নিষাদ

হুমায়ূন আহমেদ

এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি হুমায়ূন আহমেদ রচিত ‘নিষাদ’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।

হুমায়ূন আহমেদের ‘নিষাদ’ ‘মিসির আলি সিরিজে’র এমন একটি উপন্যাস, যেখানে রহস্যের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে বাস্তবতার প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন। ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত এই রচনাটি মিসির আলি সিরিজের প্রাথমিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর একটি।

উপন্যাসের সূচনাতেই মিসির আলির সামনে আসে মুনির নামের এক তরুণের অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। তার বক্তব্য ও আচরণের মধ্যে এমন কিছু অসংগতি থাকে, যা সাধারণ মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় সহজে মেলে না। মিসির আলি স্বভাবসিদ্ধ পদ্ধতিতে ঘটনাটিকে কুসংস্কার বা অলৌকিকতার বলে উড়িয়ে দেন না; বরং পর্যবেক্ষণ, তথ্য ও যুক্তির সাহায্যে সমস্যাটিকে বোঝার চেষ্টা করেন। উপন্যাসের অধ্যায়বিন্যাসেও দেখা যায়, মুনিরের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন, চিকিৎসাবিদ্যার প্রসঙ্গ, নিউরোলজিস্টের মতামত এবং মিসির আলির নিজস্ব তত্ত্ব ধীরে ধীরে রহস্যকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

‘নিষাদে’র সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর parallel world বা সমান্তরাল জগতের ধারণা। এখানে হুমায়ূন আহমেদ এমন এক কল্পজগত নির্মাণ করেছেন, যেখানে মানুষের জীবনকে একটিমাত্র সরল বাস্তবতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একাধিক সম্ভাব্য জীবন বা বাস্তবতার কথা ভাবা হয়েছে। এই ধারণাটি উপন্যাসকে প্রচলিত রহস্যকাহিনি থেকে সরিয়ে কল্পবিজ্ঞান, দর্শন এবং পরামনোবিজ্ঞানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিয়ে যায়। এ কারণেই ‘নিষাদ’কে নিছক রহস্যোপন্যাসের চেয়ে পরামনোবিজ্ঞান ও কল্পবিজ্ঞানের উপাদানসমৃদ্ধ মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস হিসেবে পড়া বেশি ফলপ্রসূ। সমকালীন পাঠ-আলোচনাতেও উপন্যাসটির এই সমান্তরাল জগতের ধারণাকে তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তবে ‘নিষাদে’র সাফল্য শুধু তার অভিনব ধারণায় নয়; মিসির আলির উপস্থিতিই সেই ধারণাকে বিশ্বাসযোগ্য সাহিত্যিক কাঠামো দিয়েছে। মিসির আলি কোন অলৌকিক শক্তির অধিকারী রহস্যভেদকারী নন। তিনি একজন পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষক, যিনি অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতার সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমে যুক্তির সাহায্য নেন। এই বৈশিষ্ট্য তাঁকে হুমায়ূন আহমেদের অন্যান্য রহস্যচরিত্র থেকে আলাদা করে। ‘দেবী’ থেকে শুরু হওয়া চরিত্রটি ‘নিশীথিনী’ ও ‘নিষাদে’র পর্যায়ে এসে আরও সুস্পষ্ট স্বাতন্ত্র্য অর্জন করে।

মজার ব্যাপার হল, ‘নিষাদে’ শেষ পর্যন্ত মিসির আলির যুক্তিবাদও একটি সীমারেখায় এসে দাঁড়ায়। তিনি রহস্যকে ব্যাখ্যা করতে চান, কিন্তু কাহিনির বিষয়বস্তু এমন এক সম্ভাবনার দিকে তাঁকে ঠেলে দেয়, যেখানে প্রচলিত বাস্তবতার ধারণাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। অর্থাৎ মিসির আলির কাজ কেবল রহস্যের সমাধান করা নয়; কখনো কখনো তিনি পাঠককে দেখিয়ে দেন যে রহস্যের সবচেয়ে কঠিন জায়গাটি হল আমাদের নিজেদের বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা। এই জায়গায় উপন্যাসটির পরামনোবৈজ্ঞানিক তাৎপর্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পরামনোবিজ্ঞান মানুষের প্রচলিত ইন্দ্রিয় ও মানসিক প্রক্রিয়ার বাইরে বলে বিবেচিত কিছু অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ‘নিষাদ’ সেই প্রশ্নকে সাহিত্যিক কল্পনার মাধ্যমে ব্যবহার করেছে। হুমায়ূন আহমেদ কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেননি; বরং বৈজ্ঞানিক যুক্তি, মনস্তত্ত্ব, কল্পনা ও অজানার সীমান্তে একটি গল্প নির্মাণ করেছেন। ফলে বইটির শক্তি বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতার চেয়ে প্রশ্ন সৃষ্টির ক্ষমতায়।

‘নিষাদে’র আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এর সংক্ষিপ্ততা। কাহিনি অপ্রয়োজনীয় বিস্তারে যায় না; অল্প পরিসরের মধ্যেই চরিত্র, রহস্য ও তত্ত্বকে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাঠকের কাছে সবকিছু সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করে দেওয়ার বদলে হুমায়ূন আহমেদ কিছু জায়গা ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রেখেছেন। এই অসম্পূর্ণতার অনুভূতিই বইটির শেষ পর্যন্ত পাঠককে ভাবিয়ে রাখে। ফলে ‘নিষাদ’ এমন একটি রচনা, যার পাঠ শেষ হওয়ার পরও তার মূল ধারণাটি মাথার মধ্যে কাজ করতে থাকে।

অবশ্য উপন্যাসটির একটি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সমান্তরাল জগতের ধারণাটি কাহিনির জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় হলেও এর যুক্তিগত ভিত্তি সর্বত্র সমানভাবে দৃঢ় নয়। কেউ কেউ তাই এটিকে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি হিসেবে গ্রহণের চেয়ে ফ্যান্টাসি বা মনস্তাত্ত্বিক রহস্য হিসেবে পড়তে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারেন। পাঠক-আলোচনাতেও এই দ্বিধা দেখা যায়—‘নিষাদ’কে বিজ্ঞানভিত্তিক কল্পকাহিনি, ফ্যান্টাসি কিংবা মিসির আলি-নির্ভর রহস্য—কোন শ্রেণিতে রাখা হবে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

তবু এই শ্রেণিবিভাগের দ্বিধাই এক অর্থে ‘নিষাদে’র সাফল্য। হুমায়ূন আহমেদ এখানে এমন একটি গল্প লিখেছেন, যা একই সঙ্গে রহস্য, মনস্তত্ত্ব, দর্শন, পরামনোবিজ্ঞান ও কল্পবিজ্ঞানের কয়েকটি প্রশ্নকে স্পর্শ করে। পাঠককে তিনি কোন একটি উত্তর দিয়ে সন্তুষ্ট করেন না; বরং বাস্তবতা সম্পর্কে তার নিজের বিশ্বাসকে কিছুক্ষণের জন্য অনিশ্চিত করে দেন।

‘দেবী’তে মিসির আলির সামনে ছিল অস্বাভাবিক এক মানবমনের রহস্য; ‘নিষাদে’ প্রশ্নটি আরও বড়—মানুষের জীবন কি সত্যিই একটিমাত্র বাস্তবতার মধ্যে সীমাবদ্ধ? এই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর না দিয়েই হুমায়ূন আহমেদ কাহিনিকে থামিয়েছেন। আর সেই কারণেই ‘নিষাদ’ মিসির আলি সিরিজের একটি স্মরণীয় রচনা: এটি রহস্যের সমাধানের চেয়ে রহস্যের সম্ভাবনাকে বড় করে তোলে এবং পাঠককে নিজের পরিচিত বাস্তবতার সীমানা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।