চাঁদের তাঁবু

সাত

অমরেন্দ্র চক্রবর্তী

অনেকক্ষণ ধরে জল বয়ে যাবার ছলছল শুনতে পাচ্ছি। হঠাৎই জোর ছলাচ্ছল শব্দ শুনে চমকে গেলাম। শেষ পর্যন্ত তাহলে এখানে জল পাওয়া গেছে! আনন্দে খাটিয়া থেকে নেমে তাঁবুর বাইরে এসে দেখি—কোথায় জল! যেখানে কুয়ো খোঁড়া হচ্ছিল, সেখানেও শুধু বালির পৃথিবী। স্বপ্নে জলের শব্দ শুনে মন আনন্দে ভরে গিয়েছিল! সত্যি, মানুষ ইচ্ছে মতন ভালো ভালো স্বপ্ন দেখার উপায় বের করতে পারলে, জীবন কত আনন্দের হত!

তাঁবুর বাইরে শীত বেশ। ভালো করে আলোও ফোটেনি। ভেতরে এসে প্রথমেই চোখে পড়ল, আমার পাশের খাটিয়া শূন্য। ছেলেটা কখন উঠে চলে গেছে, ঘুমের মধ্যে জানতেই পারিনি।

তখনই আবার তাঁবুর বাইরে এলাম। অন্য দুটো তাঁবুর মানুষজন যে-যার দিনের কাজে লেগে পড়েছে। একটা মেয়ে ছাগলের দুধ দুইতে দুইতে ছাগলটার সঙ্গে অনর্গল কথা বলে চলেছে। তাঁবুর পুব দিকে তিনটে উট কাঁটাঝোপ মুখ দিয়ে ছিঁড়ে একভাবে চিবোচ্ছে। দূর থেকে একজনকে এই তাঁবুর দিকে এগিয়ে আসতে দেখে মনে হল ছেলেটা নিশ্চয়ই ফিরে আসছে।

চোখ সরু করে সেদিকে চেয়ে আছি, হঠাৎ আরও কাছে এসে ছেলেটা চেঁচিয়ে উঠল, ‘ছোটু! পমপম! তুই বেঁচে আছিস?’

এ তো দাদা! আমার পুরো নাম অনুপম কখনো বলে না। ডাকে পমপম বলে। আদর করে ‘ছোটু’ও বলে। আমাকে দেখতে পেয়ে দাদা তো দৌড়োচ্ছেই, আমিও দৌড়ে গিয়ে দাদার গায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম।

আমি যে এখানে আছি দাদা জানল কী করে?

দাদার উত্তর, ‘আমি জানব কেন, একটা ছেলেই তো আমাকে এদিকে নিয়ে এসে এই তাঁবুর পথ বুঝিয়ে দিয়ে ফিরে গেল। বলল, সোজা গিয়ে মাঝের তাঁবুর সামনে দাঁড়িয়ে ভাইয়ের নাম ধরে ডাকতে হবে। বলেই আরেক দিকে হনহন করে সে চলে গেল।’

আমি কী করে বেঁচে আছি, এই অসীম মরুভূমিতে আশ্রয় পেলাম কী করে, শোনবার জন্য দাদার আর তর সয় না। দাদাকে নিয়ে আমারও মনের অবস্থা একই। শেষে দাদাই বলল, ‘আমি দস্যুদের হাতে ধরা পড়েছিলাম। এই ছেলেটা কী করে আমাকে আজ উদ্ধার করল সেও এক রহস্য। শেষ পর্যন্ত আমরা যে নিজেদের ফিরে পেয়েছি সেটাই জগতের নবম আশ্চর্য! এ নিয়ে সারা বছর ধরে আমাদের কথা হবে। এখন সবচেয়ে আগে দরকার দেশে ফেরার একটা উপায় বের করা। সেই ছেলেটাই হয়তো সাহায্য করতে পারত, কিন্তু ওর নিজেরই খুব বিপদ মনে হল। উটের পিঠে একটা লোক এসে ছেলেটাকে কী যে একটা বলে গেল, ছেলেটাও আমাকে নিয়ে ছুটতে ছুটতে এদিকে এসে তাঁবুর পথ দেখিয়েই উলটো দিকে দৌড় লাগাল।’

সকাল থেকে আবার কুয়োর জন্য খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছে। আমি দাদাকে বললাম, ‘এরা আমাদের জন্য কী না করেছে! দলের সর্দার ছেলেটা না থাকলে আমিও এখানে এমন আশ্রয় পেতাম না, তোমাকেও এভাবে ফিরে পেতাম না। চলো, ওদের সঙ্গে আমরাও হাত লাগাই। ওরা বালি খুঁড়ে জল বের করতে চায়।’

‘মরুভূমিতে কুয়ো? সে কি সম্ভব?’

‘কেন, আমরা তো দুবাইয়ে আছি। এখানকার মরুভূমি তো পারস্য উপসাগরের কাছেই।’

দাদা আমার মুখের দিকে চেয়ে বলল, ‘দুবাইয়ে নেমেছি বলে আমরা কি এখনও সেখানেই আছি? অনেক অনেক দূরে অসীম মরুভূমির গভীরে আমরা চলে এসেছি। দুবাই যে-দেশের রাজধানী সেই আরব আমিরশাহী থেকেও অনেক দূরে অন্য কোনো মরুভূমিও হতে পারে এটা। দস্যুরা তো আমাকে প্রথমে উটের পিঠে চড়িয়েই দিনের পর দিন ঘুরিয়েছে। প্রথম যে আস্তানায় আমাকে এনে রাখল সেটাই সাতাশ দিনের রাস্তা, যেতে যেতে আমি এক-একটা দিন গুনতাম আর মুখস্থ করে রাখতাম। যদি কখনো কোনো রক্ষীবাহিনী আসে আমাকে উদ্ধার করতে, তখন ওই দিনের হিসেবটা দূরত্ব বোঝাতে কাজে লাগবে।’

দাদার কথা শুধু ওইটুকু শুনেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ‘আমার সবটাই পায়ে হেঁটে। তবে তুমি যেমন দস্যুর হাতে পড়েছিলে, আমাকে তেমনই উদ্ধার করেছে এমন একজন যাকে তুমি পীর বা ফকির বা দেবতাও বলতে পারো।’

‘তাঁকে আর পাওয়া যায় না?’

‘শুধু পূর্ণিমায় তাঁকে পাওয়া যায়। পূর্ণিমার দু-দিন আগে আর দু-দিন পরেও তাঁকে চাঁদের তাঁবুতে পেতে পারি।’

‘চাঁদের তাঁবু? মানে?’

‘তিনি বলেন, পূর্ণিমায় চাঁদ সারা রাত আকাশ পরিক্রমা করে ওই তাঁবুতে এসে জিরিয়ে নেয়।’

‘দূর! তা আবার হয় নাকি?’ দাদা এক কথায় উড়িয়ে দিল।

আমি মনের দুঃখ সয়েও বললাম, ‘দাদা, তুমিও এবার বড়োদের মতো কাউকে না জেনে না বুঝে চট করে তার বিচার করে ফেলছ!’

‘তাই বলে উদ্ভট আজগুবি অদ্ভুতুড়ে গালগল্পও বিশ্বাস করতে হবে? তার চেয়ে চল, বরং ওদের কুয়ো-কুয়ো খেলায় আমরাও ঢুকে পড়ি।’

দাদার কি আর আমেরিকা যাওয়া হবে? সেখানে আমার স্কুলে ভরতি হবারই বা কী হবে? কুয়োর দিকে যেতে যেতে কথাটা তুলতে দাদার চটপট উত্তর, ‘তোকে ফিরে পেলাম, এর পর ওসব আর কে ভাবছে! তা ছাড়া এ বছরের তো সেমেস্টার শুরু হয়ে গেছে। আবার সামনের বছর দেখা যাবে।’

সন্ধ্যে পর্যন্ত কুয়োর কাজ চলল। গোড়ায় আমাদের অসুবিধে হলেও অল্প সময়েই স্তূপের মতো বালি সাজিয়ে রাখার দক্ষতা এসে গেল। বালির পাহাড়ের নীচেই এরকম বেশ কয়েকটা বালির স্তূপে বিকেলের নরম রোদ পড়ে অনেকরকম ছবি ফুটে উঠছে। সেইসব ছবি দেখে বালি বয়ে আনার কাজটা আমার ভালো লাগতে লাগল। একসময় দেখলাম মরুভূমিতে বালির ঢেউয়ে লেগে থাকা গোধূলিবেলার আলো মুছতে মুছতে সূর্য অস্ত যাচ্ছে।

সাত ❀ চাঁদের তাঁবু ❀ এডুলিচার পাঠশালা