গদ্যপদ্য

সংযুক্তা

স্বপ্ন

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

স্বপ্ন

নিশীথে শুইয়া, রজত পালঙ্কে

পুষ্পগন্ধি শির, রাখি রামা অঙ্কে,

দেখিয়া স্বপন, শিহরে সশঙ্কে,

মহিষীর কোলে, শিহরে রায়।

চমকি সুন্দরী, নৃপে জাগাইল,

বলে প্রাণনাথ, এ বা কি হইল,

লক্ষ যোধ রণে, যে না চমকিল

মহিষীর কোলে সে ভয় পায়!

উঠিয়া নৃপতি কহে মৃদু বাণী

যে দেখিনু স্বপন,শিহরে পরাণি,

স্বর্গীয়া জননী চৌহনের রাণী

বন্য হস্তী তাঁরে মারিতে ধায়।

ভয়ে ভীত প্রায়রাজেন্দ্রঘরণী

আমার নিকটেআসিল অমনি

বলে পুত্র রাখ, মরিল জননী

বন্যহস্তি-শূণ্ডে প্রাণ বা যায়॥

ধরি ভীম গদা মারি হস্তিতুণ্ডে

না মানিল গদা,বাড়াইয়া শূণ্ডে

জননীকে ধরি, উঠাইলে মুণ্ডে;

পড়িয়া ভূমেতে বধিল প্রাণ।

কুস্বপন আজি দেখিলাম রাণি,

কি আছে বিপদ কপালে না জানি

মত্ত হস্তী আসি বধে রাজেন্দ্রাণী

আমি পুত্র নারি করিতে ত্রাণ॥

শুনিয়াছি নাকি তুরস্কের দল

আসিতেছে হেথা, লঙ্ঘি হিমাচল

কি হইবে রণে, ভাবি অমঙ্গল,

বুঝি এ সামান্য স্বপন নয়।

জননীরূপেতে বুঝি বা স্বদেশ

বুঝি বা তুরস্ক মত্ত হস্তী বেশ,

বার বার বুঝি এইবার শেষ!

পৃথ্বীরাজ নাম বুঝি না রয়॥

শুনি পতিবাণী যুড়ি দুই পাণি

জয় জয় জয়! বলে রাজরাণী

জয় জয় জয় পৃথ্বীরাজের জয়—

জয় জয় জয়! বলিল বামা।

কার সাধ্য তোমা করে পরাভব

ইন্দ্র চন্দ্র যম বরুণ বাসব।

কোথাকার ছার তুরষ্ক পহ্লব

জয় পৃথ্বীরাজ প্রথিতনামা॥

আসে আসুক না পাঠান পামর,

আসে আসুক নাআরবি বানর,

আসে আসুক না নর না অমর।

কার সাধ্য তব শকতি সয়?

পৃথ্বীরাজ সেনা অনন্ত মণ্ডল

পৃথ্বীরাজভূজে অবিজিত বল

অক্ষয় ও শিরে কিরীট কুণ্ডল

জয় জয় পৃথ্বীরাজের জয়॥

এত বলি বামা দিল করতালি

দিল করতালি গৌরবে উছলি,

ভূষণে শিঞ্জিনী, নয়নে বিজলি

দেখিয়া হাসিল ভরতপতি।

সহসা কঙ্কণে লাগিল কঙ্কণ,

আঘাতে ভাঙ্গিয়াখসিল ভূষণ,

নাচিয়া উঠিল দক্ষিণ নয়ন,

কবি বলে তালি না দিও সতি॥

সংযুক্তা : পৃথ্বীরাজের মহিষী-কান্যকুব্জরাজার কন্যা। টডকৃত রাজস্থানের সংযুক্তার বৃত্তান্ত দেখ।