এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি জহির রায়হানের ‘গল্পসমগ্র’-এর পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস, বিষয়বস্তু ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।
কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক জহির রায়হানের বিভিন্ন সময়ে লেখা ২১টি গল্প নিয়ে সাজানো ‘জহির রায়হানের গল্পসমগ্র’। স্বল্পায়ু জীবনে তিনি যতগুলো গল্প লিখেছেন, সংখ্যায় তা খুব বেশি নয়; কিন্তু প্রতিটি গল্পেই রয়েছে তাঁর শিল্পীসত্তার স্বতন্ত্র ছাপ। কোনো গল্পে ফিরে এসেছে অতীতের স্মৃতি, কোনো গল্পে উচ্চারিত হয়েছে ভাষা আন্দোলনের প্রতিবাদী স্বর, কোনো গল্পে ফুটে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত বাস্তবতা, আবার কোনো গল্পে ধরা পড়েছে মধ্যবিত্ত জীবনের প্রেম, স্বপ্ন, অভাব ও হতাশা। কিছু গল্প ঘোরলাগা, কিছু বিষাদময়, কিছু তীব্র প্রতিবাদী—কিন্তু প্রতিটি গল্পই পাঠকের বিবেককে স্পর্শ করে।
একুশটি বিবেকস্পর্শী, সাহসী ও জীবনঘনিষ্ঠ গল্পের এই সংকলন আসলে একজন সাহসী শিল্পীর সময়কে ধারণ করার দলিল।
জহির রায়হান ছিলেন বিপন্ন এক সময়ের, বিপদগ্রস্ত এক দেশের, হতভাগ্য মানুষের প্রতিনিধি। তাঁর জীবন থেমে গেছে মাত্র সাঁইত্রিশ বছর বয়সে; কিন্তু তাঁর শিল্পীসত্তা থেমে যায়নি। বরং তাঁর গল্পগুলো পড়লে বারবার মনে হয়—আরও কিছু যদি তিনি লিখে যেতে পারতেন! আরও কিছু গল্প, আরও কিছু চরিত্র, আরও কিছু সময়ের সাক্ষ্য যদি তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে আসত!
তাঁর গল্পগুলো শুধুই গল্প নয়। প্রতিটি গল্পের ভেতরে রয়েছে গভীর উপলব্ধির বিষয়, সামাজিক বাস্তবতার নির্মোহ চিত্র এবং মানুষের প্রতি গভীর মমতা। কোথাও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কোথাও প্রতিবাদ করেছেন, কোথাও স্বপ্ন দেখিয়েছেন, আবার কোথাও মানুষের ভেতরের অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন পাঠককে। গল্পগুলোর ভাষা সহজ, বাক্য সংক্ষিপ্ত এবং বর্ণনায় প্রায় কোনো মেদ নেই; অথচ সেই সরলতার মধ্যেই তিনি তৈরি করেছেন গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী অভিঘাত।
জহির রায়হানের গল্পগ্রন্থের সংখ্যা তিনটি। ‘সূর্যগ্রহণ’ তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত একমাত্র গল্পগ্রন্থ। আর ‘যখন যন্ত্রণা’ এবং ‘কয়েকটি নদী ও একটি সমুদ্র’ তাঁর মৃত্যুর বহু পরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত কিন্তু গ্রন্থভুক্ত না হওয়া গল্প উদ্ধার করে প্রকাশিত অগ্রন্থিত গল্পের সংকলন। ফলে এই তিনটি গ্রন্থকে একসঙ্গে দেখলে জহির রায়হানের গল্পসাহিত্যের প্রকাশনা-ইতিহাসের একটি পূর্ণতর চিত্র পাওয়া যায়।
সূর্যগ্রহণ: জীবদ্দশায় প্রকাশিত একমাত্র গল্পগ্রন্থ
‘সূর্যগ্রহণ’ জহির রায়হানের গল্পসাহিত্যের সূচনাপর্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ এবং তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত একমাত্র গল্পগ্রন্থ। গ্রন্থটির প্রকাশকাল ১৩৬২ বঙ্গাব্দ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। খ্রিস্টীয় সাল নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে কিছুটা মতভেদ রয়েছে; কোথাও ১৯৫৫, আবার কোথাও ১৯৫৬ সাল উল্লেখ করা হয়েছে। ১৩৬২ বঙ্গাব্দের সঙ্গে ১৯৫৫–৫৬ খ্রিস্টাব্দের এই পার্থক্য থাকায় মুদ্রিত প্রথম সংস্করণের প্রকাশনা-পৃষ্ঠার তথ্যকে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
‘সূর্যগ্রহণ’-এর গুরুত্ব কেবল এটি জহির রায়হানের প্রথম গল্পগ্রন্থ বলে নয়। তাঁর পরবর্তী গল্পসাহিত্যে যে বিষয়গুলো বারবার ফিরে এসেছে—সাধারণ মানুষের জীবন, নিম্ন-মধ্যবিত্তের সংকট, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, প্রেম, শোষণ, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও মানুষের অস্তিত্বসংকট—এসবের অনেকগুলোর প্রাথমিক রূপ তাঁর এই সময়কার গল্পেই দেখা যায়।
তাঁর জীবদ্দশায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত আরও অনেক গল্প পরবর্তীকালে গ্রন্থাকারে সংকলিত হয়। মৃত্যুর পর ১৯৭৯ সালে ‘জহির রায়হানের গল্পসমগ্র’ প্রকাশিত হয়। কিন্তু সেই সংকলনও তাঁর সমস্ত গল্পকে ধারণ করেনি। পরবর্তী সময়ে পুরোনো পত্রপত্রিকা অনুসন্ধান করে আরও কিছু অগ্রন্থিত গল্প উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
যখন যন্ত্রণা: হারিয়ে যাওয়া গল্পের পুনরাবিষ্কার
‘যখন যন্ত্রণা’ জহির রায়হানের গল্পসাহিত্যের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এটি তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত কোনো গল্পগ্রন্থের পুনর্মুদ্রণ নয়; বরং দীর্ঘদিন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে থাকা অগ্রন্থিত গল্প উদ্ধার, সংগ্রহ ও সম্পাদনা করে প্রথমবার বই আকারে প্রকাশিত একটি সংকলন। প্রথমা প্রকাশন থেকে জানুয়ারি ২০২৩ সালে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। সংগ্রহ ও সম্পাদনা করেন কাজী জাহিদুল হক। প্রথম প্রকাশে এতে ছিল সাতটি অগ্রন্থিত গল্প।
এখানে ‘অগ্রন্থিত’ শব্দটির অর্থ বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। গল্পগুলো ২০২৩ সালে নতুন করে লেখা হয়নি এবং সেগুলো জহির রায়হানের মৃত্যুর পর প্রথম প্রকাশিতও নয়। বরং তাঁর জীবদ্দশায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় গল্পগুলো প্রকাশিত হয়েছিল, কিন্তু কোনো গল্পগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে ২০২৩ সাল হলো এসব গল্পের প্রথম গ্রন্থপ্রকাশের সাল।
এই গল্পগুলোর রচনাকাল মূলত ১৯৫৩ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে। অর্থাৎ এগুলো জহির রায়হানের সৃষ্টিশীলতার প্রারম্ভিক ও বিকাশপর্বের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ভাষা আন্দোলন, তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন, নারীজীবনের সংকট এবং নর-নারীর সম্পর্ক—বিভিন্ন বিষয় এসব গল্পে উঠে এসেছে।
‘যখন যন্ত্রণা’র প্রকাশের ফলে জহির রায়হানের গল্পকার সত্তাকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়। তাঁর পরিচিত গল্পগুলোর বাইরে আরও যে একটি বিস্তৃত গল্পভুবন ছিল, এই সংকলন তারই সন্ধান দেয়। পরবর্তী সময়ে বইটির বর্ধিত সংস্করণে আরও গল্প যুক্ত হয়, ফলে সংস্করণভেদে গল্পের সংখ্যা ভিন্ন হতে পারে।
কয়েকটি নদী ও একটি সমুদ্র: অগ্রন্থিত গল্পের দ্বিতীয় সংকলন
‘কয়েকটি নদী ও একটি সমুদ্র: অগ্রন্থিত গল্পগুচ্ছ ২’ জহির রায়হানের অগ্রন্থিত গল্প উদ্ধারের ধারাবাহিকতার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ‘যখন যন্ত্রণা’ প্রকাশের পরও অনুসন্ধানে তাঁর আরও কিছু গল্পের সন্ধান পাওয়া যায়। সেই গল্পগুলো সংগ্রহ ও সম্পাদনা করে কাজী জাহিদুল হকের উদ্যোগে প্রথমা প্রকাশন থেকে এই সংকলন প্রকাশিত হয়। বইটির প্রথম প্রকাশ ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে।
সংকলনটিতে রয়েছে জহির রায়হানের আরও পাঁচটি অগ্রন্থিত গল্প—‘জিয়নকাঠি’, ‘ফাটল’, ‘বারো ঘরের ঘরনি’, ‘কয়েকটি নদী ও একটি সমুদ্র’ এবং ‘অজগর’। এসব গল্পও তাঁর বিভিন্ন সময়ে লেখা এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রচনা, যা দীর্ঘদিন পর্যন্ত স্বতন্ত্র গল্পগ্রন্থে স্থান পায়নি।
এই গল্পগুলোর রচনাকাল ও পত্রিকায় প্রকাশের সময় বইটির প্রকাশকাল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। অর্থাৎ ২০২৫ সাল গল্পগুলোর রচনাকাল নয়; এটি গল্পগুলোর প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশের সাল। এই পার্থক্যটি জহির রায়হানের রচনাবলীর প্রকাশনা-ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
‘যখন যন্ত্রণা’ এবং ‘কয়েকটি নদী ও একটি সমুদ্র’—দুটি সংকলন পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, জহির রায়হানের গল্পসাহিত্য এখনও একেবারে সম্পূর্ণভাবে আবিষ্কৃত ও গ্রন্থবদ্ধ হয়ে গেছে—এমন দাবি করা কঠিন। পুরোনো সংবাদপত্র, সাহিত্যপত্র ও সাময়িকপত্রে ছড়িয়ে থাকা রচনাগুলো অনুসন্ধানের ফলে তাঁর সাহিত্যকর্মের আরও নতুন দিক সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
জহির রায়হানের গল্পের বিষয় ও বৈশিষ্ট্য
জহির রায়হান সেইসব শিল্পীর একজন, যাঁরা তাঁদের সময়কে এড়িয়ে যাননি। তাঁর গল্পে বারবার ফিরে এসেছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মের নামে ব্যবসা করা মানুষের স্বরূপ, মধ্যবিত্তের প্রেম ও স্বপ্ন, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, নারীর বঞ্চনা এবং বিপ্লবী চিন্তা। তাঁর গল্পের মানুষগুলো কল্পিত কোনো বিচ্ছিন্ন জগতের মানুষ নয়; তারা আমাদের চারপাশের মানুষ। তাদের স্বপ্ন আছে, অভাব আছে, ভালোবাসা আছে, ভয় আছে, আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসও আছে।
‘সময়ের প্রয়োজনে’, ‘মহামৃত্যু’, ‘কয়েকটি সংলাপ’, ‘ম্যাসাকার’ কিংবা ‘একুশের গল্প’—এসব গল্পে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেবল পটভূমি হিসেবে উপস্থিত নয়; বরং মানুষের জীবন ও বিবেকের সঙ্গে মিশে গেছে। ‘সময়ের প্রয়োজনে’ গল্পে মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের একটি গভীর মানবিক কারণ সামনে আসে—নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ। ‘ম্যাসাকার’-এ যুদ্ধের নির্মমতা ও মানবিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে উচ্চারিত হয়েছে তীব্র প্রতিবাদ। আর ‘একুশের গল্প’-এ ভাষার জন্য আত্মত্যাগের বেদনা ব্যক্তিগত সম্পর্কের করুণতার সঙ্গে মিশে গেছে।
অন্যদিকে ‘সোনার হরিণ’-এর মতো গল্পে মধ্যবিত্ত মানুষের স্বপ্ন ও বাস্তবতার দূরত্ব ধরা পড়ে। ‘একটি জিজ্ঞাসা’ গল্পে একটি শিশুর সরল প্রশ্নের মধ্য দিয়ে সমাজের ধনী-গরিব বৈষম্যকে উন্মোচিত করা হয়েছে। ‘বাঁধ’ গল্পে দেখা যায় সম্মিলিত শ্রমের শক্তি এবং অন্ধ বিশ্বাসের বিপরীতে যুক্তিবোধের অবস্থান। ‘জন্মান্তর’-এ অপরাধী হিসেবে পরিচিত একজন মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা মানবিক সত্তার জাগরণ ঘটে। আর ‘ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি’-তে শিল্প ও চলচ্চিত্রের স্বপ্নের মধ্য দিয়ে উঠে আসে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
একুশটি গল্পের সংক্ষিপ্ত পাঠ ও মূল্যায়ন
- সোনার হরিণ : মধ্যবিত্ত জীবনের স্বপ্ন, ভালোবাসা ও সীমাবদ্ধতার এক মর্মস্পর্শী গল্প। একটি দম্পতির সামান্য সংসার সাজানোর ইচ্ছার মধ্যে লেখক তুলে ধরেছেন সেই চিরপরিচিত মধ্যবিত্ত মানসিকতা—স্বপ্ন বড়, কিন্তু সাধ্য সীমিত। দশ বছর পরের একটি আকস্মিক স্মৃতি পুরোনো ভালোবাসা ও আত্মমর্যাদার গল্পকে আবার সামনে নিয়ে আসে।
- সময়ের প্রয়োজনে : একটি পুরোনো খাতার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার মানুষের দুঃখ, হতাশা, ত্যাগ ও দেশ রক্ষার সংকল্প সামনে আসে। গল্পটি দেখায়, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের পেছনে মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ কতটা গভীর ছিল।
- একটি জিজ্ঞাসা : করমআলী ও তার ছোট্ট কৌতূহলী মেয়ে মুন্নার কথোপকথনকে কেন্দ্র করে লেখা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর গল্প। শিশুর সরল প্রশ্নের সামনে বড়দের তৈরি সামাজিক ও ধর্মীয় কাঠামো যেন এক মুহূর্তে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। অল্প কয়েকটি পৃষ্ঠায় গল্পটি পাঠককে দীর্ঘ সময় ভাবতে বাধ্য করে।
- হারানো বলয় : আলম ও আরজুর সম্পর্কের মধ্য দিয়ে হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা, আত্মমর্যাদা, অভাব এবং দায়িত্ববোধের গল্প বলা হয়েছে। একই শহরে থেকেও দুজন মানুষ কীভাবে জীবনের ভিন্ন প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ায়, গল্পটি তার বিষাদময় চিত্র।
- বাঁধ : বন্যায় বিপন্ন একটি গ্রামের মানুষ বাঁধ রক্ষার জন্য ধর্মীয় আশ্রয় খোঁজে; অন্যদিকে গ্রামের যুবকেরা নিজেরাই কোদাল হাতে কাজে নেমে পড়ে। পীরের অলৌকিকতার অপেক্ষা এবং মানুষের সম্মিলিত শ্রমের বাস্তব শক্তির দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে লেখক ধর্মব্যবসার অসারতা ও মানুষের নিজস্ব শক্তিকে তুলে ধরেছেন।
- সূর্যগ্রহণ : ২১ ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে লেখা এই গল্পে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, অপেক্ষা, চিঠি ও রাজনৈতিক চেতনা এক অদ্ভুত আবহ তৈরি করেছে। আনোয়ার সাহেব, তসলিম সাহেব ও হাসিনাকে ঘিরে এগিয়ে যাওয়া গল্পের শেষভাগে এসে তৈরি হয় গভীর বিষাদ ও এক ধরনের ঘোরলাগা অনুভূতি।
- নয়া পত্তন : গ্রামের শিশুদের শিক্ষার জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে শনু পণ্ডিত মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ান। শুরুতে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের উদাসীনতা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে কাজে নেমে আসে। গল্পটি প্রতিবাদ, আত্মবিশ্বাস ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার শক্তির কথা বলে।
- মহামৃত্যু : একটি অজ্ঞাতপরিচয় রক্তাক্ত লাশকে ঘিরে মানুষের সম্মিলিত শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের গল্প। আপনজন না থাকলেও একজন শহীদের মর্যাদা রক্ষায় সবাই এগিয়ে আসে। মৃত্যু এখানে কেবল সমাপ্তি নয়; বরং মানুষের প্রতি মানুষের ঋণ ও শ্রদ্ধার এক মহৎ প্রতীক।
- ভাঙাচোরা : বাইরে থেকে স্বাভাবিক ও সুখী মনে হওয়া একটি দাম্পত্যের ভেতরে জমে থাকা অদৃশ্য ভাঙনকে গল্পটি তুলে ধরে। সালাম সাহেবের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন, মানুষের মুখের হাসি সবসময় তার অন্তরের সুখের পরিচয় বহন করে না।
- অপরাধ : মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে আশি বছরের এক পীরের সঙ্গে বিয়ে হওয়া সালেহার জীবনের নির্মমতা এই গল্পের কেন্দ্র। দীর্ঘ নির্যাতন সহ্য করার পরও প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে না পাওয়া নারীর অসহায়ত্ব এখানে অত্যন্ত তীব্রভাবে ফুটে উঠেছে। গল্পটি নারীর ওপর সামাজিক ও ধর্মীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী মানবিক প্রতিবাদ।
- স্বীকৃতি : মনোয়ারার জীবন দীর্ঘদিন ঘর-সংসার, রান্না ও সন্তান পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। জামানের উপস্থিতি তাকে নিজের স্বপ্ন ও প্রতিভার দিকে তাকাতে শেখায়। নারীরও যে নিজস্ব জীবন, প্রতিভা ও স্বপ্ন রয়েছে—গল্পটি সেই সত্যকে সামনে আনে।
- অতি পরিচিত : বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী ট্রলির পরিবারকে ঘিরে শিক্ষিত সমাজের আরেকটি অন্ধকার দিক প্রকাশিত হয়। উচ্চশিক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা মানুষকে সবসময় সত্যিকার অর্থে প্রজ্ঞাবান করে না—গল্পটির অন্তর্নিহিত বক্তব্য সেখানেই।
- ইচ্ছা-অনিচ্ছা : স্বামীহারা বিন্তির জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে গ্রামীণ সমাজের শোষণ ও ধর্মীয় ভয় দেখিয়ে দুর্বল মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা তুলে ধরা হয়েছে। সন্তানদের নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামে বিন্তি একদিকে যেমন অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে, অন্যদিকে তেমনি সামাজিক ক্ষমতার নির্মমতার শিকার হয়।
- জন্মান্তর : একাত্তরে আপনজন হারিয়ে শহরে এসে পকেটমার হয়ে যাওয়া মন্তুর জীবনে একটি বৃষ্টির রাত অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন নিয়ে আসে। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মানবিক আচরণ তার ভেতরের সুপ্ত ভালো মানুষটিকে জাগিয়ে তোলে। গল্পটি মনে করিয়ে দেয়—একজন মানুষের পরিচয় তার অপরাধে শেষ হয়ে যায় না; তার ভেতরেও মানবিকতার সম্ভাবনা থাকতে পারে।
- পোস্টার : ‘বাঁচার মতো মজুরি চাই’—এই দাবির পোস্টার দেখে ক্ষুব্ধ হওয়া আফজাল সাহেব নিজেই যখন চাকরি হারানোর আশঙ্কার মুখোমুখি হন, তখন সেই পোস্টারের অর্থ তার কাছে বদলে যায়। গল্পটি দেখায়, অন্যের প্রতিবাদকে দূর থেকে অযৌক্তিক মনে হলেও একই বাস্তবতার মুখোমুখি হলে মানুষ তার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে শেখে।
- ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি : বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্নের কথা বলেছেন লেখক। মানুষের সীমাবদ্ধ জীবন, কষ্ট, স্বপ্ন ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে চলচ্চিত্রের স্বপ্নের সঙ্গে মিলিয়ে গল্পটি জহির রায়হানের নিজের শিল্পীসত্তারও একটি পরিচয় বহন করে।
- কতকগুলো কুকুরের আর্তনাদ : রাতের নিস্তব্ধতায় একদল কুকুরের ডাক এবং তাদের হত্যা করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে লেখা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত গল্প। মানুষের নিষ্ঠুরতা, সহমর্মিতার সীমা এবং প্রাণের প্রতি আমাদের দ্বৈত আচরণকে মাত্র কয়েকটি বাক্যে লেখক তীব্রভাবে সামনে এনেছেন।
- কয়েকটি সংলাপ : ২১ ফেব্রুয়ারি পালনের প্রস্তুতি, ১৪৪ ধারা অমান্য করার সংকল্প এবং ভাষার প্রতি তরুণদের ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে গল্পটি নির্মিত। ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য তরুণদের সাহস ও প্রতিবাদী মানসিকতা গল্পটিকে একুশের চেতনার শক্তিশালী সাহিত্যিক প্রকাশে পরিণত করেছে।
- দেমাক : বাসচালক রহিম শেখের পরিশ্রমী জীবন এবং প্রতিবেশীদের ঈর্ষা ও অসহিষ্ণুতার মধ্য দিয়ে সমাজের একটি পরিচিত মানসিকতা উঠে আসে। অন্যের সামান্য সুখও যারা সহ্য করতে পারে না, তাদের সংকীর্ণতা ও দেমাককে লেখক ব্যঙ্গাত্মক অথচ মানবিক দৃষ্টিতে দেখিয়েছেন।
- ম্যাসাকার : যুদ্ধের ভয়াবহতা একজন সামরিক হাসপাতালের চিকিৎসকের চোখ দিয়ে দেখানো হয়েছে। আহত মানুষের আর্তনাদ, মৃত্যুর মিছিল এবং যুদ্ধের অর্থহীনতার বিরুদ্ধে গল্পটি এক তীব্র মানবিক প্রতিবাদ। লু-ই-সা চরিত্রের পরিণতি গল্পটির বেদনাকে আরও গভীর করে তোলে।
- একুশের গল্প : তিন বন্ধুর বন্ধুত্ব, ভালোবাসা এবং ভাষা আন্দোলনের চেতনা মিলেমিশে তৈরি হয়েছে এই গল্প। তপুকে ঘিরে বন্ধুরা যখন ভাষা আন্দোলনের বাস্তবতা ও তার পরিণতির মুখোমুখি হয়, তখন ব্যক্তিগত ভালোবাসার চেয়েও মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা কত বড় হয়ে উঠতে পারে, গল্পটি তারই মর্মস্পর্শী উদাহরণ।
গল্পগুলো কেন আজও প্রাসঙ্গিক
জহির রায়হানের গল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—তিনি তাঁর সময়কে লিখলেও গল্পগুলো কেবল তাঁর সময়ের মধ্যে আটকে নেই। মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ও হতাশা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, নারীর প্রতি অবহেলা, ধর্মের নামে প্রতারণা, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, যুদ্ধের নির্মমতা, মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব—এসব প্রশ্ন আজও আমাদের সমাজে উপস্থিত। ফলে তাঁর গল্প পড়লে মনে হয়, সময় বদলেছে, মানুষ ও প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু মানুষের অনেক মৌলিক সংকট এখনো একই রয়ে গেছে।
তাঁর গল্পের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো বক্তব্য প্রকাশের সরলতা। জহির রায়হান জটিল ভাষা বা দীর্ঘ বর্ণনার আশ্রয় নেননি। ছোট ছোট বাক্য, স্বাভাবিক সংলাপ এবং নির্বাচিত দৃশ্যের মাধ্যমে তিনি পাঠককে সরাসরি গল্পের কেন্দ্রে নিয়ে যান। কিন্তু সেই সরলতার আড়ালে থাকে তীব্র ব্যঙ্গ, গভীর বেদনা কিংবা শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক বক্তব্য। তাই গল্প শেষ হয়ে গেলেও তার অভিঘাত সহজে শেষ হয় না।
বিশেষ করে তাঁর যুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনভিত্তিক গল্পগুলো পড়লে বোঝা যায়, জহির রায়হানের কাছে সাহিত্য নিছক বিনোদন ছিল না। সাহিত্য ছিল সত্যকে দেখার এবং দেখানোর একটি মাধ্যম। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা, মানুষের কষ্টকে দৃশ্যমান করা এবং সময়ের বিবেককে প্রশ্ন করা ছিল তাঁর শিল্পীসত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একজন অসমাপ্ত গল্পকারের প্রতি ফিরে দেখা
জহির রায়হানের জীবন থেমে গেছে অসময়ে। মাত্র সাঁইত্রিশ বছরের জীবনে তিনি উপন্যাস, গল্প, চলচ্চিত্র ও সাংবাদিকতায় যে স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তা বাংলা সংস্কৃতিতে বিরল। তাঁর গল্পের সংখ্যা হয়তো খুব বেশি নয়, কিন্তু সংখ্যার বিচারে তাঁর সাহিত্যিক গুরুত্ব নির্ধারণ করা যায় না। বরং তাঁর প্রতিটি গল্প যেন তাঁর সময়ের একটি করে জানালা—কোথাও সেখানে একুশের রক্তাক্ত স্মৃতি, কোথাও মুক্তিযুদ্ধের আগুন, কোথাও মধ্যবিত্তের অপ্রাপ্তি, কোথাও নারীর কান্না, কোথাও আবার মানুষের অদম্য স্বপ্ন।
তাই ‘জহির রায়হানের গল্পসমগ্র’ পড়তে পড়তে একটি আক্ষেপ বারবার ফিরে আসে—আরো কিছু যদি তিনি লিখে যেতে পারতেন! কিছু না হোক, অন্তত আরও একুশটি গল্প। আরও কিছু গল্প হয়তো আমাদের সময়কে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করত, আরও কিছু মানুষের মুখ আমাদের সামনে তুলে ধরত।
তবু যে গল্পগুলো তিনি রেখে গেছেন, সেগুলোই যথেষ্ট তাঁর অসাধারণ গল্পকার সত্তার পরিচয় দেওয়ার জন্য। ‘সূর্যগ্রহণ’ তাঁর জীবদ্দশার গল্পকার-পরিচয়ের সূচনা, ‘যখন যন্ত্রণা’ হারিয়ে যাওয়া গল্পের পুনরাবিষ্কারের দরজা খুলেছে, আর ‘কয়েকটি নদী ও একটি সমুদ্র’ সেই অনুসন্ধানকে আরও বিস্তৃত করেছে। এই তিনটি গ্রন্থ মিলিয়ে জহির রায়হানের গল্পভুবন যেন ধীরে ধীরে আমাদের সামনে সম্পূর্ণতর হয়ে উঠছে।
জহির রায়হানের গল্প তাই শুধুই গল্প নয়। এগুলো এক সময়ের দলিল, এক জাতির সংগ্রামের স্মৃতি, এক সমাজের আয়না এবং একজন সাহসী মানুষের বিবেকের ভাষা। তাঁর গল্পের মানুষগুলো আজও আমাদের চারপাশে হাঁটে, স্বপ্ন দেখে, ভালোবাসে, কাঁদে, প্রতিবাদ করে। আর সেই কারণেই জহির রায়হানের গল্প আজও পাঠককে শুধু আনন্দ দেয় না—গভীরভাবে ভাবায়, অস্বস্তিতে ফেলে, কখনো কাঁদায় এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রতি আরও একটু মানবিক হতে শেখায়।