এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় রচিত ‘সিরাজদ্দৌলা’ গ্রন্থের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন।
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের ‘সিরাজদ্দৌলা’ বাংলা ভাষায় ইতিহাসচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যতিক্রমী গ্রন্থ। এটি নিছক কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তির জীবনী নয়; বরং ঔপনিবেশিক বয়ানে নির্মিত নবাব সিরাজদ্দৌলার চরিত্র ও পলাশীর ইতিহাসকে পুনর্বিবেচনার একটি শক্তিশালী প্রচেষ্টা। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় উনিশ শতকের শেষভাগে; পরে এর একাধিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। উইকিসংকলনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯০২ ও ১৯৫৮ সালের সংস্করণও সংরক্ষিত আছে।
মৈত্রেয়ের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো, তিনি সিরাজকে প্রচলিত ইংরেজ ঐতিহাসিকদের বর্ণনার আলোকে একমাত্রিক অত্যাচারী, দুর্বিনীত ও অযোগ্য শাসক হিসেবে দেখেননি। বরং সমকালীন দলিল, নথি, বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র এবং প্রচলিত কাহিনির তুলনামূলক বিচার করে সিরাজের চরিত্র ও কর্মকাণ্ডকে নতুনভাবে দেখার চেষ্টা করেছেন। তাঁর ইতিহাসচর্চার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তথ্যকে যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করা। সমকালীন গবেষণাতেও ‘সিরাজদ্দৌলা’কে তাঁর যুক্তিনির্ভর ইতিহাসচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর নবাব সিরাজদ্দৌলার বিরুদ্ধে প্রচলিত অপবাদ ও অতিরঞ্জিত কাহিনিগুলোর প্রতিবাদ। পলাশীর যুদ্ধকে ঘিরে পরবর্তী সময়ে যে নানা গল্প ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছিল, মৈত্রেয় সেগুলোর উৎস, কালক্রম ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। নবীনচন্দ্র সেনের পলাশীর যুদ্ধ-এ সিরাজের যে কয়েকটি চিত্রায়ণ ছিল, মৈত্রেয় তারও তীব্র সমালোচনা করেন এবং নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক তথ্যের সাহায্যে সেগুলো খণ্ডনের চেষ্টা করেন।
এই জায়গাতেই বইটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। পলাশীকে তিনি কেবল একটি যুদ্ধ হিসেবে দেখেননি; এর সঙ্গে যুক্ত দরবারি ষড়যন্ত্র, ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, দেশীয় অভিজাতদের ভূমিকা এবং ক্ষমতার পালাবদল—সবকিছুকে বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখার চেষ্টা করেছেন। ফলে সিরাজের ব্যক্তিগত চরিত্রের আলোচনার পাশাপাশি অষ্টাদশ শতকের বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতাও বইটিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে মৈত্রেয়ের ইতিহাসচর্চা সম্পূর্ণ নিরাবেগ বা পক্ষপাতশূন্য—এমন দাবি করাও ঠিক হবে না। তাঁর সিরাজ-চিত্রায়ণে সিরাজের প্রতি সহানুভূতি এবং ব্রিটিশ বয়ানের প্রতি তীব্র বিরূপতা স্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর সমালোচনায় এই বিষয়টি লক্ষ্য করেছিলেন—মৈত্রেয় ঐতিহাসিক বিচারের কঠোর নিরপেক্ষতার সীমা কোথাও কোথাও অতিক্রম করে সিরাজের প্রতি ব্যক্তিগত সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন বলে রবীন্দ্রনাথের আপত্তি ছিল।
কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাই গ্রন্থটির ঐতিহাসিক গুরুত্বকে নষ্ট করে না। বরং আজকের পাঠকের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও তৈরি করে—ইতিহাস শুধু বিজয়ীদের লেখা বিবরণ নয়; ইতিহাসের প্রচলিত বয়ানকেও প্রশ্ন করতে হয়, সূত্র যাচাই করতে হয় এবং একই ঘটনার বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য তুলনা করতে হয়। এই দৃষ্টিতে ‘সিরাজদ্দৌলা’ একটি ইতিহাসের বই হওয়ার পাশাপাশি ইতিহাস কীভাবে লেখা উচিত—সে প্রশ্নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
ভাষার দিক থেকেও বইটি আকর্ষণীয়। মৈত্রেয়ের গদ্য গবেষণাধর্মী, যুক্তিনিষ্ঠ এবং কোথাও কোথাও তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক। তাঁর লেখায় আবেগ আছে, কিন্তু সেই আবেগকে তিনি যুক্তি ও তথ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। এ কারণেই গ্রন্থটি নিছক দেশপ্রেমমূলক আবেগের বই হয়ে ওঠেনি; বরং উনিশ শতকের বাংলা ভাষায় আধুনিক ইতিহাসচর্চার বিকাশে এটি একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। গবেষণামূলক আলোচনাতেও তাঁকে বাংলায় যুক্তিনির্ভর ইতিহাসচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, ‘সিরাজদ্দৌলা’ এমন একটি গ্রন্থ, যা পাঠককে শুধু সিরাজদ্দৌলাকে নতুনভাবে চিনতে শেখায় না; বরং পলাশীর ইতিহাস, ঔপনিবেশিক ইতিহাসলেখন এবং ঐতিহাসিক সত্য নির্মাণের প্রক্রিয়া সম্পর্কেও ভাবতে বাধ্য করে। আধুনিক গবেষণার বিচারে গ্রন্থটির সব সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই; বরং সমকালীন অন্যান্য দলিল ও গবেষণার সঙ্গে মিলিয়ে পড়াই শ্রেয়। কিন্তু বাংলা ইতিহাসসাহিত্যে সিরাজের চরিত্রকে অপবাদ ও ঔপনিবেশিক বয়ানের বাইরে এনে পুনর্বিচারের যে সাহসী উদ্যোগ মৈত্রেয় নিয়েছিলেন, তার ঐতিহাসিক মূল্য আজও অক্ষুণ্ণ।
ইতিহাসপ্রেমী, বাংলা ইতিহাসচর্চায় আগ্রহী এবং পলাশীর যুদ্ধের প্রচলিত বয়ানকে প্রশ্ন করে দেখতে চান—এমন পাঠকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাঠ।