এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি হুমায়ূন আহমেদ রচিত ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।
হুমায়ূন আহমেদের “নন্দিত নরকে” বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর আত্মপ্রকাশের উপন্যাস। বইটি আকারে ছোট হলেও এর সাহিত্যিক গুরুত্ব তার আকারের তুলনায় অনেক বড়। প্রকাশের সময় হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন একেবারেই তরুণ; কিন্তু এই প্রথম প্রকাশিত উপন্যাসেই তিনি এমন একটি স্বতন্ত্র কথনভঙ্গি তৈরি করেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর বিপুল জনপ্রিয় সাহিত্যজগতের ভিত্তি হয়ে ওঠে। সমকালীন পাঠক ও সাহিত্যিকদের একটি অংশও বইটির প্রকাশের সময়ই এর মধ্যে নতুন কথাশিল্পীর সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন।[১]
‘নন্দিত নরকে’ লেখার সময় হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ছাত্র। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭০ সালে তিনি উপন্যাসটি লেখেন। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি তাঁর “প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস”, কিন্তু প্রথম লিখিত উপন্যাস নয়। তাঁর ‘শঙ্খনীল কারাগার’ আগে লেখা হলেও ‘নন্দিত নরকে’ আগে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী এক সাক্ষাৎকারে হুমায়ূন আহমেদ নিজেই জানান, তাঁর লেখা খাতাটি তাঁর বন্ধু আনিস সাবেত ‘মুখপত্র’ পত্রিকার সম্পাদকের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন এবং সেখানেই প্রথম লেখাটি প্রকাশিত হয়।[২]
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কারণে উপন্যাসটির স্বাভাবিক প্রকাশনা ব্যাহত হয়। স্বাধীনতার পর ঢাকার মাসিক সংকলন ‘মুখপত্র’-এর প্রথম বর্ষের তৃতীয় সংখ্যায় ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশিত হয়। এই প্রকাশনা সাহিত্যিক মহলে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিশেষ করে আহমদ শরীফের লেখা ভূমিকা তরুণ লেখকটির প্রতি পাঠক ও সাহিত্যিকদের কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়। পরে সাহিত্যিক আহমদ ছফার উদ্যোগে উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রকাশের ব্যবস্থা হয় এবং ১৯৭২ সালের শেষ দিকে খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি থেকে এর প্রথম বই-সংস্করণ প্রকাশিত হয়।[৩]
প্রথম সংস্করণের প্রকাশনা-ইতিহাসে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। বিভিন্ন সূত্রে প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদশিল্পী সম্পর্কে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়; তাই নির্দিষ্ট সংস্করণ হাতে না দেখে প্রচ্ছদশিল্পীর নামকে চূড়ান্ত তথ্য হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক হবে না। তবে খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি থেকে ১৯৭২ সালে প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার তথ্যটি একাধিক সূত্রে সমর্থিত। পরবর্তী সংস্করণগুলোতে প্রকাশক ও প্রচ্ছদশিল্পী পরিবর্তিত হয়েছে।[৪]
উপন্যাসটির কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে একটি মধ্যবিত্ত পরিবার এবং সেই পরিবারের সদস্যদের দৈনন্দিন জীবন, সম্পর্ক, আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ ও সংকট। হুমায়ূন আহমেদ কোনো বৃহৎ ঐতিহাসিক ঘটনা বা অসাধারণ নায়কের জীবনকে কাহিনির কেন্দ্র করেননি; বরং সাধারণ মানুষের খুব পরিচিত জীবনকেই সাহিত্যিক উপাদানে পরিণত করেছেন। এই সাধারণত্বই উপন্যাসটির অন্যতম শক্তি। পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক, ছোট ছোট আনন্দ-বেদনা, অভিমান, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ এবং জীবনের আকস্মিক বিপর্যয় ধীরে ধীরে একটি গভীর মানবিক ট্র্যাজেডির দিকে এগিয়ে যায়।
উপন্যাসটির বর্ণনাভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর “প্রথম পুরুষের কথন”। ‘খোকা’ চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবার ও ঘটনাগুলোকে দেখার ফলে পাঠক কাহিনির বাইরের কোনো নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক হয়ে থাকেন না; বরং পরিবারের ভেতরের একজন মানুষের চোখ দিয়ে ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করেন। এই কৌশল চরিত্রগুলোর মানসিক জগতকে কাছাকাছি নিয়ে আসে এবং কাহিনির আবেগকে তীব্র করে। একই সঙ্গে বর্ণনাকারীর সীমিত দৃষ্টিভঙ্গি অনেক ঘটনার পূর্ণ অর্থ পাঠকের কাছে ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে।
‘নন্দিত নরকে’র সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এর “মধ্যবিত্ত জীবনবোধ”। হুমায়ূন আহমেদের পরবর্তী বিপুল সাহিত্যকর্মেও মধ্যবিত্ত পরিবার, তাদের সম্পর্ক ও মনস্তত্ত্ব বারবার ফিরে এসেছে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই বলেছিলেন যে মধ্যবিত্ত মানুষকেই তিনি ভালোভাবে দেখেছেন, তাই তাঁর লেখায় তাদের জীবন বেশি এসেছে। ‘নন্দিত নরকে’ সেই প্রবণতার প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।[৫]
এই মধ্যবিত্ত জীবনকে লেখক আদর্শায়িত করেননি। এখানে মানুষ যেমন স্নেহশীল, তেমনই স্বার্থপর; যেমন ভালোবাসে, তেমনই ভুল বোঝে; যেমন দায়িত্বশীল, তেমনই দুর্বল। পরিবারের সদস্যরা কেউ একমাত্রিক চরিত্র নয়। তাদের আচরণের পেছনে সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা এবং মানসিক সীমাবদ্ধতা কাজ করে। ফলে উপন্যাসের পরিবারটি কোনো আদর্শ পরিবারের প্রতিকৃতি নয়; বরং বাস্তব জীবনের মতোই অসম্পূর্ণ, দ্বন্দ্বপূর্ণ এবং মানবিক।
‘নন্দিত নরকে’ নামটিও উপন্যাসের তাৎপর্য বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ‘নন্দিত’ শব্দটি আনন্দ, আকর্ষণ বা প্রশংসার ইঙ্গিত বহন করে, আর ‘নরক’ নির্দেশ করে যন্ত্রণা ও অসহনীয় বাস্তবতার দিকে। এই আপাত-বিরোধী দুটি শব্দ পাশাপাশি বসিয়ে হুমায়ূন আহমেদ যেন এমন এক জীবনজগতের দিকে ইঙ্গিত করেন, যেখানে সুখ ও দুঃখ, আনন্দ ও বেদনা, ভালোবাসা ও অসহায়তা একই সঙ্গে অবস্থান করে। সমকালীন পাঠে বইটির নামই যে বিশেষ কৌতূহল সৃষ্টি করেছিল, আহমদ শরীফের ভূমিকাতেও তার প্রতিফলন পাওয়া যায়।[৬]
উপন্যাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো “অন্তর্লীন ট্র্যাজেডি”। প্রথমদিকে কাহিনি খুব সাধারণ পারিবারিক জীবনের মতো এগোলেও ধীরে ধীরে পাঠক বুঝতে পারেন যে এই স্বাভাবিকতার নিচে চাপা পড়ে আছে গভীর সংকট। হুমায়ূন আহমেদ বড় কোনো নাটকীয় ঘোষণা না দিয়ে দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ঘটনা, কথোপকথন ও সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে সেই সংকট তৈরি করেন। ফলে চূড়ান্ত বিপর্যয় কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়ে থাকে না; তার সঙ্গে পাঠকের আগে থেকে পরিচিত হয়ে ওঠা মানুষগুলোর জীবন ও সম্পর্ক জড়িয়ে যায়।
সাহিত্যিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ‘নন্দিত নরকে’র সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব তার “স্বাভাবিক, সংযত ও সহজ গদ্য”। হুমায়ূন আহমেদ এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন যা পাঠকের কাছে কৃত্রিম বা দুর্বোধ্য মনে হয় না। তাঁর বাক্য নির্মাণে অকারণ অলংকারের ভার নেই; কথোপকথনও সাধারণ মানুষের মুখের ভাষার কাছাকাছি। এই সহজতা কখনো কখনো সমালোচনার কারণও হয়েছে—হুমায়ূন আহমেদের গদ্যকে কেউ কেউ অতিরিক্ত সরল বা জনপ্রিয় পাঠকের উপযোগী বলে মূল্যায়ন করেছেন। কিন্তু এই সরলতাই তাঁর বর্ণনাশক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সহজ ভাষায় জটিল মানবিক অনুভূতি প্রকাশ করা নিজেই একটি শিল্পকৌশল।
তাঁর জনপ্রিয়তার প্রশ্নটিও এখানেই গুরুত্বপূর্ণ। হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিতর্ক রয়েছে—বিপুল জনপ্রিয়তা কি উচ্চ সাহিত্যিক মূল্যকে খর্ব করে? ‘নন্দিত নরকে’র গ্রহণযোগ্যতা এই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক উদাহরণ। সমকালেই আহমদ শরীফের মতো সাহিত্যিক তাঁর লেখকসত্তার সম্ভাবনা লক্ষ্য করেছিলেন। পরবর্তীকালে শামসুর রাহমানও স্মৃতিচারণে জানান, বইটি পড়ে তাঁর মনে হয়েছিল বাংলা কথাসাহিত্যে একজন নতুন কথাশিল্পীর আবির্ভাব ঘটেছে।[৭]
আধুনিক গবেষণাতেও উপন্যাসটির গুরুত্ব কেবল জনপ্রিয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে ‘নন্দিত নরকে’র মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্ত সমাজের নারী-পুরুষের জীবন, আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার সংঘাত এবং মানুষের জীবন-জিজ্ঞাসাকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অর্থাৎ উপন্যাসটি জনপ্রিয় পাঠের পাশাপাশি সামাজিক ও ন্যারেটিভ বিশ্লেষণেরও উপযোগী একটি সাহিত্যকর্ম।[৮]
তবে ‘নন্দিত নরকে’কে নিখুঁত উপন্যাস বলা যাবে না। এটি হুমায়ূন আহমেদের একেবারে প্রথম দিকের রচনা; ফলে পরিণত বয়সের তাঁর কিছু উপন্যাসে যে বিস্তৃত চরিত্রায়ণ, দার্শনিক অনুসন্ধান বা বহুমাত্রিক আখ্যান দেখা যায়, এখানে তার পরিসর তুলনামূলকভাবে সীমিত। কাহিনিও আকারে ছোট এবং মূলত একটি পরিবারের আবর্তে আবদ্ধ। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাই আবার এর ঘনত্ব তৈরি করেছে। অল্প পরিসরে একটি পরিবারের জীবন ও মানসিকতার ওপর এত নিবিড় মনোযোগ উপন্যাসটিকে স্বতন্ত্র করেছে।
‘নন্দিত নরকে’র গুরুত্ব শেষ পর্যন্ত কেবল হুমায়ূন আহমেদের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস হিসেবে নয়। এটি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে একটি নতুন পাঠরুচির সূচনালগ্নেরও স্মারক। যে তরুণ লেখক ১৯৭০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় উপন্যাসটি লিখেছিলেন, তিনিই পরবর্তী চার দশকে বাংলা ভাষার অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হয়ে ওঠেন। তাঁর বিপুল সাহিত্যভুবনের দিকে ফিরে তাকালে ‘নন্দিত নরকে’কে যেন সেই দীর্ঘ যাত্রার প্রথম দরজা বলে মনে হয়।[৯]
আজকের পাঠে উপন্যাসটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর মানবিকতা। এখানে অসাধারণ হওয়ার চেষ্টা নেই; আছে সাধারণ মানুষের সাধারণ জীবন। সেই জীবনে হাসি আছে, বিষণ্নতা আছে, পারিবারিক টান আছে, অপূর্ণতা আছে এবং এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যখন পরিচিত পৃথিবী হঠাৎ অপরিচিত হয়ে ওঠে। হুমায়ূন আহমেদ পরবর্তীকালে যে স্বতন্ত্র পাঠকসমাজ তৈরি করেছিলেন, ‘নন্দিত নরকে’ তার বীজ বহন করে। তাই বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে এটি শুধু একজন জনপ্রিয় লেখকের প্রথম বই নয়; এটি এমন এক কথাশিল্পীর আগমনের দলিল, যিনি সাধারণ মানুষের জীবনকে সহজ ভাষায় এমনভাবে বলতে পেরেছিলেন যে সেই জীবন অসংখ্য পাঠকের নিজের জীবন বলে মনে হয়েছে।
টিকা ও মন্তব্য
- ১.↑হুমায়ূন আহমেদের প্রথম সাক্ষাৎকার : ‘যা লিখেছি, তার কোনোটিই কি উপন্যাস হয়েছে?’ | প্রথম আলো
- ২.↑হুমায়ূন আহমেদের প্রথম সাক্ষাৎকার : ‘যা লিখেছি, তার কোনোটিই কি উপন্যাস হয়েছে?’ | প্রথম আলো
- ৩.↑হুমায়ূন আহমেদের প্রথম সাক্ষাৎকার : ‘যা লিখেছি, তার কোনোটিই কি উপন্যাস হয়েছে?’ | প্রথম আলো
- ৪.↑নন্দিত নরকে | হুমায়ুন আহমেদের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস | সাজগোজ
- ৫.↑হুমায়ূন আহমেদের প্রথম সাক্ষাৎকার : ‘যা লিখেছি, তার কোনোটিই কি উপন্যাস হয়েছে?’ | প্রথম আলো
- ৬.↑নন্দিত নরকে: হুমায়ূন আহমেদ | রকমারী
- ৭.↑নন্দিত নরকে: হুমায়ূন আহমেদ | রকমারী
- ৮.↑Humayun Ahmed’s Nandito Noroke : A Quest of Question to the Lives of Men and Women | TRISANGAM INTERNATIONAL REFEREED JOURNAL
- ৯.↑হুমায়ূন আহমেদের প্রথম সাক্ষাৎকার : ‘যা লিখেছি, তার কোনোটিই কি উপন্যাস হয়েছে?’ | প্রথম আলো