এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি জহির রায়হান রচিত ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।
‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ জহির রায়হানের প্রারম্ভিক উপন্যাসগুলোর অন্যতম। প্রেম, মানবিক সম্পর্ক, মধ্যবিত্ত সমাজের মানসিক সংকট এবং তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন-বাস্তবতার দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে রচিত এই উপন্যাসে লেখক একদিকে যেমন মানুষের আবেগের সূক্ষ্ম রূপ উন্মোচন করেছেন, তেমনি অন্যদিকে সমকালীন সমাজজীবনের নীরব টানাপোড়েনও তুলে ধরেছেন। সহজ ভাষা, সংযত বর্ণনা এবং প্রাণবন্ত সংলাপ উপন্যাসটিকে পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে।
‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে। এটি জহির রায়হানের সাহিত্যজীবনের প্রারম্ভিক পর্যায়ের একটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি। পরবর্তীকালে তাঁর রচনাবলী ও বিভিন্ন সঙ্কলনে উপন্যাসটি অন্তর্ভুক্ত হয় এবং বাংলা কথাসাহিত্যে একটি পরিচিত রোমান্টিক উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
উপন্যাসটির কেন্দ্রে রয়েছে প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, বিচ্ছেদ, আশা এবং জীবনের অনিশ্চয়তা। চরিত্রগুলোর সম্পর্কের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে লেখক মানুষের আবেগ, আত্মসংঘাত এবং বাস্তবতার সঙ্গে আপস করার কঠিন অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরেছেন। এটি কেবল একটি প্রেমের গল্প নয়; বরং ব্যক্তি ও সমাজ, স্বপ্ন ও বাস্তবতার সংঘাতেরও একটি শিল্পিত উপস্থাপনা।
জহির রায়হান গল্পকে অযথা নাটকীয় না করে চরিত্রগুলোর মানসিক বিকাশ ও পারস্পরিক সম্পর্কের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। ফলে উপন্যাসটির আবেগ পাঠকের কাছে স্বাভাবিক ও বিশ্বাসযোগ্য বলে প্রতীয়মান হয়।
উপন্যাসের চরিত্রগুলো মধ্যবিত্ত সমাজের বাস্তব জীবন থেকে উঠে এসেছে। তাদের আনন্দ, বেদনা, দ্বিধা, ভালোবাসা এবং হতাশা স্বাভাবিক ও মানবিক। লেখক চরিত্রগুলিকে আদর্শিক রূপ না দিয়ে তাদের দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতাসহ উপস্থাপন করেছেন। এই বাস্তবধর্মিতা উপন্যাসটিকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে।
জহির রায়হানের গদ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য তার সাবলীলতা। ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’-তেও তিনি সহজ, প্রাঞ্জল ও সংযত ভাষা ব্যবহার করেছেন। সংলাপগুলো স্বাভাবিক এবং চরিত্রের মানসিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অল্প কথায় আবেগ প্রকাশের দক্ষতা এবং দৃশ্য নির্মাণের ক্ষমতা উপন্যাসটিকে সাহিত্যিক সৌন্দর্য দিয়েছে।
জহির রায়হানের পরবর্তী রচনায় যে সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতার গভীরতা দেখা যায়, তার পূর্বাভাস এই উপন্যাসেও আংশিকভাবে লক্ষ করা যায়। যদিও এটি মূলত একটি রোমান্টিক উপন্যাস, তবু এর ভেতরে মধ্যবিত্ত সমাজের মূল্যবোধ, সম্পর্কের জটিলতা এবং মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ বিদ্যমান। ফলে এটি কেবল প্রেমকাহিনি হিসেবে নয়, মানবজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার দলিল হিসেবেও মূল্যবান।
‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ বাংলা রোমান্টিক উপন্যাসের ধারায় জহির রায়হানের একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। প্রেমের আবেগকে তিনি এখানে কৃত্রিম নাটকীয়তায় নয়, বরং মানবজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং মানসিক দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন। সহজ ভাষা, বিশ্বাসযোগ্য চরিত্র এবং সংযত বর্ণনাশৈলীর কারণে উপন্যাসটি আজও পাঠযোগ্য। জহির রায়হানের সাহিত্যিক বিকাশের ধারাকে বোঝার ক্ষেত্রেও ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা।