ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়

অবন ঠাকুরের দরবারে

দুই

জসীম উদ্‌দীন

আমার সঙ্গে আলাপ করিয়া আমার লেখাগুলি শুনিয়া অবন বাবুর ছবি আঁকার কাজের ব্যাঘাত হইত না। বরঞ্চ আমার মত কেহ তার কাছে বসিয়া গল্প করিলে ছবি আঁকা আরও সুন্দর হইত। এইজন্য বাড়ির লোকে আমার ঘন ঘন তার কাছে যাওয়া-আসা খুব পছন্দ করিতেন।

একদিন মোহনলালের বাবা মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয় আমাকে বলিলেন, “অবনবাবু তোমার ‘নকসী কাঁথার মাঠ’এর কথা বললেন। তোমার বই তার ভাল লেগেছে। আমাকে আদেশ করলেন বইএর ছন্দের বিষয়ে তোমাকে নির্দেশ দিতে। তা ছন্দের রাজা অবনবাবুই যখন তোমার সমস্ত বই দেখে দিয়েছেন, আমার আর কি প্রয়োজন।” আমি বুঝিতে পারিয়া আনন্দিত হইলাম। আমার সামনে না করিলেও অগোচরে তিনি পুস্তকের প্রশংসা করিয়াছেন।

বার বার অবনবাবুর বাড়ি আসিয়া তাহার দৌহিত্র মোহনলালের সঙ্গে আমার বিশেষ বন্ধুত্ব গড়িয়া উঠে। ঠাকুর-পরিবারের মধ্যে এমন নিরহঙ্কার মিশুক লোক খুব কমই দেখিয়াছি। মোহনলালের বন্ধুগোষ্ঠী এমনই বিচিত্র, এবং পরস্পরে এমন আকাশ-জমীন তফাৎ, তাহা ভাবিলে আশ্চর্য হইতে হয়।

আমি যখন কলিকাতা হইতে দেশে ফিরিতাম তখন মোহনলালের সঙ্গে সুদীর্ঘ পত্রালাপের মাধ্যমেঠাকুরবাড়ির সঙ্গে পরিচিতির যোগসূত্র বজায় রাখিতাম। আমি লিখিতাম পল্লীবাংলার গ্রামদেশের অলিখিত রুপকাহিনী। বর্ষাকালে কোন ঘন বেতের ঝাড়ের আড়ালে ডাহুকের ডাক শুনিয়াছি, কোথায় কোন ডোবায় সোলপোনাগুলি জলের উপরে আলপনা আঁকিতে আঁকিতে চলিয়াছে, বসন্তের কোন মাসে কোন বনের মধ্যে নতুন গাছের পাতার ঝালর দুলিয়া উঠিয়াছে, তাহার উপরে আমগাছের শাখায় হলদে-পাখিটি ডাকিয়া ডাকিয়া হয়রান হইতেছে, এই সব কাহিনী। আর মোহনলাল লিখিত তার দাদামশায়ের নিত্যনৈমিত্তিক জীবনের বহু বিচিত্র ঘটনা; আমার মানসলোকের রবীন্দ্রনাথের রহস্যময় আনাগোনার কথা, কোন মাসে তিনি শান্তি নিকেতনের রূপকারদের সঙ্গে লইয়া আসিয়া কোন কথাকাহিনীর উপহার দিয়া গেলেন কলিকাতার বুকে—সেই সব ঘটনা। চিঠির ঘুড়িতে চড়িয়া তখন দেবলোকের ইন্দ্রজিতের মনের গগন-কোণে আসিয়া ভিড় জমাইত। চিঠিতে যে কথা সবটা স্পষ্ট হইয়া না উঠিত, কলিকাতা গিয়া বন্ধুর সঙ্গে একান্তে বসিয়া সেই সব কথা ইনাইয়াবিনাইয়া ওলট করিয়া পালট করিয়া নতুন ভাবে উপভোগ করিতাম।

তারপর অবনঠাকুরের বারান্দায় দিনের পর দিন, সকাল হইতে দুপুর পর্যন্ত, একাগ্র বসিয়া থাকিতাম। দুই ভাই অবনবাবু আর গগনবাবু রঙের জাদুকর; কথার সরিৎসাগর। তুলির গায়ে রঙ মাখাইয়া কাগজের উপরে রঙ মাখামাখি খেলা—দেখিয়া দেখিয়া সাধ মেটে না। দূর-অতীতে মোগল-হেরেমের নির্জন মণিকোঠায় সুন্দরী নারীর অধরের কোণে যে ক্ষীণ হাসিটি ফুটিতে না ফুটিতে ওড়নার আড়ালে মিলাইয়া যায়—একজন তারই এতটুকু রেস রঙিন তুলির উপরে ধরিয়া বিশ্বের রূপপিয়াসীদের মনে অনন্তকালের সান্ত্বনা আঁকিয়া দিতেছেন, আরজন কথাসরিৎসাগরে সাঁতার কাটিয়া ইন্দ্রধনুর দেশ হইতে রূপকথার রূপ আনিয়া  কাগজের উপরে সাজাইতেছেন। এ রূপ দেখিয়া মন তৃপ্তি মানে না। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, সকাল হইতে দুপুর, বিকাল হইতে সন্ধ্যা চলিয়াছে দুই জাদুকরের একান্ত সাধনা। এদের বন্ধু নাই, আত্মীয় নাই, স্বজন নাই, প্রতিবেশী নাই। নীড়হীন দুই চলমান বিহঙ্গ উড়িয়া চলিতে চলিতে পথে পথে ছবির রঙিন ফানুস ছড়াইয়া চলিয়াছেন। এরা চলিয়া যাইবেন আমাদের গ্রহপথ হইতে হয়ত আর কোন সুন্দরতর গ্রহপথে। যাওয়ার পথখানি ছবির রঙিন আখরের দান-পত্রে রাঙাইয়া চলিয়াছেন। দুইজনের মুখের দিকে একান্তে চাহিয়া থাকি। গগনবাবু  কথা বলেন না মাঝে মাঝে মৃদু হাসেন। সে কী মধুর হাসি! অবনবাবু কাগজের উপর রঙ চড়ান, আর মধ্যে মধ্যে কথা বলেন। কথার সরিৎসাগরে অমৃতের লহরী খেলে।

অবনবাবু মাঝে মাঝে জিজ্ঞাসা করেন, “কি হে, জসীমিঞা, কোন কথা যে বলছ না?”

কথা আর কী বলিব। হৃদয় যেখানে শ্রদ্ধা হইয়া ওই দুই সাধকের চরণতলে লুটাইয়া পড়িতেছে, সেখানে সকল কথা নীরব। মনে মনে শুধু বলি অমনই একান্ত সাধনার শক্তি যেন আমার হয়। আমার যা বলার আছে, তা যেন একান্ত তপস্যায় অঙ্কুরিত হইয়া ওঠে।

অতি সঙ্কোচের সঙ্গে একদিন জিজ্ঞাসা করি, “দাদামশাই, (মোহনলালের সঙ্গে আমিও তাকে দাদামশাই বলিয়া ডাকিবার অধিকার পাইলাম) আপনি ওরিয়েন্টাল আর্ট-এর জন্মদাতা। আপনার মুখে একবার ভাল করে শুনি ওরিয়েন্টাল আর্ট কাকে বলে।”

ছবিতে রং লাগাইতে লাগাইতে অবনবাবু বলেন, “আমি জানিনে বাপু, ওরিয়েন্টাল আর্ট কাকে বলে।”

আমি বলি, “তবে যে ওরিয়েন্টাল আর্ট নিয়ে লোকের এত লেখালেখি। সবাই বলে, আপনি ওরিয়েন্টাল আর্ট-এর পথের দিশারী।”

হাসিয়া অবনবাবু বলেন, “তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করো, ওরিয়েন্টাল আর্ট কাকে বলে। আমি করেছি আমার আর্ট। আমি যা সুন্দর বলে জেনেছি, তা আমার মত করে এঁকেছি। কেউ যদি আমার মত করে আঁকতে চেষ্টা করে থাকে, তারা আমার অনুকরণ করেছে। তারা তাদের আর্ট করতে পারেনি।”

নিজের ছবির বিষয়ে তার কি মত, জানিতে কৌতূহল হইল। জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনার ছবির পাত্র-পাত্রীদের আপনি সুন্দর করে আঁকেন না কেন? লোকে বলে আপনি ইচ্ছে করেই আপনার চরিত্রগুলোকে এবড়ো-খেবড়ো করে আঁকেন।”

অবনবাবু বলেন, “আমি সুন্দর করেই আঁকি। আমার কাছে আমার সুন্দর। তোমাদের কাছে তোমাদের সুন্দর। আমি ইচ্ছে করে কোন ছবি অসুন্দর করে আঁকিনে।”

আমি তবু বলি,“আপনার বনবাণীর ছবিখানার কথাই ধরা যাক। অত বয়সের করে এঁকেছেন কেন? অল্প বয়সের করলে কি দোষ হত?”

অবনবাবু হাসেন : “আমি ওই বয়সেই তাকে সুন্দর করে দেখেছি।”

এখন নিজের ভুল বুঝিতে পারি। বন কত কালের পুরাতন; সেই বনের রাণীও অমনি পুরাতন বয়সের হইবেন। তাছাড়া অবনবাবুর বয়সও সেই বনের মত প্রবীন।

আর একদিন অবনবাবুকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “দাদামশাই, কিছু লিখতে মন আসছে না। কি করি?”

তিনি বলিলেন, “চুপ করে বসে থাক। পড়াশুনো কর।”

আমি জিজ্ঞাসাকরি, “আচ্ছা দাদামশাই, মনের ভাবকে বাড়াবার জন্য আপনি কিছু করেন না?”

দাদামশাই হাসেন : “আমার যা ভাব আছে, তারই জন্যে রাতে ঘুম হয় না। সারাদিন তাই ভাব কমানোর জন্য ছবি আঁকি। আর ভাব বাড়ালে ত মরে যাব।”

অবন আর গগন দু-ভাই আঁকেন। ওপাশে সমর বসিয়া বসিয়া শুধু বই পড়েন। কত দেশী-বিদেশী গুণীব্যক্তিরা আসেন। অবনের কাছে আর গগনের কাছে তাদের ভিড়। সমরের দিকে তাঁরা ফিরিয়াও চাহেন না। সমর তাঁর বই-এর পাতার পর পাতা উল্টাইয়া চলেন। আরব্য রজনীর ইংরাজী অনুবাদ, কালীসিংহের মহাভারত, কুট হ্যামসুন, টলস্টয় ইত্যাদি কত দেশের কত মহামনীষীর লেখা। স্বপনপুরীর রাজপুত্র বই-এর পাতায় ময়ুরপঙ্খীতে চড়িয়া দেশ বিদেশে ঘুরিয়া বেড়াইতেছেন। মাঝে মাঝে বই হইতে মুখ তুলিয়া গগনের ছবি দেখেন—অবনের ছবি দেখেন। দুই ভাই-এর সৃষ্টির গৌরব যেন তাঁরই একার। এই রঙ-রেখার জাদুকরদের দ্বারপ্রান্তে তিনি যেন প্রহরীর মত বসিয়া আছেন। কতবার কত সময়ে আমি সেই বারান্দায় গিয়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাইয়াছি। কোনদিন ভাই-এ ভাই-এ কথা-বলাবলি করিতে শুনি নাই। ঝগড়া ত তাহারা জানিতেনই না; সাংসারিক কোন আলাপ, কি কোন অবসর বিনোদনের কথাবার্তা—কোন কিছুতেই এই তিন ভাইকে কোনদিন মশগুল দেখিতে পাই নাই। গগন খুশি আছেন, এপাশে অবন ছবি আঁকিতেছেন ওপাশে সমর বই পড়িতেছেন। অবন খুশি আছেন,— পাশে গগনের তুলিকাটা  কাগজের উপর উড়িয়া চলিয়াছে তেপান্তরের রূপকথার দেশে। সমর ত দুই ভাই এর সৃষ্টি কার্যের গৌরবে ডগমগ।  কথা যদি এদের কিছু থাকে, সে কথা হয় মনে মনে। পাশে ভাইরা বসিয়া আছেন, ইহাই ত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম আনন্দ।

এক একদিন সন্ধ্যাবেলায় অবন নামিয়া আসেন নিচের তলায় হলঘরে। সেখানে বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তাদের নাতিপুতিরা অবনদাকে ঘিরিয়া ধরে, “গল্প বল।”

অবনের গল্প বলার সে কী ধরন। অবন যেমন ছবি আঁকেন, রঙ দিয়া মনের কথাকে চক্ষুর গোচর করাইয়া দেন—তেমনি তার গল্পের কাহিনীকে হাত নাড়িয়া ইচ্ছামত চোখমুখ ঘুরাইয়া কোনখানে কথাকে অস্বাভাবিকভাবে টানিয়া কোন কথাকে দ্রুতলয়ে সারিয়া তার গল্পের বিষয়বস্তুকে চক্ষুগোচর করিয়া তুলিতে চেষ্টা করেন। মাঝে মাঝে ইকিড়ি-মিকিড়ি কথা ভরিয়া শব্দের অর্থের সাহায্যে নয়, ধ্বনির সাহায্যে গল্পের কথাকে রূপায়িত করেন।

অবনের দুই অস্ত্র-রঙ আর কথা, আঁচড় আর আখর। তাঁকে ঘিরিয়া শিশুদলের মৌমাছি সর্বদা গুনগুন করে।

কোন কোন দিন তিনি ভূতের গল্প বলিয়া শিশুদের ভয় পাওয়াইয়া দেন। বলেন, ভূতের গল্প শুনিয়া ওদের হার্ট বলবান হইবে।

সেদিন ছিল বর্ষা। অবন নিচে নামিয়া আসিলেন। বাড়ির সকলে তাকে ঘিরিয়া বসিল। ভাইপোরা নাতি-নাতনীরা সকলে। তিনি উদ্ভট ধাঁধা রচনা করিয়া সবাইকে তার মানে জিজ্ঞাসা করেন। নাতিনাতনীরা শুধু নয়, বয়স্ক ভাইপোরা পর্যন্ত সেই ধাঁধার উত্তর দিতে ঘামিয়ে অস্থির। কত রকমের ধাঁধা রচনা করেন! ধাঁধার কথাটি মুখে উচ্চারণ না করিয়া হাত নাড়িয়া চোখমুখ ঘুরাইয়া ধাঁধার ছবি তৈরী করেন, সঠিক উত্তর না পাইলে উত্তরটিকে আরও একটু ইঙ্গিতে বুঝাইয়া দেন। নাতিপুতিরা উত্তর দিলে খুশিতে উজ্জ্বল হইয়া ওঠেন।

সেবার গ্রীষ্মের ছুটির পর দেশ হইতে ফিরিয়া মোহনলালের কাছে শুনিলাম, খেয়াল হইয়াছিল কয়টি মোরগ পুষিবেন। সকালবেলা ঘণ্টার পর ঘণ্টা নাতিপুতিদের লইয়া জল্পনাকল্পনা চলে, কি রকম মোরগ হইবে, কেমন তার গায়ের রঙ, কেমন তার চলনবলন। তারপর গাড়িতে করিয়া দুপুরের রোদে শেয়লদার হাট। এমনি তিন-চার হাট ঘুরিলেন। মনের মত মোরগ পাওয়া গেল না।

আমার কাছে ছিল একখানা শহীদে-কারবালার পুঁথি। তাকে পড়িতে দিলাম। সে বই তিনি শুধু পড়িলেন না, যে জায়গা তার ভাল লাগিল দাগ দিয়া রাখিলেন। হাতের চিহ্ন-আঁকা সেই বই এখনো আমার কাছে আছে।

তারপর খেয়াল চাপিল, আরও পুঁথি পড়িবেন। আমাকে বলিলেন, “ওহে জসীমিঞা, চল তোমাদের মুসলমানী পুঁথির দোকানে মেছুয়াবাজারে।”

তাঁকে লইয়া গেলাম কোরবান আলী সাহেবের পুঁথির দোকানে। দোকানের সামনে অবনীন্দ্রনাথের গাড়ি। জোব্বাপাজামা পরা এ কোন শাহজাদা পুঁথির দোকানে আসিয়া বসিলেন। পুঁথিওয়ালারা অবাক! এমন সুন্দর শাহজাদা কোন দিন তাদের পুঁথির দোকানে আসে নাই। এটা-ওটা পুঁথি লইয়া নাড়াচাড়া করেন। দোকানী আমার কানে কানে জিজ্ঞাসা করেন, “কে ছদ্মবেশী বাদশাজাদা?” আমি বলি, “বাদশাজাদা নন, ইনি রঙের রেখার আর কথার আতসবাজ, পাশ্চাত্ত্য ও দেশীয় চিত্রকলার শাহানশাহ অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।”

দোকানী ব্যস্ত হইয়া ওঠে মেছুয়াবাজারের মালাই-দেওয়া সিঙ্গল চা ও পান আনিয়া হাজির করে।

দোকানীর কানে কানে বলি, “ওসব উনি খাবেন না। পেয়ালাগুলো দেখুন না কেমন ময়লা?

দোকানীর আন্তরিকতা দেখিয়া চায়ের পেয়ালায় মুখ দিয়া বলিলেন, “দেখ জসীমিঞা, কেমন সুন্দর চা।”

দোকানী খুশি হইয়া যেখানে যত ভাল পুঁথি আছে, তার সামনে আনিয়া জড় করে। ছহি সোনাভান, জয়গুন বিবির কেচ্ছা, আলেফ লায়লা, গাজী কালু চম্পাবতী—আরও কত বই। শিশু যেমন মুড়ি কুড়াইয়া খুশি হইয়া বাড়িতে লইয়া আসে, তেমনি এক তাড়া বই কিনিয়া অবনীন্দ্রনাথ ঘরে ফিরিলেন। তারপর দিনের পর দিন চলিল পুঁথি পড়া। শুধু পড়া নয়—পুঁথির যেখানে নায়িকার বর্ণনা, গ্রামদেশের প্রকৃতির বর্ণনা, বিরহিনী নায়িকার বারোমাসের কাহিনী, অবনবাবু তার খাতার মধ্যে ঢুকিয়ে রাখেন। খাতার পর খাতা ভর্তি হইয়া যায়। সবগুলি পুঁথি শেষ হইলে আবার একদিন চলিলেন সেই মেছুয়াবাজারে। এমনি করিয়া বার বার গিয়া এ-দোকান ও-দোকান ঘুরিয়া শুধু পুঁথিই কিনিলেন না, পুঁথির দোকানদারদের সঙ্গে রীতিমত বন্ধুত্ব করিয়া আসিলেন।

রোজ সকাল হইতে দুপুর, আবার বিকাল হইতে সন্ধ্যা সমানে পুঁথি পড়া চলিয়াছে। খাতার পর খাতা ভর্তি হইয়া চলিয়াছে। কেহ দেখা করিতে আসিলে তাকে পুঁথি পড়িয়া শোনান—গাজীকালুর পুঁথিতে যেখানে বাঘের বর্ণনা, মামুদ হানিফের সঙ্গে সোনাভানের লড়াই-এর বর্ণনা, নানা গ্রামের নাম ও নায়ক-নায়িকার পোশাকের বর্ণনা। রঙ-গোলার কোটা শুষ্ক হইয়া পড়িয়া আছে। তুলিতে ধূলি জমিয়াছে। কোথায় রঙ, কোথায়  কাগজ কোনদিকে খেয়াল নাই। এই রূপে তিন-চার মাস কাটিয়া গেল। আর বই পাওয়া যাইতেছে না। মজার গল্পে-ভরা যত পুঁথি, সব পড়া শেষ হইয়া গিয়াছে।

এমন সময় রবীন্দ্রনাথ আসিলেন শান্তিনিকেতন হইতে। খুড়ো-ভাইপোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মুসলমানী পুঁথি লইয়া আলাপ চলিল। রবীন্দ্রনাথ বলিলেন, পুঁথির একটি সংকলন বিশ্বভারতী হইতে ছাপাইবেন। পুঁথি-সংকলনের খাতা বিশ্বভারতীতে চলিয়া গেল। (সেগুলি হয়ত সেখানেই পড়িয়া আছে; আজও ছাপা হয় নাই।)

অবনীন্দ্রনাথ আবার ছবি আঁকায় মন দিলেন। কোথায় রঙের কৌটা শুষ্ক হইয়া পড়িয়াছিল, তাহাতে পানি ঢালিলেন, ধূলিমাখা তুলিটি ঝাড়িয়া মুছিয়া লইলেন।

একবার তাঁর খেয়াল চাপিল, মানুষের ছবি আঁকিবেন। বাড়ির সবাইকে ডাকিলেন সিটিং দিতে। অনেকের ছবি আঁকা হইয়া গেল। একদিন আমাকে বলিলেন, “এসো, তোমার একটি ছবি আঁকি।”

আমি সঙ্কোচবোধ করিতেছি। পাশে ব্রতীন্দ্রনাথ ঠাকুর দাঁড়াইয়াছিলেন। তিনি সিটিং দিতে বসিয়া গেলেন। আজ মনে বড়ই অনুতাপ হইতেছে। সেদিন যদি সঙ্কোচ না করিতাম, তবে সেই অমর তুলিকার জাদুস্পর্শে নিজেকে কতকটা অমর করিয়া লইতে পারিতাম।

মহাত্মা গান্ধী যেদিন ডাণ্ডী-যাত্রা করিলেন লবণ-আইন অমান্য করিতে, তিনি সেইদিন আরব্য রজনীর ছবিগুলি আঁকা আরম্ভ করিলেন। এক একখানা ছবি আঁকিতে বিশ-পঁচিশ দিন লাগে। আমি সামনে বসিয়া বসিয়া দেখি আর তার কাছে আমার পল্লীবাংলার গল্প বলি।

কোথায় কোন গ্রামে এক বেদে সাপ ধরিতে যাইয়া সাপের ছোবলে মৃত প্রায় হইয়াছিল, তারপর বেদেনী আসিয়া কেমন করিয়া তাকে মন্ত্র পড়িয়া সারাইয়া দিয়াছিল; কোন গ্রামে ভীষণ মারামারি হইতেছিল, হঠাৎ আফাজদ্দি বয়াতি আসিয়া গান গাহিয়া সেই কলহপ্রবণ দুই দলকে মন্ত্র-মুগ্ধ করিয়া তুলিয়াছিল; কোন গ্রামে মেয়েরা পিঠার উপর নক্সা আঁকিতে আঁকিতে গান করে, কোথায় এক বৈষ্ণবী গান গাহিতে থাকে আর তার বৈষ্ণব কাঁদিয়া কাঁদিয়া তার পায়ের উপর আছড়াইয়া পড়ে; কোথায় কোন জঙ্গলে একটা বৃষকাষ্ঠ আছে, তার ছবিগুলি যেন জীবন্ত হইয়া  কথা কহিতে চায়। আমি বলি এই সব কথা, আর তিনি ছবি আঁকিয়া চলেন।

বুড়া হইয়া যাইতেছেন। মুখের চামড়া ঝুলিয়া পড়িতেছে। কিন্তু তিনি বলেন, “সমস্ত আরব্য রজনীর গল্প ছবিতে ছবিতে ভরে দেব।”

আমি জিজ্ঞাসা করি, “দাদামশাই, এক একটা ছবি আঁকতে এতদিন সময় নিচ্ছেন, এতবড় বিরাট আরব্য রজনীর বই-এর ছবিগুলি কি আপনি শেষ করে যেতে পারবেন?

দাদামশাই হাসিয়া উত্তর করেন, “আমি শিল্পীর কাছে শিল্প সীমাবদ্ধ, কিন্তু শিল্পীর জীবন—eternal অনন্ত। এর কোন শেষ নেই, কতদিন বেঁচে থাকব সে প্রশ্ন আমার নয়, আমায় কাজ করে যেতে হবে।”

দিনের পর দিন ছবি আঁকা চলিল। তখন বাংলার রাজনৈতিক আকাশে অসহযোগের ডামাডোল চলিতেছে। মহাত্মা গান্ধী জেলে গেলেন। সমস্ত ভারত রাজনৈতিক চেতনায় উন্মাদ হইয়া উঠিল। খবরের কাগজে নিত্য নূতন উত্তেজনাপূর্ণ খবর বাহির হইতেছে। ইস্কুল-কলেজ ভাঙিতেছে, জেলে রাজবন্দীদের উপর অত্যাচার হইতেছে, কিন্তু শিল্পী একান্তে বসিয়া বসিয়া আরব্য রজনীর ছবি আঁকিতেছেন। কোনদিন খবরের কাগজের পাতা উল্টাইয়া দেখেন না। সকাল হইতে দুপুর, আবার বিকাল হইতে সন্ধ্যা-সমানে চলিয়াছে ছবি আঁকার সাধনা। সেই ছবিগুলিতে শিল্পীর বাড়িরই ছেলেমেয়েরা, তারাই যেন আরব্য রজনীর পোশাক পরিয়া নাটক করিতে নামিয়াছে। এমনি করিয়া প্রায় এক বৎসর কাটিয়া গেল। শান্তিনিকেতন হইতে রবীন্দ্রনাথ আসিলেন বসন্ত-উৎসবের নাচের দল লইয়া। অবনীন্দ্রনাথ চলিলেন এম্পায়ার থিয়েটার-হলে অভিনয় দেখিতে।

পরদিন সকালে দেখি, তিনি চুপ করিয়া বসিয়া আছেন। আমাকে দেখিয়া বলিলেন, “ওহে জসীমিঞা, কাল শান্তিনিকেতনের বসন্ত-উৎসব দেখে এলাম। ওরা কী আবিরের গুড়ো ছড়িয়ে দিল। তাতে চোখ অন্ধ হয়ে গেছে। তোমাদের মোগলযুগের ছবি আর চোখে দেখতে পাচ্ছিনে।”

সেইদিন হইতে তার আরব্য রজনীর ছবি আঁকা শেষ হইল। সেই অসমাপ্ত ছবিগুলি রবীন্দ্রসদনে রক্ষিত আছে।

বি. এ. পাশ করিয়া এম. এ. পড়িতে আমি কলিকাতায় আসিলাম। তখন থাকিতাম মেছুয়াবাজার ওয়াই. এম. সি. এ. হোস্টেলে। কিন্তু আমার মন পড়িয়া থাকিত অবনঠাকুরের দরবারে। অবসর পাইলেই আমি অবনীন্দ্রনাথের সামনে গিয়া চুপ করিয়া বসিয়া থাকিতাম। তিনি ধীরে ধীরে ছবির উপরে তুলি চালাইয়া যাইতেন। একটি বাঁশের চোঙায় তার ছবি আঁকার সাজ-সরঞ্জাম রাখিতেন।

তিনি ছবির উপরে খুব আবছা রঙ দেওয়া পছন্দ করিতেন। একখানা কাঠের তক্তার উপর  কাগজ রাখিয়া তিনি ছবি আঁকিতেন। হাতের তুলিটি যেন ইচ্ছামত নরম হইত, ইচ্ছামত শক্ত হইত। এ-রঙে ও-রঙে তুলি ঘষিয়া তিনি মাঝে মাঝে সামান্য জল মিশাইয়া ছবির উপরে মৃদু প্রলেপ মাখাইয়া যাইতেন। প্রথমে কাগজের উপর তিনি শুধু রঙ পরাইয়া যাইতেন। সেই রঙের উপর ধীরে ধীরে ছবির মূর্তিগুলি ভাসিয়া উঠিত। আমার মনে হইত, কোন ইন্দ্রপুরীর জাদুকর নিজের ইচ্ছামত কাগজের উপর রঙের কয়েকটি রেখার বন্ধনে স্বর্গ-মর্ত্য-রসাতলের দেব-নর-যক্ষ-কিন্নরদের আনিয়া ইচ্ছামত অভিনয় করাইয়া যাইতেছেন। সেই অভিনয়ের আরম্ভ হইতে শেষ পর্যন্ত দেখিতে প্রতিদিন কে যেন আমাকে সেখানে টানিয়া লইয়া যাইত। মাঝে মাঝে তিনি তার অঙ্কিত ছবির কাগজখানি পানিতে ডুবাইয়া লইতেন। রঙ আরও ফ্যাকাশে হইয়া যাইত। কাগজ কিঞ্চিৎ শুকাইলে আবার তাহার উপরে তিনি নতুন করিয়া রঙ পরাইতেন। এ দৃশ্য দেখিতে আমার বড়ই ভাল লাগিত।