পুরানো সেই দিনের কথা

চতুর্দশ অধ্যায়

সচিবালয়ে বিশৃঙ্খলা

আকবর আলি খান

সচিবালয়ে তখন বিশৃঙ্খলা চলছে। নুরুল কাদের খান তখন সংস্থাপনসচিব। সংস্থাপনসচিব হিসেবে তিনি তার পছন্দমতো লোকদের ইচ্ছেমতো পদোন্নতি দিচ্ছেন। তাঁর বড় ভাই একজন সার্কেল অফিসার (রাজস্ব বিভাগ) ছিলেন। পাকিস্তান শাসনামলে তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করে কাজ করেছেন। হঠাৎ তাকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করে সার্কেল অফিসার রেভিনিউ থেকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এর আগে এ ধরনের পদোন্নতি কাউকে দেওয়া হয়নি। ঢাকা শহরে ডেপুটি কমিশনার পদে নিয়োগ করা হয় নাটোরের মহকুমা প্রশাসক কামাল উদ্দিন আহমদকে। ঢাকায় তখন পাকিস্তানিদের অনেক বড় বড় বাড়ি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। এ বাড়িগুলো দখল করার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ অভিযানে সহায়তা করেন ঢাকার ডেপুটি কমিশনার। ১৬ ডিসেম্বরের পর যারা মুক্তিবাহিনীর আদৌ সদস্য ছিলেন না, তাঁরা নিজেদের মুক্তিবাহিনীর সদস্য বলে দাবি করেন। এই ধরনের নকল মুক্তিযোদ্ধারা ১৬ ডিভিশন’ নামে পরিচিত হন। অনেক পরিত্যক্ত বাড়ি ঢাকার ডেপুটি কমিশনারের সহযোগিতায় সামরিক এবং বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তারা দখল করে নেন। সাধারণ মানুষের বাড়িঘর লুট করা হয়। আমার ছোট ভাই জসিম। ন্যাশনাল অ্যান্ড গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকে চাকরি করত। তার বাসায় একজন উর্দু ভাষাভাষী অফিসার থাকত। এই উর্দু ভাষাভাষী অফিসারকে ধরার নাম করে যখন তাদের কেউ বাসায় ছিল না, তখন বাসায় হামলা করে জসিমের বিদেশি টেলিভিশন ও টেপ রেকর্ডার লুট করে নিয়ে যায়। মুক্তিবাহিনীর কমান্ডারদের সুস্পষ্ট আশ্বাস সত্ত্বেও এগুলো পুনরুদ্ধার করার কোনো ব্যবস্থাই করা যায়নি। এ ধরনের লুটপাটের পরিস্থিতিতে আমার সিলেটের ডেপুটি কমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণ করার ইচ্ছা একেবারেই উবে যায়।

আমি বঙ্গভবনে হোসেন তৌফিক ইমামের সঙ্গে কাজ করতে থাকি। ইতিমধ্যে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিযুক্ত ডেপুটি কমিশনার সৈয়দ আহমদ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হন। এর ফলে সিলেটে নতুন ডেপুটি কমিশনার নিয়োগের অত্যাবশ্যকীয়তা থাকে না। আমি সাত দিনের ছুটির জন্য একটি দরখাস্ত দিয়ে বাড়ি চলে যাই। আমরা ঢাকা থেকে ছোট ভাই জসিমের গাড়িতে করে কুমিল্লা হয়ে কোম্পানীগঞ্জ যাই। কোম্পানীগঞ্জ-নবীনগর রাস্তার যুদ্ধে বিশেষ ক্ষতি হয়নি। তবে রাস্তা ছিল অত্যন্ত খারাপ। তবু এই রাস্তা দিয়ে আমরা নবীনগর পর্যন্ত যাই। নবীনগরে গিয়ে দেখতে পাই বাবা-মা ফিরে এসেছেন। তাঁদের সঙ্গে কয়েক দিন কাটিয়ে আমি আবার ঢাকায় ফিরে আসি।