সুকান্তের অপ্রচলিত রচনা

অগ্রন্থিত ও অপ্রচলিত রচনাসমূহ

সুকান্ত ভট্টাচার্য

এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি সুকান্ত ভট্টাচার্য রচিত ‘সুকান্তের অপ্রচলিত রচনা’ সংকলনের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।

বাংলা কবিতার যুবরাজ ও মার্ক্সবাদী চেতনার দীপ্ত প্রতীক সুকান্ত ভট্টাচার্য মাত্র একুশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে বাংলা সাহিত্যকে যে অমূল্য সম্পদ উপহার দিয়ে গেছেন, তার একটি বড় অংশ বিভিন্ন সময়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও স্মরণে। তাঁর বহু রচনা জীবনের তাগিদে, তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও জীবদ্দশায় গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়ে উঠতে পারেনি। পরবর্তীতে গবেষক ও অনুরাগীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সুকান্ত ভট্টাচার্যের এই অগ্রন্থিত ও প্রচলিত রচনাসমূহ সংকলিত হয়।

সুকান্তর এই সঙ্কলিত রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু মননশীল গল্প, প্রবন্ধ, বহুচর্চিত গান, ছড়া এবং কবিতা। তাঁর গল্পগুলোর মধ্যে ‘ক্ষুধা’ (১৯৪৩), ‘দুর্বোধ্য’ (১৯৪৩), ‘ভদ্রলোক’, কিংবা ‘দরদী কিশোর’ ও ‘কিশোরের স্বপ্ন’-এর মতো রচনাগুলো তৎকালীন যুদ্ধকালীন মন্বন্তর, সামাজিক বৈষম্য ও কিশোর মনের মনস্তত্ত্বকে ফুটিয়ে তুলেছে। ‘অরণি’ বা ‘জনযুদ্ধ’ পত্রিকার পাতা থেকে সংগৃহীত এই রচনাগুলো প্রমাণ করে কথাসাহিত্যেও সুকান্তের মুন্সিয়ানা ছিল লক্ষণীয়। এর পাশাপাশি ‘ছন্দ ও আবৃত্তি’ প্রবন্ধটি তাঁর মননশীলতার পরিচয়বাহী। গান এবং ছড়ার ক্ষেত্রেও সুকান্ত তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণমানুষের মুক্তির সুরকে ধারণ করেছিলেন। ‘জনযুদ্ধের গান’ সংকলন কিংবা মাসিক বসুমতীতে প্রকাশিত গানগুলো কিংবা ‘ভবিষ্যতে’, ‘সুচিকিৎসা’ ও ‘পরিচয়’-এর মতো ছড়াগুলো তাঁর বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে।

সুকান্তর অনেক কবিতার পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনা বা ব্যক্তিগত স্মৃতি। ‘ভারতীয় জীবনত্রাণ-সমাজের মহাপ্রয়াণ উপলক্ষে শোকোচ্ছ্বাস’ কবিতাটি দক্ষিণ কলকাতার লেক অঞ্চলের ‘ইণ্ডিয়ান লাইফ সেভিং সোসাইটি’ বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে শচীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছিল। এছাড়া মেজদা রাখাল ভট্টাচার্যের গ্রেপ্তার ও মুক্তি উপলক্ষে কবিতা কিংবা কাশী ভ্রমণ শেষে রেণু দেবীকে লেখা চিঠি কবির ব্যক্তিগত সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশ করে। জীবনের শেষ পর্যায়ে শয্যাশায়ী অবস্থায় ‘রেড-এড কিওর হোম’ হাসপাতালের রাইটিং প্যাডে লিখে পাঠানো কবিতা কিংবা ‘মার্শাল তিতোর প্রতি’ (১৯৪৬) ও ‘ব্যর্থতা’র মতো সৃষ্টিগুলো তাঁর আপসহীন মানসিকতা ও সৃজনশীলতার চূড়ান্ত রূপ ফুটিয়ে তোলে।

নিচে এই সংকলন ও রচনাগুলির বিস্তারিত তালিকা প্রদান করা হলো:

  1. ‘ক্ষুধা’ গল্পটি ২রা এপ্রিল ১৯৪৩-এর অরণি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। অরুণাচলকে লেখা ২৭শে চৈত্র ১৩৪৯ তারিখের চিঠিতে এই গল্পটির উল্লেখ করেছেন সুকান্ত।
  2. ‘দুর্বোধ্য’ গল্পটি ২৮শে মে ১৯৪৩-এর অরণি পত্রিকায় চিত্র-গল্প হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে।
  3. ‘ভদ্রলোক’ গল্পটিও অরণিতে ১৪ই ফ্রেব্রুয়ারী ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে।
  4. ‘দরদী কিশোর’ গল্পটি সাপ্তাহিক জনযুদ্ধ পত্রিকায় কিশোর বিভাগে ২৮শে এপ্রিল ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত হয়।
  5. ‘কিশোরের স্বপ্ন’ গল্পটি জনযুদ্ধের কিশোর বিভাগে ৬ই অক্টোবর ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত হয়। জনযুদ্ধে প্রকাশিত গল্প দুটি শ্রীসুধী প্রধানের সহায়তায় সংগৃহীত।
  6. ‘ছন্দ ও আবৃত্তি’ প্রবন্ধটি ২৫শে ফেব্রুয়ারী ১৯৪৪-এর অরণিতে প্রকাশিত হয়েছে।
  7. গানটির রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪০। এটি ‘সূর্য-প্রণাম’-এর সমকালীন একটি অসম্পূর্ণ গীতিকাব্যের প্রথমাংশ বলে মনে হয়।
  8. এই গানটি শ্রীবিমল ভট্টাচার্য তাঁর স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে দিয়েছেন। গানটি গীতিগুচ্ছের গানগুলির সমকালীন বলে মনে হয়।
  9. সেপ্টেম্বর ১৯৪২-এ প্রকাশিত ‘জনযুদ্ধের গান’ সংকলন গ্রন্থটি থেকে এই গানটি সংগৃহীত।
  10. গানটি মাসিক বসুমতী, আশ্বিন ১৩৬৩-তে প্রকাশিত হয়েছে। পাণ্ডুলিপিও পাওয়া গেছে। রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪৩-৪৪ সাল।
  11. গানটির রচনাকাল ১৯শে জুলাই ১৯৪৪ সাল।
  12. ১২-১৩। ‘ভবিষ্যতে’ ও ‘সুচিকিৎসা’—এই ছড়া দুটি শ্রীভূপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের লেখা সুকান্ত-প্রসঙ্গ’, ‘শারদীয়া বসুমতী’, ১৩৫৪-থেকে সংগৃহীত। পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় নি! এগুলি ১৯৪০-এর আগের লেখা বলে অনুমিত।
  13. পরিচয় ছড়াটির রচনাকাল ১৩৩৯-৪০ সাল বলে মনে হয়।
  14. এই কবিতাটিও ভূপেন্দ্রনাথের ‘সুকান্ত-প্রসঙ্গ’ প্রবন্ধ থেকে সংগৃহীত। পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়নি, এটি ১৯৪০-এর আগের রচনা।
  15. ‘চৈত্রদিনের গান’ কবিতাটি শ্রীবিজনকুমার গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত ছোটদের ‘শিখা’ পত্রিকার জন্য রচিত। রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪০।
  16. এই কবিতাটি অরুণাচলকে সুকান্ত পত্রাকারে লিখেছিলেন। রচনার তারিখ ১৩ই কার্তিক ১৩৪৮।
  17. ‘পটভূমি’ কবিতাটির রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪২-৪৩।
  18. ‘ভারতীয় জীবনত্রাণ-সমাজের মহাপ্রয়াণ উপলক্ষে শোকোচ্ছ্বাস (শচীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য-কে)’ — এই শিরোনামায় কবিতাটি লেখা হয়েছিল। দক্ষিণ কলকাতার লেক অঞ্চলের ‘ইণ্ডিয়ান লাইফ সেভিং সোসাইটি’র সদস্য ছিলেন শ্রীশচীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। লেকে যুদ্ধকালীন মিলিটারী ক্যাম্প হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলে সুকান্ত এই কবিতাটি লিখেছিলেন।
  19. “নব জ্যামিতি”র ছড়া সাপ্তাহিক জনযুদ্ধের কিশোর বিভাগে প্রকাশের উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছিল। রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪৩।
  20. ‘জবাব’ কবিতাটি কার্তিক ১৩৫০-এর পরিচয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। কবিতাটি শ্রীঅমিয়ভূষণ চক্রবর্তীর সৌজন্যে প্রাপ্ত।
  21. ‘চরমপত্র’ কবিতাটির রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪৪।
  22. ১৯৪৪ সালে সুকান্তর মেজদা শ্রীরাখাল ভট্টাচার্য গ্রেফতার হন। তাঁর মুক্তি উপলক্ষে সুকান্ত এই কবিতাটি লেখেন।
  23. ১৯৪৫ সালে সুকান্ত মেজবৌদি রেণু দেবীর সঙ্গে কাশী বেড়াতে যান। সুকান্ত ফিরে এসে শ্যামবাজারের বাড়ি থেকে এই চিঠিটি তাঁকে লিখেছিলেন। চিঠিটি শ্রীরাখাল ভট্টাচার্য স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে দিয়েছেন।
  24. ‘মার্শাল তিতোর প্রতি’ কবিতাটির রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪৬।
  25. ‘ব্যর্থতা’ কবিতাটি আষাঢ় ১৩৫৩-এর কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কবিতাটি ‘মীমাংসা’ কবিতার প্রথম খসড়া বলে মনে হয়।
  26. ১৯৪৬ সালে রচিত এই কবিতাটি খুলনা ‘সপ্তর্ষি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। শয্যাশায়ী সুকান্ত ‘রেড-এড কিওর হোম’ হাসপাতালের রাইটিং প্যাডে লিখে এটি পাঠান। কবিতাটি শ্রীমনীশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৌজন্যে প্রাপ্ত।