নিশীথিনী

হুমায়ূন আহমেদ

এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি হুমায়ূন আহমেদ রচিত ‘নিশীথিনী’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।

হুমায়ূন আহমেদের ‘নিশীথিনী’ মিসির আলিকে কেন্দ্র করে রচিত অন্যতম আলোচিত রহস্যোপন্যাস। ‘দেবী’র পর মিসির আলি চরিত্রকে আরও বিস্তৃত ও গভীর পরিসরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এই উপন্যাসে। বইটি মিসির আলি সিরিজের দ্বিতীয় রচনা হিসেবে পরিচিত এবং এর কেন্দ্রে রয়েছে এমন কিছু ঘটনা, যেগুলোর ব্যাখ্যা যুক্তি, মনস্তত্ত্ব ও অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস—তিনটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেই করা সম্ভব।

উপন্যাসের কাহিনিতে ফিরোজের অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতা, নীলুকে ঘিরে রহস্য, হানিফার অজানা পরিচয় এবং মিসির আলির অনুসন্ধান পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি জটিল রহস্যজাল তৈরি করে। ফিরোজ মোহনগঞ্জে বন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার পর অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তার আচরণের পরিবর্তন এবং পরবর্তী ঘটনাবলি মিসির আলিকে অনুসন্ধানে নামতে বাধ্য করে। একই সময়ে হানিফার পরিচয় নিয়েও তৈরি হয় আরেকটি রহস্য।

‘নিশীথিনী’র সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল এর রহস্যের প্রকৃতি। এখানে রহস্য কেবল বাহ্যিক ঘটনা নয়; মানুষের মন, স্মৃতি, ব্যক্তিত্ব এবং অবচেতন জগতও রহস্যের অংশ হয়ে ওঠে। মিসির আলি প্রতিটি ঘটনার যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা খুঁজতে চান। কিন্তু উপন্যাসের ঘটনাগুলো এমনভাবে নির্মিত যে পাঠকও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করতে থাকেন—যা ঘটছে তা কি সত্যিই অতিপ্রাকৃত, নাকি মানুষের মন ও মস্তিষ্কের জটিল কোন প্রকাশ? এই অনিশ্চয়তাই কাহিনির উত্তেজনা ধরে রাখে। পাঠক-প্রতিক্রিয়াতেও ‘নিশীথিনী’র এই বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মধ্যবর্তী অবস্থানটি বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়।

মিসির আলি চরিত্রটির বিকাশের দিক থেকেও ‘নিশীথিনী’ গুরুত্বপূর্ণ। ‘দেবী’তে তাঁর যে যুক্তিবাদী ও অনুসন্ধিৎসু পরিচয় দেখা যায়, এই উপন্যাসে তা আরও পরিণত হয়। কিন্তু তিনি নিছক রহস্য-সমাধানকারী বুদ্ধিজীবী নন। মানুষের প্রতি তাঁর কৌতূহলের সঙ্গে সহমর্মিতা ও দায়বোধও যুক্ত। ‘নিশীথিনী’তে তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতি এবং বিশেষ করে নীলুর প্রতি আকর্ষণের আভাসও চরিত্রটিকে আরও মানবিক করে তোলে। তাঁর বয়স ও রোমান্টিক অনুভূতি নিয়ে লেখকের সরাসরি মনোযোগ দেওয়ার বিষয়টি মিসির আলির চরিত্র-নির্মাণে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

হুমায়ূন আহমেদের ভাষা এই উপন্যাসের অন্যতম শক্তি। জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও আধিভৌতিক বিষয়কে তিনি সহজ, সাবলীল ও প্রায় কথোপকথনধর্মী ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। ফলে রহস্যের বিষয়বস্তু কখনও ভারী বা দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে না। বরং সাধারণ জীবনের পরিচিত পরিবেশের মধ্যেই অস্বাভাবিকতার আবির্ভাব ঘটে। এই স্বাভাবিকতার ভিতর অস্বাভাবিকতাকে স্থাপন করার কৌশলই ‘নিশীথিনী’র ভয়ের আবহকে আরও কার্যকর করে তোলে। পাঠক-সমালোচনাতেও হুমায়ূন আহমেদের সহজ ভাষায় ভয় ও রহস্য নির্মাণের ক্ষমতার কথা উঠে এসেছে।

তবে ‘নিশীথিনী’কে নিছক একটি ভৌতিক বা অতিপ্রাকৃত উপন্যাস হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত বৈশিষ্ট্য ধরা পড়বে না। এর গভীরে রয়েছে মানুষের বিশ্বাসের সীমা, যুক্তির সীমা এবং অজানাকে বোঝার মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা। মিসির আলি একদিকে বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার অনুসারী, অন্যদিকে তাঁর সামনে এমন কিছু অভিজ্ঞতা উপস্থিত হয় যার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা সহজে পাওয়া যায় না। ফলে উপন্যাসটি পাঠককে কোনও সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেওয়ার পরিবর্তে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

এই দিক থেকেই ‘নিশীথিনী’ হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় রহস্য-সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। মিসির আলির বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান, মানুষের মনস্তত্ত্ব, অতিপ্রাকৃতের আবহ এবং সহজ অথচ আকর্ষণীয় ভাষা—এই চারটি উপাদান একত্র হয়ে উপন্যাসটিকে স্বতন্ত্র করেছে। পাঠক যেমন এর রহস্য অনুসরণ করে এগিয়ে যান, তেমনি শেষ পর্যন্ত তাঁর মনে থেকে যায় আরও বড় একটি প্রশ্ন—মানুষের জ্ঞান ও যুক্তির বাইরে সত্যিই কি কোন অজানা জগৎ রয়েছে, নাকি অজানার একটি বড় অংশ এখনও মানুষের মনোজগতের মধ্যেই লুকিয়ে আছে?

‘নিশীথিনী’র সার্থকতা এখানেই যে, এটি রহস্যের সমাধানের চেয়ে রহস্যের অনুভূতিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। মিসির আলির যুক্তি যেমন পাঠককে বাস্তবতার দিকে টেনে আনে, তেমনি কাহিনির অস্বাভাবিক ঘটনাগুলো তাঁকে আবার সেই বাস্তবতার সীমা নিয়ে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে। এই দ্বন্দ্বই উপন্যাসটির প্রাণ এবং হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলি-সাহিত্যের স্থায়ী আকর্ষণের অন্যতম কারণ।