জোছনা ছোঁয় না

অমরেন্দ্র চক্রবর্তী

সূর্য আকাশের পশ্চিম দিকে একদম একটা সিঁদুরটিপ হয়ে গেছে। মস্ত বড়ো সিঁদুরটিপ। আরেকটু পরেই টুপ করে ডুবে যাবে। এদিকে পুব-আকাশে গাছপালার আড়াল থেকে গোল চাঁদ উঠে আসছে। পূর্ণিমার দিনে এরকম দেখা যায়। আকাশের একদিকে সূর্য, আর একদিকে চাঁদ। একটা ডুবছে, একটা উঠছে। যেন একসঙ্গে দুটো চাঁদ।

আমি আর তুম্মা আর তুষি মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছি আর একসঙ্গে সূর্য-চন্দ্র দেখছি, হঠাৎ আমাদের চোখের সামনেই সূর্য ডুবে গেল, আর চাঁদটা একটু এগিয়ে একটা দেবদারু গাছের মাথার ওপর চুপ করে এসে বসলো। চাঁদ কখনো এক জায়গায় বসে থাকে? ভালো করে চেয়ে দেখলুম। একটু-একটু করে দূরের তালবনের দিকে চলে যাচ্ছে।

চাঁদের আলোয় চারদিক আলো হয়ে আছে। গাছের পাতা চিকচিক করছে। মাঠের একধারে এক ঝাঁক সন্ধ্যামালতীর গাছ। ঠিক মনে হয় জ্যোৎস্নায় চান করে উঠেছে। পাতায়-ফুলে জ্যোৎস্না একদম লেগে রয়েছে।

তুষি এর আগে কখনো এরকম করে জ্যোৎস্না দেখেনি, সে এক দৌড়ে সন্ধ্যামালতীর ঝোপের কাছে গিয়ে ডাকলো, দিদি, ছুটে আয়। আমরা জোছনা ছোঁবো। ইশ, কী কাছে!

তুম্মা তখন মাঠের মাঝখানে। সে নিচু হয়ে ঘাসে হাত বুলিয়ে বললো, জোছনা তো ঘাসেও লেগেছে। এই তো আমি ছুঁয়েছি।

বলে যেই চোখের সামনে হাত নিয়ে জোছনার রং দেখতে গেছে, অমনি তার কান্না পেয়ে গেল। কোথায় জোছনা, হাতের পাতায় কাদা লেগে রয়েছে।

তুষি অতো দূর থেকে কিছু শুনতে পায়নি, একদম একা জোছনায় হাত দিতে তার ভয় করছে, সে এবার চেঁচিয়ে বললো, দিদি, শিগগির আয়, ফুলের ওপর কতো জোছনা!

তুম্মা তার কাছে যেতে সে ফিসফিস করে বললো, কী সুন্দর দেখ! ছুঁবি?

একদম হাতের কাছেই জোছনা। ফুলের ওপর টলমল করছে। তুম্মা চোখ সরাতে পারে না। তার খুব ইচ্ছে করছে আঙুলে করে একটুখানি জোছনা তুলে নেয়। বললো, তুই আগে ছোঁ তো, দেখি কী হয়!

তুষি যেই একটা ফুলের গায়ে জোছনা ছুঁয়েছে, অমনি পুরো গাছটাই খুব বিরক্ত হয়ে উঠলো। তুষি স্পষ্ট দেখলো, গাছটা দু-বার নড়ে উঠলো। সে হাত গুটিয়ে নিয়ে বললো, থাক দিদি, কাজ নেই।

তুম্মা গাছটার খুব কাছে গিয়ে বললো, দাঁড়া, আমি শুধু একটুখানি জোছনা তুলে নেবো।

পাতার আড়ালে কোথায় একটা পাখি ছিল, হয়তো তার পাতার বাসায় ঘুমোচ্ছিল, হঠাৎ জেগে উঠে সুর করে ডাকতে লাগলো- জোন্না, নোন্না, জোন্নাই নুন্নাকে।

হঠাৎ পাখির ডাকে চমকে উঠে তুম্মা-তুষি সরে এলো। তুম্মা আমার কাছে এসে বললো, আচ্ছা, পাখিটা কি আমাদের কিছু বলছে?

তোমরা যারা পাখির ভাষা একটু-একটুও জানো তারা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছো? পাখিটা বলছে, জোছনা ছোঁয় না, জোছনাই ছুঁয়ে থাকে।