পাখির খাতা

পাখির কষ্ট

অমরেন্দ্র চক্রবর্তী

একেক সময় আমার মনে হয়, মানুষের দুঃখ-কষ্ট মানুষের চেয়ে পাখিরাই বেশি বোঝে। একবার আসামের এক গ্রামে, মাঘ মাসে খুব শীত পড়েছে, তার ওপর সকাল থেকে মেঘলা আর ঝিরঝিরে বৃষ্টি। উঃ, সে কি হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। কেউ আর ঘর থেকে বেরুতেই পারে না। চাষীরাও সেদিন মাঠে যায়নি। লোকে কাজে না বেরুলে খাবে কী? শীতের চোটে কাজকর্ম খাওয়া-দাওয়া সব মাথায় উঠেছে। সারা গ্রামের লোক যে যার মাটির ঘরে দরজা-জানলার ঝাঁপ টেনে দিয়ে কাঁথা-টাথা জড়িয়ে শুধু হি-হি করে কাঁপছে। সেই গ্রামে বেড়াতে গিয়ে আমিও ওরকম একটা কুঁড়েঘরে আটকে পড়েছি, হঠাৎ শুনি, বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে একটা পাখি ‘কীচচিত কীচচিত কীচচিত কীচচিত’ বলতে-বলতে উড়ে গেল। কীচচিত নিশ্চয় বুঝেছ, কী শীত।

কীচচিত শুনে আমাদের ঘরের ঠিক পেছনেই বাঁশবন থেকে আরেকটা পাখি দুবার ‘আহা রে, আহা রে’ করে উঠে, সুর করে টেনে-টেনে বলতে লাগলো, ‘আ-হা! খাবে কী? আ-হা! খাবে কী?’

বলতে-বলতে তার নিজেরই গলা ঠান্ডায় কেঁপে যাচ্ছে।

মাঘের শীতে, বৃষ্টিতে পাখিদেরও তো কষ্ট! বনে-বনে উড়ে বেড়ানোই বলো, আর খাবারের খোঁজে ঘুরে বেড়ানোই বলো, দুটোই তখন অসম্ভব। পাখিটা সেই কষ্টের কথা কিন্তু বলছে না, তার কষ্ট গ্রামের মানুষের জন্যে। নিজেদের কষ্টের কথা বললে নিশ্চয়ই ‘খাবে কী’ না বলে ‘খাবো কী’ বলতো।

এ বছর পুজোর সময়ও কলকাতায় একটা পাখির কথা শুনে আমার মনে হলো, পাখিদের মনে মানুষের চেয়ে দয়ামায়া অনেক বেশি।

সেদিন অষ্টমী।

দুর্গা ঠাকুরের সামনে অনেকক্ষণ ধরে নেচে-নেচে ঢোল বাজিয়ে ঢুলীদের হাত ব্যথা হয়ে গেছে, তারা কাঁধ থেকে ঢোল নামিয়ে চাটাইয়ে বসে বিশ্রাম করছে। ছোট্ট একটা ছেলে দুলে-দুলে কাঁসর ঘন্টা বাজাচ্ছিল কাঁই না-না, কাঁই না-না, সঙ্গের ঢুলীদের থামতে দেখেও তার কাঁসর থামাতে ইচ্ছে করছে না। একদম মশগুল হয়ে সে একাই বাজিয়ে চলেছে কাঁই না-না, কাঁই না-না, নাই মানা, নাই মানা।

বাজাচ্ছে তো বাজাচ্ছেই, হঠাৎ প্যান্ডেলের কলাগাছে কোত্থেকে একটা পাখি উড়ে এসে ডেকে উঠলো, ‘বন্যা না, বন্যা না?’

পাখির ডাক ছেলেটার কানে যায়নি, সে দুলে-দুলে বাজিয়েই চলেছে কাঁই না-না, কাঁই না-না। দেখে পাখিটা এবার আরো জোরে-জোরে বলে উঠলো, ‘বন্যা না, বন্যা না?’ ছেলেটা যতই বাজায় কাঁই না-না, কাঁই না-না, পাখিটাও তত চেঁচায়, ‘বন্যা না, বন্যা না?’

বুঝতে পেরেছো? পুজোর ঠিক আগেই খুব বন্যা হয়ে গেল না? চার দিনের বৃষ্টিতে পশ্চিম বাংলার কত যে গ্রাম জলে একদম ডুবে গিয়েছিল, কত লোকের ঘর-বাড়ি ভেসে গিয়েছিল, আমার সাধ্য কী, সে-সব দুঃখের কথা লিখি! সেই দারুণ বন্যার পর খুব আলো-টালো জ্বালিয়ে, গান-বাজনা করে পুজোয় উৎসব করা কি উচিত? পাখি তাই বলছে।