এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি সুকান্ত ভট্টাচার্য রচিত ‘অভিযান’ কাব্যগ্রন্থের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের বহুমুখী সাহিত্যসত্তার একটি অত্যন্ত স্বতন্ত্র ও পরীক্ষামূলক সৃষ্টি হলো ‘অভিযান’। প্রচলিত কবিতার পরিচিত পরিসর থেকে সচেতনভাবে বেরিয়ে এসে এখানে কবি গীতিনাট্যের অনন্য আঙ্গিকে মানুষের জীবনসংগ্রাম, সামাজিক বাস্তবতা এবং পরিবর্তনের অদম্য আকাঙ্ক্ষাকে রূপ দিয়েছেন। সুকান্তের অন্যান্য রচনার মতোই এই নাট্যরীতির কেন্দ্রেও অক্ষুণ্ণ রয়েছে মানুষ ও তার অধিকারের লড়াই; তবে এখানে সেই বক্তব্য কেবল কবিতার একক পঙ্ক্তিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সংলাপ, চরিত্রায়ন, সংগীত এবং নাট্যঘটনার এক অপূর্ব সম্মিলনে একটি সম্মিলিত ও জীবন্ত শিল্পরূপ লাভ করেছে।
‘অভিযান’-এর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বকীয় গীতিনাট্যধর্মী নির্মাণশৈলী। নাটকের মূল বক্তব্যকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি গান এখানে কেবল বিনোদনের উপকরণ নয়, বরং গভীর আবহ, মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতি ও নাট্যরস নির্মাণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ফলে গানগুলোকে নাটকের মূল প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে এই গীতিনাট্যের প্রকৃত তাৎপর্য ও শিল্পসৌন্দর্য অধরা থেকে যায়। বিভিন্ন চরিত্রের অন্তরের আবেগ, তাদের প্রান্তিক সামাজিক অবস্থান, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং বেঁচে থাকার সংঘাতকে সংগীতের সুরে মূর্ত করে তোলার এই প্রয়াস রচনাটিকে গতানুগতিক নাটক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক উচ্চতা দিয়েছে।
সুকান্তের জীবনকাল ছিল এক গভীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অস্থিরতার কাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি, কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ, মহামারি, দারিদ্র্য এবং নির্মম শ্রেণিবৈষম্য সেকালের সাধারণ মানুষের জীবনকে আমূল বিপর্যস্ত করেছিল। সেই নিষ্ঠুর সামাজিক বাস্তবতা তাঁর সংবেদনশীল চেতনাকে গভীরভাবে মথিত করেছিল। ‘অভিযান’ ঠিক সেই সময়ের মানুষের রক্তক্ষয়ী জীবন ও টিকে থাকার লড়াইয়ের সঙ্গেই নিবিড়ভাবে যুক্ত একটি প্রামাণ্য নাট্যপ্রকাশ। এখানে কোনো একক ব্যক্তিমানসের সংকট বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মিশে যায়; মানুষের ব্যক্তিগত বেদনা ও না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস শেষ পর্যন্ত একটি সামগ্রিক ও বিপ্লবমুখী সামাজিক প্রশ্নে পরিণত হয়।
‘অভিযান’ গীতিনাট্যটির নামকরণটিও অত্যন্ত গভীর ব্যঞ্জনাবাহী। এটি যেন স্থবিরতা, জড়তা, বঞ্চনা ও পরাজয়ের অন্ধকার পেরিয়ে আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক অপরাজেয় প্রতীক। এই অগ্রযাত্রা কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট চরিত্র বা ব্যক্তির ব্যক্তিগত যাত্রা নয়; বরং এটি একটি গোটা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত অভিযাত্রা। পুরোনো শোষণ, কূপমণ্ডূকতা ও বৈষম্যের জীর্ণ শিকল ভেঙে এক নতুন মানবিক সমাজের দিকে ধাবিত হওয়ার যে তীব্র বাসনা সুকান্তের সমগ্র সাহিত্যজুড়ে প্রবহমান, ‘অভিযান’-এর সামগ্রিক নাট্যভাবনাতেও তার অত্যন্ত স্পষ্ট ও উজ্জ্বল প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।
এই গীতিনাট্যে গান এবং নাট্যক্রিয়া বা অ্যাকশনের পারস্পরিক সম্পর্কটি অত্যন্ত নিবিড় ও তাৎপর্যপূর্ণ। সুর ও বাণীর এই মেলবন্ধনে গান কখনো চরিত্রের অন্তর্গত সুগভীর বেদনা প্রকাশ করে, কখনো গোটা নাটকের পটভূমি ও পরিবেশ রচনা করে, আবার কখনো কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর সামষ্টিক অনুভূতির স্তরে উন্নীত করে। এই নান্দনিক বৈশিষ্ট্যই ‘অভিযান’-কে নিছক কিছু গান-সংবলিত গতানুগতিক নাটক না রেখে প্রকৃত অর্থে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সার্থক গীতিনাট্যের রূপ দান করেছে।
এই রচনার আরেকটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় দিক হলো এতে ‘সমষ্টি’ বা গণমানুষের সরব উপস্থিতি। সুকান্তের সমাজচেতনায় সাধারণ মেহনতি মানুষ কখনো কোনো উপেক্ষীয় পার্শ্বচরিত্র নয়; বরং ইতিহাস ও সামাজিক পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হলো এই সাধারণ মানুষেরাই। গীতিনাট্যের মতো একটি সম্মিলিত ও মঞ্চমুখী পরিবেশনার উপযোগী শিল্পমাধ্যমে এই দৃষ্টিভঙ্গি আরও বহুগুণ বেশি কার্যকর ও জোরালো হয়ে ওঠে। এখানে একক ব্যক্তির কণ্ঠের সঙ্গে গোটা সমষ্টির আপসহীন কণ্ঠ যুক্ত হওয়ার অপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়, যা নাটকের অন্তর্নিহিত বার্তাকে আরও বেগবান করে।
‘অভিযান’-এর যথাযথ মূল্যায়নের জন্য সুকান্তের বরেণ্য অথচ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত স্বল্পায়ু সাহিত্যজীবনের দিকটিও বিশেষভাবে স্মরণে রাখা প্রয়োজন। অতি অল্প বয়সের এই জীবনে তিনি কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ, অনুবাদ এবং নাট্যরচনাসহ সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় সাহসী ও অভিনব পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন। ‘অভিযান’ তাঁর সেই বহুমুখী ও ক্ষণজন্মা সৃষ্টিশীলতার একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এটি আমাদের দ্ব্যর্থহীনভাবে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সুকান্ত কেবল প্রতিবাদী ও দ্রোহের কবিতার কবিই ছিলেন না; নাটক, সুর ও সংগীতনির্ভর একটি সম্মিলিত মঞ্চশিল্প রূপায়ণ নিয়েও তাঁর সুচিন্তিত ও স্পষ্ট আগ্রহ ছিল।
সব মিলিয়ে ‘অভিযান’ হলো সুকান্ত ভট্টাচার্যের ইস্পাতকঠিন সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং রূপগত শিল্প-পরীক্ষার এক দুর্লভ গীতিনাট্য। এর মূল শক্তি কেবল শাণিত বক্তব্যে নয়; বরং গান, সংলাপ, নাট্যদ্বন্দ্ব ও সমষ্টিগত আবহের সুষমামণ্ডিত সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক সামগ্রিক শিল্পরূপে। যে নির্মম সমাজবাস্তবতার অগ্নিগর্ভ থেকে সুকান্ত তাঁর কলম চালনা করেছিলেন, ‘অভিযান’ সেই বাস্তবতাকে মঞ্চের উপযোগী এক সুরময় ও দ্রোহী নাট্যভাষায় রূপ দেওয়ারই সার্থক প্রয়াস। তাই সুকান্তের সাহিত্যিক প্রতিভাকে পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝতে হলে তাঁর বিখ্যাত কবিতার পাশাপাশি ‘অভিযান’-এর মতো এই ব্যঞ্জনাময় গীতিনাট্যটিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে পাঠ করা অপরিহার্য।