কয়েকটি মৃত্যু

জহির রায়হান

এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি জহির রায়হান রচিত ‘কয়েকটি মৃত্যু’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।

জহির রায়হানের ‘কয়েকটি মৃত্যু’ বাংলা সাহিত্যের এমন একটি ছোট আকারের উপন্যাস, যার পরিসর খুব সীমিত হলেও এর ভাবনার বিস্তার অত্যন্ত গভীর। একটি পরিবার, একটি রাত, একটি দুঃস্বপ্ন এবং মৃত্যুকে ঘিরে মানুষের আতঙ্ক—এই সামান্য উপকরণ নিয়েই জহির রায়হান নির্মাণ করেছেন মানুষের মনস্তত্ত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক, স্বার্থপরতা এবং মৃত্যুচেতনার এক তীক্ষ্ণ সাহিত্যিক প্রতিচ্ছবি। বইটির আকার ছোট; কিন্তু পাঠ শেষ করার পর যে প্রশ্নগুলো মনে থেকে যায়, সেগুলোর পরিধি অনেক বড়।

উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছেন আহমদ আলী শেখ। দেশভাগের পর চব্বিশ পরগণার সম্পত্তির বিনিময়ে পাওয়া একটি বাড়িতে তিনি তাঁর বড় পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। ১৯৪৭-এর দেশভাগ থেকে ১৯৬৮ পর্যন্ত দীর্ঘ একুশ বছরের ব্যবধান তাঁর জীবনের পটভূমিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর চার ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে গড়ে ওঠা পরিবারটি বাইরে থেকে স্বচ্ছল ও স্বাভাবিক একটি একান্নবর্তী পরিবারের ছবি মনে হলেও, মৃত্যুভয় হঠাৎ সেই পরিচিত পারিবারিক কাঠামোর ভেতরের মানুষগুলোকে অন্যভাবে প্রকাশ করে।

কাহিনির মূল উত্তেজনা তৈরি হয় একটি স্বপ্নকে কেন্দ্র করে। আহমদ আলী এমন একটি স্বপ্ন দেখেন, যার সঙ্গে অতীতের একটি মৃত্যুঘটনার অদ্ভুত যোগ রয়েছে। এই স্বপ্ন পরিবারের মধ্যে মৃত্যুর আশঙ্কা ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু জহির রায়হানের আসল আগ্রহ কার মৃত্যু ঘটবে, সেই রহস্যে নয়; বরং মৃত্যুর আশঙ্কা মানুষের আচরণকে কীভাবে বদলে দেয়, সেই বিষয়টিতে। মৃত্যুর সম্ভাবনা সামনে আসতেই পরিবারের সদস্যদের অন্তর্গত চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা, ভয় এবং স্বার্থ ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে।

এখানেই ‘কয়েকটি মৃত্যু’র প্রকৃত শক্তি। সাধারণ অবস্থায় মানুষ নিজেকে যেভাবে উপস্থাপন করে, বিপদের মুহূর্তে তার সেই সামাজিক মুখোশ আর আগের মতো থাকে না। মৃত্যু যখন খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়, তখন ভালোবাসা, কর্তব্য, পারিবারিক বন্ধন ও নৈতিকতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ব্যক্তিগত স্বার্থগুলোও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। জহির রায়হান এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনকে কোনো দীর্ঘ ব্যাখ্যার মাধ্যমে নয়, বরং চরিত্রগুলোর আচরণ ও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন।

উপন্যাসটির নাম ‘কয়েকটি মৃত্যু’—এটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে মৃত্যু কেবল শারীরিক অস্তিত্বের অবসান নয়; মৃত্যুর ভয়, মৃত্যুর অপেক্ষা এবং মৃত্যুকে ঘিরে মানুষের মানসিক প্রতিক্রিয়াও কাহিনির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এমনকি একটি সাম্প্রতিক আলোচনায় যথার্থভাবেই বলা হয়েছে যে, উপন্যাসে সরাসরি মৃত্যুর ঘটনা না ঘটলেও মৃত্যুভয় চরিত্রগুলোর ওপর প্রবলভাবে চেপে বসে।

এই মৃত্যুভয়ই মানুষকে তার প্রকৃত চেহারায় প্রকাশ করে। কে নিজের জীবন বাঁচাতে চায়, কে আপনজনের জন্য উদ্বিগ্ন, কে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত, আর কে নিজের স্বার্থকে অন্যের জীবনের চেয়ে বড় করে দেখে—এই পার্থক্যগুলো ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে উপন্যাসটি এক অর্থে মৃত্যুর গল্প হলেও অন্য অর্থে এটি জীবিত মানুষের চরিত্রের গল্প।

জহির রায়হানের অসাধারণত্ব এখানেই যে, তিনি খুব সাধারণ একটি পারিবারিক পরিস্থিতিকে বৃহত্তর সামাজিক অর্থ দিতে পারেন। একটি একান্নবর্তী পরিবারের ঘরোয়া সম্পর্কের ভেতর দিয়ে তিনি যে মানুষের স্বার্থপরতা, ভয় এবং নৈতিক সংকটকে তুলে ধরেছেন, তা কেবল একটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পাঠকের মনে হয়, এই চরিত্রগুলো আমাদের চারপাশেরই মানুষ—পরিচিত, স্বাভাবিক এবং আপাতদৃষ্টিতে আপন; কিন্তু সংকটের মুহূর্তে তাদের প্রত্যেকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্য মানুষটি সামনে চলে আসে।

‘কয়েকটি মৃত্যু’র আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো মধ্যবিত্ত ও একান্নবর্তী পরিবারের মনস্তত্ত্ব। একই ছাদের নিচে বসবাস করলেই মানুষের স্বার্থ এক হয়ে যায় না। প্রত্যেকের নিজস্ব আকাঙ্ক্ষা, নিরাপত্তাবোধ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও ব্যক্তিগত হিসাব থাকে। স্বাভাবিক সময়ে পারিবারিক সম্পর্ক এসব পার্থক্যকে আড়াল করে রাখে; কিন্তু মৃত্যুর আশঙ্কা সেই আড়াল সরিয়ে দেয়। এই সূক্ষ্ম পারিবারিক মনস্তত্ত্বই উপন্যাসটিকে নিছক রহস্য বা মৃত্যুভিত্তিক গল্পের চেয়ে অনেক বেশি অর্থবহ করে তুলেছে।

জহির রায়হানের ভাষাশৈলীও এই ছোট উপন্যাসর সাফল্যের অন্যতম কারণ। তাঁর গদ্য সরল, সংক্ষিপ্ত ও গতিশীল। অল্প কথায় চরিত্র ও পরিস্থিতিকে স্পষ্ট করে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর ছিল অসাধারণ। ফলে মাত্র কয়েক ডজন পৃষ্ঠার একটি রচনাতেও তিনি এমন একটি আবহ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন, যেখানে একটি রাত ক্রমশ দীর্ঘতর ও ভারী হয়ে উঠতে থাকে। বর্তমান সংস্করণগুলোর অনেকগুলোতেই বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা প্রায় ২৮–৩২ পৃষ্ঠার মধ্যে দেখা যায়।

তবে ‘কয়েকটি মৃত্যু’-কে শুধু মৃত্যুভয় ও পারিবারিক স্বার্থপরতার গল্প হিসেবে পড়লে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা বাদ পড়ে যায়। জহির রায়হানের সাহিত্যকর্মে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ঘটনাকে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা ছিল। এই রচনাকেও সেই দৃষ্টিকোণ থেকে পড়া যায়। সাধারণ মানুষের ভেতরের ভয়, নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা, স্বার্থপরতা ও ক্ষমতার সম্পর্কের যে চিত্র এখানে দেখা যায়, তা বৃহত্তর সমাজেরও একটি ক্ষুদ্র প্রতিরূপ হয়ে ওঠে। এমনকি কিছু আলোচনায় উপন্যাসটির পারিবারিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে ষাটের দশকের পূর্ব পাকিস্তানের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীকী পাঠও খোঁজা হয়েছে।

রচনাটির সবচেয়ে তীক্ষ্ণ প্রশ্ন সম্ভবত মানুষের স্বার্থপরতা নিয়ে। আমরা সাধারণত নিজেদের সভ্য, নৈতিক ও মানবিক হিসেবে ভাবতে ভালোবাসি। কিন্তু যখন নিজের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে, তখন সেই নৈতিকতার সীমা কতটা অটুট থাকে? নিজের জীবন রক্ষার প্রশ্নে মানুষ কি অন্যের কথা ভুলে যেতে পারে? আপনজনের মৃত্যুর সম্ভাবনাতেও কি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে হিসাব শুরু হয়? জহির রায়হান সরাসরি এসব প্রশ্নের উত্তর দেন না; বরং চরিত্রগুলোর আচরণের মধ্য দিয়ে পাঠককে উত্তরটি আবিষ্কার করতে বাধ্য করেন।

এই কারণেই ‘কয়েকটি মৃত্যু’ পড়ার অভিজ্ঞতা অস্বস্তিকর। এখানে ভয়ের উৎস শুধু মৃত্যু নয়—মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের ভেতরের মানুষটিকে আবিষ্কার করাও এক ধরনের ভয়। পাঠক যখন চরিত্রগুলোর আচরণ দেখতে থাকেন, তখন ধীরে ধীরে নিজের সম্পর্ক, নিজের স্বার্থ এবং নিজের মৃত্যুচেতনা নিয়েও ভাবতে শুরু করেন। একটি ছোট উপন্যাসর জন্য এ এক অসাধারণ সাফল্য।

সাহিত্যিক বিচারে ‘কয়েকটি মৃত্যু’র বড় অর্জন হলো এর সংক্ষিপ্ততার মধ্যে গভীরতা। এখানে দীর্ঘ কাহিনি নেই, বিস্তৃত চরিত্রপরিচয় নেই, ঘটনাবহুল নাটকীয়তাও নেই। অথচ অল্প কয়েকটি চরিত্র ও একটি সীমিত সময়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে লেখক মানুষের মনস্তত্ত্বের এমন কিছু অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছেন, যা পাঠ শেষ হওয়ার পরও সহজে মন থেকে সরে যায় না। পাঠক বুঝতে পারেন, মৃত্যু শেষ পর্যন্ত কেবল জীবনের সমাপ্তি নয়; মৃত্যুর আশঙ্কাও জীবিত মানুষের সম্পর্ক ও নৈতিকতাকে বদলে দিতে পারে।

সব মিলিয়ে, জহির রায়হানের ‘কয়েকটি মৃত্যু’ ছোট আকারের হলেও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ একটি উপন্যাস। এর কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে একটি পরিবারের মৃত্যুভয়, কিন্তু এর প্রকৃত বিষয় মানুষ নিজেই—তার ভয়, স্বার্থ, ভালোবাসা, নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা এবং নৈতিকতার সীমাবদ্ধতা। একটি রাতের ঘটনাকে অবলম্বন করে জহির রায়হান যে মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক জগৎ নির্মাণ করেছেন, সেটিই এই রচনাকে স্মরণীয় করে রেখেছে।

‘কয়েকটি মৃত্যু’ শেষ করার পর তাই শুধু প্রশ্ন জাগে না—কে মরবে? আরও বড় প্রশ্নটি সামনে আসে—মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালে আমরা আসলে কেমন মানুষ হয়ে উঠি? আর এই প্রশ্নের কারণেই বহু বছর পরও জহির রায়হানের এই সংক্ষিপ্ত রচনাটি পাঠকের কাছে নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।