মাইথনে একটা পাখির সঙ্গে দেখা হলো, উঃ, সে যা কথা বলতে পারে! আমি একেবারে তাজ্জব বনে গেছি।
পাখিটার যেমন রঙের বাহার, তেমনি মিষ্টি গলা। মুখে একেবারে খই ফুটছে। আমি বৃষ্টিতে ভিজে পাহাড়ী পথ বেয়ে সবে পাহাড়ের ওপরের বাড়িটায় পৌঁছে একটু-একটু হাঁফাচ্ছি, দেখি, পাহাড়ের গাছপালা থেকে বেরিয়ে এসে ছোট্ট একটা রঙটুকটুক পাখি আমার ঘরের সামনের আকাশে ঘুরে-ঘুরে বলছে, ‘সাকট্টম, সাকট্টম!’ সাকট্টম মানে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছো, স্বাগতম। বিয়েবাড়ির গেটে লেখা থাকে দেখোনি? আমি এখানে এসেছি বলে পাখিটা খুশি হয়ে আমাকে স্বাগত জানাচ্ছে। অতো সুন্দর করে আর কোনো পাখিকে আমি স্বাগতম বলতে শুনিনি, ঠিক টুং টাং বাজনার মতন। আমি ভিজে গায়েই ব্যাগ থেকে আমার খাতা বের করে সাকট্টম কথাটা বানান করে-করে লিখে রাখছি, হঠাৎ শুনি পাখিটা বলছে, ‘জলজঙল, কেমনজা! জলজঙল, কেমনজা।’ তার মানে, জলজঙ্গল, কী মজা! এদিকে পাহাড়, ওদিকে পাহাড়, বাড়িটাই তো পাহাড়ের গায়ে, তিনদিকেই পাহাড় ভরতি জঙ্গল, আর নিচে, ঠিক আমার সামনেই অনেক দূর অব্দি অজয়-বরাকর-দামোদর নদীর জল বাঁধ দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে- এরকম জায়গায় কার না আনন্দ হয়! আমি এসেছি বলে পাখিটাও খুব খুশি। মনের আনন্দে নেচে-নেচে আমার কাছে নিজের দেশের গুণগান করছে।
ভোরবেলা ঘুম ভেঙে আমি তো অবাক। দেখি, মাথার ধারের জানলায় পাহাড় থেকে একটা গাছের ডাল মুখ বাড়িয়ে আছে আর সেই ডালে বসে সেই ছোট্ট পাখিটা গান গেয়ে-গেয়ে বলছে, ‘জল রঙোলো, জাগ লো জাগ। জল রঙোলো, জাগ লো জাগ।’
পাখিটাই তাহলে গান গেয়ে আমার ঘুম ভাঙিয়েছে! জল রঙোলো মানে তো জল রাঙা হলো। আমি দরজা খুলে বাইরে এসে দেখি, তিন নদীর জলের ওপর অনেক দূরে একটা লাল টকটকে বল চুপ করে ভেসে রয়েছে। ওটাই সূর্য। একটু-একটু করে আকাশে উঠছে। অমনি করেই তো ভোর হয়। ভোরের সাত রং লেগে নদীর জল একেবারে রাঙা হয়ে উঠেছে। আকাশে, জলে সে যে কী দারুণ রং, যে নিজের চোখে দেখেনি, তাকে বোঝানো যাবে না। আমি দু-চোখ ভরে দেখছি। নিশ্বাস নিতেও ভয় হয়, পাছে নিশ্বাসের হাওয়া লেগে রং নড়ে যায়! আকাশভরা, নদীভরা সে এক বিরাট রং।
দেখছি তো দেখছিই, হঠাৎ আমার মাথার ওপর পাখির টুং টাং কথা কানে এলো- ‘মুখে মাখো না, গায়ে মাখো! আমি মাখিনি? গায়ে মাখো!’
সত্যিই যদি পাখিটার মতো এই রং গায়ে মাখতে পারতাম!