১৫১৩ সাল

সম্পাদকীয়

সত্যভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

একটা প্রাচীন গ্রন্থের সম্পাদকের কাজ কী, এই বিষয়ে নানান মত আছে– বেশির ভাগ সম্পাদকেরা মনে করেন, গ্রন্থটিকে আধুনিক ভাষার সাথে মিলিয়ে পরিবর্তন করাই হচ্ছে সম্পাদনা। কিন্তু আমাদের মত ভিন্ন, আমরা সম্পাদনার সময় বিবেচনায় রাখি যাতে মূল গ্রন্থকারের স্বকীয়তা নষ্ট না হয়। চর্যাপদ বা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকে যদি আমরা আধুনিক ভাষায় রূপান্তর করি, তবে গ্রন্থের আদিরস যে লুপ্ত হবে তাই নয়, বরং তা হবে গ্রন্থকারের প্রতি অত্যাচারের শামিল। সম্পাদককে মনে রাখতে হবে, তিনি যত ভাল লেখকই হোন না কেন, তিনি কিন্তু গ্রন্থকার নন।

আমরা গ্রন্থ সম্পাদনার সময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেই, লেখকের জীবদ্দশায় গ্রন্থের সর্বশেষ সংস্করণে কী বানান ছিল। আমরা প্রমিত বানানকে অবমূল্যায়ন করি না, তাই বলে একজন প্রাচীন গ্রন্থকারের গ্রন্থকে প্রমিত বানানে রূপান্তরও করি না। একটি গ্রন্থের বানান, লেখকের যুগের ভাষার দলিল, ভাষার শব্দরূপ ও অর্থের বিবর্তনের ইতিহাস।

বর্তমান গ্রন্থেও আমরা লেখকের বানানে হাত দেইনি। অনুস্মৃত সংস্করণে বানান যেমন ছিল তেমনই রেখেছি। তবে, আমরা কী সম্পাদনা করলাম? আমরা মূলত গ্রন্থটির পরিচ্ছদকে পরিচ্ছন্ন করেছি, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে তাকে নূতন সজ্জা পরিয়েছি, যাতে আধুনিক পাঠকের নিকট দৃষ্টিনন্দন হয়।

এবার গ্রন্থটি সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলি। দ্বিতীয় সংস্করণের প্রকাশকের দাবি– “১৫১৩ সাল” বাঙ্গালা ভাষার সর্ব্বপ্রথম মৌলিক বৈজ্ঞানিক উপন্যাস। – তার এই দাবিকে অস্বীকার করার মত ঐতিহাসিক তথ্য আপাতত আমাদের হাতে নেই, কখনও নতুন তথ্যাদি পেলে তা উল্লেখপূর্বক সমালোচনা করা যাবে।

তৎকালীন পাঠ্যপুস্তক পর্ষদ গ্রন্থটিকে তাদের পাঠ্যের তালিকাভুক্ত করেছিলেন। গ্রন্থটি সম্পর্কে আর বেশি কোন তথ্য জানা যায় নি। অনেক সন্ধান করেও লেখকের কোন ভূমিকা বা মন্তব্য জানা যায়নি। তবে গ্রন্থের নাম দৃষ্টে মনে হয় “১৫১৩” বাংলা সালে একজন বৈজ্ঞানিকের নেতৃত্বে একদল ব্যবসায়ী ও জমিদার মিলে সমুদ্রের লোনা পানি থেকে সোনা নিষ্কাষণের প্রকল্প হাতে নিবে, যদিও লেখকের কল্পনা শক্তি তাঁর যুগকে অতিক্রম করতে পারেননি। কাহিনির শুরু থেকেই ‘প্রভাতী’ নামক পত্রিকার সম্পাদক এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ব্যক্তিগত বিদ্বেষবশত সম্পাদক-প্রবর চেষ্টা করতে থাকেন যাতে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত না হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি বৈজ্ঞানিক ও তার সঙ্গীদের হত্যা করার জন্য জলদস্যুদের সাথে চুক্তি করেন–বৈজ্ঞানিকের জাহাজ ধ্বংস করে দিতেও সক্ষম হন, কিন্তু সমুদ্রের লোনা জল থেকে নিষ্কাষিত সোনার লাভ তাদের সে ক্ষতিপূরণ পুষিয়ে দেয়।

আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে, বৈজ্ঞানিকের রাষ্ট্রশক্তির বাইরে গিয়ে সোনা নিষ্কাষণ।