠল।

অপার সমুদ্র ধূ ধূ করছে। যেদিকে চায়, সেইদিকেই নীল জলের ঢেউ। সব যেন একাকার। অজগরপুরী কোথায় তার কোনো নিশানাই চোখে পড়ে না। অগাধ সমুদ্রে সে পথ হারিয়ে ফেলেছে। এখন কী করে? কী করে সে স্ত্রীর কাছে ফিরে যায়? কে তাকে পথ বলে দেয়?

সে ভেবে কিছুই ঠিক করতে পারল না। তখন তার মনে হল, স্ত্রী তাকে যে তোরঙ্গটি দিয়েছে হয়তো সেইটে খুললেই অজগরপুরীর একটা ঠিকানা পাওয়া যাবে।

তোরঙ্গটি যেমন খোলা অমনি তার ভিতর থেকে খানিকটা সাদা ধোঁয়া হুস্‌ করে বেরিয়ে, সমুদ্রের উপর দিয়ে মেঘের সঙ্গে মিশে গেল। তখন উরশিমার মনে পড়ল, আর সে স্ত্রীর কাছে ফিরে যেতে পারবে না। তখন তার কান্না পেতে লাগল। সংসারে কারোর কাছে দাঁড়াবার আর ঠাঁই নেই। সে হাত তুলে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কেঁদে কেঁদে সেই মেঘটাকে ফিরে ডাকতে লাগল। ইচ্ছে হচ্ছিল ছুটে গিয়ে ধরে আনে। কিন্তু সে মেঘ কোথায়? সে আকাশের মেঘের সঙ্গে মিশে এক হয়ে গেছে।

এই তোরঙ্গর ভিতর উরশিমার পরমায়ু আর তার জ্বর, কম্প, শোক, দুঃখ, তার দাঁত-পড়া, চুল-পাকা, রোগা-হওয়া, চোখে ছানি-পড়া, আরও কত কী উৎপাত হাঁড়ির ভিতর সাপের মত বন্ধ ছিল। আজ হঠাৎ খোলা পেয়ে সব উৎপাতগুলো উরশিমাকে চারিদিক থেকে ছেঁকে ধরল।

উরশিমার নধর শরীর দেখতে দেখতে রোগা হয়ে গেল, মুক্তোর মত দাঁতগুলি একে একে খসে পড়ল, মাথায় দু-একগাছা চুল যা রইল তাও পেকে যেন শনের নুড়ি হয়েছে। উরশিমা আর চোখে দেখতে পায় না, হাত কাঁপতে লেগেছে, কোমর ভেঙে পড়েছে, তবু সে প্রাণপণে নৌকো বেয়ে চলেছে। ওই সামনে পাহাড়ের মত কালো ঢেউ।

দূরে ওই অজগরপুরীর সোনার চুড়ো দেখা দিয়েছে। ওই না রাজকন্যার মত কে ছাদের উপরে? উরশিমা আর ভালো দেখতে পাচ্ছে না, তার দুটি চোখেই ছানি পড়ে গেছে, আর দাঁড় টানবার শক্তি নেই, জ্বর কম্প দিয়ে এসে ধরেছে, প্রাণ যায়।

উরশিমার নৌকো বিনা পালে স্রোতের মুখে ভেসে চলল। আর একটু গেলেই অজগরপুরীর বাঁধা ঘাট। সেই ঘাটে রাজকন্যা এসে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু নৌকোটা আর চলতে চায় না।

উরশিমার নৌকোখানাও দেখতে দেখতে হঠাৎ কতকালের পুরোনো হয়ে পড়ল,— তার রশারশি এলিয়ে গেল। কাঠগুলো ঘুন ধরে ফোঁপরা হয়ে উরশিমার জীর্ণ তরী রাজপুরীর ঘাটের কাছে এসে বানচাল হল। পোড়া কাঠখানার মতো উরশিমার জীর্ণ দেহ সেই অতল সমুদ্রের কোথায় তলিয়ে গেল! আর অজগরপুরীতে ফিরে আসা হল না।