শীতকালে কলকাতায় কত যে বিদেশী পাখি আসে, কেউ তা গুনে শেষ করতে পারে না। হাজার রঙের হাজার-হাজার পাখি দলে-দলে কত দূর-দূর দেশ থেকে প্রতি বছর ঠিক একই সময়ে উড়ে আসে। সবচেয়ে আশ্চর্য, পাখিদের কখনো পথ ভুল হয় না। এরোপ্লেন পর্যন্ত কুয়াশায় পথ হারিয়ে অচেনা সাগরে, মরুভূমিতে নেমে পড়ে। আমি তো একবার সামান্য ডিমাপুর থেকে হাফলং যেতেই ভুল ট্রেনে উঠে লামডিং জংশনে নেমে পড়েছিলুম। অথচ পাখিরা দ্যাখো, সেই কোন সাইবেরিয়া থেকে, সুইজারল্যান্ড থেকে পথ চিনে-চিনে হাজার-হাজার মাইল আকাশ সাঁতরিয়ে ঠিক কলকাতায় পৌঁছে যায়। ওদের না আছে কম্পাস, না আছে মানচিত্র। তার ওপর ভাবো, অতোটা পথ উড়ে আসে শুধু একটু বেড়াবার জন্যে। বেড়ানোও হয়, আবার নিজেদের দেশের হাড়কাঁপানো শীতের হাত থেকেও বাঁচে। আমাদের শীতকাল তো ওদের কাছে বসন্তকাল।
চিড়িয়াখানায় ঘুরে-ঘুরে আমি এরকম প্রচুর পাখি দেখছি আর এইসব ভাবছি, এক জায়গায় শুনি, আমাদের সুন্দরবনের একটা পাখি বলছে, ‘জন্মট্টান? জন্মট্টান?’
তার সামনেই খুব সুন্দর একদল বিদেশী পাখি ঠোঁট দিয়ে পালক-টালক ঠিক করছিল। মনে হয়, এরা সবে এসে পৌঁছেছে। অতোটা পথ উড়ে এসেছে তো, হাওয়ায় পালকগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে, তাই বোধহয় ঠোঁট দিয়ে ঠিক করে নিচ্ছে, সুন্দরবনের পাখিটা দেখলুম টুক-টুক করে লাফিয়ে-লাফিয়ে এই পাখির দলের কাছে এসে দাঁড়ালো। বার-কতক তার ছোট্ট ঘাড় বাঁকিয়ে ওদের ল্যাজ থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিয়ে আবার বললো, ‘জন্মট্টান? জন্মট্টান?’
বুঝেছো? বিদেশী পাখির দলটাকে ওদের জন্মস্থান কোথায় জিজ্ঞেস করছে।
ওদের মধ্যে একটু গম্ভীর ধরনের একটা পাখি পালক সাফ করা থামিয়ে বললো, ‘উজবেকিট্টান, উজবেকিট্টান, উজবেকিট্টান।’ উজবেকিস্তান বলে একটা জায়গা আছে না? ওরা আসলে সেখানকার পাখি।
সুন্দরবনের পাখিটা মনে হয় চিড়িয়াখানার পাখিদের দলপতি। ডানা নাচাতে-নাচাতে খানিক উড়ে গিয়ে আরেক দল বিদেশী পাখিকে ওইরকম করে তাদের জন্মস্থান জিজ্ঞেস করলো।
কী সুন্দর রং সেই পাখিগুলোর। শাদা, কালো, হলুদ, বেগুনী রঙে একেবারে ঝলমল করছে। আর ল্যাজের সে কী বাহার। ঠিক ছোট্ট জাপানি পাখার মতন। আমার খুব ইচ্ছে করছিল, একটুখানি গায়ে হাত বুলিয়ে দিই। কিন্তু সেটা হয়তো ঠিক হবে না। আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে শুধু দেখতে লাগলুম। দেখলুম, মাথায় হলুদের মধ্যে বেগুনি রেখা-ওলা একটা পাখি নিজেদের মধ্যে কীসব বলাবলি করলো। সে-ই বোধহয় এদের দলপতি। পাখিদের সব দলেই দেখছি একজন করে দলপতি থাকে। তো, সেই বেগুনি-ডোরা পাখিটা সুন্দরবনের পাখির কাছে এসে ভারি মিষ্টি করে বললো, ‘ম্যানচেট্টার ম্যানচেট্টার।’
তার মানে ম্যানচেস্টার। পাখিদের ঠোঁটে মাঝের স-টা ঠিক আসে না। ফরাসিরা যেমন হসপিটালকে ওপিতাল বলে, একবার বলেছিলুম না?
উঃ, কত দেশের কত যে পাখি! চিড়িয়াখানায় একেবারে পাখির মেলা বসেছে। আর কত যে রং। চোখের পলক ফেলতেও ইচ্ছে করে না।
সত্যিই, একসঙ্গে এত পাখি, মনে হয় যেন স্বপ্ন দেখছি। হঠাৎ শুনি ‘থাকছো ক দিন? থাকছো কত দিন?’ বলতে-বলতে সাত-আটটা এদেশী পাখি কোত্থেকে উড়ে এসে আমার বুক ঘেঁষে খানিক এগিয়ে ডানা গুটিয়ে ঝুপ-ঝুপ করে নেমে পড়লো। ম্যানচেস্টারের দলটার ঠিক সামনেই। পাখিদের একটা সুবিধে, যে যে-ভাষাই বলুক না কেন, এক-দেশের পাখি আরেকদেশের পাখির ভাষা বুঝতে পারে। ‘থাকছো ক দিন?’ শুনে ম্যানচেস্টারের দলপতি এবারও খুব মিষ্টি করে বললো, ‘হোলুইনটার, হোলুইনটার।’
তার মানে গোটা শীতকালটা।