ছাত্র বনাম পুলিশ

তিন

সৈয়দ মুজতবা আলী

অধীর পাঠক! শান্ত হও, তোমার মনে কি কুচিন্তা সে আমি জানি; ইতিমধ্যে ঐ বাবদে দু’খানা চিঠিও পেয়েছি, আমার কিন্তু-কিন্তু-কিন্তু ভাবটা যাচ্ছে না। আমি জানি, তোমার জ্ঞানতৃষ্ণা প্রবল, তাই জানতে চাও আমি কখনো ধরা পড়ে শ্রীঘরবাস করেছিলাম কিনা। আমার সে দুরাবস্থার[১] বর্ণনা শুনে তোমার হৃদয়মনে কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্ট হবে সেই নিয়ে আমার দুর্ভাবনা। তাহলে একটি ছোট কাহিনী দিয়ে আমার সঙ্কোচটা বোঝাই।

মাত্র কয়েকদিন আগে, ১৬ই অগ্রহায়ণ, আমরা স্বর্গত গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুদিন পালন করলুম। এঁর বহু বহু সদগুণ ছিল, তার অন্যতম, তিনি নিজে সাহিত্য নাট্য সৃষ্টি করুন আর নাই করুন সে যুগের সবাই মেনে নিয়েছিলেন যে তাঁর মত শাস্ত্রজ্ঞ রসজ্ঞ জন বাঙলা দেশে বিরল—এবং শুদ্ধমাত্র রসজ্ঞ হিসাবে অদ্বিতীয়। তাই কাঁচা পাকা সর্ব লেখকই তাঁকে তাঁদের বই পাঠিয়ে মতামত জানতে চাইতেন। ওদিকে গুরুদাস ছিলেন কর্মব্যস্ত পুরুষ। সেই ডাঁই ডাঁই বই পড়ে স্বহস্তে উত্তর লেখার তাঁর সময় কই? তাই একখানা পোস্টকার্ডে যা ছাপিয়ে নিয়েছিলেন তার মোটামুটি মর্ম এই:—‘মহাশয়, আপনার পাঠানো পুস্তকের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি উহা মনোযোগ সহকারে পড়িয়াছি। সত্য বলিতে কি পড়িতে পড়িতে—’ এখানে এসে থাকতো একটা লম্বা লাইন এবং তার উপরে ছাপা থাকতো, ‘হাস্য সম্বরণ করিতে পারি নাই’ এবং লাইনের নিচে ছাপা থাকতো, ‘অশ্র সম্বরণ করিতে পারি নাই।’ তিনি নাকি পাঠানো বইখানা পড়ে যথোপযুক্তভাবে হয় লাইনের উপরের ‘হাস্য সম্বরণ’ বা নিচের ‘অশ্রু সম্বরণ’ কেটে দিতেন। তিনি ছিলেন অজাতশত্রু, তাই নিশ্চয়ই কোনো বদরসিক কাহিনীটির সঙ্গে আরো জুড়ে দিত যে, অধিকাংশ স্থলেই তিনি নিজে বইখানি পড়তেন না, তাঁর সেক্রেটারি সেটি পড়ে বা না পড়ে উপরের ‘হাস্য’ কিংবা নিচের ‘অশ্রু’ কেটে দিত।[২]

তাই আমার কিন্তু-কিন্তু, তুমি লাইনের উপরের না নিচের, কোন বাক্যটি কাটবে—আমার কাহিনী শুনে। তা সে যাকগে, বলেই ফেলি। কোন দিন আবার দুম করে মরে যাবো।

পূর্বেই নিবেদন করেছি, চিতে বাঘ হরিণের পালের গোদাটাকেই সব সময় ধরবার চেষ্টা করে তারই পিছনে ধাওয়া করে যখন সব কটা এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ে—শহরের পুলিশও ঠিক সেই রকম আমাদের মত ‘পিশাচসম্প্রদায়ে’র সব চেয়ে হোঁৎকাটাকেই ধরবার চেষ্টা করতো, আমরা যখন তাড়া খেয়ে হরিণের টেকনিকই অনুসরণ করে ইদিকের ওদিকের গলিতে ছড়িয়ে পড়তুম। কিন্তু কিছুদিন পরে আমরা লক্ষ্য করলুম, একই গোদাকে বার বার শিকার করে পুলিশ যেন আর খাঁটি স্পোর্টসম্যানের নির্দোষানন্দ লাভ করছে না। তখন তারা দুসরা কিংবা তেসরা মোট্‌কাটাকে ধরবার চেষ্টা করতে লাগলো। তাদেরও ট্রেনিং হচ্ছে, আম্মোগোরও। কখনো তারা জেতে, কখনো আমরা জিতি। সেই যে গুলিখোর শিকারী বয়ান দিচ্ছিল, ‘তারপর আমি তো ফইর করলুম বন্দুক, আর কুত্তাকেও দিলুম শিকারের দিকে লেলিয়ে। তার পর বন্দুকের গুলি আর কুত্তাতে কী রেস! কভী কুত্তা কভী গোলী, কভী গোলী কভী কুত্তা!’ আমাদের বেলাও তাই, ‘কভী ইসটুডেন্ট কভী পুলিশ, কভী পুলিশ কভী ইসটুডেন্ট! আমার অবশ্য কোনই ডর ভয় ছিল না। কারণ আমি তখন এমনিতেই ছিলম বেহদ, রোগা টিঙটিঙে পাঁচ ফুট সাড়ে ছ’ইঞ্চি নিয়ে একশ' পাঁচ পৌণ্ড ওজন অর্থাৎ হোঁৎকা মোটকা জর্মন সহপাঠীদের তুলনায় তো আধটিপ নস্যি! তদুপরি আমি সর্বদাই সুনির্মল বসুর সেই তিরস্কারটি মনে রাখি, ‘বাঙালী হয়েছে, পালাতে শেখ নি!’

কিন্তু বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, এই রাত্রে দেখি, পুলিশ অন্য ব্যবস্থা করেছে। এতদিন যেই আমি একা হয়ে যেতুম, পিছনে আর বুটের শব্দ শুনতে পেতুম না। সেরাত্রে দেখি, পুলিশ নিতান্ত আমাকেই ধরবার জন্য যে মনস্থির করেছে তাই নয়, আগের থেকে, বেশ চিন্তিত ফাইভ ইয়ারস প্ল্যানিং করে যেন জাল পেতেছে। আমি তাড়া খেয়ে যেদিকেই যাই, পিছনে তো বুটের শব্দ শুনতে পাই-ই, তদুপরি দেখি, ঐ দূরে গলির মুখে আরেকটা পুলিশ দাঁড়িয়ে রয়েছে—যেন বিরহজর্জরিত ফিলমের নায়ক প্রোষিতভর্তৃকা নায়িকাকে আলিঙ্গনার্থে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু আমি মহাভারত পড়েছি, জানি, এ আলিঙ্গন হবে ধার্তরাষ্ট্র। অতএব মারি গুত্তা অন্য বাগে।

অনেকক্ষণ ধরে এই খেলা চললো। ইতিমধ্যে আমি কয়েক সেকেণ্ডের তরে সব পুলিশের দৃষ্টির বাইরে; এবং সঙ্গে সঙ্গে টুকলুম একটা ‘পাবে’। ঝটকা মেরে ‘বার’ থেকে অন্য কারো অর্ডারী এক কাপ কঞ্চি যেন ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে বসলুম, ‘পাব’-এর সুদূরতম প্রান্তে। সঙ্গে সঙ্গে ঢুকলো একটা পুলিশ।

খাইছে। এবারে এসে পাকড়াবে। বৈদ্যরাজ চরক বলেন, ‘এ অবস্থায় হরিনামের বটিকা খেয়ে শুয়ে পড়বে!’

সে কিন্তু হাঁপাতে হাঁপাতে প্রথমটায় ‘বার কীপারের মুখোমুখি হয়ে আমার দিকে পিছন ফিরে এক গেলাস বিয়ার কিনে একটা অতি দীর্ঘ চমক দিলে। আমি বুঝলুম, মাইকেল সত্যই বলেছেন, সীতাদেবীকে রাবণের রাক্ষসী প্রহরিণীরা কোনো গাছতলায় বসিয়ে বেপরোয়া ঘোরাঘুরি করতো।

‘হীনপ্রাণা হরিণীরে রাখিয়া বাঘিনী
নির্ভয় হৃদয়ে যথা ফেরে দূর বনে।’

গদ্যময় ইংরিজীতে যাকে বলে নিতান্তই ‘ক্যাট অ্যান্ড মাউন্স প্লে’। বরঞ্চ রবীন্দ্রনাথেরটাই ভালো, এ যেন পাখি লয়ে বিবিধ ছলে শিকারী বিড়ালের খেলা!’

এবারে সে গেলাস হাতে করে বার-এর দিকে পিছন ফিরে আমার দিকে মুখ করে তাকাল।

আমিও অলস কৌতূহলে একবার তার দিকে তাকালুম। ‘পাব’-এ নূতন নিরীহ খদ্দের ঢুকলে যেরকম অন্য নিরীহ খদ্দের তার উপর একবার একটি নজর বুলিয়ে অন্য দিকে চোখ ফেরায়।

আমি যদিও তখন মাথা নিচু করে কাপের দিকে তাকিয়ে আছি—যেন মাইক্রোস্কোপ দিয়ে বৈজ্ঞানিক অণুপরমাণু পর্যবেক্ষণ করছেন—তবু স্পষ্ট বুঝতে পারলুম, লোকটা কি ভাবছে। তারপর শুনলুম, ‘গুটে নাখট’! আমি মাথা তুলে দেখি পুলিশ তার বিয়ার শেষ করে ‘পাব’ওলাকে ‘গুড নাইট’ জানিয়ে চলে যাচ্ছে। (জর্মনীর অলিখিত আইন, ‘বিয়ার খাবে ঢক ঢক করে ওয়াইন খাবে আ-স্তে আ-স্তে।’)

ঠিক বুঝতে পারলুম না কেন? তবু হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম বলি নি। এদের তো রাবণের গুষ্টি। এবার যিনি আসবেন, তিনি এঁয়ার মত বাপের সুপুত্তুর নাও হতে পারেন। আবার বাইরে যাবারও উপায় নেই। জাল গুটিয়ে সবাই চলে গেছেন, না ঘাপটি মেরে বসে আছেন, কে জানে?

ঘণ্টাখানেক পর যখন ‘পাব’ নিতান্তই বন্ধ হয়ে গেল, তখন দেখি সব ফাঁকা। তবু সাবধানের মার নেই। অকুস্থলের উল্টো মুখে রওয়ানা দিয়ে অনেকখানি চক্কর খেয়ে বাড়ি ফিরলুম ‘তড়পত হুঁ জৈসে জলবিন মীন’ হয়ে।

তার দু-তিনদিন পর সকালবেলা যখন পাত্তাড়ি নিয়ে য়ুনি (ভার্সিটি) যাচ্ছি, তখন একজন পুলিশ হঠাৎ সামনে দাঁড়িয়ে বুটের গোড়ালি গোড়ালিতে ক্লিক করে আমাকে সেলুট দিলে। আমি হামেশাই পুলিশের সামনে ভারী সবিনয়ী—বার তিনেক ‘গুটেন মর্গেন’ ‘গুটেন মর্গেন’ বললুম, যদ্যপি একবারই যথেষ্ট।

কোন প্রকারের লৌকিকতা না করে সোজা শুধোলে, ‘তুমি ইণ্ডিয়ান?’

তালেবর পুলিশ মানতে হবে! বলেছে ‘ইণ্ডার। ইণ্ডিয়ানার’ বা রেড ইণ্ডিয়ান বলে নি। এদেশের অধিকাংশ শিক্ষিত লোকও সে পার্থক্যটি জানে। বললাম, ‘হ্যাঁ।’—

শুধোলে, ‘এখান থেকে ইণ্ডিয়া কতদূর?’

আমি বললাম, ‘এই হাজার পাঁচেক মাইল হবে। সঠিক জানি নে, তবে জাহাজে যেতে বারো-তেরো দিন লাগে।’

বললে, ‘বাপ-মা এই পাঁচ হাজার মাইল দূরে পাঠিয়েছে বাঁদরামি শেখবার জন্যে?’

এতক্ষণে আমার কানে জল গেল। বুঝলুম, উইথ রেফারেন্স টু দি কনটেকসট যে, লোকটা সেই রাত্রের আমাদের দলের কর্ম এবং পরবর্তী লুকোচুরির কথা পাড়ছে। আমি তবু নাক-টিপলে-দুধ-বেরোয়-না গোছ হয়ে বললুম, ‘কিসের বাঁদরামি?’

জৰ্মনে ‘ন্যাকা’ শব্দের ঠিক ঠিক প্রতিশব্দ নেই। কিন্তু যে কটি শব্দ পুলিশম্যান প্রয়োগ করলে তার অর্থ ঐ দাঁড়ায়। তারপর নামলো সম্মুখে সমরে! বললে, ‘সেরাত্রে কয়েক সেকেণ্ডের জন্য চোখের আড়াল হয়ে যেতে পেরেছিলে বলে তোমাকে ধরি নি। এবারে কিন্তু ছাড়বো না।’

‘অনেক ধন্যবাদ!’ তারপর আমিও রণাঙ্গনে নেমে বেহায়ার মত বললুম, সে দেখা যাবে।’

যেন একটু দরদী গলায় বললে, ‘কিন্তু কেন, কেন এসব করো?’

আমি তখন একটু নরম গলায় বললুম, ‘এদেশে কি শুধু য়ুনিতে পড়তেই এসেছি? ওদেশে বসেও তো এ-দেশের বই কিনে পড়া যায়। আমি এসেছি সব শিখতে, আর-সব স্টুডেন্টরা যা করে, তাই করি।’

;সব ছেলে এরকম বাঁদরামি করে?’

আমাকে বাধ্য হয়ে স্বীকার করতে হল সবাই করে না।

‘তবে?’

তখন বললুম, ‘ব্রাদার শোনো। এই স্টুডেন্ট বনাম পুলিশ লড়াই সর্বপ্রথম আরম্ভ হয় চতুর্দশ শতাব্দীতে হাইডেলবের্গে। এখানে আরম্ভ হয় ১৭৮৬তে। তারপর কয়েক বছর য়ুনি বন্ধ ছিল— কেন, সঠিক জানি নে, বোধ হয় নেপোলিয়ন তার জন্য দায়ী ফের য়ুনি খোলার সঙ্গে সঙ্গে ১৮১৮ থেকে। এবারে তুমিই কও, বুকে হাত দিয়ে, এই আমরা আজ যারা স্টুডেন্ট, আমরা যদি আজ লড়াই ক্ষান্ত দি তবে ভবিষ্যৎ-বংশীয় স্টুডেন্টরা ইতিহাসে লিখে রাখবে না ‘অতঃপর বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এক দল কাপুরুষ ছাত্র আগমনের ফলে—তাহাদের মধ্যে একটা অপদার্থ ইণ্ডিয়ানও ছিল—সেই সংগ্রাম বন্ধ হইয়া যায়—স্টুডেন্টরা পরাজয় স্বীকার করিয়া লইল।” তারপর ভারতীয় নাটকীয় পদ্ধতিতে ‘হা হতোস্মি’ করার পর বললাম, ‘এই যে মহাকবি হাইনে, তিনি পর্যন্ত এখানে—’

এই করলুম ব্যাকরণে ভুল। বাধা দিয়ে শুধোলে, ‘তুমি তার মত কবিতা লিখতে পারো?’

নিশারণে সে জিতেছিল না আমি জিতেছিলুম, সেটা সমস্যাময়, সেটাকে ‘ড্র’ বললেও বলা যেতে পারে, কিন্তু দিবাভাগে এই তর্ক-যুদ্ধে আমি হার মেনে বললুম, বাকিটা আর একদিন হবে, ব্রাদার। এখন তোমার নামটা বলল। সেই শনির রাত্রে যেখানে আমাদের প্রথম চারি চক্ষুর মিলন হয়েছিল সেখানেই দেখা হবে। আমি ফোন করে ঠিক করে নেব। এখন চলি, আমার ক্লাস আছে।

সে হেসে যা বললে সেটাকে বাঙলায় বলা চলে, ‘ডুডু খাবে টামাকও ছাড়বে না।’

এবারে ধরতে পারলে ছাড়বে না সে তো বুঝলম। ওদিকে এক মাস পরে আমার পরীক্ষা। তিনটে ভাইভা। শনির রাত জেগে তামাম রববার শুধু, মুখস্থ আর মুখস্থ। হাসি পায় যখন এদেশে শনি, এখানে বড্ড বেশী মুখস্থ করানো হয়; মুখস্থ না করে কে কবে কোন দেশে কোন পরীক্ষা পাশ করেছে! তা সে পেসতালদ্‌জির দেশেই হোক আর ফ্রোবেলের দেশ, এই জর্মনিতেই হোক। তাই আমাকে আর যুদ্ধে না ডেকে আমাদের ফীলড মার্শেল আমাকে রিজার্ভ রাখলেন। মাত্র এক রাত্রে ডাক পড়েছিল, তবে সেটা শহরের অন্য প্রান্তে। আর এক দিন, সেই দৈত্যকুলের ‘প্রহ্লাদ-পো’টির সঙ্গেই একটা ‘পাব’-এ বসে দু-দণ্ড রসালাপ করেছিলুম। লোকটি সত্যই অমায়িক।

এদেশে পরীক্ষার পূর্বে এত সাতান্ন রকমের কাগজপত্র মায় থীসিস্‌ ডীনের দফতরে জমা দিতে হয় যে, সবাই শরণ নেয় আনকোরা হালের যে দুদিন আগে পাস বা ফেল করেছে। তারাই শুধু, এসব হাবিজাবির লেটেস্ট খবর রাখে। সে রকম দুজনা অনেকক্ষণ ধরে বসে, দফে দফে একাধিক বার মিলিয়ে নিয়ে এক বাণ্ডিল কাগজ, ফর্ম, সার্টিফিকেট আমাকে দিয়ে বললে, এইবারে যাও বৎস, ডীনের দফতরে। সব মিলিয়ে দিয়েছি। আর, শোনো, সব কাগজের নিচে রাখবে একখানা পাঁচ মার্কের (তখনকার কালে পাঁচ টাকার একটু কম) নোট। এটা কেরানীর অন্যায্য প্রাপ্য—কিন্তু পূর্ণ শত বৎসরের ঐতিহ্য।’

দুরু দুরু বুকে প্রায় নার্ভাস ব্রেক ডাউনের সীমান্তে পৌছে—দাঁড়ালাম গিয়ে ডীনের দফতরে, কাউন্টারের সামনে। পাঁচ টাকার চেয়ে বেশীই রেখেছিলুম।

যে কেরানী এসে সম্মুখে দাঁড়ালেন তাঁর এ্যাব্বড়া হিণ্ডেনবুর্গী গোঁফ, আর বয়েসে বোধ হয় তিনি য়ুনির সমান। সাতিশয় গম্ভীর কণ্ঠে আমার গুডমর্নিঙের কি একটা বিড়বিড় করে উত্তর দিয়ে দফে দফে কাগজ গুনলেন, টাকাটা কি কায়দায় যে সরালেন ঠিক ঠাহর করতে পারলুম না। কিন্তু মুখে হাসি ফুটলো না। বরঞ্চ গভীর কণ্ঠ গম্ভীরতর করে শুধোলেন, ‘অমুক সাটিফিকেটটা কই?’

আমি তো সেই দই যোগানদারদের উপর রেগে টঙ। পই পই করে আমি শুধিয়েছি, ওরা আরো পই পই করে বলেছে, সব কাগজ ঠিকঠাক আছে, এখন এ কী গেরো রে বাবা! বুঝলুম, কি একটা সার্টিফিকেট আনা হয় নি। কিন্তু সে সার্টিফিকেট কিসের, কোনোই অনুমান করতে পারলুম না। যোগানদারদের মুখেও শুনি নি।

ভয়ে ভয়ে শুধালুম, ‘কি বললেন, সার!’

এবার যেন নাভিকুণ্ডুলি থেকে ফৈয়াজখানি কণ্ঠে কি একটা বেরুলো।

গুরু-মুর্শীদ, ওস্তাদ-মুরব্বীদের আশীর্বাদ-দোওয়া আমার উপর নিশ্চয়ই ছিল; হঠাৎ অর্থটা মাথার ভিতরে যেন বিদ্যুতের মত ঝিলিক মেরে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে আপন অজান্তে এক গাল হেসে বলে ফেলেছি, ‘চেষ্টা তো দিয়েছি, স্যর, দু বচ্ছর ধরে প্রায় প্রতি শনির রাত্রে—মাফ করবেন স্যর বলা উচিত রবির ভোরে। তা ওরা ধরতে না পারলে আমি কি করবো?—বললে পেত্যয় যাবেন না স্যর।’

ইতিমধ্যে বুড়ো হঠাৎ ঠাঠা করে হেসে উঠেছেন। যেমন তাঁর গাম্ভীর্য তেমন তার হাসি। বিশেষ করে তাঁর বিরাট গোঁপ জোড়ার একটা দিক নেমে যায় নিচে, তো অন্যটা উঠে যায় উপরের দিকে। সে হাসি আর থামে না। ইতিমধ্যে ছোকরা কেরানীরাও হাসির রগড় দেখে তাঁর চতুর্দিকে এসে দাঁড়িয়েছে। এবারে থেমে বললেন, ‘ধরা দেবার চেষ্টা করলে, আর ওরা ধরতে পারলো না, এটা কি রকম কথা?’

আমি বললুম, ‘যে-পুলিশ আরেকটু, হ’লে ধরতে পাররতো, তাকে সাক্ষী স্বরূপ হাজির করতে পারি যে, আমি চেষ্টার ত্রুটি করি নি, এই জেলে যাবার সার্টিফিকেট যোগাড় করার।’

সংক্ষেপে বললেন, ‘খুলে কও।’

আমি সেই প্রকৃতির লোক যারা নার্ভাস ব্রেকডাউনের ভাঙন থেকে পড়িপড়ি করতে করতে বেচে গিয়ে হঠাৎ নিষ্কৃতি পেয়ে হয়ে যায় অহেতুক বাচাল—সেও আরেক রকমের নার্ভাসনেস। গড় গড় করে বলে গেলুম, পুলিশের সেই জাল পাতার কাহিনী—বিশেষ করে আমার উপকারার্থে—'পাব’-এর ভিতরকার বয়ান ও সর্বশেষে সেই পুলিশম্যানের সঙ্গে পথিমধ্যে আমার যম-নচিকেতা কথোপকথন। বক্তৃতা শেষ করলুম, দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে, ‘এর পর এই পরীক্ষার পড়া নিয়ে বড় ব্যস্ত ছিলুম বলে সলিড্‌ কিছু করে উঠতে পারি নি, স্যর। শুধু, ঐ যে, দিন পনেরো আগে হঠাৎ এক সকালে দেখা গেল লর্ড মেয়ারের। বিরাট দফতরের উচ্চতম টাওয়ারে একটা ছেঁড়া ছাতা বাঁধা, বাতাসে পৎপৎ করছে, ফায়ার ব্রিগেড পর্যন্ত নামাতে পারে নি, ঐ উপলক্ষে অধীন কিঞ্চিৎ, অতি যংকিঞ্চিৎ সাহায্য করতে—’

একজন ছোকরা কেরানী আঁতকে উঠে বললে, ‘সর্বনাশ! ওটার তালাশী যে এখনো শেষ হয় নি!’

বুড়ো বললেন, ‘আমরা তো কিছু শুনছি না।’

বুড়োর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরুতে গেলে তিনি কাউণ্টারের ফ্ল্যাপটা তুলে আমার সঙ্গে দোর পর্যন্ত এলেন—পরে শুনলুম, এ-রকম বিরল সম্মান ইতিপূর্বে নাকি মাত্র দু’একজন বিদেশীই পেয়েছেন। আমি কিছু, শুধাবার পূর্বেই তিনি যেন বুঝতে পেরে তাঁর মাথাটি আমার কানের কাছে নিচ করে, এবং সঙ্গে সঙ্গে বুড়ো আঙুলের ডগা বুকে ঠুকে ঠুকে ফিস ফিস করে বললেন, ‘আমি তিনবার, আমি তিনবার। তারপর অত্যন্ত সিরিয়াসলি শুধোলেন বছর তিনেক পূর্বে এক ডাচ স্টুডেন্ট বললে—বুঝতেই পারছো, এ রসিকতাটা আমি শুধু, বিদেশী ছাত্রদের সঙ্গেই করে থাকি, সুদ্দুমাত্র জানবার জন্য, তারা কতখানি সত্যকার জর্মন ঐতিহ্যের য়ুনি ছাত্র হতে পেরেছে। স্টুডেন্টরা নাকি ক্রমেই হারছে!’ কণ্ঠে রীতিমত আশঙ্কার উৎপীড়ন।

আমি তাঁর প্রসারিত হাত ধরে হ্যাণ্ডশেক করতে করতে বললুম, ‘তিন বছর পূর্বে, ইয়া। কিন্তু তারপর জানেন তো, আমি আর আপনার মত মুরব্বীকে কি বলবো, কৃষ্ণতম মেঘেরও রুপালী সীমন্তরেখা থাকে—এল জর্মনিতে অভূতপূর্ব বিরাট বেকার সমস্যা, যেটা এখনও চলছে। ফলে ছেলেরা ম্যাট্রিক পাস করে এদিক ওদিক কাজে ঢুকতে না পেরে বাধ্য হয়ে ঢুকছে য়ুনিতে, আগে যেখানে ঢুকতো একজন এখন ঢোকে দশজন। ওদিকে সরকারের পয়সার অভাবে পুলিশের গুষ্টি না বেড়ে বরঞ্চ কমতির দিকে। আমরা এখন দলে ভারি। বস্তুতঃ আমরা এখন নিশাচরবৃত্তি পরিত্যাগ পূর্বেক দিবাভাগেই তাদের সম্মুখ-সময়ে আহবান করতে পারি—করি না, শুধু, শতাধিক বৎসরের ঐতিহ্য ভঙ্গ হবে বলে।’ তারপর একটু, থেমে গভীরতর কণ্ঠে বললুম, ‘আর যদি কখনো সে দুর্দিনের চিহ্ন দেখি, তবে সেই সুদূর ভারত থেকে ফিরে আসবো আ-মি। সামনের পরীক্ষায় পাস করি আর ফেলই মারি, সেই পরাজয় প্রতিরোধ করার জন্য য়ুনিতে ঢুকে ছাত্র হব আবার—আ-মি।

‘আম্মো’।

 ১/১/৬৬

টিকা ও মন্তব্য

  1. ১.↑
    এ-যুগের ছেলে ছোকরারা বিদ্যাসাগর পড়ে না বলে বলতে দোষ নেই যে একদা এক পিতা-পুত্র বিদ্যাসাগরর মশায়ের কাছে তাদের দুঃখের কাহিনী শেষ করলে এই বলে, ‘আমাদের দূরাবস্থাটা দেখুন।’ বিদ্যাসাগর নাকি মুচকি হেসে বললেন, ‘তা সেটা আকার (আ-কার) থেকেই বুঝতে পারছি।
  2. ২.↑
    ভিক্‌টর য়্যুগো (Hugo) সম্বন্ধে বলা হয়, একবার এক খ্যাতনামা কবি য়্যুগোকে তাঁর কবিতার বই পাঠিয়ে তাঁর মতামত জানতে চাইলেন। সঙ্গে সঙ্গে য়্যুগোর সানন্দ অভিনন্দন এসে পৌঁছল সেই কবির হাতে, তাঁর কাব্যসৃষ্টির অজস্র প্রশংসাবাদ করে য়্যুগো শেষ করেছেন এই বলে, ‘হে নবীন কবি, আমি তোমাকে সাদর আলিঙ্গন করে ফ্রান্সের কবিচক্রের আমন্ত্রণ জানাই।’ তিন দিন পরে বুক-পোষ্টে পাঠানো কবির সেই কবিতার বই ফেরত এল তাঁর কাছে। উপরে পিঠে পোষ্ট অফিসের রবর স্ট্যাম্পে ছাপ, ‘যথেষ্ট টিকিট লাগানো হয়নি বলে গ্রহণকারী বেয়ারিং হারে ফালতো পয়সা দিতে নারাজ, অতএব প্রেরকের কাছে ফেরত পাঠানো হল।’