ক’দিন ধরে একটা বনবিড়াল আমাদের পাড়ায় খুব উৎপাত করে বেড়াচ্ছিল। আজ এ বাড়ির মুরগির ছানা খেয়ে যাচ্ছে, কাল ও-বাড়ির পোষা পায়রা সাবাড়, শনিবার রিন্টুদের দু-দুটো খরগোশ শেষ করেছে- এমনি রোজ। আমার মেজদি হাঁসের ছানা নিয়ে খেলতে খুব ভালোবাসে, শুধু সেই জন্যেই খুব যত্ন করে হাঁস পোষে। ডিম ফুটিয়ে ছানা করে। তুলোর গোল্লার মতন ছোট্ট-ছোট্ট শাদা ধবধবে হাঁসের ছানাগুলো সারাদিন উঠোনে ঘুর-ঘুর করে। খুঁটে খুঁটে পোকা-টোকা খায়। সন্ধ্যে হলে মেজদি নিজের হাতে সেগুলোকে ঝুড়ি চাপা দিয়ে রেখে দেয়। একদিন ভোরবেলা উঠে ঝুড়ি তুলতে গিয়ে মেজদি চিৎকার করে কেঁদে উঠলো।
সেদিন আবার মহালয়া। শেষ রাত থেকে বিছানায় শুয়ে শুয়েই আমি মন দিয়ে রেডিয়োয় মহালয়ার গান আর নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ শুনছি, হঠাৎ মেজদির চিৎকারে তাড়াতাড়ি বাইরে এসে দেখি, হাঁসের ঝুড়ি উলটোনো আর ছেঁড়া ফুলের পাঁপড়ির মতন চারদিকে কচি-কচি পালক ছড়িয়ে আছে। বনবিড়ালটা একটা ছানাও আস্ত রাখেনি। অমন ফুটফুটে ছানা আর নেই, এতে কার না কান্না পাবে! তার ওপর মেজদি ওদের বড্ড ভালোবাসতো। উঠোনময় ছড়ানো পালকের মধ্যে দাঁড়িয়ে মেজদির সে কী বুকফাটা কান্না!
এখন হয়েছে কী, একটা জেলে দূরের কোন নদীতে সারারাত মাছ ধরে ভোরবেলা মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরছিল। আমাদের পাড়াটা যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে মাঠের ধারে জেলেদের পাড়া। লোকটা আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, মেজদির কান্না শুনে দাঁড়িয়ে পড়লো। তারপর আমাদের কাছে এসে পালক-টালক দেখে বললো, এ নিশ্চয়ই সেই বনবিড়ালটার কাজ। পালক দেখে মনে হচ্ছে একটু আগেই ছানাগুলোকে খেয়েছে।
এতক্ষণে আমি লোকটাকে চিনতে পারলাম। এ তো পঞ্চা জেলে। খুব ভালো লোক। কদিন আগে বনবিড়ালটা রাস্তার মধ্যে পঞ্চা জেলেকে আঁচড়ে-কামড়ে তার হাত থেকে একটা দু-কেজি ওজনের কাৎলা মুখে নিয়ে পালিয়েছিল।
পঞ্চা জেলের একটা কান ততক্ষণে আপনা-আপনি নড়তে শুরু করেছে। খুব মন দিয়ে কিছু শুনলে তার ওরকম কান নড়ে। কানটা একবার সামনের দিকে মুড়ে আসছে, আবার টান হয়ে যাচ্ছে। এ রকম কয়েক বার হবার পর পঞ্চা হঠাৎ ছাদের দিকে মুখ তুলে চাপা গলায় আমাকে বললো, শুনতে পাচ্ছো? কেমন গরগর করছে। শয়তানটা এখানো ছাদেই আছে। আজ আমার একদিন কি ওরই একদিন।
বলে হাতের জাল-টাল নামিয়ে রেখে তিন-চারটে করে সিঁড়ি লাফিয়ে সোজা ছাদে। আমিও তার পেছন-পেছন উঠে গেলাম। মাত্র কদিন আগে যে পঞ্চার মাছ নিয়ে গেছে, তাকে সামনে পেয়ে পঞ্চা কি আর ছেড়ে দেবে!
গিয়ে যা দেখলাম, তা কেউ নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবে না। ছাদের দক্ষিণ কোণে আমাদের ফণিমনসা গাছের পাশেই একটা পাখি দুপায়ে ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বেশ বড়ো পাখি। ডানা দুটোকে দু পাশে টান-টান করে মেলে রেখেছে। ডানার এক-একটা পালক ফাঁক-ফাঁক হয়ে ধারালো ছুরির মতন দুপাশে উঁচানো। আর, কী আশ্চর্য, ছাইরঙের মস্ত বনবিড়ালটা পাখিটার পায়ের নিচে চাপা পরে রাগে গর গর করছে। থাবা থেকে এই বড়-বড় নখ বেরিয়ে এসেছে, মোটা ল্যাজটা একবার এদিকে একবার ওদিকে কাঁপতে-কাঁপছে বেঁকে যাচ্ছে, আর মুখ দিয়ে সে কী গরগরানি! পাখিটা কিন্তু বনবিড়ালকে দু পায়ের ধারালো নখে একদম বিঁধেই রেখেছে।
পাখিকে কখনো চোখ পাকিয়ে তাকাতে দেখেছো? রাগে চোখ বড়-বড় করে চেয়ে আছে, দেখেছো কেউ? আমি এই প্রথম দেখলাম। চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরোচ্ছে। এক দৃষ্টিতে বনবিড়ালটার দিকে চেয়ে আছে আর মাঝে-মাঝে দু-পাশের ডানা গুটিয়ে এনে শক্ত ছুঁচলো পালকের ডগাগুলো এক সঙ্গে সাঁ করে বিঁধিয়ে দিচ্ছে বনবিড়ালটার বুকে। বনবিড়ালটার সারা গা রক্তে মাখামাখি। তবু কি তার গরগরানি থামে। পাখিটার পায়ের তলা থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার সে কী চেষ্টা।
আমি তো আমি, পঞ্চা জেলে পর্যন্ত হাঁ হয়ে গেছে। কতক্ষণ যে ও রকম চলছিল খেয়াল করিনি, হঠাৎ শুনি পাখিটা ঝমঝমিয়ে গম্ভীর গলায় বলছে, গুন্ডা তুই, তোর মুন্ডু নিই? গুন্ডা তুই, তোর মুন্ডু নিই?
পাখি তো, তাই ভয়ংকর কথাগুলোও ঠিক একটা গম্ভীর গানের মতন শোনাচ্ছিল। কয়েকবার ও-রকম বলে পাখিটা একবার থামলো। চোখ দুটো রাগে ধক-ধক করছে। একটু পরে একই রকম ভীষণ গলায় বলে উঠলো, রাক্ষণ নাশ হোক!
বলেই বনবিড়ালটার মাথায় লম্বা ঠোঁট দিয়ে এক ঠোক্কর। মাথা সঙ্গে-সঙ্গে দু-ফাঁক। সব গরগরানি, ল্যাজ আছড়ানো একদম শেষ।
রেডিয়োয় তখনো নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ হচ্ছে, জেলেপাড়ার দিক থেকে আকাশ জ্বালিয়ে সূর্য উঠছে, পঞ্চা জেলে হঠাৎ গলা ফাটিয়ে ‘জয় মা দুগ্গা, দুগ্গতিনাশিনী’ বলে ধপ করে ছাদের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো। তার দু-হাত কপালে ঠেকানো।
পাখিটা ডানার ঝাপটায় ফণিমনসা গাছ দুলিয়ে আকাশের অনেক উঁচুতে উঠে গেল। আমি পঞ্চা জেলেকে হাত ধরে তুলে বললাম, তুমি ওরকম করলে কেন? পাখিটা বেশ ছিল, হয়তো আরো কোনো কথা বলতো, তোমার চিৎকারেই উড়ে গেল।
পঞ্চা আকাশে মুখ তুলে কপালে হাত ঠেকিয়ে আবার নমস্কার করলো। তারপর বললো, তুমি কি পাখি ভেবেছিলে নাকি? স্বয়ং মা দুগ্গা!
পাখিটা ‘রাক্ষস নাশ হোক’ বলেছিল বটে, ডানা দুটোও অনেকটা দুর্গার দশ হাতের মতন দেখতে, চোখ তো একদম দুর্গা ঠাকুরের চোখের মতনই রাগে ধক-ধক করছিল, তাই বলে পাখি কখনো ঠাকুর হয়!
সিঁড়ি দিয়ে নামতে-নামতে পঞ্চা আমার মনের কথা টের পেয়ে বললো, আগেকার দেব-দেবীরাই তো পরের জন্মে পাখি হয়ে জন্মায়। দেবতারা কোথায় থাকে? আকাশে না? পাখিরাও বেশির ভাগ সময় দেখবে আকাশে থাকতেই ভালোবাসে। আগের জন্মের অভ্যেস কিনা।