এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি জহির রায়হান রচিত ‘তৃষ্ণা’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।
জহির রায়হানের ‘তৃষ্ণা’ বাংলা সাহিত্যের একটি ছোট কলেবরের অথচ গভীর জীবনঘনিষ্ঠ উপন্যাস। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত এই রচনায় লেখক প্রেমের একটি কাহিনিকে অবলম্বন করলেও এর পরিসর কেবল প্রেমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নগরজীবনের নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব, সামাজিক অনাচার, নৈতিক সংকট এবং সামান্য একটু সুখের জন্য মানুষের অন্তহীন আকাঙ্ক্ষা—সবকিছু মিলিয়ে ‘তৃষ্ণা’ শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষার গল্প।
উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে শওকত ও মার্থা। শওকত একজন বেকার, ব্যর্থ ও আত্মবিশ্বাসহীন যুবক। জীবনের প্রতি তার এক ধরনের হতাশা ও অনিশ্চয়তা রয়েছে। অন্যদিকে মার্থা একজন খ্রিস্টান তরুণী, যার জীবনও সহজ নয়; কিন্তু তার মধ্যে রয়েছে নতুন করে জীবন শুরু করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। শওকত ও মার্থার সম্পর্ক তাই নিছক প্রেমের সম্পর্ক নয়—দুজন অসহায় মানুষের একসঙ্গে একটু আশ্রয়, একটু নিরাপত্তা এবং একটু সুখ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা।
মার্থা চরিত্রটি বিশেষভাবে স্মরণীয়। জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে আসা এই নারী শওকতকে কেন্দ্র করে একটি ছোট সংসারের স্বপ্ন দেখে। তার স্বপ্ন খুব বড় নয়—একটি পছন্দের ঘর, কিছুটা ভালোবাসা, সামান্য নিরাপত্তা এবং অভাবের মধ্যেও নিজের মতো করে বেঁচে থাকা। কিন্তু জহির রায়হানের নির্মিত পৃথিবীতে মানুষের স্বপ্ন ও বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব অনেক। ফলে মার্থার এই সরল আকাঙ্ক্ষা ক্রমে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। পাঠকের কাছে চরিত্রটি তখন কেবল একটি উপন্যাসের চরিত্র থাকে না; সে হয়ে ওঠে সমাজের প্রান্তিক ও বঞ্চিত মানুষের স্বপ্নের প্রতীক।
‘তৃষ্ণা’ নামটিও তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে তৃষ্ণা শুধু প্রেমের নয়। মানুষের সুখের তৃষ্ণা, নিরাপত্তার তৃষ্ণা, স্বীকৃতির তৃষ্ণা এবং বেঁচে থাকার তৃষ্ণা—সবকিছু এই একটি শব্দের মধ্যে এসে মিলেছে। শওকত ও মার্থা যেমন একটি সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখে, তেমনি উপন্যাসের অন্যান্য চরিত্রের জীবনেও রয়েছে নিজ নিজ আকাঙ্ক্ষা ও অপূর্ণতার গল্প। জহির রায়হান দেখিয়েছেন, মানুষের চাওয়া-পাওয়ার ধরন আলাদা হলেও বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা প্রায় সবার মধ্যেই প্রবল।
এই কারণেই উপন্যাসটিকে শুধু প্রেমের উপন্যাস হিসেবে পড়লে এর প্রকৃত গভীরতা ধরা পড়ে না। প্রেম এখানে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার একটি অংশ। প্রেমের পাশাপাশি এসেছে পরকীয়া, অবৈধ সম্পর্ক, দেহব্যবসা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, মদ্যপান, দারিদ্র্য ও সামাজিক নিষ্ঠুরতা। কিন্তু লেখক এসব বিষয়কে কেবল নৈতিক বিচারের চোখে দেখেননি। বরং তিনি দেখিয়েছেন, মানুষের চারপাশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ কীভাবে তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও সম্পর্ককে প্রভাবিত করে।
‘তৃষ্ণা’র অন্যতম বড় শক্তি এর নগরজীবনের চিত্রায়ণ। একটি ঘনবসতিপূর্ণ ভাড়াবাড়িকে কেন্দ্র করে লেখক বিচিত্র শ্রেণি ও পেশার মানুষের জীবন পাশাপাশি দাঁড় করিয়েছেন। একই পরিবেশে বসবাস করলেও প্রত্যেকের জীবন আলাদা, প্রত্যেকের দুঃখ আলাদা, প্রত্যেকের স্বপ্নও আলাদা। এই বিচিত্র মানুষগুলোর জীবনকে পাশাপাশি রেখে জহির রায়হান আসলে একটি সময়ের শহুরে সমাজের প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন। সমকালীন একটি সাহিত্যিক মূল্যায়নেও ‘তৃষ্ণা’কে শহরকেন্দ্রিক উপন্যাস হিসেবে উল্লেখ করে এর মধ্যে তৎকালীন নগরজীবনের বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠার কথা বলা হয়েছে।
উপন্যাসটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর সংক্ষিপ্ত পরিসরে বিস্তৃত জীবনচিত্র। বইটি মাত্র কয়েক ডজন পৃষ্ঠার; বর্তমান একটি সংস্করণের তথ্য অনুযায়ী এর দৈর্ঘ্য ৪৮ পৃষ্ঠা। এত অল্প পরিসরে এতগুলো চরিত্র, সম্পর্ক ও সামাজিক বাস্তবতাকে ধারণ করা সহজ নয়। অথচ জহির রায়হান দীর্ঘ বর্ণনার পরিবর্তে নির্বাচিত দৃশ্য, সংলাপ ও চরিত্রের আচরণের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ জগৎ নির্মাণ করেছেন। এ কারণেই ‘তৃষ্ণা’কে কেউ কেউ উপন্যাসের চেয়ে বড়গল্পের কাছাকাছি বলেও মনে করেন; তবে এর বিষয়গত বিস্তার ও চরিত্রনির্মাণ একে উপন্যাস হিসেবেই গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
জহির রায়হানের ভাষা এই রচনার আরেকটি বড় আকর্ষণ। তাঁর গদ্য সহজ, প্রাঞ্জল ও দৃশ্যনির্ভর। উপন্যাসের শুরুতেই একটি শান্ত, সুন্দর সকালের চিত্রের মধ্যে শওকত ও মার্থার সম্পর্ককে উপস্থিত করা হয়; কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালে ধীরে ধীরে যে কঠিন বাস্তবতা উন্মোচিত হয়, সেটিই পরবর্তীকালের কাহিনিকে গভীর করে। সৌন্দর্য ও অন্ধকারের এই পাশাপাশি অবস্থান জহির রায়হানের লেখার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
শওকত ও মার্থার সম্পর্কের মধ্যেও লেখক একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তৈরি করেছেন। শওকত যেখানে ভীত, দ্বিধাগ্রস্ত ও আত্মবিশ্বাসহীন, মার্থা সেখানে তুলনামূলকভাবে বেশি আশাবাদী। সে স্বপ্ন দেখতে জানে। এই স্বপ্নই তাকে কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও টিকিয়ে রাখে। ফলে দুজনের সম্পর্ক একদিকে ভালোবাসার, অন্যদিকে দুটি বিপরীত মানসিকতার মানুষের সম্পর্ক। শওকতের দুর্বলতা এবং মার্থার স্বপ্ন দেখার শক্তি উপন্যাসের আবেগকে আরও তীব্র করে তোলে।
তবে ‘তৃষ্ণা’র সৌন্দর্য তার রোমান্টিক আবহে যতটা, তার চেয়ে বেশি তার নির্মম বাস্তবতায়। জহির রায়হান পাঠককে কোনো কৃত্রিম সুখের পৃথিবী উপহার দেন না। এখানে ভালোবাসা আছে, কিন্তু তার সঙ্গে দারিদ্র্যও আছে; স্বপ্ন আছে, কিন্তু তার সঙ্গে ব্যর্থতাও আছে; সম্পর্ক আছে, কিন্তু সেই সম্পর্কের ভেতরেই স্বার্থ ও সামাজিক চাপ কাজ করে। জীবনকে এই দ্বৈততার মধ্যেই দেখেছেন লেখক।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জহির রায়হান চরিত্রগুলোর ওপর সহজ নৈতিক রায় চাপিয়ে দেন না। তাদের ভুল, দুর্বলতা কিংবা নৈতিক বিচ্যুতির পেছনে যে সামাজিক বাস্তবতা কাজ করে, সেটিকেও তিনি পাঠকের সামনে রাখেন। ফলে পাঠক শুধু চরিত্রকে বিচার করেন না; বরং প্রশ্ন করেন—কী ধরনের সমাজ মানুষকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে? এই প্রশ্ন ‘তৃষ্ণা’কে একটি নিছক প্রেমের উপন্যাস থেকে সামাজিক উপন্যাসের স্তরে নিয়ে যায়।
উপন্যাসটির শেষভাগে এসে কাহিনির আবেগ ও অর্থ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। পাঠক বুঝতে পারেন, এতক্ষণ যে ‘তৃষ্ণা’র কথা বলা হয়েছে, তা কোনো একজন মানুষের নয়। এটি সেইসব মানুষের তৃষ্ণা, যারা জীবনকে একটু ভালোভাবে বাঁচতে চেয়েছিল, কিন্তু চারপাশের বাস্তবতা তাদের সেই সুযোগ দেয়নি। তাই ‘তৃষ্ণা’র করুণতা কোনো একটি চরিত্রের পরিণতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর করুণতা ছড়িয়ে আছে সমগ্র জীবনচিত্রে।
সব মিলিয়ে, জহির রায়হানের ‘তৃষ্ণা’ একটি প্রেমের গল্পের আড়ালে লেখা মানুষের বেঁচে থাকার গল্প। শওকত ও মার্থার সম্পর্ক এর আবেগের কেন্দ্র হলেও উপন্যাসটির প্রকৃত বিষয় আরও বিস্তৃত—দারিদ্র্য, নগরজীবন, সামাজিক অনাচার, নৈতিক সংকট, অপূর্ণ স্বপ্ন এবং মানুষের অদম্য জীবনতৃষ্ণা। অল্প পরিসরে এত গভীর সামাজিক ও মানবিক বাস্তবতা তুলে ধরার ক্ষমতাই এই উপন্যাসকে জহির রায়হানের উল্লেখযোগ্য রচনাগুলোর একটি করে তুলেছে।
‘তৃষ্ণা’ তাই শেষ পর্যন্ত প্রেমের উপন্যাস হয়েও কেবল প্রেমের উপন্যাস নয়। এটি সেইসব মানুষের গল্প, যারা জীবনের কাছে খুব বেশি কিছু চায়নি—শুধু একটু ভালোবাসা, একটু নিশ্চয়তা, একটু সুখ এবং নিজের মতো করে বেঁচে থাকার অধিকার। আর সেই সামান্য চাওয়াটুকুই যখন তাদের কাছে দুর্লভ হয়ে ওঠে, তখন ‘তৃষ্ণা’ শব্দটি তার গভীরতম অর্থে পৌঁছে যায়।