এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি হুমায়ূন আহমেদ রচিত ‘হিমুর দ্বিতীয় প্রহর’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।
হুমায়ূন আহমেদের ‘হিমুর দ্বিতীয় প্রহর’ হিমু সিরিজের অন্যতম স্মরণীয় গ্রন্থ। ১৯৯৭ সালে প্রথম প্রকাশিত এই বইটির বিশেষ গুরুত্ব শুধু হিমুর একটি স্বতন্ত্র কাহিনি হিসেবে নয়; হুমায়ূন আহমেদের দুই জনপ্রিয় চরিত্র—হিমু ও মিসির আলি—এই বইয়েই প্রথম এবং একমাত্রবার মুখোমুখি হয়।
হিমু চরিত্রটি মূলত যুক্তির প্রচলিত কাঠামোর বাইরে হাঁটে। তার জীবনযাপন অনিয়মিত, তার আচরণ অনেক সময় রহস্যময়, এবং সে মানুষের প্রচলিত সুখ-দুঃখ, ভয়-আশা কিংবা সামাজিক নিয়মকে অন্যভাবে দেখতে চায়। বিপরীতে মিসির আলি হলেন পর্যবেক্ষণ, মনস্তত্ত্ব ও যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণের মানুষ। অস্বাভাবিক কোন ঘটনা সামনে এলে তিনি তার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা খোঁজেন; বিশ্বাসের পরিবর্তে প্রমাণ এবং অনুমানের পরিবর্তে যুক্তিকে গুরুত্ব দেন। এই দুই চরিত্র তাই হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট জগতের দুই বিপরীত মেরুর প্রতিনিধিত্ব করে।
এই কারণেই ‘হিমুর দ্বিতীয় প্রহরে’র কেন্দ্রীয় আকর্ষণ কেবল গল্পের ঘটনাপ্রবাহ নয়, হিমু ও মিসির আলির মুখোমুখি অবস্থান। হুমায়ূন আহমেদ নিজেই গ্রন্থের ভূমিকায় এই সাক্ষাতের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর ভাষায়, তিনি অনেক দিন ধরে দুজনকে মুখোমুখি করার কথা ভাবছিলেন এবং তাঁদের তুলনা করেছেন ‘ম্যাটার’ ও ‘অ্যান্টিম্যাটারে’র সঙ্গে। তাঁর কৌতূহল ছিল—দুজন মুখোমুখি হলে কী ঘটে এবং লেখক হিসেবে তিনি আসলে কোন চরিত্রকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, সেটিও যেন এই সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মিসির আলির উপস্থিতি থাকলেও এটি প্রচলিত অর্থে মিসির আলির একটি উপন্যাস নয়। তাঁর ভূমিকা তুলনামূলকভাবে সীমিত; ফলে মিসির আলি সিরিজের আনুষ্ঠানিক গ্রন্থতালিকায় বইটিকে সাধারণত মূল মিসির আলি উপন্যাসগুলোর সঙ্গে একইভাবে গণনা করা হয় না। কিন্তু সাহিত্যিক দিক থেকে এর গুরুত্ব অনেক বেশি, কারণ এটি দুই ভিন্ন চরিত্র-দর্শনের একমাত্র সরাসরি সংঘাত।
হিমুর সঙ্গে মিসির আলির সাক্ষাতের তাৎপর্য এখানেই। হিমু কোন রহস্যের সমাধান করতে মিসির আলির কাছে আসা প্রচলিত অর্থের ‘ক্লায়েন্ট’ নয়; বরং হিমু নিজেই যেন মিসির আলির যুক্তিবাদী মানসিকতার সামনে একটি জীবন্ত প্রশ্ন। মিসির আলি যেখানে কোন ঘটনার কারণ খুঁজতে চান, হিমু সেখানে অনেক সময় কারণ খোঁজার প্রয়োজনকেই অপ্রাসঙ্গিক করে তোলে। একজন প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন, অন্যজন কখনো কখনো প্রশ্নটিকেই নতুন অর্থ দেন।
এই দ্বন্দ্ব উপন্যাসটিকে হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রসৃষ্টির একটি অসাধারণ পরীক্ষাগারে পরিণত করেছে। মিসির আলির যুক্তিবাদ এবং হিমুর রহস্যময় জীবনদর্শন—দুটিই লেখকের সৃষ্টিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ দিক। অথচ হুমায়ূন কোন একজনকে সম্পূর্ণ বিজয়ী করে দেননি। বরং তাঁদের সাক্ষাৎ পাঠককে ভাবায়—মানুষের অভিজ্ঞতার সবকিছু কি যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব? আবার যুক্তির বাইরে কোন অভিজ্ঞতা থাকলেই কি তাকে অলৌকিক বলে মেনে নিতে হবে?
গ্রন্থটির আরেকটি আকর্ষণ হিমুর নিজের ভয় ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া। সাধারণত হিমুকে পাঠক এমন একজন মানুষ হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত, যে অন্যদের ভয়কে উপেক্ষা করে নিজের অদ্ভুত জীবনপদ্ধতিতে এগিয়ে যায়। এই বইয়ে তার চরিত্রের কিছু ভিন্ন মাত্রা উন্মোচিত হয়। ফলে হিমু কেবল রহস্যময় বা হাস্যরসাত্মক চরিত্র নয়; তার মধ্যেও ভয়, সংশয় ও মানবিক প্রতিক্রিয়া রয়েছে—এই উপলব্ধি চরিত্রটিকে আরও জীবন্ত করে।
বইটির ভাষা ও নির্মাণেও হুমায়ূন আহমেদের স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট। রহস্যময় পরিস্থিতির পাশাপাশি হাস্যরস, দৈনন্দিন জীবনের বিচিত্রতা এবং চরিত্রের স্বাভাবিক কথাবার্তা কাহিনিকে সহজপাঠ্য করে। পাঠক একদিকে হিমুর অদ্ভুত আচরণে মজা পান, অন্যদিকে তার জীবনদর্শনের অন্তর্নিহিত প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবেন। এ কারণেই বইটি নিছক রহস্যকাহিনি কিংবা নিছক হাস্যরসের বই হয়ে থাকে না।
‘হিমুর দ্বিতীয় প্রহরে’র সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক মূল্য অবশ্য হিমু ও মিসির আলির একমাত্র সাক্ষাৎ। হুমায়ূন আহমেদের দুই জনপ্রিয় চরিত্রকে আলাদা আলাদা সিরিজে পড়লে তাদের স্বাতন্ত্র্য বোঝা যায়; কিন্তু একই কাহিনিতে মুখোমুখি দেখলে তাদের পার্থক্য আরও তীব্র হয়ে ওঠে। একজন বাস্তবতার প্রচলিত সীমা অতিক্রম করতে চান, অন্যজন সেই বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করে তার ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে চান। তাঁদের সাক্ষাৎ তাই একই সঙ্গে চরিত্র-সংঘাত, দর্শন-সংঘাত এবং লেখকের নিজের সৃষ্ট দুই জগতের মিলন।
সব মিলিয়ে ‘হিমুর দ্বিতীয় প্রহর’ হিমু সিরিজের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, কারণ এটি হিমুর চরিত্রকে নতুন আলোয় দেখার সুযোগ দেয়; আর বাংলা জনপ্রিয় কথাসাহিত্যের ইতিহাসে এটি বিশেষ স্মরণীয় হয়ে থাকে হিমু ও মিসির আলির প্রথম ও শেষ সাক্ষাতের জন্য। হুমায়ূন আহমেদ যে দুই বিপরীত মেরুর চরিত্রকে এতদিন আলাদা জগতে রেখেছিলেন, এই একটি গ্রন্থে তাঁদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে তিনি পাঠকের জন্য একটি অনন্য সাহিত্যিক মুহূর্ত সৃষ্টি করেছেন।