মিঠেকড়া

সুকান্ত ভট্টাচার্য

এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি সুকান্ত ভট্টাচার্য রচিত ‘মিঠেকড়া’ কাব্যগ্রন্থের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।

সুকান্ত ভট্টাচার্যের অন্যতম আলোচিত গ্রন্থ ‘মিঠেকড়া’ মূলত তাঁর ছড়া ও ব্যঙ্গরসাত্মক রচনার একটি অনবদ্য সংকলন। গ্রন্থটির নামকরণের মাঝেই এর অন্তর্নিহিত প্রকৃতি ও শিল্পরূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে—‘মিঠে’ বা মিষ্টি রসের আলংকারিক আবরণের আড়ালে এখানে লুকিয়ে থাকে ‘কড়া’ এক সামাজিক ও রাজনৈতিক সত্য। বিভিন্ন ছড়ায় যুদ্ধ, বোমাবর্ষণ, জমিদারি প্রথা, সামাজিক বৈষম্য, শোষণ, ভণ্ডামি এবং সমকালীন জীবনের নানা অসংগতিকে হাস্যরস ও তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ‘ভালো খাবার’ কিংবা ‘গোপন খবর’-এর মতো রচনাগুলোতে শিশুসুলভ ছন্দ ও লোকায়ত কৌতুকের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতার প্রতি কবির তীক্ষ্ণ ও দ্রোহী দৃষ্টি সমানভাবে প্রতিভাত হয়।

গ্রন্থটির প্রকাশনা ইতিহাস ও গ্রন্থগত তথ্যের দিকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথম সংস্করণের প্রামাণ্য তথ্য অনুযায়ী, ‘মিঠেকড়া’ প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় শ্রাবণ ১৩৫৮ বঙ্গাব্দে (অর্থাৎ ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে)। এই প্রথম সংস্করণের প্রকাশক ছিলেন প্রশান্ত ভট্টাচার্য, সারস্বত লাইব্রেরী। সুকান্তের অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের তুলনায় ‘মিঠেকড়া’র স্বর ও মেজাজ কিছুটা স্বতন্ত্র। ‘ছাড়পত্র’ বা ‘পূর্বাভাস’-এর সরাসরি গম্ভীর ও সংগ্রামমুখী কাব্যভঙ্গির পরিবর্তে এখানে কবি ছড়া, কৌতুক, ব্যঙ্গ ও চিত্রময়তার সাহায্যে একই প্রতিবাদী চেতনাকে অপেক্ষাকৃত সহজ, সাবলীল ও চিত্তাকর্ষক রূপ দিয়েছেন। ফলে এটিকে কেবল শিশু-কিশোর পাঠের উপযোগী চপল ছড়ার বই হিসেবে মূল্যায়ন করলে এর গভীর তাৎপর্য খাটো করা হবে; বরং এটি সুকান্তের রাজনৈতিক ও মানবিক চেতনার এক ভিন্নতর শিল্পরূপ।

‘মিঠেকড়া’র আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর চিত্রনির্ভর পরিকল্পনা। শিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের আঁকা অসাধারণ সব ছবির সঙ্গে সুকান্তের ছড়ার এক অপূর্ব সৃজনশীল সমন্বয় ঘটেছিল এই গ্রন্থে। ঐতিহাসিক ও উপলব্ধ প্রথম সংস্করণের তথ্যানুযায়ী, দেবব্রত মুখোপাধ্যায়কে এর চিত্রশিল্পী হিসেবে যুক্ত করার পেছনে কবি নিজেই সচেষ্ট ছিলেন; এমনকি গ্রন্থটির সামগ্রিক পরিকল্পনা সুকান্ত ও দেবব্রত দুজনে মিলেই করেছিলেন বলে জানা যায়। শব্দ এবং রেখার এই মিছিলে কবিতা ও চিত্রকলার মেলবন্ধন বাংলা প্রকাশনা জগতে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।

বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, সুকান্তের হাস্যরস কখনো নিছক বিনোদনের খোরাক জোগাতে আসেনি। তাঁর ‘মিঠে’ ভাষার বুননে সর্বদা সেঁটে থাকে ‘কড়া’ কিছু প্রশ্ন—কে শোষণ করছে, কারা বঞ্চিত, সমাজের ক্ষমতাবানদের ভণ্ডামি ঠিক কোথায় এবং সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই কতটা নির্মম। এই দ্বৈত স্বর বা ব্যঞ্জনাই গ্রন্থটির প্রধান শক্তি। পরিশেষে বলা যায়, ‘মিঠেকড়া’ সুকান্তের সাহিত্যিক বহুমাত্রিকতার এক মূল্যবান দলিল—যেখানে প্রতিবাদী কবি একই সঙ্গে রসিক, শাণিত ব্যঙ্গকার এবং অসাধারণ ছন্দসচেতন ছড়াকার হিসেবে অমরত্ব লাভ করেছেন।