আয়নার কাণ্ড

মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়

অজ পাড়াগাঁয়ে তাদের বাড়ী। সে বাড়ীতে কেবল বাপ আর ছেলে। এ দুইটি প্রাণী ছাড়া সে সংসারে আর কেউ ছিল না।

ছেলেটি যখন খুব কচি তখন থেকে তার মা নেই। বাপ কোলে-পিঠে করে ছেলেটিকে মানুষ করেন—নিজের হাতে খাওয়ান দাওয়ান। ছেলেটি তাই বাপ ছাড়া আর কাউকে জানে না—বাবা না হলে তার এক দণ্ড চলে না।

ছেলে ছাড়া বাপেরও আর কেউ নেই। মায়া বলো, স্নেহ ভালোবাসা বলো, যা কিছু প্ৰাণের জিনিস তার সমস্তটুকু ছেলেটিকে দিয়েই তিনি আনন্দ পান। ছেলে তাঁর নয়নের মণি, আঁধার ঘরের মানিক, অন্ধের নড়ি। সে ছেলে চোখের আড়াল হলে বাপ পলকে প্ৰলয় দেখেন।

ছেলে বড় হতে লাগল, বাপ বুড়ো হতে থাকলেন। বাপের তখন ভাবনা হল—আমি মরে গেলে ছেলের কী দশা হবে? কী সুখে সে ঘরে থাকবে?

বাপ ছেলেকে ডেকে বললেন, বাবা, তুমি বিয়ে করো। ছেলে বললে, কেন বাবা, আমরা দুটিতে তো বেশ আছি—মাঝের থেকে আর একজনকে আনব কেন?

বাবা বললেন, না, বাবা তুমি বুঝছ না। আমি আজ আছি, কাল নেই। তোমাকে সংসারী দেখে মরতে পারলে আমি সুখে মরব; বিয়ে না করলে কি তোমার চলে?

বাবা বলছেন, তাঁর কথা কখনো অমান্য করেনি। ছেলে রাজি হল। একটি টুকটুকে কনে দেখে বাপ ছেলের বিয়ে দিলেন।

তারপরেই বাপের শরীর একেবারে ভেঙে পড়ল। বিছানা থেকে উঠতে পারেন না—নানারকমের রোগ এসে বুড়োর শরীর ছেঁকে ধরলে।

ছেলে আহার নিদ্ৰা ভুলে সেবা শুশ্রুষা করলে, কিন্তু বাপকে তাতে রাখতে পারলে না। যে বাপকে সে একদণ্ড না দেখে থাকতে পারত না সেই বাপ তাকে ছেড়ে জন্মের মতো চলে গেলেন।

ছেলেটি শোকে বড় কাতর হয়ে পড়ল। তার স্ত্রী তাকে কত সান্ত্বনা দিয়ে, কত হেসে হেসে কথা কয়, কিন্তু মন থেকে শোক কিছুতে যায় না।

ছেলেটি সমস্ত দিন কাজকর্মে ব্যস্ত থাকে, থেকে থেকে বাপের কথা মনে পড়ে, চোখে জল আসে। বাড়ী ফিরে এসে স্ত্রীর সঙ্গে কথা কয়, গল্প করে, তাতে মনে সুখ পায় না, বাপের জন্য প্ৰাণটা কেবলই কাঁদতে থাকে।

শোক যখন কিছুতে ভুলতে পারলে না, তখন ছেলেটি মনে মনে ভাবল, যাই একবার দেশবিদেশ ঘুরে আসি, নানান জিনিস দেখে যদি বাপের কথা ভুলতে পারি।

কিয়োটো শহর, ভারি আশ্চর্য শহর। দেশবিদেশ থেকে লোক সে শহর দেখতে আসে। সে শহরে নাচ-তামাশা, দেখবার জিনিস ঢের আছে। ছেলেটি মনে করল সেইখানেই যায়।

কিয়োটো শহরে যা কিছু দেখবার জিনিস আছে, সে সমস্ত দেখা শেষ করে ছেলেটি রাস্তা দিয়ে চলেছে। রাস্তা লোকে লোকারণ্য, দোকানপাটে ভরা, গাড়ি পালকি পিঁপড়ের সারের মতো চলেছে। এইসব অবাক হয়ে দেখতে দেখতে সে যাচ্ছে।

সামনে একখানা মনোহারী দোকান পড়ল। দোকানখানা কত রকম-বেরকমের মন-ভোলানো জিনিসে ঠাসা। তার একটা জিনিসও সে কখনো চক্ষে দেখেনি, সেসব জিনিসের একটিরও দাম সে জানে না।

সেই দোকানখানির সামনে দাঁড়িয়ে এ জিনিস, সে জিনিস দেখছে আর মনে মনে তারিফ করছে, এমন সময় হঠাৎ দেয়ালে টাঙানো একখানা আয়নার দিকে তার নজর পড়ল। আয়নাখানার উপর রোদ পড়ে সেটা ঝক ঝক করছিল। সে তাইতে ভারি আশ্চর্য হয়ে সেই দিকে এগিয়ে গিয়ে তার সামনে দাঁড়াল। আয়না সে কখনো দেখেনি, আয়না কী কাজে লাগে তাও সে জানে না।

আয়নার দিকে চাইতেই সে চমকে উঠল। আয়নার ভিতর একটা মানুষ রয়েছে না? তাই তো! মানুষই তো বটে। সে চেনে চেনে করছে যে! চেনেই তো! খুব ভালো করে দেখে সে—বাবা! বলে চেঁচিয়ে উঠল। পাশের লোকগুলো অবাক হয়ে তার দিকে চাইতে সে একটু থতমত খেয়ে গেল। আয়নার দিকে যতই চায়, তার মন ততই আনন্দে ভরে ওঠে। বাপের সে রোগা চেহারা আর নেই। এখন মোটাসোটা হয়ে উঠেছেন। শুকনো মুখ, তোবড়া গাল বেশ নিরেট গোলগাল হয়ে উঠেছে। বাপের এই চেহারা সে খুব ছেলেবেলায় দেখেছিল বলে একটু একটু মনে পড়তে লাগল। বাপকে এইরকম দেখে তখনই তার শোক মন থেকে চলে গেল।

আয়নাখানি তাকে নিতেই হবে। বাপকে যখন একবার পেয়েছে, সে কি আর ছাড়তে পারে? তাড়াতাড়ি সেখানি দেওয়াল থেকে খুলে নিয়ে দোকানদারকে দাম জিজ্ঞেস করল।

দোকানদার বলল, দু-আনা।

অ্যাঁ! এত সস্তা! সে ভেবেছিল না-জানি কত টাকাই দিতে হবে—হয়তো ঘরদুয়ার বিক্রি করে বাবাকে ঘরে আনতে হবে। দু-আনা শুনে ভারি আনন্দ হল। আর কথা না বলে সে কোমরের গেজে থেকে দু-আনা বার করে দোকানদারকে দিয়ে দিল।

আয়নাখানি সাতপুরু কাপড়ে জড়িয়ে তোরঙ্গর ভিতর পুরে সে মনে করল—এইবার যাই দেশে—আর কেন? শহরের অনেক জিনিস তখনও দেখা বাকি, কিন্তু আর কিছু দেখবার তার সাধ নেই;—দেশে ফিরতে পারলেই সে যেন বাঁচে।

পাছে কেউ নিয়ে নেয়, এই ভয়ে যে তোরঙ্গটিতে আয়নাখানি রেখেছিল সেটি কাউকে ছুঁতে পর্যন্ত দিল না; নিজে বুকে-পিঠে-মাথায় করে সারা পথটা বয়ে নিয়ে গেল।

দেশে ফিরে আয়নাখানির কথা কাউকে বলল না। পাছে কেউ দেখতে চায়, পাছে সেখানি কোনোরকমে নষ্ট হয়ে যায়—ভয়ে ভয়ে, খুব যত্নে যক্ষের টাকার মতো লুকিয়ে রেখে দিল। স্ত্রীকে পর্যন্ত জানতে দিল না।

রোজ সে আয়নাখানি সেই লুকোনো জায়গা থেকে বার করে—আয়নার দিকে চাইলেই বাপকে দেখতে পায়, মাটিতে পড়ে তাঁকে প্ৰণাম করে, তাঁর সঙ্গে আরও কত কথা কয়। কাজে বেরোবার সময় হলে বাপকে বলে, বাবা, আমি এখন কাজে যাই? ফিরে এসে আবার তোমার সঙ্গে দেখা করব।

স্ত্রী ভাবলে, এ কী আশ্চর্য! ঘরে কাউকে দেখিনে অথচ স্বামী রোজ রোজ কার সঙ্গে এতক্ষণ ধরে ফিস ফিস করে কথা কন!

কিছুদিন এমনি শুনতে শুনতে মনে কেমন একটা সন্দেহ হল। তখন সে স্বামীকে একদিন জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁ গা! ঘরে খিল দিয়ে রোজ দুবেলা কার সঙ্গে কথা কও?

স্বামী মনে করল, এই রে, সব বুঝি ফাঁস হয়ে যাবে! বাপকে আর রাখতে পারলুম না। থতমত খেয়ে সে কথা পর্যন্ত কইতে পারল না। স্বামী কথার জবাব দেয় না দেখে স্ত্রীর মনে আরও সন্দেহ হল। স্বামীকে সে বারবার জিজ্ঞেস করে। কিন্তু কোনো উত্তর পায় না। তখন সে রেগে উঠে বলল—বলো বলছি, নইলে ভালো হবে না!

স্বামী তখন কী করে, সব কথা খুলে বলতে হল। সে বলল, আমি যখন কিয়োটো শহরে বেড়াতে যাই তখন রাস্তায় এক দোকানে একখানা চকচকে জিনিসের ভিতরে বাবাকে হঠাৎ দেখতে পাই। সেই জিনিসটা কিনে এনেছি। বাবা তার ভিতরে আছেন। রোজ তাঁরই সঙ্গে কথা কই। তোমাকে এ কথা জানাইনি, পাছে গোলমাল হলে বাবার কিছু মন্দ হয়।

স্ত্রীর কাছে একথাটা কেমন কেমন ঠেকল। মরা মানুষ কি ফিরে আসে? যা হোক, সে তখন চুপ করে গেল। মনে ভাবল, এর ভিতর একটা কিছু মজা আছে।

তারপর স্বামী যখন কাজে বেরিয়ে গেল, তখন আসল কথাটা কী—তাই জানবার জন্যে স্বামী যে ঘরে লুকিয়ে কথা কয়, সে সেই ঘরে গেল। এদিক ওদিক খুঁজে, এ জিনিস সে জিনিস নেড়ে আশ্চর্যরকমের কিছুই তার নজরে পড়ল না। খোঁজা শেষ করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে, এমন সময় কাপড়-জড়ানো একটা কাঠের বাক্স দেখতে পেল। সেই বাক্সটা দেখেই তার মনে হল—এইবার পাওয়া গেছে, দেখি এটা খুলে ভিতরে কী আছে! বাক্সটা খোলবামাত্রই কাঠ দিয়ে বাঁধানো একটা চকচকে জিনিস তার নজরে পড়ল, সেইটে দেখে মনে করলে স্বামী বোধহয় এইটের কথাই বলেছেন।

কই দেখি, কেমন এর ভিতর ওর বাবা আছেন—এই বলে আয়নাটা তুলে নিয়ে মুখের সামনে ধরলে। ধরতেই প্রথমে চমকে উঠল।

আবার ভালো করে দেখল। মনে একটা ভারি অভিমান এল। স্বামী তাহলে তাকে মিথ্যে বলে ভুলিয়েছে! যতবার আয়নার দিকে চায় ততবারই একটি পরমা সুন্দরী মেয়ের মুখের ছবি তার উপরে ফুটে উঠে। যতই দেখে, অভিমান গিয়ে রাগ ততই বাড়তে থাকে।

ঠিক এমনি সময় স্বামী বাড়ীতে ফিরল। আর পায় কে? রাগ উথলে উঠল। স্বামীকে সে চেঁচিয়ে বলল, আমার কাছে লুকোনো! মিথ্যা বলে আমায় ঠকাবার চেষ্টা!

স্বামী বলল, রাগছ কেন, কী হয়েছে?

স্ত্রী তখন নিজের মুখের সামনে আয়নাখানা ধরে বলল, ইনি তোমার বাবা?

স্বামী। বাবাই তো!

স্ত্রী। আমি কি কানা? দেখতে পাই না? বাবা!

স্বামী। নিশ্চয় বাবা!

স্ত্রী। কক্ষনো না!

স্বামী। আমি বলছি, হ্যাঁ!

স্ত্রী। আমি বলছি, না!

স্বামী। আমি কি মিথ্যা বলছি?

স্ত্রী। না, ভারি সত্যিবাদী! এই পেতনীর মতো মেয়েটার সঙ্গে রোজ লুকিয়ে কথা কওয়া হয়, আর আমায় বলা হচ্ছে ইনি ওঁর বাবা!

স্বামী বলল, এ তুমি কী বলছ? আমি কিছু বুঝতে পারছি না!

স্ত্রী বলল, আমি ঠিক বলছি! খুব বুঝতে পারছি।

এইরকমে একটা তুমুল ঝগড়া বেঁধে উঠল। চ্যাঁচামেচি শুনে পাড়ার লোকজন সেখানে ছুটে এল। ছেলেটি তাদের আসল কথাটা বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করলে, কিন্তু তার স্ত্রী প্রত্যেকবার বাঁধা দিয়ে বলতে লাগল, মিথ্যাবাদীর কথায় কেউ বিশ্বাস কোরো না—আমাকে মিথ্যা কথা বলে ভুলিয়েছে, তোমাদের ভোলাবার চেষ্টা করছে! আমি কি কানা? আমি কি চোখে দেখতে পাই না? আমি স্পষ্ট দেখেছি সে ওর বাপ নয়। একটা কালো কিস্কিন্দি মেয়ে!

স্বামী অবাক হয়ে বলল, এ আমি কিছু বুঝতে পারছি না—স্ত্রী পাগল হল নাকি! আমি দিব্যি গেলে বলতে পারি। তিনি আমার বাবা।

স্ত্রী আরও চটে উঠে বলল, বাবা! বাবাই বটে! আমি কি চোখের মাথা খেয়েছি?

ঝগড়া ক্ৰমেই বেড়ে উঠছে দেখে একজন প্রতিবেশী এগিয়ে এসে বলল, দেখো, এরকম করলে ঝগড়া কোনো কালে শেষ হবে না। এক কাজ করো ওপাড়ার ওই ভাঙা মন্দিরে যে ভৈরবী ঠাকরুণ আছেন তাঁর কাছে যাও— জ্ঞানে বুদ্ধিতে তাঁর সমান কেউ নেই—তাঁকে গিয়ে সব খুলে বলো। তিনি ধ্যানে বসে আসল কথাটা কী তা ঠিক বলে দেবেন।

তাই ঠিক হল। স্বামী ও স্ত্রী আয়নাখানি নিয়ে সেই ভাঙা মন্দিরে ভৈরবীর কাছে গেল। ভৈরবী ঠাকরুণ আদর করে বাঘছালের উপর তাদের বসালেন। কুশল জিজ্ঞেস করে বললেন, আমার কাছে কী মনে করে, বাছারা?

ছেলেটি তখন মাটিতে পড়ে ভৈরবীকে প্ৰণাম করে জোড়হাত করে বলল, ঠাকরুণ! আপনার কাছে একটা নিবেদন আছে, যদি শোনেন তো বলি।

ভৈরবী বললেন, বলো না বাছা! শুনব বৈকি!

ছেলেটি বলল, স্ত্রী আমার উপর মিছে রাগ করেছে, আপনি ওকে ঠাণ্ডা হতে আজ্ঞা করুন।

ভৈরবী বললেন, ব্যাপারটা কী খুলে বলো, সব কথা শুনি।

ছেলেটি তখন বলল, আমার বাবা মারা যাবার পর আমি তাঁর শোকে বড় কাতর হয়ে পড়েছিলুম। তাই সে শোক ভোলবার জন্যে কিয়োটো শহরে বেড়াতে যাই। শহরের এক দোকানে একটা জিনিসের ভিতর বাবাকে দেখতে পেয়ে সে জিনিসটা আমি কিনে আনি। বাবা তারই ভিতর আছেন, তাঁর সঙ্গে রোজ কথা কই। স্ত্রী আজ সে জিনিসটা দেখতে পেয়ে বলছেন তাতে আমার বাবা নেই—আমি একটা কালো কিস্কিন্দি মেয়ে পুষে রেখেছি। এই নিয়ে ঝগড়া বেঁধেছে—ও বলে সে একটা মেয়ে, আমি বলি তিনি আমার বাবা।

ভৈরবী বললেন, কই, জিনিসটা দেখি!

তখন ছেলেটি আয়নাখানি ভৈরবীর হাতে দিল। ভৈরবী আয়না কখনো দেখেননি। মুখের সামনে আয়নাখানি ধরতে তিনি প্রথমে চমকে উঠলেন। তারপর ভালো করে চেয়ে দেখে বললেন, ঠিক হয়েছে! আর ভাবনা নেই! তোমাদের দুজনের ঝগড়া দেখে মেয়েটি ভৈরবী হয়ে গেছে; গেরুয়া পরেছে—ছাই মেখেছে—সংসারে এর আর মতিগতি নেই। ভালোই হয়েছে, এ মন্দিরে আমার দোসর কেউ নেই—এ আমার কাছেই থাক! তোমরা ঘরে ফিরে যাও।

ছেলেটি এই কথা শুনে অবাক হয়ে রইল। সে নিজের চোখে তার বাপকে দেখেছে তা তো ভুল হবার নয়! ভৈরবী ঠাকরুণও তো কখনো মিথ্যা বলবেন না!—এ তবে কী হল? ব্যাপারটা সে বুঝতে পারল না।

তার স্ত্রীর ভারি আমোদ হল—কালো কিস্কিন্দি মেয়েটা যে ভৈরবী হয়ে গেছে তাতে তার আনন্দ ধরছিল না।

কিন্তু ছেলেটির ভারি দুঃখ—হারানো বাপকে পেয়েও আবার হারাতে হল।