এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি হুমায়ূন আহমেদ রচিত ‘ময়ূরাক্ষী’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।
‘ময়ূরাক্ষী’ বাংলা কথাসাহিত্যের নন্দিত রূপকার হুমায়ূন আহমেদ রচিত জনপ্রিয় ‘হিমু’ গ্রন্থলাইনের সূচনাপর্ব বা প্রথম উপন্যাস। ১৯৯০ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসের মধ্য দিয়েই রূপালি জোছনা আর হলুদ পাঞ্জাবির মায়াজালে ঘেরা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কালজয়ী চরিত্র ‘হিমু’র আত্মপ্রকাশ ঘটে। বাস্তবতার কাঠখোট্টা নিয়ম আর পরাবাস্তব ভাবাবেগের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনে বোনা এই উপন্যাসের উল্লেখযোগ্য চরিত্রসমূহ হলো— চৌধুরী খালেকুজ্জামান টুটুল (হিমু), জাস্টিস এম. সোবাহানের কনকনে অহংকারী মেয়ে মীরা, হিমুর প্রতি পরম অনুগত ফুফাত ভাই বাদল, বাদলের বোন রিনকি, হিমুর অধরা রূপময়ী বান্ধবী রূপা এবং মেসের বন্ধু মজিদ।
হিমুর জীবন নিয়ন্ত্রিত হয় তার বাবার এক অদ্ভুত ও বিকারগ্রস্ত জীবনদর্শনের মাধ্যমে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন— কঠোর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যদি ডাক্তার কিংবা প্রকৌশলী তৈরি করা যায়, তবে সঠিক নিয়মে চেষ্টা করলে ‘মহাপুরুষ’ তৈরি করাও সম্ভব। সেই বাসনা থেকেই তিনি গড়ে তোলেন এক বিচিত্র নৈশবিদ্যালয়, যার একমাত্র শিক্ষার্থী ছিল তাঁর নিজ সন্তান হিমু। মহাপুরুষ বানানোর কঠিন সাধনার একপর্যায়ে তিনি সন্তানকে পার্থিব মায়ামুক্ত করতে নির্মমভাবে নিজ স্ত্রীকে হত্যা করেন। পরবর্তীতে মৃত্যুর আগে তিনি হিমুকে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত তার মাতুলালয়ে থাকার নির্দেশ দেন। একই সাথে সতর্ক করে যান যে, তার মামারা সবাই ‘পিশাচ’ প্রকৃতির লোক; আর পিশাচদের কাছাকাছি না থাকলে জগতের কুটিলতা ও সৎ গুণের প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
কৈশোর পেরিয়ে হিমু তার মামাবাড়ি ছেড়ে ফুফুর সংসারে আশ্রয় নেয়। সেখানেও হিমুর রহস্যময় ব্যক্তিত্বের প্রভাব পড়ে। তার অনুজ সমতুল্য ফুফাতো ভাই বাদল মহাপুরুষ সাধনার প্রতি আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে এবং হিমুকে পরম শ্রদ্ধায় ভক্তি করতে শুরু করে। হিমুর অসংলগ্ন প্রতিভার আকর্ষণে পড়ে বাদল পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়ে পর পর তিনবার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়, তবুও হিমুর প্রতি তার বিশ্বাসের বিন্দুমাত্র চির ধরে না।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দ্বিতীয় বর্ষে এসে হিমুর পরিচয় ঘটে রূপার সাথে। রূপার নিভৃত হৃদয়ে হিমুর জন্য এক গভীর ও ব্যাকুল অনুরাগের সৃষ্টি হয়। রূপা চায় হিমু আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক। কিন্তু হিমু রূপার ভালোবাসাকে যেমন সরাসরি গ্রহণ করে না, তেমনি তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে চলেও যায় না। বাবার রেখে যাওয়া ‘মহাপুরুষ’ হওয়ার কঠোর সাধনা আর এক অলৌকিক ময়ূরাক্ষী নদীর মনস্তাত্ত্বিক টানের মাঝে দাঁড়িয়ে হিমু এক চিরন্তন অধরা সত্তা হয়ে রূপার অপেক্ষাকে দীর্ঘায়িত করে চলে।