হরতাল

সুকান্ত ভট্টাচার্য

এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি সুকান্ত ভট্টাচার্য রচিত ‘হরতাল’ গ্রন্থের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।

বাংলা সাহিত্যের মার্কবাদী চেতনার দীপ্ত প্রতীক ও গণমানুষের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সাহিত্যকর্মে কবিতার পাশাপাশি তাঁর গদ্যরচনার এক বিশিষ্ট স্থান রয়েছে। কবি তাঁর সংক্ষিপ্ত কিন্তু বর্ণাঢ্য ব্যক্তিজীবনে আজীবন সমাজতন্ত্র ও মার্কবাদী দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন; তাঁর সেই অটল রাজনৈতিক চিন্তারই এক শক্তিশালী প্রকাশ ঘটেছে তাঁর গদ্যসংকলন ‘হরতাল’-এ। ১৯৫২ সালে (মতান্তরে ১৯৬২ সালে সংকলিত রূপ পাওয়ার ক্ষেত্রে) প্রকাশিত এই গ্রন্থে কবির দূরদর্শী চিন্তা, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম, শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক আপসহীন প্রতিবাদের সুর স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর কবিতার মতো গদ্যেও বঞ্চিত ও নির্যাতিত মানুষের আর্তনাদ, বিপ্লবের ভাষা এবং একজন আপসহীন বিপ্লবীর বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর মূর্ত হয়ে উঠেছে।

‘হরতাল’ মূলত সুকান্তের জীবদ্দশায় ও তাঁর অকালপ্রয়াণের পর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছড়িয়ে থাকা প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত গদ্যগুলোর একটি সুবিন্যস্ত সংকলন। এই গ্রন্থের নামকরণের মাঝেই এর অন্তর্নিহিত প্রতিবাদী চেতনা ও রাজনৈতিক সংগ্রামের রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংকলনটিতে অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন গদ্যের মধ্যে বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনার দিক থেকে বেশ বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। এর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘হরতাল’, ‘দেবতাদের ভয়’, ‘ষাঁড়-গাধা-ছাগলের কথা’, এবং ‘লেজের কাহিনী’-র মতো তীক্ষ্ণ ও ব্যঙ্গাত্মক অথচ গভীর তাৎপর্যবহ গদ্যসমূহ। এসব রচনায় কবি প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি, সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা এবং শোষক শ্রেণির ওপর অত্যন্ত শাণিত ও কৌতুকপূর্ণ কষাঘাত হেনেছেন।

সুকান্তের গদ্যের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সহজবোধ্যতা ও সরাসরি বক্তব্য উপস্থাপনের ক্ষমতা। জটিল রাজনৈতিক তত্ত্বকে তিনি সাধারণ পাঠকের বোধগম্য করে তুলতে দারুণ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। ‘হরতাল’ গ্রন্থের লেখাগুলোতে সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের যে নিখুঁত চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, তা কেবল তৎকালীন সময়ের দলিল নয়, বরং যেকোনো যুগের নিপীড়িত মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সব মিলিয়ে, সুকান্তের দ্রোহী কবিচেতনার পাশাপাশি তাঁর প্রাবন্ধিক ও চিন্তক সত্তাকে অনুধাবন করার জন্য ‘হরতাল’ একটি অপরিহার্য ও মূল্যবান গ্রন্থ।