কুহুরানী

হুমায়ূন আহমেদ

এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি হুমায়ূন আহমেদ রচিত ‘কুহুরানী’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।

হুমায়ূন আহমেদের ‘কুহুরানী’ এমন একটি উপন্যাস, যার পেছনে রয়েছে লেখকের নিজের ভাষায় এক ধরনের অনুরোধের ইতিহাস। লেখক ফ্ল্যাপে মজার ছলে লিখেছেন,–

“অনুরোধের ঢেঁকির মতো অনুরোধের উপন্যাসও আছে। অনুরোধের উপন্যাসগুলি সাধারণত ঈদসংখ্যা এবং পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। প্রোটিনের অভাবে অপুষ্ট দেহ। লিকলিকে শরীরে বিরাট পেট।

কুহুরানী এরকম একটি উপন্যাস। একটা পত্রিকার ঈদ সংখ্যার লেখা। আমার হাতে সময় মাত্র তিন দিন।পত্রিকার লোক বসার ঘরে শুকরা মুখে বসে আছেন।আমি লিখছি। ছয়-সাত পাতা লেখা হতেই তিনি স্লিপ নিয়ে পত্রিকা অফিসে ছুটে যাচ্ছেন। কম্পোজ করে গেটাপ দিয়ে সাজিয়ে দেখা হচ্ছে। ভুল ভ্রান্তি?

আগে পত্রিকা বের হোক, ভুল ভ্রান্তি পরে দেখা যাবে। অনুরোধের কুহুরানীকে বই হিসেবে ঠিকঠাক করতে অনেক কষ্ট করতে হলো্ কুহুরানী প্রকাশনার দিনে ছোট্ট একটি প্রতিজ্ঞা করছি-অনুরোধের উপন্যাস আর না।”

এই আত্মস্বীকারোক্তি উপন্যাসটির জন্মপরিস্থিতিকে যেমন মজার করে তোলে, তেমনি বইটি পড়তে বসার আগে পাঠককে এর রচনাপ্রক্রিয়া সম্পর্কেও একটি বিশেষ ধারণা দেয়।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত অল্প সময়ের চাপে লেখা একটি উপন্যাস হয়েও ‘কুহুরানী’ কেবল তাড়াহুড়ো করে লেখা কোনো হালকা গল্প হয়ে থাকেনি। এর কেন্দ্রে রয়েছে একজন ষাটোর্ধ্ব একাকী মানুষের দীর্ঘদিনের নিঃসঙ্গতা, অতীতের গভীর ক্ষত, একটি ভ্রাম্যমাণ সার্কাস দলের অন্ধকার বাস্তবতা এবং সমাজের ক্ষমতাবান মানুষের নোংরা প্রভাব। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ সরল ও ঝরঝরে ভাষায় এই উপাদানগুলোকে এমনভাবে পাশাপাশি বসিয়েছেন যে গল্পটি একদিকে পাঠযোগ্য ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে ধীরে ধীরে পাঠকের মনে বিষণ্ণতার একটি দীর্ঘ ছায়াও ফেলেছে।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মোফাজ্জল করিম। নয়াপাড়ার খায়রুননেসা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের হেডমাস্টার; তাঁর বয়স একষট্টি বছর। আড়ালে ছাত্ররা তাঁকে ‘তিতা টমেটু’ কিংবা ‘গর্জন স্যার’ বলে ডাকে। বাইরে থেকে দেখলে তিনি কঠোর, নিয়মানুবর্তী এবং কিছুটা রাগী প্রকৃতির মানুষ। কিন্তু তাঁর কঠোরতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর নিঃসঙ্গতা। তিনি একা মানুষ। জীবনে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর স্ত্রী জোছনার গায়ের রং ছিল শ্যামলা বলে শ্বশুর আদর করে তাঁর নাম রেখেছিলেন জোছনা। নামটির মধ্যে যেন শ্বেত-আলোর একটি কৌতুক ছিল, কিন্তু মোফাজ্জল করিমের কাছে জোছনা ছিলেন সত্যিই তাঁর জীবনের আলো। তিনি স্ত্রীকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। একমাত্র সন্তানকে জন্ম দিতে গিয়ে জোছনা মারা যান; আর মায়ের মৃত্যুর পরপরই সেই সন্তানটিও মারা যায়। একসঙ্গে স্ত্রী ও সন্তানকে হারিয়ে মোফাজ্জল করিমের জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা আর কোনোদিন পূরণ হয়নি। এরপর বহু বছর ধরে তিনি একাই জীবন কাটিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর জীবন যেন কোনো শান্ত, বহতা নদী—নীরবে নিজের গতিতে বয়ে চলেছে, কোথাও বড় কোনো ঢেউ নেই, কোথাও কোনো নতুন প্রত্যাশাও নেই।

এই নিঃসঙ্গ জীবনের মধ্যে হঠাৎ করেই এসে পড়ে নিউ বেঙ্গল সার্কাস পার্টি। গ্রামের মানুষজনের কাছে সার্কাস মানে কয়েক দিনের আনন্দ, আলো, ঢাকঢোল, নাচগান, দড়ির খেলা, ম্যাজিক আর বিচিত্র সব কসরত। কিন্তু সার্কাসের সেই উজ্জ্বল আলোর পেছনে যে আরেকটি অন্ধকার জগৎ থাকে, হুমায়ূন আহমেদ সেই অন্ধকারটিকেই গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ করে তুলেছেন। সার্কাসের ম্যানেজার ইয়াকুব অত্যন্ত চালাক মানুষ। আসলে সার্কাসের মালিকও সে। গ্রামে সার্কাসের তাবু পড়ার পরপরই সে এলাকার মান্যগণ্য ব্যক্তিদের তালিকা করে প্রত্যেকের কাছে নিজে গিয়ে ফ্রি পাস দিয়ে আসে। বিশেষ করে স্কুল ও মসজিদ-মাদ্রাসার কমিটি সাধারণত সার্কাসের বিরোধিতা করে—এই সামাজিক বাস্তবতাও ইয়াকুবের অজানা নয়। তাই সে আগেভাগেই স্কুলের শিক্ষকদের ফ্রি পাস দেয় এবং নিজের চমৎকার ব্যবহার ও কথার মায়ায় হেডমাস্টার মোফাজ্জল করিম ও মাওলানাকেও বশ করে ফেলে। মোফাজ্জল করিম কথা দেন, রাতে তিনি সার্কাস দেখতে যাবেন।

সেই রাতেই তাঁর জীবনে ঘটে যায় এমন একটি ঘটনা, যা তাঁর বহু বছরের নিশ্চুপ জীবনে হঠাৎ ঢেউ তোলে। সার্কাসের মঞ্চে তিনি একটি কালো মেয়েকে দেখতে পান, যে দড়ির ওপর খেলা দেখাচ্ছে। মেয়েটির নাম কুহুরানী। মেয়েটিকে দেখেই মোফাজ্জল করিম যেন অতীতের কোনো দরজা হঠাৎ খুলে যেতে দেখেন। কুহুরানীর মুখে, তার অবয়বে, তার উপস্থিতিতে তিনি তাঁর মৃত স্ত্রী জোছনার ছায়া দেখতে পান। এত বছর পর যে মানুষটি তাঁর জীবনে নেই, সার্কাসের আলো-আঁধারির মধ্যে যেন সেই মানুষটিরই একটি অদ্ভুত প্রতিরূপ তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায়। এখান থেকেই কুহুরানী শুধু সার্কাসের একটি মেয়ে থাকে না; সে হয়ে ওঠে মোফাজ্জল করিমের অতীত, স্মৃতি, ভালোবাসা ও হারানোর সঙ্গে বর্তমানের একটি অদৃশ্য সেতু।

কুহুরানীর নিজের জীবনও কোনো আনন্দময় জীবনের গল্প নয়। ছোটবেলায় সে বাবার সঙ্গে ট্রেনে ট্রেনে ভিক্ষা করত। ট্রেনেই একদিন তার পরিচয় হয় জয়নাল চাচার সঙ্গে। জয়নাল খেলা দেখাত। তার কাছেই কুহুরানী বিভিন্ন খেলা শেখে। বাবার মৃত্যুর পর জয়নাল চাচার সঙ্গেই থাকতে শুরু করে সে। কিন্তু একসময় কুহুরানী বড় হয়ে উঠলে জয়নাল তাকে বিয়ে করতে চায়। যে মানুষটিকে এতদিন সে চাচা বলে জেনে এসেছে, তার কাছ থেকে এমন প্রস্তাব পেয়ে কুহুরানী তাকে ছেড়ে চলে আসে। সে আশ্রয় নেয় এই সার্কাসের দলে। পরে রোগে-শোকে জয়নাল মারা যায়। কুহুরানীর ফিরে যাওয়ার মতো আর কোনো জায়গা থাকে না। সার্কাসের অন্য মেয়েদের মতোই তার জীবনও ধীরে ধীরে ভেসে যেতে থাকে এক অনিশ্চিত স্রোতে।

সার্কাসের জীবন বাইরে থেকে যতটা রঙিন, ভেতরে তার বাস্তবতা ততটাই অন্ধকার। আলো ঝলমলে মঞ্চে যে মেয়েটি দড়ির ওপর দাঁড়িয়ে দর্শকদের বিনোদন দেয়, তার নিজের জীবনে নিরাপত্তা, স্বাধীনতা কিংবা স্বাভাবিক ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা নেই। কুহুরানী নিজের ইচ্ছায় এই জীবন বেছে নেয়নি। পরিস্থিতি তাকে এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে। সে মাঝে মাঝেই সার্কাসের দল থেকে পালানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনোভাবে আবার ফিরে এসেছে—কখনো নিজে, কখনো তাকে ধরে এনে। এই পালিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আসলে কেবল একটি সার্কাসের দল থেকে পালানোর আকাঙ্ক্ষা নয়; এটি তার নিজের বন্দিজীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সেই মুক্তির পথ তার সামনে খোলা নেই।

একদিন প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে রাতের অন্ধকারে কুহুরানী আবার সার্কাস থেকে পালিয়ে যায়। অসুস্থ শরীর নিয়ে কোথাও আশ্রয় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত সে এসে দাঁড়ায় মোফাজ্জল করিমের বাড়িতে। আর এখানেই উপন্যাসের মানবিক দিকটি সবচেয়ে তীব্র হয়ে ওঠে। মোফাজ্জল করিম অসুস্থ মেয়েটির মধ্যে তাঁর মৃত স্ত্রী জোছনার ছায়া দেখতে পান। তিনি কাউকে কিছু না জানিয়ে কুহুরানীকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেন। এই আশ্রয় কেবল একজন অসুস্থ মেয়েকে দেওয়া সাময়িক আশ্রয় নয়; বহু বছর ধরে নিঃসঙ্গ থাকা একজন মানুষের জীবনে আবার মানুষের উপস্থিতিরও যেন সূচনা।

কিন্তু কুহুরানীর চারপাশের পৃথিবী এত সহজ নয়। গ্রামের ক্ষমতাধর ধনী ব্যক্তি খন্দকার সাহেব কুহুরানীকে পছন্দ করে ফেলেছেন। সার্কাসের মালিক ইয়াকুব তার স্বভাবসিদ্ধ কৌশলে খন্দকার সাহেবকেও নিজের পক্ষে নিয়ে নেয়। খন্দকার সাহেবের প্রভাব এতটাই প্রবল যে থানার অফিসার থেকে শুরু করে মাদ্রাসার মাওলানা—গ্রামের প্রায় সবাই তার প্রভাবের বলয়ের মধ্যে চলে আসে। এখানে হুমায়ূন আহমেদ শুধু কয়েকজন ব্যক্তির গল্প বলেননি; তিনি একটি গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোর চিত্রও তুলে ধরেছেন, যেখানে অর্থ, প্রভাব ও সামাজিক মর্যাদা সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। একজন অসহায় নারীর পক্ষে সেই কাঠামোর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কতটা কঠিন, কুহুরানীর জীবন তারই একটি নির্মম উদাহরণ।

সার্কাসের এক মাসের আসর শেষ হয়। কুহুরানীকে আবার ফিরে যেতে হয় সেই জগতে, যেখান থেকে সে পালাতে চেয়েছিল। সার্কাস চলে যাওয়ার দিনে সে মোফাজ্জল করিমের কাছে দোয়া নিতে আসে। এই বিদায়ের মুহূর্তটি উপন্যাসের আবেগকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। মোফাজ্জল করিমের জীবনে কুহুরানীর আগমন ছিল ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সেই ক্ষণস্থায়ী উপস্থিতি তাঁর বহু বছরের নিঃসঙ্গ জীবনে যে আলোড়ন সৃষ্টি করে, তা সহজে মুছে যাওয়ার নয়। কুহুরানীর জীবনও যেন আবার তার আগের স্রোতে ফিরে যায়—একটি এমন স্রোত, যার গন্তব্য সে নিজে ঠিক করেনি।

‘কুহুরানী’ পড়তে পড়তে সার্কাসের প্রতি আমাদের পরিচিত আকর্ষণটিও নতুনভাবে ভাবতে হয়। একসময় গ্রামবাংলায় মানুষের বিনোদনের অন্যতম বড় উৎস ছিল সার্কাস। কয়েক দিনের জন্য কোনো গ্রামে তাবু পড়ত; হাতি, ঘোড়া, খরগোশ, কবুতর, কখনো বাঘ কিংবা সিংহ, সঙ্গে থাকত নাচগান, দড়ির খেলা, আগুনের খেলা, ম্যাজিক, ব্যান্ডপার্টি—সব মিলিয়ে মানুষের জন্য এক আশ্চর্য উৎসব। কিন্তু সেই আলো, ঢাকঢোল ও হাততালির আড়ালে কী ঘটত? সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত নারীদের জীবন কতটা নিরাপদ ছিল? প্রভাবশালী ও বিত্তবান পুরুষদের চোখে তাদের অবস্থান কী ছিল? হুমায়ূন আহমেদ এই প্রশ্নগুলোর সরাসরি বক্তৃতামূলক উত্তর দেননি; বরং কুহুরানীর জীবন দিয়ে পাঠকের সামনে সেই অন্ধকার বাস্তবতাকে দাঁড় করিয়েছেন।

এই দিক থেকে ‘কুহুরানী’ কেবল একজন সার্কাসকন্যা ও এক বৃদ্ধ হেডমাস্টারের গল্প নয়। এটি নারী-অসহায়ত্ব, সামাজিক ক্ষমতা, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা এবং মানুষের একাকীত্বের গল্প। কুহুরানীর জীবন নিজের হাতে গড়ে নেওয়া কোনো জীবন নয়। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে ট্রেনে ভিক্ষা করা, পরে জয়নাল চাচার সঙ্গে থাকা, তার বিয়ের প্রস্তাব থেকে পালিয়ে সার্কাসে এসে পড়া, সার্কাস থেকে পালানোর বারবার চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত আবার সেই দলে ফিরে যাওয়া—প্রতিটি পর্যায়েই তার নিজের ইচ্ছার চেয়ে পরিস্থিতির ভূমিকা বেশি। সে যেন নিজের জীবনের যাত্রী, কিন্তু চালক নয়।

অন্যদিকে মোফাজ্জল করিমও এক ধরনের বন্দিত্বের মধ্যে বাস করেন। তাঁর বন্দিত্ব বাহ্যিক নয়, মানসিক। স্ত্রী ও সন্তানকে হারানোর পর তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। তাঁর জীবন নিয়মে বাঁধা, কিন্তু সেই নিয়মের মধ্যে উষ্ণতা নেই। কুহুরানীর আগমন তাঁর সেই স্থির জীবনেunexpected একটি মানবিক স্পন্দন নিয়ে আসে। কুহুরানীর মধ্যে তিনি জোছনাকে দেখতে পান—কখনো বাস্তবের মানুষ হিসেবে, কখনো স্মৃতির ছায়া হিসেবে। এই আবেগকে হুমায়ূন আহমেদ খুব বেশি ব্যাখ্যা করেননি। বরং তাঁর স্বাভাবিক সংযত বর্ণনার মধ্য দিয়ে পাঠককে অনুভব করার সুযোগ দিয়েছেন। এখানেই লেখকের গল্প বলার ক্ষমতা।

হুমায়ূন আহমেদের লেখার একটি বড় শক্তি তাঁর মেদহীন ভাষা। ‘কুহুরানী’-তেও সেই বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট। গল্প কোথাও ভারী হয়ে ওঠে না, চরিত্র নিয়ে অযথা দীর্ঘ ব্যাখ্যা নেই, ভাষা সহজ এবং কথোপকথন স্বাভাবিক। পাঠক একবার গল্পের ভেতরে ঢুকে গেলে কাহিনি নিজের গতিতে এগিয়ে চলে। কোথাও বাহুল্য বা অতিরিক্ত মনে হয় না। হাস্যরস আছে, কিন্তু সেই হাস্যরস কখনো গল্পের মূল বেদনাকে আড়াল করে না। বরং অনেক সময় হাসির আড়ালেই চরিত্রগুলোর অসহায়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তবে উপন্যাসটির শেষাংশ নিয়ে পাঠকের মনে কিছুটা অতৃপ্তি তৈরি হতে পারে। এতগুলো চরিত্র, এতগুলো সম্পর্ক এবং কুহুরানীর জীবনকে ঘিরে যে আবেগ ও উত্তেজনা তৈরি হয়, তার তুলনায় সমাপ্তিটি কিছুটা তাড়াহুড়ো করে শেষ হয়েছে বলে মনে হতে পারে। বিশেষ করে কুহুরানীর ভবিষ্যৎ নিয়ে পাঠকের মনে যে প্রশ্ন তৈরি হয়, তার অনেকটাই অনুচ্চারিত থেকে যায়। কিন্তু একই সঙ্গে এই অসম্পূর্ণতার মধ্যেই বাস্তবতার একটি কঠিন সত্য লুকিয়ে আছে। জীবনের সব গল্প সুন্দর সমাপ্তি পায় না; অনেক মানুষের গল্পের শেষ হয় কোনো সমাধান ছাড়াই।

উপন্যাসের শেষের দিকে কুহুরানীকে নিয়ে যে বেদনাময় অনুভূতি তৈরি হয়, সেটিই সম্ভবত বইটির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব। পাঠকের মনে তখন প্রশ্ন জাগে—কী এমন হতো, যদি কুহুরানী একটি স্বাভাবিক জীবন পেত? যদি কোনো একদিন একজন চমৎকার পুরুষ তার হাত দুটি ধরে বলত, “তোমার সব দুঃখ শেষ”? যদি তার জন্যও জীবনে একটি নিরাপদ ঘর, ভালোবাসার মানুষ এবং সম্মানজনক ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করত? কিন্তু পরক্ষণেই বাস্তবতা সেই কল্পনাকে ভেঙে দেয়। হুমায়ূন আহমেদ যে পৃথিবীকে দেখেছেন, সেই পৃথিবীতে কুহুর মতো নারীদের জন্য এমন হাত বাড়িয়ে দেওয়া খুব সহজ নয়। কোনো সত্যিকারের ভালো মানুষ তাকে গ্রহণ করতে চাইলেও সমাজ, ক্ষমতা, অর্থ ও প্রচলিত নৈতিকতার নানা দেয়াল তার সামনে দাঁড়িয়ে যেতে পারে।

এই কারণেই কুহুরানীর কান্না শুধু একটি চরিত্রের কান্না হয়ে থাকে না; তা যেন একটি জীবনব্যবস্থার বিরুদ্ধে নীরব অভিযোগ হয়ে ওঠে। “কুহুরানী কেঁদেই যাচ্ছে। তার সারামুখে কাজল লেপ্টে গেছে। কাজলের মাখামাখি হয়ে কী সুন্দরই না তাকে লাগছে!”—এই দৃশ্যটির সৌন্দর্যের মধ্যেও গভীর বেদনা আছে। মঞ্চে সাজানো সেই মেয়েটি, যে অন্যদের আনন্দ দেওয়ার জন্য হাসে, তার নিজের জীবনের অন্ধকারে শেষ পর্যন্ত কান্নাই সত্য হয়ে থাকে। কাজল লেপ্টে যাওয়া মুখটি তখন আর সার্কাসের রঙিন মুখ নয়; সেটি হয়ে ওঠে তার সমস্ত হারানো জীবন, অপূর্ণতা ও অসহায়তার প্রতীক।

‘কুহুরানী’ তাই হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে জটিল বা দার্শনিক উপন্যাসগুলোর একটি না হলেও, মানবিক অনুভূতির দিক থেকে এটি যথেষ্ট শক্তিশালী একটি রচনা। এখানে রহস্যের চমক নেই, মিসির আলির যুক্তিবিশ্লেষণ নেই, অতিপ্রাকৃত কোনো ঘটনার ওপর কাহিনির ভারও নেই। আছে মানুষ—তার নিঃসঙ্গতা, তার আকাঙ্ক্ষা, তার দুর্বলতা, তার ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ভালোবাসার জন্য তার দীর্ঘ অপেক্ষা। মোফাজ্জল করিম ও কুহুরানী দুই ভিন্ন জীবন থেকে এসে একই গল্পের দুই প্রান্তকে ধারণ করেছে—একজন হারানো ভালোবাসার স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন, আরেকজন কোনোদিন পূর্ণ ভালোবাসা ও নিরাপদ জীবনের স্বাদই পায়নি।

সব মিলিয়ে ‘কুহুরানী’ এমন একটি উপন্যাস, যা প্রথম পাঠে সহজ, সাবলীল ও উপভোগ্য মনে হলেও শেষ করার পর তার বিষণ্ণতা ধীরে ধীরে পাঠকের ভেতরে জমতে থাকে। সার্কাসের ঝলমলে আলো নিভে যাওয়ার পর যেমন বিশাল তাবুর ভেতরটা হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যায়, তেমনি উপন্যাসের শেষেও কুহুরানীর জীবন নিয়ে পাঠকের মনে এক ধরনের অন্ধকার থেকে যায়। সেই অন্ধকারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফিরে আসে একটি প্রশ্ন—কুহুরানীর মতো একজন মানুষের জন্য কি সত্যিই অন্য কোনো জীবন সম্ভব ছিল? হুমায়ূন আহমেদ সরাসরি উত্তর দেন না। তিনি শুধু তাঁর গল্পটি বলেন। আর সেই গল্প শেষ হওয়ার পর উত্তরটি খুঁজে নেওয়ার দায় পাঠকের নিজের।

কুহুরানী ❀ এডুলিচার পাঠশালা