এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি প্রমথনাথ বিশী রচিত ভূমিকা—‘কিরীটী-তত্ত্ব’ যা ‘কিরীটি অমনিবাসে’র পরিচিতি ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।
কিরীটী রায় রোমাঞ্চ-অন্বেষী কিশোর মনের চিরন্তন নায়ক। বয়ঃসন্ধির বালক নিজেকে দুঃসাহসের পথে, সংগ্রাম ও বীরত্বের পথের নায়ক বলে চিরকাল কল্পনা করতে ভালবাসেন। কিন্তু মধ্যবিত্ত বাঙালী-জীবনে সে রহস্য, রোমাঞ্চ, সংঘাত, বীরত্ব ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশের অবকাশ কোথায়? তাই কল্পনাই তাকে ছুটিয়ে নিয়ে চলে। এককালে সে হয়েছে পক্ষীরাজ-আরূঢ় রাজপুত্র, চলেছে শতবাধাকণ্টকিত পথে, রাক্ষসখোক্কস বিনাশ করে পাতালপুরীতে নিদ্রিতা অপরূপা রাজকন্যাকে লাভ করার উদ্দেশ্যে। সেকাল এখন ক্রমে ক্রমে বিস্মৃত পথে। কিন্তু মানুষের মর্মজ প্রবৃত্তি সে অপরিবর্ত্তনীয়। সুতরাং তাকে নূতনতর পন্থা খুঁজে বার করতে হয়েছে। এ রাজপুত্র সোনার মুকুট পরে না, পক্ষীরাজে চড়ে না, নিতান্তই এ সহজ সরল মধ্যবিত্ত বাঙালী যুবক। বাইরে থেকে আর পাঁচজনের সঙ্গে তার প্রভেদ নেই। অথচ সে অন্তরে সেই চিরন্তন রাজপুত্তুর—নাইবা থাকলো তার সাজসরঞ্জাম, পক্ষীরাজঘোড়া। বিজ্ঞান আছে তার বাহন। মন্ত্রীপুত্র কোটালপুত্রের বদলে তারও আছে সুযোগ্য সহকারী। রাক্ষসও কি আজকের জগতে অপ্রতুল? নানা রূপে নানা ছদ্মবেশে সে রয়েছে। আশামুগ্ধ মানুষের জীবনে টেনে আনছে অনন্ত বেদনা। নেই ছদ্মবেশী রাক্ষস আজকের জগতে হয়ত নিষ্ঠুর হত্যাকারী, হয়ত অতুল সম্পদের লোভে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য।
তাদের নির্মোক মোচনই তার ব্রত। অবশ্য তার সম্মানমূল্য দিতে কোন রাজা তাঁর রাজকন্যা ও রাজমুকুট নিয়ে এগিয়ে আসবেন না এটা সত্য। পরিবর্তে নায়ক পাবে যে যশোমুকুট—তাও তুচ্ছ করার নয়। বরং আজকের বাস্তব জগতের অধিবাসী কিশোরের কাছে এটার মূল্যই বোধ হয় আগেরটির থেকে কিছু বেশি। আর তাছাড়া নিজেকে ভয়ত্রাতার ভূমিকায় দেখবার মোহই বা যায় কোথায়?
সুতরাং ভাবালু কিশোর মনের ছায়া অনুসরণ করে গড়ে ওঠে একজাতীয় রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনী। কিরীটী রায় তাঁদের মধ্যে প্রথম সারির অধিবাসী। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাঙালী কিশোর পাঠকমনকে এই সম্ভাব্য-অম্ভাব্যতার আলোছায়া ঘেরা জগতে মোহমুগ্ধ করে রেখেছে রহস্যভেদী কিরীটী রায়।
“প্রায় সাড়ে ছয় ফুট লম্বা, গৌরবর্ণ, বলিষ্ঠ চেহারা। মাথা ভর্তি কোঁকড়ানো চুল, ব্যাকব্রাশ করা।
চোখে পুরু লেন্সের কালো সেলুলয়েডের ফ্রেমের চশমা।
দাড়িগোঁফ নিখুঁতভাবে কামানো।
মুখে হাসি যেন লেগেই আছে, সদানন্দ, আমুদে।”
এই কিরীটী রায়ের পরিচয়। কলেজজীবনে শখের তাড়নায় যে নেশার শুরু, ক্রমে তাই তার বৃত্তি বা পেশায় পরিণত হয়েছে। কিরীটী রায়ের কলেজজীবনের প্রথম যুগের রহস্যভেদের কাহিনী আছে ‘রহস্যভেদী’ গল্পে। এছাড়াও আছে বিভিন্ন স্বাদের কাহিনী—চক্রী, বৌরাণীর বিল এবং সর্বপ্রধান কাহিনী সেই সুবিখ্যাত কিংবা কুখ্যাত ‘কালোভ্রমর’ সম্পর্কিত কাহিনী ‘কিরীটীর আবির্ভাবে’। গ্রন্থটির প্রথম কাহিনী ‘কিরীটীর আবির্ভাব’ হলেও, বস্তুতঃ রহস্যভেদীই এই ‘সিরিজের প্রথম গল্প, অন্তত কাহিনীর ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রয়োজনে। ‘কিরীটীর আবির্ভাব’-এ কিরীটী এই কাহিনীত্রয়ীর অন্যতম বিখ্যাত ভ্রাতৃদ্বয় রাজু সনৎ ও সুব্রতর সঙ্গে পরিচিত হন। এরপরই কালোভ্রমর কাহিনীর শুরু। বাংলা-রহস্য কাহিনীর নায়ক কিরীটীর সঙ্গে দূর্বৃত্ত কালোভ্রমরও বাঙালী পাঠকচিত্তে স্মরণীয় স্থান পেয়ে গেছে। বাঙালী পাঠকের আগ্রহ কালোভ্রমরের কাহিনী পর্বে পর্বে নানাভাবে কখনও দেশে কখনও বিদেশে টেনে নিয়ে গেছে। বিশেষ ভাবে বর্মার রেঙ্গুন শহর, কলকাতার চীনাপাড়া—আমাদের কাছে স্বল্প-পরিচয়ের অবকাশে একটা রহস্য-কুহেলীর আবরণ টেনে কাহিনীর শীতল ভয়াল পরিবেশ রচনায় সাহায্য করেছে। কিশোর মনে ইরাবতী নদীর তীরে মিয়াং-এর পরিত্যক্ত জীর্ণ বৌদ্ধ প্যাগোডা, তার সন্নিকটে ভগ্নমূর্তি, ড্রাগনের মুখে ঝোলানো বালায় গুপ্ত ধনাগারের চাবি, গুপ্তধনের সঙ্কেতবাহী লিপিতে দুর্বোধ্য ইশারা—
“ড্রাগন দেখ বসে আছে
ধনাগারের চাবি কাছে
মুখে তার লোহার বালা
দুলছে তাতে চিকণ শলা।
দুইএর পিঠে শূন্য নাও
ত্রিশ দিয়ে গুণ দাও,
শূন্য যদি যায় বাদ
সেই কবারে পূরবে সাধ।”
‘উত্তেজনা ও আবেগেঃ কিরীটীর বুকের মাঝে যখন ‘ঢিবঢিব’ করে ওঠে তখন তার মানসিক সঙ্গী পাঠক কিশোর বা বালকের মনেও এই একই প্রতিক্রিয়া। অবশেষে গুপ্তধন ভাণ্ডারের পাথর সরে গুপ্তপথ প্রকাশ পায়। পাতালপুরীর আঁধার কক্ষে দেখায়—
“ছোট একখানি ঘর। সেই ঘরের ছাদের ওপর হতে শিকরের মাথায় একটা কাঁচের প্রদীপদান ঝুলছে। সেই প্রদীপের স্বল্পালোকে দেখা যায় ঘরের চারিপাশে ছোট ছোট বেতের ঝাঁপিতে ভর্তি অসংখ্য গিনি। কে একজন আগাগোড়া কালো পোশাক-পরা লোক নীচু হয়ে এক-একটা ঝাঁপির কাছে আসছে আর দুহাত দিয়ে সেই ঝাঁপি হতে মুঠো করে গিনি তুলে নিয়ে পরক্ষণেই মুঠো আলগা করে ধরেছে—অনি সুমধুর ঝনঝন শব্দ করে সেই সব গিনি কক্ষের রন্ধ্রে ছড়িছে পড়ছে।
এই অতুল ঐশ্বর্যের লোভ মানুষখে চিরকালই পাগল করে রেখেছে। তবে বয়স্ক মানুষের কাছে সেই ঐশ্বর্যের অর্থমূল্য যতটা ছোটদের কাছে ততটা নয়। বরং তার অনুসন্ধান দ্বারা আবিষ্কারমূল্য, রহস্যের নেশাতে ছুটে যাবার মূল্যই বেশি। তাই স্বভাবতঃই তারা যেন কিরীটীর এই কৃতিত্বের সমান অংশীদার হয়ে পড়ে। পরে যদি এই গুপ্তধনের সমগ্র ধনভাণ্ডারটাই তাদের আয়ত্তের বাইরে চলেও যায় তাহলেও তাদের দুঃখ নেই। কেন না সেই কুখ্যাত দস্যু কালোভ্রমর তো ধরা পড়েছে। বয়স্ক মানুষের হয়ত সেক্ষেত্রে একটি গোপন দীর্ঘনিঃশ্বাসই পড়ত।
‘চক্রী’র পরিবেশেও একটা রহস্যময় আবহাওয়া গড়ে তুলতে পারা গেছে। সমুদ্রতীরবর্তী পাহাড়ের চূড়ায় খেয়ালী শিল্পীর পুরাতন অর্ধপরিত্যক্ত প্রাসাদ তার পটভূমি। সেখানে সাধারণের অজ্ঞাতে বহুভুজ প্রেম এবং ধনসংক্রান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ও গোপন প্রতিহিংসার লীলা চলেছে। এবং তার উপসংহারেও আছে আকস্মিকতার চমক।
‘বৌরাণীর বিল’-এ জীবন ও মৃত্যু যেন পাশাপাশি অন্তরঙ্গ দুই স্রোতে বহমান। একদিকে নিষ্ঠুর হত্যার লীলা অন্যদিকে নতুন করে গড়ে-ওঠা হৃদয়-সম্পর্ক। এখানেও কাহিনী বয়নে নূতনত্বের ব্যঞ্জনা পাওয়া যায়।
সব কটি গল্পের কাহিনী ও স্থানকালপাত্র পৃথক হলেও সর্বত্র নায়ক রহস্যভেদী কিরীটী রায় ও তার সুযোগ্য সহকারী সুব্রত। কোথাও লেখকের জবানীতে কোথাও সহকারী সুব্রতের জবানীতে (চক্রী) কাহিনী বিবৃত করা হয়েছে।
রহস্য কাহিনীর অস্তিত্বের মূল বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘদিনের নয়। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে কোথাও অন্ততঃ ডিটেকটিভ উপন্যাস বা কাহিনীর ইঙ্গিত আছে বলে আমাদের জানা নেই। সুতরাং অতি স্বাভাবিক ভাবেই এই জাতীয় কাহিনী যে সাহিত্যের থেকে উদ্ভূত তার প্রভাব থাকা সম্ভব। তবে তার অর্থ এই নয় যে বাংলা রহস্য-কাহিনী মাত্রই ইংরাজী বা মার্কিন কাহিনীর কঙ্গালে গঠিত। যে কোন উন্নতিশীল সাহিত্যেই অপর শক্তিশালী সাহিত্যের ছায়াপাত ঘটে থাকে। এক্ষেত্রেও সেরকম ছায়াপাত দুর্লক্ষ্য নয়। তবে এক্ষেত্রে তা অলঙ্কারের মত শোভমানই হয়ে উঠেছে বলা চলে।
এছাড়াও রহস্য উপন্যাসের প্রাণবন্ত যে ‘সাসপেন্স’ বা পূর্বাপর কৌতূহল বজায় রাখবার প্রয়োজনীয়তা—এখানে তা বিশেষ উল্লেখযোগ্য ভাবে রক্ষিত হয়েছে। ফলে রুদ্ধ-নিঃশ্বাসের দৃঢ়পিনন্ধ কাহিনীর শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত এক লক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের কল্পনাকে পরাজিত করে আকস্মকভাবে অপ্রত্যাশিতজনকে অপরাধী বলে যখন উপস্থিত করা হয়—তখন কাহিনীর অন্যান্য পাত্রপাত্রীর সঙ্গে পাঠককেও বিমূঢ় হয়ে যেতে হয়। এবং কিরীটী রায় যখন সুশৃঙ্খল যুক্তিবিশ্বাসের দ্বারা অপরাধীর কার্যপরম্পরাকে বিশ্লেষণ করে তখন আমাদের মনে হয়, এ তো নিতান্তই সহজ ও সরল। সহজ মাত্রেই যে সরল নয় সেকথা তখন আমাদের স্মরণে থাকে না। এবং কাহিনী শেষ করার সঙ্গে কাহিনীর উর্দ্ধে জেগে থেকে পাঠকমনে রহস্যকাহিনীর রহস্যভেদী নায়ক কিরীটী রায়ের ব্যক্তিত্ব, তার তীব্রতীক্ষ্ন যুক্তিবোধ, পরিমিতি বোধ, ক্ষুরধার বুদ্ধির মালিন্যমুক্ত ঔজ্জ্বল্য নিয়ে। যা কিরীটী রায়কে সমসাময়িক ডিটেকটিভ কাহিনীর নায়কদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠত্বের আসন দিয়েছে এবং তার স্রষ্টাকে দিয়েছে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ প্রত্যক্ষ সাফল্য।
প্রমথনাথ বিশী