এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি সুকান্ত ভট্টাচার্য রচিত ‘পূর্বাভাস’ কাব্যগ্রন্থের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬–১৯৪৭) আধুনিক বাংলা কবিতার ধারায় এক অনন্য ও যুগান্তকারী কণ্ঠস্বর। অতি অল্প বয়সেই—মাত্র একুশ বছরের ক্ষণজন্মা জীবনে—তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রগতিশীল ও গণমুখী কাব্যধারায় এক চিরস্থায়ী বিপ্লবের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। কৈশোর থেকেই তিনি প্রত্যক্ষভাবে মার্কসবাদী-সাম্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। তৎকালীন পরাধীন ভারতের মহামারী, পঞ্চাশের মন্বন্তর, ফ্যাসিবাদের উত্থান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং শ্রমিক-কৃষক শ্রেণির ওপর ঔপনিবেশিক ও বুর্জোয়া শোষণের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যিক চেতনাকে শাণিত করেছিল। শোষিত মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম, সামাজিক অসাম্যের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ এবং একটি শোষণমুক্ত সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নই তাঁর কাব্যসৃষ্টির মূল প্রেরণা।
কবির জীবদ্দশায় কেবল তাঁর বিখ্যাত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ছাড়পত্র’ (১৯৪৭) আত্মপ্রকাশ করেছিল, যা বলিষ্ঠ প্রকাশভঙ্গি এবং বিষয়বস্তুর অভূতপূর্ব ধারালো বাণীর জন্য বিপুল পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে। কবিমৃত্যুর পর তাঁর অমূল্য পাণ্ডুলিপি ও বিভিন্ন সাময়িকপত্রে প্রকাশিত কবিতা সংকলিত হয়ে প্রকাশিত হয় ‘ঘুম নেই’ (১৯৫০), ‘পূর্বাভাস’ (১৯৫০) এবং ব্যঙ্গকবিতার সংকলন ‘মিঠে কড়া’ (১৯৫২)। এগুলো সুকান্তের ক্ষুরধার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কাব্যপ্রতিভার উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করে।
‘পূর্বাভাস’ সুকান্ত ভট্টাচার্যের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ হিসেবে ১৯৫০ সালে প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এই সংকলনের নামকরণের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক নতুন ভোর, সামাজিক রূপান্তর এবং আসন্ন শ্রেণীসংগ্রামের বারোমাসি অঙ্গীকার। কবি এখানে কেবল বর্তমানের যন্ত্রণা তুলে ধরেই ক্ষান্ত হননি; বরং অন্যায়-অবিচারের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন পৃথিবীর আগমনী বার্তার "পূর্বাভাস" দিয়েছেন।
কাব্যগ্রন্থটিতে মোট ২৯টি কবিতা স্থান পেয়েছে। কবিতাগুলো হলো—পূর্বাভাস, হে পৃথিবী, সহসা, স্মারক, নিবৃত্তির পূর্বে, স্বপ্নপথ, সুতরাং, বুদ্বুদ মাত্র, আলো–অন্ধকার, প্রতিদ্বন্দ্বী, আমার মৃত্যুর পর, স্বতঃসিদ্ধ, মুহূর্ত (ক), মুহূর্ত (খ), তরঙ্গ ভঙ্গ, আসন্ন আঁধারে, পরিবেশন, অসহ্য দিন, উদ্যোগ, পরাভব, বিভীষণের প্রতি, জাগবার দিন আজ, ঘুমভাঙার গান, হদিশ, দেয়ালিকা, প্রথম বার্ষিকী, তারুণ্য, মৃত পৃথিবী ও দুর্মর। প্রতিটি কবিতায় প্রগতিশীল রাজনীতি, শাণিত সমাজচেতনা এবং গণমানুষের মুক্তিকামী ভাবধারার এক অনবদ্য মেলবন্ধন ঘটেছে।