প্রাক্ পলাশী বাংলা

পূর্বাভাষ

সুবোধকুমার মুখোপাধ্যায়

আজ আর একথা জোর দিয়ে বলার দরকার নেই ইতিহাস শুধু রাজকাহিনী নয়। অর্থাৎ রাজনীতি ইতিহাসের একমাত্র বিষয় নয়। আর পাঁচটি বিষয়ের মধ্যে এটি একটি। ঐতিহাসিক কালে মানুষের সমগ্র জীবন চর্চাই ইতিহাসের বিষয়বস্তু। ইতিহাসের এ আদর্শ ও সংজ্ঞা আজ সর্বজনস্বীকৃত। তবে এ আদর্শ অনুসরণ করে আজো সর্বস্তরে ইতিহাস লেখা হয়নি। আঠারো শতকের প্রথম ভাগের বাংলার আর্থ-সামাজিক জীবনে অনেকখানি আমাদের অজানা। এ যুগের সামাজিক ও আর্থিক জীবনের রূপরেখাটি তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এ গ্রন্থে। প্রাক্-পলাশী যুগের ইতিহাস চর্চা মূলত রাজনীতি, বিদ্রোহ, সমর কাহিনী, কূটনীতি, আইন ও প্রশাসন ঘিরে। এ যুগের সমাজ, দৈনন্দিন ও সামাজিক জীবন, কৃষি ও শিল্প, বাণিজ্য ও যোগাযো, মুদ্রা, ব্যাঙ্কিং ও বিনিময়, রাজ্যের আর্থিক কাঠামো, দ্রব্যমূল্য, মূল্যস্তর, বাজার ও মজুরি, শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্ম, ধর্মীয় জীবন ও নৈতিকমান ধারাবাহিক ইতিহাসে স্থান পায়নি, এ যুগের শ্রমিক, দাস ও নারী জাতির অবস্থা সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট নয়। অথচ এগুলি সামাজিক ইতিহাসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। এ বিষয়গুলি বাদ দিয়ে বাঙালীর জীবন চর্যার পরিচয় পাওয়া যায় না।

বাংলার সামাজিক ও আর্থিক ইতিহাস রচনায় কোনো বিশেষ মতাদর্শ বা মডেল অনুসরণ করিনি। আগে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে তথ্যানুসন্ধানের প্রয়াস নেই। যদি কোন মডেল বা কাঠামো দেখা দিয়ে থাকে তবে সেটা স্বাভাবিক ভাবেই এসেছে। সযত্নে গড়ে তোলা হয়নি। এমন কোনো সিদ্ধান্ত বা বক্তব্য এ গ্রন্থে নেই যার পেছনে তথ্যের সমর্থন নেই। ‘নো ডকুমেন্ট, নো হিস্ট্রি’ আদর্শে আমার আস্থা আছে। তথ্যের বিশ্লেষণে চিত্র যেমন দাঁড়ায় তেমন রাখার চেষ্টা করেছি। নিজের চিন্তা বা মন্তব্য জোর করে পাঠকের ওপর চাপানোর চেষ্টা করিনি। দু একটি সাধারণভাবে অজানা তথ্যের দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। যথাসম্ভব নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার জন্য সচেষ্ট থেকেছি। বাঙালী পাঠকের কাছে প্রাক্-পলাশী বাংলার সামাজিক ও আর্থিক জীবনের পরিচয় তুলে ধরা আমার মূল লক্ষ্য। এ উদ্দেশ্য সাধিত হলে আমার পরিশ্রম সার্থক মনে করবে।

স্বেচ্ছায় এ গ্রন্থ প্রকাশনার দায়িত্ব নিয়ে কে. পি. বাগচী এ্যণ্ড কোম্পানীর পরিচালকরা আমাকে ঋণী করেছেন। এঁদের আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।

কৃষ্ণনগর কলেজ, নদীয়া,
মহালয়া, ১৩৮৯

সুবোধকুমার মুখোপাধ্যায়