জগৎ সংসার প্রথমে দুটি পরীর দখলে ছিল। তাঁরা মারা যাবার সময় নিজেদের ছেলেমেয়েকে এই চন্দ্র, সূর্য, আর জল ভাগ করে দিয়ে গেলেন। বড় মেয়ে আমা পেলেন সূৰ্য, বড় ছেলে সুসানো পেলেন সমুদ্র, মেজো ছেলে পেলেন চন্দ্ৰ।
মেজো ছেলে চাঁদের দেশের রাজা হয়ে চাঁদকন্যাকে বিয়ে করে সুখে ঘরকন্না করতে লাগলেন। বড় মেয়ে সূর্যের দেশে গিয়ে সেখানকার রাণী হলেন।
আগে সূর্যের তেজ ছিল না, রৌদ্র ছিল না, আমা যাওয়া মাত্র সূর্য জেগে উঠলেন—সোনার আলোয় জগৎ ভরে গেল।
বড় ছেলে সুসানোর ভারি হিংসে হল। মেজো ভাই চাঁদের দেশে আছেন, চাঁদের সুধা খাচ্ছেন। বড় বোন সূর্যের দেশের রাণী,—তাঁর রূপে, তাঁর তেজে, তাঁর দিকে কেউ চাইতে পারে না; সকলেই তাকে ভক্তি করে, প্ৰণাম করে। আর তিনি নিজে পড়ে আছেন কিনা সমুদ্রের লোনা জলে; যেখানে কেবল হাঙর আর তিমি!
একদিন তিনি রেগে ঝড়ের মতন সমুদ্র থেকে উঠে সূর্যের দেশে চলে গেলেন। আমা সখীদের নিয়ে চরকায় করে তুলো কেটে, সোনার সুতো বুনছিলেন।
এমন সময় দাদা এসে মার-মার কাট-কাট করে পড়লেন। চরকা ভেঙে, তুলে উড়িয়ে একেবারে একাকার করে ফেললেন। দাদার সেই তর্জন গর্জন দেখে আমা ভয়ে অস্থির। সূর্য ছেড়ে পালিয়ে তিনি এক পাহাড়ের গুহার মধ্যে লুকোলেন।
সূর্য গেল নিভে! জগৎ আঁধার, কেউ কারো মুখ দেখতে পারে না, কেউ কোনো কাজ করতে পারে না—সকলে হায় হায় করতে লাগল।
পরীরা সবাই বলতে লাগল, আমা-রাণী সূর্যে এসে না বসলে তো আমরা বাঁচব না। অন্ধকারে যে প্ৰাণ গেল!
তারা তখন আমা যে অন্ধকার গুহায় লুকিয়ে ছিলেন সেই গুহার দ্বারে পড়ে চ্যাঁচাতে লাগল, ওগো আমাদের রাণী—আমাদের চোখের মণি! তুমি বিনে সব আঁধার! তুমি এসো! তুমি এসো।
আমা কারো কথা শুনলেন না—গুহার দ্বারও খুললেন না, গুহা থেকে বেরোলেনও না।
তখন সকলে বলতে লাগল, তবে কী করা যায়? আমা নাচ দেখতে, গান শুনতে বড় ভালোবাসতেন। কোথাও নাচগান হলে তিনি ছুটে যেতেন।
পরীরা বলল, এসো আমার সবাই মিলে এই গুহার দরজায় দাঁড়িয়ে নাচ-গান করতে থাকি।
তখন সকল পরী মিলে কেউ গাইতে লাগল, কেউ নাচতে লাগল। আমা গুহার ভিতর বসে গানের সুর, নাচের তাল শুনতে পেয়ে আর স্থির থাকতে পারলেন না। সব ভুলে গিয়ে তাড়াতাড়ি দরজাটা একটুখানি ফাঁক করে দাঁড়ালেন।
পরীরা নাচতে নাচতে ফন্দি করে দরজার সামনে থেকে একটু সরে গেল। আমা তখন দরজা আর একটু বেশি ফাঁক করে মুখ বাড়ীয়ে দেখতে লাগলেন। পরীরা আরও একটু সরে গেল, আমা আরও একটু মুখ বাড়ালেন। এমনি করতে করতে তিনি শেষে একেবারে বাইরে এসে দাঁড়ালেন।
তখন পরীরা সবাই মিলে তাঁর হাত ধরে বলল, ধরেছি। যখন, তখন আর ছাড়ছি না—সূর্যে গিয়ে বসতেই হবে।
আমা বললেন, কী করে যাই? সেখানে যে আমার দাদা আছেন!
পরীরা বলল, ভয় নেই, আমরা সবাই মিলে তাকে তাড়িয়ে দিচ্ছি।
এই বলে তারা তখনই বড় ভাই সুসানোকে সূর্য থেকে তাড়িয়ে দিল। আমা সূর্যে এসে বসলেন—আলোয় জগৎ ভরে গেল।
এদিকে সুসানো সূর্য থেকে তাড়া খেয়ে মনের রাগে ঝড়ের মতন গর্জন করতে করতে সমুদ্রের জলে এসে পড়লেন। সুসানোর রাগে সমুদ্র চঞ্চল হয়ে উঠল, ঢেউয়ের জোরে পাহাড়-পর্বত ভেঙে পড়তে লাগল। সমস্ত পৃথিবীটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। এমনি করে দিন রাত্রি সুসানো চারিদিক তোলপাড় করে বেড়াতে লাগলেন।
ঘুরতে ঘুরতে সুসানো একদিন দেখতে পেলেন, এক নদীর তীরে এক বুড়ি একটি মেয়েকে কোলে করে ভেউ ভেউ করে কাঁদছে। এক বুড়ো তার পাশে। তারও চোখে জল।
তাদের কান্না দেখে সুসানোর মনে দুঃখ হল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের কি হয়েছে?
বুড়ো বলল, আর বাবা, আমাদের দুঃখের কথা কী শুনবে! আমার আট মেয়ে ছিল, এখন এই একটিতে ঠেকেছে। এই যে জলা দেখছ, ওইখানে একটা অজগর থাকে, আটটা তার ফণা। প্রতি বৎসর আজকের দিনে এসে সে আমার একটি করে মেয়ে খেয়ে যায়। এমনি করে আমার সাত-সাতটি মেয়ে গেছে; আজকে সূর্য পাটে বসবার আগে এটিও যাবে।
এই কথা বলে বুড়ো আরও কাঁদতে লাগল।
সুসানো বললেন, কেঁদো না তুমি। আমি তোমার মেয়েকে রক্ষা করব।
বুড়ি বলল, আহা তুমি পরের বাছা, আমাদের জন্যে কেন প্রাণ খোয়াবে? সে অজগরকে কি কেউ মারতে পরবে! স্বয়ং যমও তাকে ভয় পায়!
সুসানো বললেন, আমার জন্যে কিছু ভেবো না। আমি যা বলি শোনো। এইখানে আটটা চুলো জ্বালাও, আট চুলোর মাথায় আটটা হাঁড়ি বসাও, আট হাঁড়িতে আট ঘড়া মদ ঢালো, সেই মদ জ্বাল দাও।
বুড়ো-বুড়ি তাই করল। আট হাঁড়ি মদ টগবগ করে ফুটতে লাগল। তাই থেকে ভরভর করে গন্ধ বেরিয়ে আট যোজন পথ গন্ধে গন্ধময় হল। সাপ ছিল বিশ যোজন দূরে; আট যোজনের মধ্যে আসতেই তার নাতে সেই গন্ধ গেল।
সে মনে মনে বলল, কীসের গন্ধ এ? এমন গন্ধ তো কখনো পাইনি—জিভে জল আসে যে!
অজগর সুড়সুড় করে বুকে হেঁটে আসতে লাগল। আট ফণার ফোঁস ফোঁস শব্দ আকাশ কাঁপিয়ে তুলল। দেশের লোক সবাই জানল, অজগর আসছে; তারা যে যার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বসে রইল। ভয়ে তাদের কাঁপুনি থামে না!
প্রকাণ্ড অজগর। সে কী লম্বা! আর কী মোটা!—এ পাহাড়ে তার মুখ, পিছনের আটটা পাহাড় ডিঙিয়ে তার ল্যাজ! হাজার হাতি একত্র করলে তবে তার সমান মোটা হয়!
ওই অত বড় দেহখানা টেনে নিয়ে অজগর গুড়ি গুড়ি আসতে লাগল। যেখানে মদ জাল দেওয়া হচ্ছে, সেইখানে এসে থামল। মদের গন্ধে তার প্ৰাণ ভরপুর। সে তাড়াতাড়ি আটটা ফণা, আট হাঁড়ির মধ্যে চুবিয়ে চোঁ চোঁ শব্দে মদ খেতে লাগল।
খেতে খেতেই নেশা! শেষে নেশায় একেবারে ঢুলে পড়ল, হাঁড়ির মধ্যে থেকে মুখ বার করে নেবার আর ক্ষমতা রইল না। যখন একেবারে অচেতন, তখন সুসানো বেরিয়ে এসে তরোয়াল খুলে তার আট মাথা আট কোপে কেটে ফেললেন।
সাপ তো মলো। বুড়ো-বুড়ির আনন্দ ধরে না। তারা তখন সুসানোর সঙ্গেই তাদের মেয়ের বিয়ে দিল। সুসানো বিয়ে করে জলের দিকে বউকে নিয়ে যেতে চান।
বুড়ো বলল, যাও কোথা?
বুড়ি বলল, বাবা, এ তো তোমারই ঘর।
বৌ বলল, ও বাবা, ও মা, তোমরা আমায় কি শেষে জলে ফেলে দিলে!
সুসানো মহা বিপদে পড়লেন। শেষে ভেবেচিন্তে মাটির উপর মস্ত এক কোঠা বানিয়ে ঘরকন্না করতে লাগলেন, যেন মাটির মানুষ—মুখে আর কথাটি নেই।
আমা সূর্যের রাণী হয়ে সূর্যের দেশেই রইলেন। মেজো ভাই যেমন চাঁদের দেশে ছিলেন তেমনি সেখানেই রইলেন। সুসানো পৃথিবী দখল করলেন; ঝগড়াঝাটি মিটে গেল। যেমন দিন যাচ্ছিল, তেমনি দিন কাটতে লাগল।