‘ইজরায়েল বিশ্বের প্রবাদ-সত্য রূপে গণ্য হবে’
—বাইবেল
ঘরে ঢুকতেই বললেন, এদিক এসো। অসাধারণ পণ্ডিত লোক। আমি তাঁকে বড্ডই শ্রদ্ধা করি, বলতে কি, ভালবাসি। তিনিও আমাকে স্নেহ করেন। সত্যকার পণ্ডিত কখনোই মুর্খকে অবহেলা করে না।
ঘরে আর কেউ নেই। তবু তিনি ফিসফিস করে বললেন, তোমরা কাল বৌদ্ধধর্মের সৃষ্টিরহস্য নিয়ে আলোচনা করছিলে না?
‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
‘তা তোমার আটকাচ্ছিল কোথায়?’
‘আজ্ঞে, আমি শুধাচ্ছিলুম আল্লা যদি না-ই থাকবেন তবে এই দুনিয়াটা পয়দা করলে কে? আপনারাও তো—’
বাধা দিয়ে বললেন, ‘আমাদের কথা বাদ দাও...তোমার মুশকিলটা কোথায় সেইটে খুলে কও।’
‘শরণঙ্করসাধু’ হীনযানপন্থী বৌদ্ধ: সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন না। তিনি বলছিলেন, সৃষ্টির আদিও নেই অন্তও নেই। অতএব সৃষ্টিকর্তারও প্রয়োজন নেই। তারপর বললেন, যদি তর্কস্থলে ধরেও নেওয়া হয় সষ্টিকর্তা আছেন, তবুও তো শেষ সমস্যার সমাধান হয় না। প্রশ্ন উঠবে, সৃষ্টিকর্তাকে সৃষ্টি করলেন কে? শুনুন আজগুবী কথা! তারপর তিনি তাঁর গেরুয়া আলখাল্লার ভিতর থেকে নোটবুক বের করে আঁকলেন একটা চক্কর—সার্কল। বললেন এই সার্কলের যেমন কোনও জায়গায় আরম্ভ নেই, শেষও নেই, সৃষ্টিও হুবহু তেমনি। তারপর আপনি ঘরে ঢুকলেন। পাছে আপনাকে ডিস্টার্ব করা হয় তাই আমরা আরো খানিকক্ষণ ফিসফিস করে কথা বলার পর উনি চলে গেলেন।
ওরিয়েণ্টাল সেমিনারি অর্থাৎ প্রাচ্য বিদ্যায়তন। তারই একটা কামরায় আমরা তিনজন কাজ করি। একজনের বিষয়বস্তু ইরানী ফাইয়াঁস-পর্সেলিন—বিশ্বকলাসৃষ্টিতে তাঁর স্থান। অন্যজন বাইবেলের ওল্ড-টেষ্টামেণ্টের হীব্রু পাঠের নয়া সম্পাদনা করেছেন। আর আমি—তা সে যাকগে। দুজনাই বছর দশেক পূর্বে সর্বোত্তম শ্রেণীর ডক্টরেট নিয়েছেন; একজন আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
শুধোলেন, ‘চক্কর এঁকে সাধু বললেন সৃষ্টি এরই মত আদি অন্তহীন। তা এতে আবার দুর্বোধ্য কি আছে? তবে হ্যাঁ, আরো সোজা করে বলা যেতে পারতো। আচ্ছা, স্কচদের বিশেষত্ব কি—অন্তত তাদের কোন বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশ্বের লোক হাসিঠাট্টা করে?’
এক গাল হেসে বললাম, ‘সে আর বলতে! কিপ্টেমী!’
‘বিলক্ষণ! সেই গল্পটা জান তো—লণ্ডনের এক ইংরেজ কোম্পানি স্কটল্যাণ্ডের এবার্ডীন শহরে খুললে ট্রামওয়ে। হাড়কিপ্টে স্কচরা ট্রাম চড়বে না কিছুতেই। কোম্পানি লাটে ওঠার উপক্রম। তখন লণ্ডন থেকে পাঠানো হল স্পেশালিস্ট—তাঁকে বের করতে হবে দাওয়াই, স্কচকে কি প্রকারে ট্রামে ঢোকানো যায়। তিনি এবার্ডীনে এসেই ট্রাম ভাড়া থ্রাপেন্স থেকে এক ঝটকায় এক পেনি কমিয়ে দিলেন টাপেন্স। পরের দিন তাঁর আপিসের সামনে মহাপ্রলয়ের ভিড়। তিনি তো ড্যাম গ্লাড—নিশ্চয়ই তাঁকে ধন্যবাদ জানাতে এসেছে, ভাড়া কমিয়ে দেবার জন্য। ইয়াল্লা, তওবা, তওবা! এরা যে তাঁরই জানলা তাগ করে পচা ডিম হাজা টমাটো ছুঁড়ছে আর চীৎকার করছে, “কোত্থেকে এসেছে এই নচ্ছার, আগে আমরা পায়ে হেটে, ট্রাম ভাড়ার তিন পেনি বাঁচাতে পারতুম, এখন কুল্লে দু’পেনি! নিকালো রাস্কেলকো এবার্ডীনসে।” আচ্ছা, হলো। এবার বলো তো ইহুদিদের বৈশিষ্ট্য কি? পারলে না? আমিই বলছি, হুবহু একই গাধার এ-কান ও-কান। কিপ্টেমীতে।’
ইহুদিদের কিপ্টেমী সম্বন্ধে আমি কোনো গল্প জানি নে, অতখানি বে-খবর বেরসিক আমি নই, কিন্তু বিশেষ কারণে আমি চুপ করে রইলুম। সে-কারণ একটু পরে পাঠক নিজের থেকেই বুঝে যাবেন।
তিনি বলে যেতে লাগলেন, ‘একবার এক ইহুদি আর স্কচে ঝগড়া লেগেছে, কে কতক্ষণ ধরে ডুবসাঁতার দিতে পারে—দু’জনা দুই সুইমিং পুলে কাজ করতো আর দুই পলের মধ্যে ছিল উৎকট রেষারেষি। শেষ পর্যন্ত বাজি ধরা হল এক শিলিঙ। বাজে লোকের কৌতূহল এড়াবার জন্য তারা নদীর এক নিভৃত জায়গায় দিল ডুব।’
তিনি চুপ মারলেন, আমি ভাবলাম, ওস্তাদ কথকের মত তিনি পজ্ দিয়েছেন আমার মনের উপর গল্পটা কি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে সেইটে দেখবার জন্য। কিন্তু কই? তা তো নয়। তিনি দেখি, পকেট থেকে ছুরি বের করে আপন মনে দিব্য পেনসিল কাটতে আরম্ভ করেছেন। তখন থাকতে না পেরে আমি শুধোলুম, তারপর?
উদাস সুরে বললেন, কি করে বলবো ভাই কও। দু’জনার কেউই তো উঠলো না জলের তলা থেকে।’ তারপর হন্তদন্ত হয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, ভাগ্যিস তারা বাজিটা পাকাপোক্ত করার জন্য তাদের এক উকীল বন্ধুর কাছে কাগজ-কলমে লিখিয়ে নিয়ে—অবশ্য সবকুছ মুফতমে—তারই জিম্মায় রেখে এসেছিল; নইলে শহরের লোক কস্মিনকালেও জানতে পেতো না, এ দুটো শান্ত, অজাতশত্রু, লোক হঠাৎ ইহসংসার থেকে কি করে কপ্পুর হয়ে গেল। হুঁ! এক শিলিঙ—বাপরে! চাট্টিখানি কথা!’
‘কিন্তু—’
‘এর মধ্যে “কিন্তু” “but” “mais” “aber” কিছুই নেই, ভাই। কিন্তু সেই যে, অন্তহীন চিরচক্রের দৃষ্টান্ত দিলেন সিংহলের মহাস্থবির, বলছিলুম কিনা, সেটা আরো সোজা করে বলা যেতে পারতো। তাই তোমাকে পয়লা বাজিয়ে নিলুম। তুমি ইহুদি স্কচ সম্বন্ধে চালু গল্পগুলোর খবর রাখো কিনা। সবাই বলে, ওরিয়েণ্টালরা এবং বিশেষ করে ইণ্ডিয়ানরা নাকি সর্বক্ষণ মুখে গুমড়ো করে, নাসিকাগ্রে মনোনিবেশ করে আত্মচিন্তায় মগ্ন, রসকষের বালাই নেই। যতো সব! হ্যাঁ, অন্তহীন চিরচক্র সহজ করে বোঝাতে হলে বলতে হয়—স্কচ বিল শোধ করবে না আর পাওনাদার ইহুদিও তাকে ছাড়বে না। সে ধাওয়া করেছে স্কচের পেছনে। শহরটাও ছোট। তখন কি হয়? অন্তহীন চিরচক্র। এখনো যদি বুঝে না থাকো তবে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে কোনো ইহুদির দোকানে এপ্রেণ্টিসি করগে।’
আমি বললুম, একটি কথা শুধোতে পারি—অপরাধ যদি না নেন, ব্যক্তিগত কথা।’
তিনি বললেন, ‘মাই লাইফ ইজ এন ওপন বুক। যা-খুশি শুধোতে পারো।’
‘আচ্ছা, আপনি তো, বোধ হয় ইজরায়েলাইট—’
বাধা দিয়ে মৃদু হাসি হেসে বললেন, ‘অত ভদ্রতা করে, অন্য লোক হলে বলতুম ভণ্ডামি করে, ইজরায়েলাইট না বলে য়ুডে (Jude=ইহুদি) বলতে পারো, তার চেয়েও অবজ্ঞাসূচক Jut বলতে পারো, এমন কি পাঁচজন জর্মন আড়ালে যে “ফীজার য়োট” (মোটামুটি, “ঘৃণ্য ইহুদির বাচ্চা”) ব্যবহার করে সেও করতে পারো। আমি নির্বিকার।’
আমি জিভ কেটে বললুম, “ছি ছি, কি যে বলেন—’
ফের বাধা দিয়ে বললেন, “শোনো, ভদ্র! তুমি কি বললে, কি না বললে কিচ্ছুটি এসে যায় না। এই দেখ আমার নাকটা কি রকম বেঁকে গিয়ে হুকের মত ঝুলে আছে, তারপর আমার কান দু’খানা—মাথার সঙ্গে লেপটে না গিয়ে একটা ডান দিকে আরেকটা বাঁ দিকে যেন উড়ে যাবার পণ করেছে, দাঁড়াও, তোমাদের দেশের হাতীর বোধ হয় এ রকম কান হয়, তারপর আমার চুল— কানের কাছে কি রকম যেন কোঁকড়া কোঁকড়া, নিগ্রোদের মত, আমাদের মিশরবাসের সামান্য অবশিষ্ট—’
‘থাক না। প্লীজ।’
একটু হাসলেন, তাতে কোনো তিক্ততা ছিল না। বললেন, ‘এক ফার্লং দূরের থেকে লোক চিনতে পারে, ঐ আরেক ব্যাটা ইহুদি আসছে! তুমি ইজরায়েলাইট বললে না য়ুডে বললে তাতে কি যায় আসে? তা সে যাক গে। তুমি কি যেন শুধোচ্ছিলে!’
‘আপনি তো ইহুদি—’
‘বলে ইহুদি! রীতিমত খানদানী মনিষ্যি আমি। কেন, নাম থেকে বুঝতে পারছো না? তোমাদের কুরান শরীফেও যে প্রফেট ইয়াকুবের (জেকব্) উল্লেখ আছে তাঁর তৃতীয় পুত্রের নাম লেভি। কিংবা বাইবেলের প্রথম অধ্যায় জেনেসিসেও পাবে এ-গোষ্ঠীর খবর। কিন্তু থাক্, প্রপিতামহের শুকনো হাড় চিবিয়ে বেঁচে থাকা যায় না। তবে এ-কথা ঠিক, আমাদের পরিবারের বংশানুক্ৰমে ইহুদি ধর্ম ও হীব্রু সাহিত্যের চর্চা আছে।’
‘তাহলে আপনি ইহুদিদের কঞ্জুসী নিয়ে, আপন চেহারার ইহুদিলক্ষণ নিয়ে অত ঠাট্টা-মস্করা করেন কি করে?
মিটমিট করে হেসে বললেন, ‘কেন, শোন নি, স্কচদের সম্বন্ধে যে সব নূতন নূতন গল্প বেরোয় তার অধিকাংশের জন্মস্থল এবারর্ডীন, জনক স্কচরা স্বয়ং? তত্ত্বটার সত্যি মিথ্যে জানি নে, কিন্তু ইহুদির কঞ্জসী, সে নোংরা—স্নান করে না, যে-দেশে বাস করে সেটাকে মাতৃভূমিরূপে স্বীকার করে না, আরো কত কী—এসব নিয়ে যে-সব গল্প আছে তার একটা বিরাট ভাণ্ডার আছে আমার কাছে। পেয়েছি উত্তরাধিকারসূত্রে ঠাকুর্দার কাছ থেকে এবং এর অধিকাংশই ইহুদিদের তৈরি কোনো সন্দেহ নেই সে-বিষয়ে। বাবার এসবেতে শখ নেই। তিনি পড়ে আছেন হিব্রুশাস্ত্র নিয়ে আর অবসর সময়ে ঐ একই অভিনিবেশ, সহকারে, জর্মন সাহিত্যচর্চা। কারো সঙ্গে মেশেন না বড় একটা, কিন্তু তোমাকে যতটুকু চিনতে পেরেছি তার থেকে মনে হয়, তোমাকে বাড়ি নিয়ে গেলে তিনি খুশী হবেন। প্রাণভরে তাঁর কাছ থেকে জর্মন সাহিত্যের খুটিনাটি খুটিয়ে খুটিয়ে বের করতে পারবে। আসবে একদিন ডিনারে? বেশ। মাকে শুধিয়ে দিন ঠিক করে তোমাকে বলবো।’
‘আচ্ছা, বলুন তো, এদেশে নাকি একটা পোলিটিকাল পার্টি দিন দিন শক্তি সঞ্চয় করে চলেছে, আর তারা নাকি নির্বিচারে সব ইহুদিদের এ দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে চায় যারা পাঁচশ’ সাতশ’ বছর ধরে জর্মনিতে আছে তাদেরও, যারা এক বর্ণ হীব্রু জানে না, সিনাগগে যায় না, নাস্তিক্যবাদের পক্ষ সমর্থন করে প্রামাণিক গ্রন্থ লিখেছে তাদেরও। দোষটা কি ওদের?’
এই তার মুখ একটুখানি গভীর হল। সেটা যেন মুছে ফেলে মুচকি হেসে বললেন, ‘এ তো কিছু নূতন নয়। বাইবেলের “এস্টার” পুস্তিকা পড়েছ?’
আমি অভিমানের সুরে বললাম, ‘আমি অগা। কিন্তু এস্টার পড়ি নি, এসন্দেহ কেন করছেন? তবে হ্যাঁ, ওল্ড টেস্টামেন্ট পড়া উচিত, তারই নির্মাতা কোনো ইহুদি রাব্বির কাছ থেকে। আমি পড়েছি খৃষ্টান—তাও লুথেরীয় অর্থাৎ কিনা প্রটেস্টান্ট্-পাদ্রির কাছে। ওনারা তো এস্টারের ঐতিহাসিকতায় আদৌ বিশ্বাস করেন না।’
‘সে কথা পরে হবে। উপস্থিত অন্তত এটুকু মেনে নিতে পারো, সেখানে যে চিন্তাধারা প্রকাশ পেয়েছে তার অনেকখানি খাঁটি সত্যতা সে যার মুখ দিয়েই বলানো হয়ে থাক না কেন এবং ইরানের রাজা গ্রীস-মিশর-বিজয়ী Xerxes ইহুদি-বালা এস্টারকে বিয়ে করে থাকুন, আর না-ই করে থাকুন, সেখানে Xerxes (বাইবেলের ‘অহস্ভেরুস)-এর মন্ত্রী তাঁকে একদিন বললেন, “মহারাজের বিশাল সাম্রাজ্যে এক শ্রেণীর লোক সর্বদাই পাওয়া যায় (ইহুদি) যাদের আইনকানুন অন্য সব জাতদের থেকে ভিন্ন, এমন কি রাজাদেশও তারা মানে না অতএব এক বিশেষ দিনে এদের সবংশে নির্বংশ করা হোক।”... তখনও প্রভু যীশুর জন্ম হয় নি, খৃষ্টধর্মের সঙ্গে বৈরীভাবের প্রশ্নই ওঠে না, আর ঐ যে নয়া পলিটিকাল পার্টির কথা বলছিলে, যারা জাতে অ্যারিয়ান—তাদের ভিতর আবার নীল চোখ, ব্লণ্ড চুল ওলা সর্বশ্রেষ্ঠ নর্ডিক জাত সম্বন্ধে প্রচার করতে গিয়ে তারা পিঠপিঠ বলে ইহুদিরা মানুষ পর্যায়ের নিম্নে (untemensch=underman)! সে পার্টি তো পর্শুদিনের—নিতান্ত শিশু। তা সে যাক গে—এই আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস জেনে তোমার যে কি লাভ হবে জানি নে। তোমাদের দেশে—’
‘হালে আমাদের দেশে ইহুদিরা এসেছে ইয়োরোপ থেকে। তার বহু, শতাব্দী পূর্বে ঝড়ের মারে একখানা নৌকায় করে সাতজন পুরষ আর সাতজন স্ত্রীলোক এসে পৌঁছয় বোম্বাইয়ের ত্রিশ মাইল দক্ষিণে, অধুনালুপ্ত চেমুল বন্দরের কাছে[১]। শাস্ত্রাদি সব লোপ পায় বলে লোকে এদের ইহুদি পরিচয় পায় নি; শুধু শনিবারে এরা বিশ্রাম নিত বলে (ইহুদির সাব্বাৎ) এবং তেলীর ব্যবসা করতো বলে (বোধ হয় মধ্যপ্রাচ্যের অলিভ তেল তৈরির কায়দা এরা তিল-সর্ষের উপর চালায়) এদের নাম হয়েছিল “শনিবার-তেলী”। একশ' বছরও বোধ হয় হয় নি, তর্কাতীত সিদ্ধান্ত হয়েছে, এরা জাত-ইহুদি। কিন্তু এদের পিছনে তো কেউ কখনো লাগে নি—এস্টার কেতাবের পাইকিরি কচু কাটার নৃশংস প্রস্তাব কহাঁসে কঁহা!’
‘জানি তাই বলছিলুম, তোমার কি লাভ? আর এদেশের আরো বলেন, ইহুদি লাভ, টাকা, সোনারূপো ভিন্ন অন্য চিন্তা অন্য বস্তু বোঝে না। রূপোর কথাই যদি উঠলো তবে একটি ইহুদি কথিকা—কঞ্জুসীবাবদ—ঠিক পপুলার গল্প নয়, হাফশাস্ত্র বাক্যের মত বলি,—শ্রবণ করো, এবং তারপর—’
ইঙ্গিত বুঝে বললুম, ‘যাচ্ছি আপন টেবিলে হীব্রু ব্যাকরণ কণ্ঠস্থ করতে।’
ব্যাগ খুলে একটা আপেল বের করে এগিয়ে বললেন, ‘একদা জনৈক অর্থ-পিচেশ মজ্জা-কিপটে কোটিপতি—কখনো কানা কড়িটি দান করেছে এ কথা তার কোনো হাতই জানে না—এসেছে এক রাব্বির কাছে। জানলার কাছে নিয়ে গিয়ে রাব্বি তাকে বললেন, “বাইরের দিকে তাকিয়ে আমায় বলো, কি দেখতে পাচ্ছে।”
ধনী বললেন, “লোকজন—বিস্তর মানুষ।”
রাব্বি বললেন, “উত্তম প্রস্তাব।” তারপর একটা আয়নার সামনে তাকে দাঁড় করিয়ে শুধোলেন, “এবারে কি দেখছ?”
“আমি নিজেকে দেখতে পাচ্ছি—” বললে কিপটে।
“ততোধিক উত্তম প্রস্তাব”—বললেন রাব্বি, “এইবারে শোনো, বৎস, কান পেতে মন দিয়ে। জানলার শার্সি কাঁচের তৈরি, আয়নাও কাঁচের তৈরি—তফাৎ কি? আয়নার পিছনে রয়েছে অতিশয়, হাল্কার চেয়ে হাল্কা সামান্য একটু রূপোর প্রলেপ—ধর্তব্যের মধ্যেই নয়। কিন্তু বৎস, যেই না এল সামান্যতম রূপো, অম্নি তুমি আর অন্য মানুষকে দেখতে পাও না, দেখতে পাও শুধু নিজেকে।[২]
২৩/৪/৬৬
টিকা ও মন্তব্য
- ১.↑
মারাঠীতে ‘চ’ অক্ষরের উচ্চারণ ‘ৎস’-এর মত। তাই টলেমি এ বন্দরকে তিমুলা, সিমুল্লা দুই উচ্চারণেই লিখেছেন। চিৎপাবন ব্রাহ্মণদের (টিলক, গোখলে ও যদি বেয়াদপি মাফ করেন তবে উল্লেখ করি, অধীনের অধুনা প্রকাশিত ‘দু-হারা’ পুস্তকের চরিত্র কাণে) অনেকেরই নীল ছোখ, কটা চুল; এঁদের ভিতরেও কিংবদন্তী, এঁরাও ঝড়ের মারে কোঁকণ অঞ্চলে পৌঁছন।
বরদার সয়াজীরাও যেরকম রমেশ, অরবিন্দ, আম্বেডকরকে পৃষ্ঠপোষকতা দেন, ঠিক তেমনি এই সাত স্ত্রীপুরুষের বংশধর পণ্ডিত কাহিম্করতে বোম্বাই থেকে ধরে এনে বরদা হাইকোর্টের জজ নিযুক্ত করেন। ভারতবর্ষের এঁরা প্রাচীনতম ইহুদি। এঁরা ইয়োরোপীয় বহু ইহুদির ন্যায় ‘ইহুদি’ শব্দটাকে অত্যন্ত পছন্দ করেন এবং নিজেদের ‘বেনে-ইজরায়েল’ [বেনে—আরবী বিন—ইবন=পুত্র; ইবন্ বৎতুতা তুলনীয়]=’ইজরায়েল-সন্তান’ রূপে পরিচয় দেন। আমার পরম সৌভাগ্য বরদাবাসকালীন এই বিদ্যাসাগরের সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গতা হয়। এই মাটির মানুষটির যৎপরোনাস্তি অনাড়ম্বরে প্রকাশিত ‘বেনে-ইজরায়েল’ পুস্তিকা ইয়োরোপীয় পণ্ডিতসমাজে, বিশেষ করে রাব্বিদের ভিতর যেন টর্পোডোর মত পড়ে। বস্তুত তারপর যে যা লিখেছেন বিশেষ করে ভিন্ন ভিন্ন এনসাইক্লোপিডিয়ায়—তার বেশীর ভাগ জজ কাহিম্-করের কাছ থেকে নেওয়া। সপ্রশংস কৃতজ্ঞতা সহ। বরদার দ্বিতীয় ইহুদি ছিলেন জর্মন। এ-লেখনের ড. লেভির মত, ড. কোন্-ভীনার (‘কোন-ভীনারের মা’ পশ্য—পঞ্চতন্ত্র, ১ম)।—ইয়োরোপীয় ইহুদি ও কাহিম্করের কোঁকনী ইহুদিদের পাল পরবের ক্যালেণ্ডার ভিন্ন ভিন্ন—আল্লাকে বে-শুমায় শোকরিয়া। আমি কখনো বা জজ সাহেবকে নিয়ে কোন্-ভীনারের গৃহে, কখনো বা কোন্-ভীনারকে নিয়ে জজের বাড়িতে বহু বিচিত্র বহ্বান্ন ভক্ষণ করে—একই পরব দু’-দুবার যথা গোস্বামী মতে ইত্যাদি পালন করে, ধর্ম রক্ষা করতুম। বেনে-ইজরায়েলদের সম্বন্ধে আমার যেটুকু সামান্য জ্ঞানগম্যি সেটুকু সমূচহ জজের খয়রাৎ।
- ২.↑এ লেখনের সঙ্গে কোন সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও আমার অন্তরঙ্গ পাঠকদের না জানিয়ে কিছুতেই থাকতে পারলাম না যে ২৬ মার্চ (১৯৬৬) সন্ধ্যেবেলা প্যারিস বেতার থেকে ইন্দিরাজীর ফরাসীতে প্রদত্ত মঁসিয়ে দ্য গলের অভ্যর্থনার প্রত্যুত্তরের রেকর্ডিং। অনবদ্য রিসেপশনে—কলকাতা ‘খ’-য়ের চেয়ে কোটিগুণে শ্রেয়। ইন্দিরাজীর ফরাসী উচ্চারণ অতি সুন্দর, পরিষ্কার। অনভ্যাসবশত মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছিলেন বটে, কিন্তু উচ্চারণে বিদেশী আড় প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। যুদ্ধের সময় আমি চার্চিলের ফরাসী ভাষণ বেতারে শুনেছি। ইংরেজীর জোরালো একসেন্ট দ্বারা আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা ফরাসী উচ্চারণ। দাঁতমুখ খিচিয়ে, বেতার-যন্তে কান সেঁটে না শুনলে মনে হবে, গাঁক গাঁক করে ইংরেজ সাবলটর্ন কুচকাওয়াজের ‘হুকুমদার’ ঝাড়ছে। ফরাসীতে আনুনাসিকে ছয়লাপ। ইংরেজের কাছে সে বহু গোমাংস। অতএব বাংলার ‘চাঁদ’ যেন ইংরেজের মুখে ‘চ্যানড্’ হয়ে বেরচ্ছিল। ইন্দিরাজীর ফরাসী উচ্চারণ চার্চিলের চেয়ে ইনফিনিটি পার্সেন্ট শ্রেয়।