এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি হুমায়ূন আহমেদ রচিত ‘নিশীথিনী’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।
হুমায়ূন আহমেদের ‘অনীশ’ মিসির আলি সিরিজের অষ্টম গ্রন্থ। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে বিচিত্রা পত্রিকার ঈদসংখ্যায়; পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় লেখক কিছু পরিবর্তন ও সংযোজন করেন। লেখকের ভূমিকাতেই তিনি জানিয়েছেন, বিশেষ করে রূপার স্বামী সম্পর্কে মিসির আলির একটি যুক্তিনির্ভর ধারণা গ্রন্থসংস্করণে যুক্ত করা হয়েছিল।
‘অনীশে’র সূচনা অন্য অনেক মিসির আলি-কাহিনির তুলনায় ভিন্ন। মিসির আলি নিজেই তখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। শারীরিক অসুস্থতা তাঁর স্বাভাবিক অনুসন্ধানী মানসিকতাকেও কিছুটা সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। এই অবস্থাতেই তাঁর পরিচয় হয় রূপা চৌধুরীর সঙ্গে—একজন পরিচিত অভিনেত্রী, যার ব্যক্তিগত জীবনের একটি গভীর ও জটিল রহস্য মিসির আলির সামনে এসে উপস্থিত হয়। রূপা নিজের জীবনের ঘটনাগুলো লিখে রাখা একটি ডায়েরি মিসির আলির হাতে তুলে দেন। সেই ডায়েরিই হয়ে ওঠে রহস্যের প্রধান সূত্র।
এখানে হুমায়ূন আহমেদের একটি চমৎকার কৌশল হল, মিসির আলিকে সরাসরি ঘটনাস্থলে না পাঠিয়ে একটি লিখিত ব্যক্তিগত বিবরণের পাঠক করে তোলা। ফলে মিসির আলির অনুসন্ধান যেমন এগোয়, পাঠকের অনুসন্ধানও একই সঙ্গে এগোয়। ডায়েরির বর্ণনায় কোনটি সত্য, কোনটি স্মৃতি, কোনটি কল্পনা আর কোনটি মানসিক অভিজ্ঞতার ফল—এই প্রশ্নগুলো ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
‘অনীশে’র রহস্যের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের মন এবং কল্পনার বাস্তবায়নের সম্ভাবনা। রূপার অভিজ্ঞতার মধ্যে এমন কিছু ঘটনা আছে, যেগুলোকে সরলভাবে বাস্তব ঘটনা বলে মেনে নেওয়া যায় না, আবার নিছক কল্পনা বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হুমায়ূন আহমেদ এই অস্পষ্ট জায়গাটিকেই গল্পের প্রধান শক্তি করেছেন। ফলে পাঠককে বারবার নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়।
মিসির আলির ভূমিকা এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি রূপার বর্ণনা শুনে আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্তে পৌঁছান না। বরং ঘটনাগুলোর মধ্যে সম্পর্ক খোঁজেন, চরিত্রগুলোর আচরণ বিশ্লেষণ করেন এবং মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার দিকে এগিয়ে যান। তাঁর যুক্তি সবসময় পাঠকের কাছে আরামদায়ক বা গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। লেখক নিজেই ভূমিকায় এই বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট করেছেন—মিসির আলির একটি যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে নাও হতে পারে; কিন্তু যুক্তি মানুষের পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভর করে চলে না।
এই বক্তব্যটি আসলে ‘অনীশে’র দর্শন বোঝার চাবিকাঠি। মিসির আলি এমন এক চরিত্র, যিনি বিশ্বাসের পরিবর্তে প্রমাণ এবং অনুভূতির পরিবর্তে যুক্তিকে অগ্রাধিকার দেন। কিন্তু তাঁর যুক্তি কখনোই মানবিক অনুভূতিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে না। বরং মানুষের আচরণের গভীরে গিয়ে তিনি বোঝার চেষ্টা করেন কেন একজন মানুষ এমন কিছু বিশ্বাস করতে পারে, যা বাইরে থেকে অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়।
উপন্যাসটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল মিসির আলির নিজের অসুস্থতা। সাধারণত তিনি অন্যের সমস্যার পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষক। কিন্তু ‘অনীশে’ তিনি নিজেই শারীরিকভাবে দুর্বল। এই পরিস্থিতি চরিত্রটিকে কিছুটা মানবিক ও ভঙ্গুর করে তোলে। রহস্য সমাধানের সময় তাঁর শারীরিক সীমাবদ্ধতা এবং মানসিক দৃঢ়তার মধ্যে একটি বৈপরীত্য তৈরি হয়। ফলে মিসির আলি এখানে কেবল ‘অসাধারণ বুদ্ধিমান রহস্যভেদী’ নন; তিনি একজন অসুস্থ মানুষ, যিনি অসুস্থ শরীর নিয়েও অজানা একটি সমস্যার সামনে নিজের যুক্তিকে সক্রিয় রাখেন।
রূপা চরিত্রটিও উপন্যাসটির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাঁর জীবন, স্মৃতি, সম্পর্ক এবং মানসিক অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়। বিশেষ করে তাঁর অতীতকে বোঝার জন্য মিসির আলির যে বিশ্লেষণ, সেটিই গল্পের রহস্যকে গভীর করে। রূপাকে কেবল রহস্যের বাহক হিসেবে না দেখে একজন জটিল মানসিক জগতের মানুষ হিসেবে নির্মাণ করেছেন হুমায়ূন আহমেদ।
‘অনীশ’ নামটির মধ্যেও একটি তাৎপর্য আছে। শব্দটি সাধারণত ঈশ্বর বা নিয়ন্ত্রকের অনুপস্থিতির ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু উপন্যাসের নামকে সরল ধর্মতাত্ত্বিক অর্থে পড়লে এর ব্যাপ্তি সংকুচিত হয়ে যায়। হুমায়ূন আহমেদ বরং মানুষের বিশ্বাস, অবিশ্বাস, যুক্তি ও অজ্ঞাতের প্রতি আকর্ষণ—এই বৃহত্তর প্রশ্নগুলোর দিকে পাঠকের দৃষ্টি নিয়ে যান।
তবে ‘অনীশ’ নিয়ে পাঠকের প্রতিক্রিয়া একরকম নয়। কেউ এটিকে মনস্তাত্ত্বিক রহস্য হিসেবে প্রশংসা করেছেন, আবার কেউ গল্পের চরিত্রায়ণ বা সমাধান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এই মতভেদই হয়ত বইটির একটি বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে—এটি এমন কোন রহস্যকাহিনি নয় যার আকর্ষণ কেবল শেষের চমকে নির্ভর করে; বরং এর বড় অংশ নিহিত আছে রহস্যের ব্যাখ্যা নিয়ে পাঠকের নিজের অবস্থান নির্ধারণে।
সব মিলিয়ে ‘অনীশ’ মিসির আলি সিরিজের একটি মনস্তাত্ত্বিক রহস্যকেন্দ্রিক রচনা, যেখানে অতিপ্রাকৃতের সম্ভাবনা এবং যুক্তির অনুসন্ধান পাশাপাশি চলে। এর সবচেয়ে বড় শক্তি হল, হুমায়ূন আহমেদ রহস্যকে কেবল ‘কী ঘটেছিল’ প্রশ্নে আটকে রাখেননি; তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—মানুষ যা অনুভব করে, তা কতটা বাস্তব; আর বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে মানুষের মন কতটা নির্ভরযোগ্য?
এই কারণে ‘অনীশ’কে নিছক রহস্য-উপন্যাস হিসেবে পড়লে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর বাদ পড়ে যায়। এটি একই সঙ্গে মানুষের স্মৃতি, কল্পনা, বিশ্বাস ও মানসিক জগতের অনুসন্ধান। আর সেই অনুসন্ধানের কেন্দ্রে থাকা মিসির আলি পাঠককে কোন অলৌকিক উত্তেজনার দিকে ঠেলে না দিয়ে বারবার যুক্তির দিকে ফিরিয়ে আনেন। শেষ পর্যন্ত রহস্যের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে সেই প্রশ্নটি—আমরা যে বাস্তবতাকে সত্য বলে জানি, তার কতটুকু সত্যিই আমাদের জানা?