চাঁদের তাঁবু

তিন

অমরেন্দ্র চক্রবর্তী

সকালে বালির স্তূপের ছায়া যেমন লম্বা শুয়ে পড়েছিল, সূর্যাস্তের আগে আবার তেমনই লম্বা ছায়া, এবার স্তূপের অন্যদিকে। দুঃখে, খিদেয়, ক্লান্তিতে দিশেহারা হয়ে বালির স্তূপের আড়ালে শুয়ে শুয়েই দিনটা কেটে গেল। সূর্য ডোবার সঙ্গে পাখিটা তার বাসায় ফিরে যাবে। তখন আবার পেট পুরে জল খেয়ে দাদার খোঁজে যতদূর যেতে হয় যাব।

দূরে সূর্য পুরোপুরি বালিতে মিশে যাবার আগে থেকেই পুব আকাশে গোল চাঁদ চোখে পড়ল। আমিও বালি থেকে উঠে যেদিকে চোখ যায় হাঁটতে লাগলাম।

হাঁটতে হাঁটতে রাত কত হল জানি না, হয়তো প্রায় শেষ হয়ে আসছে। অথবা পূর্ণিমার আলোয় মরুভূমিতে সেভাবে রাতের অন্ধকার নামেনি। একসময় দূরে একটা বিরাট তাঁবু দেখতে পেয়ে সেদিকে এগোতে লাগলাম।

সাদা ধপধপে তাঁবুর পাশেই একটা কালো ঘোড়া। মস্ত বড়ো তাঁবুর ঠিক পিছনে বিরাট একটা গোল চাঁদ। প্রায় তাঁবুর মাথায় এসে বসেছে। এই চাঁদই আমি সন্ধ্যে নামার আগে প্রথমে পুব আকাশে দেখেছি।

‘এখানে আসবে আমি জানতাম।’ বলতে বলতে তাঁবুর ভেতর থেকে বেরিয়ে এল সেই বুড়ো লোকটা। কাল রাত থেকে আজ সকাল পর্যন্ত যে আমার শুধুই উপকার করে গেছে।

মরুভূমির মধ্যে আশপাশে আর কোথাও এত বড়ো তাঁবু আমি দেখিনি। বিশেষ করে এত উঁচু তাঁবু। তাঁবুর মালিক নিজে কিন্তু খুব লম্বা নয়। এখানেও পা থেকে গলা পর্যন্ত সাদা পোশাকে ঢাকা শরীরের মুখটুকু শুধু বেরিয়ে আছে। সাদা চুলদাড়ির ফাঁকে সেই পালিশ করা কুচকুচে কালো কাঠের মতো মুখ।

এত বড়ো একটা তাঁবুতে লোকটার বাসা! খুব অবাক হয়েছি দেখে লোকটা আমাকে কাছে ডেকে নিয়ে বলল, ‘আমি মালিক নই, তাঁবুটা আসলে চাঁদের। পূর্ণিমায় চাঁদ সারা আকাশ ঘুরে শেষরাতে এই তাঁবুর পিছনে এসে বিশ্রাম করে। রোদ না ফোটা অবধি। তারপর নিজের জগতে চলে যায়।’

মালিক নয়, তাহলে ইনি কে? তাঁবুতেই বা কী করছেন?

আমি তার মুখের দিকে চেয়ে আছি বুঝতে পেরে তিনি কাছে এসে আমাকে ডেকে নিলেন—‘এত দূর এসেছ যখন, তাঁবুতে দু-দণ্ড বসে যাও।’

তাঁবুর ভেতরে পা দিয়ে দেখি মেঝেময় নুড়ি পাথরের ছড়াছড়ি। অনেকটা মুক্তোর মতো, তবে মুক্তোর চেয়ে বড়ো। অসংখ্য নুড়ি তাঁবুর এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত ছড়ানো। অথচ তাঁবুর বাইরে আদিগন্ত শুধু বালি।

আকাশে তখনও সূর্যোদয়ের ছোঁয়া লাগেনি, এদিকে জ্যোৎস্নাও ফিকে হয়ে এসেছে, তাহলে চারদিক বন্ধ তাঁবুর ভেতরে এমন জ্যোৎস্নার মতো আলো কী করে হয়?

আমি খেজুর গাছের কাটা গুঁড়ির ওপর বসে এসব ভাবছি, লোকটা বড়ো একটা পাথরের গেলাস এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘খেয়ে তেষ্টা মেটাও। এ হল খরমুজার রস। যেমন ঠাণ্ডা তেমনই মিষ্টি।’ সত্যিই তাই। কয়েক চুমুকে রস শেষ করে মরুপথের ক্লান্তি কেটে গেল।

আমার সামনেই আরেকটা খেজুর গাছের কাটা গুঁড়ি। ঘষে ঘষে মসৃণ করা। লোকটা তার ওপর এবার খেজুর পাতায় বোনা থালায় একগাদা খেজুর রেখে বলল, ‘খাও। এমন মিষ্টি আর কোনো ফলে তুমি পাবে না।’

এ হল মরূদ্যানের বড়ো বড়ো খেজুর, মিষ্টি তো বটেই, তন্দুরি রুটির মাখা-আটার মতো নরম। দানাও বেশ সরু।

কালো মুখের হাসিও বড়ো মিষ্টি, তার ওপর যখন মাথা ঝুঁকিয়ে ফিসফিস করে কথা বলতে লাগল তখন তার প্রত্যেকটা কথাই মনে হল সত্যি।

লোকটা বলল, ‘সারা রাত আকাশ ঘুরে এসে চাঁদ স্বয়ং এই তাঁবুতে বিশ্রাম করছে।’

অবিশ্বাস করব কী, আমি চমকে গিয়ে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালাম। লোকটার মতোই ফিসফিস করে বললাম, ‘চাঁদ? এই তাঁবুর ভেতর? কই, দেখছি না তো!’

‘চাঁদের মাপ জানো? এই তাঁবু তো ছাড়, গোটা মরুভূমিটার চেয়ে কোটি কোটি গুণ বড়ো। চাঁদ নামে পৃথিবীর এই উপগ্রহ দেখতে অনেকটা সোনার থালার মতো জানো নিশ্চয়ই? একটা থালাকে লক্ষ কোটি গুণ বড়ো করলেও চাঁদের মাপের তুমি নাগাল পাবে না। সেই চাঁদকে এত কাছে এসে দেখা যায় নাকি! আকাশে যে চাঁদ দেখো, সেটা কোটি কোটি মাইল দূর থেকে দেখো বলেই দেখতে পাও। তাঁবুর ঠিক পিছনেই মস্ত বড়ো চাঁদ দেখোনি তুমি? তাঁবুর টানে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে এসে বিশ্রাম নিচ্ছে।’

বিজ্ঞানের দিক থেকে কথাটা নিয়ে আমি ভাবছি দেখে লোকটা আবার বলল, ‘তুমি তো এখন পৃথিবীতেই আছ, গোলাকার পৃথিবীটা কি তুমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছ? পৃথিবী থেকে কোটি কোটি মাইল দূরের কোনো গ্রহ থেকে যদি পৃথিবীর দিকে তাকাও, আকাশে ঠিক চাঁদের মতোই পৃথিবীকেও দেখতে পাবে।’

কিছুই বুঝতে না পেরে বললাম, ‘এই নুড়ি পাথরের মতো এখানে এগুলো কী?’

‘সবই চাঁদের পাথর। চন্দ্রকান্তমণি। এই রত্নপাথর রোজই চাঁদের গা থেকে খসে পড়ে। চাঁদ নিজেই গা ঝাড়া দিয়ে এগুলো ঝরায়। কেন জানো?’

জিজ্ঞেস করেই লোকটা চুপ করে গেল। কারণটা জানি না তাই আমিও চুপ। একসময় ধীরে ধীরে লোকটা আবার মুখ খুলল—‘এই মরুভূমিতে ভীষণ গরিব যত লোক আছে তাদের দেবার জন্য, যাতে দূর শহরে গিয়ে তারা এগুলো বেচে পেটের খিদে মেটাবার রুটি, আর রাতে শীতের কামড় থেকে বাঁচবার কম্বল জোটাতে পারে।’

কথা শেষ করে লোকটা এত জোরে লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল যে সামনের দশ-বারো হাত বালিও যেন ছটফট করে উঠল।

‘এতে যদি তারা খেতে-পরতে পায় তাহলে তোমার এই দীর্ঘশ্বাস কেন?’

লোকটা এবারও একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘চাঁদই যদি না বাঁচে, তাহলে চাঁদের পাথর আর পাব কী করে?’

চাঁদের আবার মৃত্যু হয় নাকি? আমি এতই অবাক হয়ে গেলাম যে, চাঁদ কেন আর নাও বাঁচতে পারে বলে তার মনে হচ্ছে, তা জিজ্ঞেস করতে পারলাম না।

লোকটা নিজের মনেই বলে চলল, ‘চাঁদকে শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যাবে কি না কেউ জানে না। পৃথিবীটাই বা কত দিন বাঁচবে! চাঁদ-পৃথিবীর ওপর রাক্ষসদের লোভ তো আজকের নয়, সেই প্রাচীন কাল থেকে।’

এ হয়তো কোনো পৌরাণিক কাহিনির কথা। আমার ক্লান্ত মাথায় ঢুকবে না। শেষ অবধি মানুষটার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাইরে এসে দেখি, চাঁদ তাঁবুর মাথায় বসে আছে। এত কাছ থেকে এমন বিরাট চাঁদ কোথাও আমি দেখিনি।

পৃথিবীর যেখানেই যাও সেখানেই চাঁদ দেখা যায়। মনে হবে তোমার সঙ্গে সঙ্গেই চলেছে। অথচ দাদা এই মরুভূমিরই কোথাও হারিয়ে আছে, আমার সঙ্গে দেখাই হচ্ছে না।

চাঁদ আকাশ থেকে সবাইকে দেখতে পায়, আমার দাদাকেও দেখতে পাচ্ছে, তবু আমি দাদাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন?

উদ্ভট সব চিন্তা করতে করতে যেদিকে পারি সেদিকে চলেছি, মরুভূমিও সকালের রোদে গরম হতে শুরু করেছে।

এর মধ্যে কয়েক জায়গায় মরীচিকা দেখেছি। দূর থেকে মনে হয় সামনেই খাল বা হ্রদ। কোথাও দিঘির জল চিকচিক করছে। যতই কাছে যাই, জল ততই দূরে সরে যায়।

অনেক দূরে একটা তাল-খেজুর গাছের জটলার মতো দেখে মনে হল এও বুঝি মরুভূমির কোনো মরীচিকা।

আরও এগিয়ে চোখে পড়ল কয়েকটা খেজুর গাছ। রঙিন ফুলে রাঙা ঝোপও চোখে পড়ল। কাছেই কয়েকটা ঘরবাড়িও দেখা যাচ্ছে। মনে হয় কোনো গ্রাম। কিন্তু এ কখনো সম্ভব? ধুধু মরুভূমিতে প্রচণ্ড রোদে নিশ্চয়ই আমি জেগে স্বপ্ন দেখছি।

আরও কাছে গিয়ে বুঝলাম, স্বপ্ন নয়, রঙের মরীচিকা নয়, সত্যিই একটা আস্ত গ্রাম। ছোট্ট মরূদ্যান। কিন্তু মরূদ্যানের যেসব ছবি দেখেছি, তাতে কোথাও রঙিন ফুলের মেলা দেখেছি কি?

বোরখার মতো লম্বা ঢোলা পোশাক পরা একজন মহিলা ঘরের সামনেই একটা কুয়োয় বালতি নামাতে নামাতে অচেনা বিদেশি আমাকে আসতে দেখে আমার মুখের দিকে চেয়ে আমাকে বুঝতে চাইছে মনে হল। তার মুখ কিন্তু খোলা। আর বোরখার রংও কালো নয়, সাদা।

যখন কুয়োর সামনে এলাম, ততক্ষণে মহিলা কুয়ো থেকে জলভরা বালতি টেনে তুলেছে। চামড়ার বালতি। পুরু চামড়া, মোটা সুতোর মতো কিছু দিয়ে সেলাই করা। কুয়োর পাড় পাথরের চাঙর দিয়ে বাঁধানো।

ঘরের সামনেই আমাকে বসতে দিয়ে বড়ো খেজুর পাতার থালা-ভরতি খেজুর আর খরখরে ভারী পাথরের গ্লাসে জল এগিয়ে দিল। অদ্ভুত তৃপ্তিতে আর শান্তিতে আমার মন ভরে গেল। আমার ভয়, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা কয়েক মুহূর্তের জন্য মন থেকে মুছে গেছে। নরম মিষ্টি খেজুরে খিদে মিটিয়ে কুয়োর ঠাণ্ডা জলে তৃষ্ণা দূর করে ভাবছি আমি এদের কী দিতে পারি, এমন সময় ঘর থেকে আরেকজন মহিলা কোলে ছ-আট মাসের একটা ফুটফুটে ছেলে নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। এখানকার মহিলারা সবাই দেখছি বোরখার মতোই ঢিলে-ঢালা পোশাক-পরা, তবে বোরখার রং সাদা, মুখেও ঢাকনা নেই। মহিলা আমার হাতের আঙুলের সোনার আংটি দেখিয়ে তার ছেলের জন্য চাইল। দুর্বোধ্য ভাষায় আকারে-ইঙ্গিতে বোঝাল, ছেলেটা আমার মতো বড়ো হয়ে এই আংটি পরবে, আর তা দেখে ওদের আমার কথা মনে পড়বে।

এই আংটি আমার উপনয়নের সময় দাদু আমাকে দিয়েছিলেন। আংটিটা খুলে ওই শিশুর হাতের মুঠোয় দিয়ে দিলাম। সে কিছু না বুঝেই গালভরা হাসি হাসল।

ঘরের পিছনেই দিগন্ত পর্যন্ত খোলা প্রান্তর। তার ওপর দিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে ভয়ানক চেহারার একটা লোক ঘরবাড়ি প্রায় আড়াল করে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। জোরে একটা হাঁক পেড়ে আমাকেই বলল, ‘ওরে মাল-বওয়া খোঁড়া উটের বাচ্চা! আমার হাঁটুর কাছে এসে দাঁড়া দেখি, দেখ তো তোর মাথা আমার হাঁটু ছাড়াতে পেরেছে কি না।’

লোকটার চোখ-মুখ সাংঘাতিক, তার চেয়ে সাংঘাতিক তার দেহের উচ্চতা। মাথা প্রায় আকাশে গিয়ে ঠেকছে। আর তেমনি পেশীবহুল চেহারা।

আমার মাথা লোকটার হাঁটু পর্যন্ত পৌঁছোতেই পারেনি শুনে সে মহাখুশি হয়ে বলল, ‘চাঁদ কি আমার চেয়েও উঁচুতে ঘুরে বেড়ায়?’

তার প্রশ্নটা ঠিক বুঝতে না পেরে বললাম, ‘পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব হল তিন লক্ষ চুরাশি হাজার চার-শো তিন কিলোমিটার।’

লোকটা আমার কথা বুঝল বা বিশ্বাস করল বলে মনে হল না। দূর থেকে চাঁদের তাঁবুর মালিককে আসতে দেখে বলল, ‘ওই তো, ওর তাঁবুর মাথায় নাকি পূর্ণিমার চাঁদ নামে, ওকেই জিজ্ঞেস করব। তবে ও আবার আমার সঙ্গে কথাই বলতে চায় না। ওর ধারণা আমি নাকি রাতকানা, রাতের আকাশে চাঁদ দেখা আমার কম্ম নয়।’

তাঁবুর মালিক সোজা আমার কাছে এসে আমার একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে বলল, ‘চলো, তোমাকে এই মরুরাজ্যের এক অদ্ভুত রাজার কাছে নিয়ে যাব।’

কথাটা শুনেই লম্বা লোকটা চিৎকারে চারপাশ কাঁপিয়ে বলল, ‘কোত্থাও যেতে পারবে না! আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। মরুভূমির সবচেয়ে লম্বা মানুষের চেয়েও চাঁদ উঁচুতে থাকে কী করে?’

‘তুমি রাতকানা বলে রাতে কি একেবারেই দেখতে পাও না?’

কথাটা কানে না তুলে লম্বা লোকটা এবার গর্জে উঠে বলল, ‘আমার কথার জবাব দাও। পূর্ণিমার শেষ রাতে চাঁদ কি সত্যিই তোমার তাঁবুতে এসে জিরোয়?’