বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘গদ্যপদ্য’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ। তাঁর সাহিত্যজীবনের এমন এক পর্যায়ে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়, যখন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে আধুনিকতার নতুন প্রবাহ ক্রমশ সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে। উপন্যাস ও প্রবন্ধের পাশাপাশি কবিতার ক্ষেত্রেও বঙ্কিমচন্দ্র নিজের স্বতন্ত্র সাহিত্যিক প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন। ‘গদ্যপদ্য’ সেই বহুমুখী প্রতিভারই একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।
নাম থেকেই বোঝা যায়, গ্রন্থটির রচনায় গদ্য ও পদ্যের পারস্পরিক সম্পর্কের একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যভাবনা কেবল কাহিনি নির্মাণ বা মনোরঞ্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; ভাষা, সমাজ, দেশ, ধর্ম, নীতি, সৌন্দর্য ও মানুষের অন্তর্জীবন সম্পর্কে তাঁর গভীর চিন্তা তাঁর বিভিন্ন রচনায় প্রকাশ পেয়েছে। ‘গদ্যপদ্য’-এর রচনাগুলিতেও তাঁর সেই চিন্তাশীল ও অনুসন্ধিৎসু মননের পরিচয় পাওয়া যায়। কবিতার ভাষায় কখনও ব্যক্তিগত অনুভূতি, কখনও প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের উপলব্ধি, আবার কখনও বৃহত্তর জীবনবোধ ও সমাজচেতনা প্রকাশিত হয়েছে।
বঙ্কিমচন্দ্র মূলত ঔপন্যাসিক হিসেবে সর্বাধিক খ্যাতি অর্জন করলেও তাঁর সাহিত্যিক সত্তা ছিল বহুমাত্রিক। তিনি কবিতা দিয়ে সাহিত্যজীবন শুরু করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়েও পদ্যরচনার প্রতি তাঁর আগ্রহ বজায় ছিল। তাঁর কবিতায় একদিকে উনিশ শতকের বাংলা কাব্যের প্রচলিত রোমান্টিক ও ভাবপ্রবণতার প্রভাব যেমন দেখা যায়, অন্যদিকে তেমনি তাঁর নিজস্ব যুক্তিবাদী, মননশীল ও ব্যঙ্গপ্রবণ দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রকাশ ঘটে। ফলে ‘গদ্যপদ্য’কে কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু কবিতার সংকলন হিসেবে দেখলে এর সাহিত্যিক গুরুত্ব সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা যায় না; এটি বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যিক বিকাশ এবং তাঁর বহুমুখী সৃষ্টিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
গ্রন্থটির প্রকাশনা-ইতিহাসের সঙ্গেও ‘বঙ্গদর্শন’-এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে ‘বঙ্গদর্শন’ যে নবজাগরণী ভূমিকা পালন করেছিল, বঙ্কিমচন্দ্র তার অন্যতম প্রধান স্থপতি। তাঁর বিভিন্ন রচনা এই পত্রিকার মাধ্যমে পাঠকের কাছে পৌঁছেছিল। ‘গদ্যপদ্য’-এর রচনাগুলির মধ্যেও সেই সময়ের সাহিত্যরুচি, ভাষার পরিবর্তন এবং বঙ্কিমচন্দ্রের নিজস্ব সাহিত্যচিন্তার বিকাশের ছাপ লক্ষ করা যায়।
‘গদ্যপদ্যে’র বিশেষ মূল্য এখানেই যে, এটি বঙ্কিমচন্দ্রকে কেবল উপন্যাসের স্রষ্টা হিসেবে নয়, একজন কবি ও সাহিত্যচিন্তক হিসেবেও বুঝতে সাহায্য করে। যদিও তিনি কবি হিসাবে সফল নন। তবু, তাঁর ভাষার সৌন্দর্য, ভাবের বৈচিত্র্য, প্রকৃতির প্রতি সংবেদনশীলতা এবং জীবনের নানা বিষয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ এই গ্রন্থকে তাঁর সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে। বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাই ‘গদ্যপদ্য’ একটি উপেক্ষণীয় গ্রন্থ নয়; বরং তাঁর সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বের একটি স্বতন্ত্র দিকের পরিচয়বাহী গুরুত্বপূর্ণ রচনা।