এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি সমরেশ মজুমদার রচিত ‘কালোচিতার ফটোগ্রাফ’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।
সমরেশ মজুমদার বাংলা সাহিত্যে মূলত বৃহৎ ক্যানভাসের কথাসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর রহস্য ও রোমাঞ্চধর্মী রচনাগুলোরও একটি স্বতন্ত্র আকর্ষণ আছে। কালোচিতার ফটোগ্রাফ সেই ধারার একটি দ্রুতগতির, ঘটনাবহুল ও উত্তেজনাপূর্ণ উপন্যাস। আকারে তুলনামূলক ছোট হলেও কাহিনির মধ্যে রহস্যের এমন এক জাল বিস্তার করা হয়েছে, যা পাঠককে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরবর্তী ঘটনার অপেক্ষায় রাখে। বইটি পরে সমরেশ মজুমদারের পাঁচটি রহস্য উপন্যাস সংকলনেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, যেখানে তাঁর পাঁচটি রহস্যকাহিনি একত্রে প্রকাশিত হয়।
উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে প্রদীপ গুরং—অর্থের প্রয়োজন তাকে এমন এক কাজের দিকে নিয়ে যায়, যা প্রথমে সহজ বলেই মনে হয়। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বেড়াতে আসা কয়েকজন পর্যটকের সন্ধান দিতে হবে তাকে। কিন্তু ঘটনাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অত্যন্ত বিরল ও রহস্যময় ছবি—কালোচিতার মিলনদৃশ্যের ফটোগ্রাফ। এই ছবির অস্তিত্বকে ঘিরেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় সন্দেহ, আতঙ্ক ও মৃত্যুর ছায়া। যারা এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত, তাদের মধ্যে একে একে বিপদ নেমে আসে; ফলে একটি সাধারণ অনুসন্ধান ক্রমশ জীবন-মরণের লড়াইয়ে পরিণত হয়। পাঠকও প্রদীপের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করতে থাকে—একটি ছবির জন্য এত মানুষের আগ্রহ কেন? ছবিটির মধ্যে এমন কী আছে, যার জন্য খুন পর্যন্ত ঘটতে পারে?
এই উপন্যাসের সবচেয়ে বড় শক্তি তার গতি। সমরেশ মজুমদার এখানে দীর্ঘ ভূমিকা বা জটিল দার্শনিক আলোচনার পথে হাঁটেননি। ঘটনার পর ঘটনা, নতুন চরিত্রের আবির্ভাব, সন্দেহের পরিবর্তিত কেন্দ্র এবং বিপদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে যায় দ্রুত। পাহাড়ি পরিবেশ, সীমান্তবর্তী এলাকার অনিশ্চয়তা এবং অপরিচিত মানুষের আচরণের মধ্যে লেখক এমন এক আবহ তৈরি করেছেন, যেখানে পাঠক সহজে কাউকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারে না।
প্রদীপ গুরং চরিত্রটিও উপন্যাসের গতিশীলতার সঙ্গে মানানসই। সে কোনো অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন গোয়েন্দা নয়; বরং পরিস্থিতির চাপে পড়ে ধীরে ধীরে রহস্যের গভীরে প্রবেশ করতে থাকা একজন সাধারণ মানুষ। এই সাধারণত্বই চরিত্রটিকে পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। বিপদ যত ঘনিয়ে আসে, প্রদীপের সামনে তত নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়। সে কেবল রহস্যের সমাধান করতে চায় না, তাকে নিজের অস্তিত্বও রক্ষা করতে হয়।
উপন্যাসে রোমাঞ্চের পাশাপাশি মানবিক সম্পর্কের একটি রেখাও রয়েছে। ভয়, অনিশ্চয়তা ও বিপদের মধ্যে মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতা, বিশ্বাস এবং আবেগ কাহিনিকে কেবল একটি খুনের রহস্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। ফলে পাঠক একদিকে যেমন রহস্যের সমাধান জানতে চায়, অন্যদিকে চরিত্রগুলোর ভাগ্য নিয়েও আগ্রহী হয়ে ওঠে।
সমরেশ মজুমদারের গদ্যের একটি বিশেষ গুণ এখানে স্পষ্ট—তিনি খুব অল্প কথায় দৃশ্য নির্মাণ করতে পারেন। পাহাড়ি শহরের সিঁড়ি, নির্জন পথ, হোটেল, অচেনা মানুষ এবং বিপদের আশঙ্কা মিলিয়ে উপন্যাসের পরিবেশ ক্রমশ ঘনীভূত হয়। গল্পের বিভিন্ন পর্যায়ের শিরোনাম ও ঘটনাবিন্যাসও ইঙ্গিত দেয় যে কাহিনি ধাপে ধাপে আরও বিপজ্জনক পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
তবে কালোচিতার ফটোগ্রাফ নিয়ে একটি বিতর্কের কথাও উল্লেখ করা যায়। কিছু পাঠক-সমালোচক উপন্যাসটির কাহিনির সঙ্গে বিদেশি থ্রিলার, বিশেষত সিডনি শেলডনের The Doomsday Conspiracy-এর প্লটের সাদৃশ্যের অভিযোগ তুলেছেন। এটি পাঠকসমাজের আলোচনায় উত্থাপিত একটি মত; ফলে উপন্যাসটির মৌলিকতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এর বাংলা পাঠক-অভিজ্ঞতা ও রোমাঞ্চসৃষ্টির ক্ষমতা আলাদাভাবে বিচারযোগ্য।
সব মিলিয়ে, কালোচিতার ফটোগ্রাফ সমরেশ মজুমদারের সেই ধরনের উপন্যাস, যা গভীর সামাজিক বিশ্লেষণের চেয়ে পাঠককে একটি টানটান রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা দিতে বেশি সফল। রহস্যের কেন্দ্রে থাকা একটি দুর্লভ ফটোগ্রাফ, তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া লোভ ও ষড়যন্ত্র, অপ্রত্যাশিত মৃত্যু এবং ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে ওঠা পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে এটি এক বসায় পড়ে শেষ করার মতো থ্রিলার।
সমরেশ মজুমদারের উত্তরাধিকার, কালবেলা বা সাতকাহনের মতো বিশাল জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাসের সঙ্গে এর তুলনা করা ঠিক হবে না।
কালোচিতার ফটোগ্রাফের শক্তি অন্য জায়গায়—এর দ্রুতগতি, রহস্য নির্মাণ, বিপদের আবহ এবং শেষ পর্যন্ত পাঠককে কৌতূহলী করে রাখার ক্ষমতায়। যারা বাংলা রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাসে জটিল ধাঁধার চেয়ে দ্রুতগতির কাহিনি, অজানা পরিবেশ এবং জীবনসংকটের উত্তেজনা খোঁজেন, তাদের জন্য এটি সমরেশ মজুমদারের একটি উপভোগ্য ও স্মরণীয় রচনা।