হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর

উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

সম্পাদনা: অভীক চট্টোপাধ্যায়

এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়!

‘হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর’কে সাধারণ আত্মজীবনী হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব কিছুটা আড়ালে থেকে যায়। এটি মূলত উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়ের একটি আংশিক আত্মজীবনীমূলক স্মৃতিকথা, যেখানে তাঁর জীবনের শৈশব থেকে চলচ্চিত্রজগতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে। রচনাটি সম্পূর্ণ আত্মজীবনী নয়; প্রকাশিত অংশের সময়সীমা আনুমানিক ১৯৬২ সাল পর্যন্ত।

গ্রন্থটির বিশেষ মূল্য এখানেই যে, এটি মহানায়ক উত্তমকুমারের প্রতিষ্ঠিত তারকা-পরিচয়ের আড়ালে থাকা মানুষটিকে দেখার সুযোগ দেয়। পর্দায় যাঁকে আমরা আত্মবিশ্বাসী, রোম্যান্টিক ও জনপ্রিয় নায়ক হিসেবে চিনি, তাঁর এই লেখায় দেখা যায় দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে আসা এক তরুণকে। কর্মজীবনের অনিশ্চয়তা, অভিনয়ে প্রবেশ, প্রাথমিক ব্যর্থতা, সুযোগের অপেক্ষা এবং ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করার অভিজ্ঞতা—এসব স্মৃতির মধ্য দিয়ে তাঁর শিল্পী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি বোঝা যায়। বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ তাই ‘তারকা উত্তমকুমার’কে নয়, উত্তমকুমার হয়ে ওঠার মানুষটিকে আবিষ্কার করা।

রচনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর আত্মপ্রকাশের স্বর। এটি কোনো পরবর্তী জীবনের সুসংগঠিত আত্মজীবনী নয়, যেখানে জীবনের ঘটনাগুলোকে পেছন ফিরে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোয় সাজানো হয়েছে। বরং সমকালীন সময়ের কাছাকাছি থেকে লেখা হওয়ায় এতে স্মৃতির স্বাভাবিকতা ও ব্যক্তিগত অনুভূতির উপস্থিতি বেশি। এই কারণেই গ্রন্থটি চলচ্চিত্র-ইতিহাসের পাশাপাশি একজন শিল্পীর আত্মপরিচয় নির্মাণের দলিল হিসেবেও মূল্যবান।

‘হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর’-এর প্রকাশনা-ইতিহাসও গ্রন্থটির গুরুত্ব বাড়িয়েছে। উত্তমকুমার এই আত্মজীবনীমূলক রচনাটি ‘নবকল্লোল’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে লিখেছিলেন। দীর্ঘদিন রচনাটি সহজলভ্য ছিল না। পরে পুরোনো পত্রিকার সংখ্যা থেকে লেখাগুলো সংগ্রহ করে অভীক চট্টোপাধ্যায় সম্পাদনা করেন এবং ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে সপ্তর্ষি প্রকাশন থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন। সম্পাদকীয় ভূমিকায় জানানো হয়েছে, সংগৃহীত রচনাটি যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে সময় এসে দাঁড়ায় ১৯৬২ সালের এপ্রিল–মে মাসে; অর্থাৎ উত্তমকুমারের জীবনের পরবর্তী দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবন এই বইয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

এই অসম্পূর্ণতাই একই সঙ্গে গ্রন্থটির সীমাবদ্ধতা এবং আকর্ষণ। পাঠক এখানে উত্তমকুমারের সমগ্র জীবনকাহিনি পান না। তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত বহু অধ্যায়—পরবর্তী সময়ের অসংখ্য চলচ্চিত্র, দীর্ঘ তারকাজীবন, শিল্পী হিসেবে পরিণতি এবং জীবনের শেষ পর্ব—এই বইয়ে অনুপস্থিত। ফলে এটিকে পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী না বলে অসম্পূর্ণ বা আংশিক আত্মজীবনীমূলক স্মৃতিকথা হিসেবে বিবেচনা করাই যথার্থ। সম্পাদকও গ্রন্থটির এই সীমাবদ্ধতার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।

তবু এই অসম্পূর্ণতা বইটির ঐতিহাসিক মূল্য কমায় না। বরং একটি বিশেষ সময়ে উত্তমকুমারের নিজের কণ্ঠে নিজের জীবনকে দেখার সুযোগ সৃষ্টি করে। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উত্তমকুমারের উত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঘটনা। সেই উত্থানের প্রাথমিক পর্যায়টি তাঁর নিজের স্মৃতিতে কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, তা জানার জন্য এই বই একটি অনন্য উৎস।

গ্রন্থের ভাষাও এর আকর্ষণের অন্যতম কারণ। এখানে সাহিত্যিক অলংকারের চেয়ে ব্যক্তিগত বয়ানের গুরুত্ব বেশি। ফলে পাঠকের কাছে মনে হয়, কোনো দূরবর্তী কিংবদন্তির জীবনী পড়া হচ্ছে না; বরং নিজের জীবনের কথা বলা একজন মানুষের স্মৃতিচারণ শোনা যাচ্ছে। এই অন্তরঙ্গতা বইটিকে তথ্যনির্ভর জীবনী থেকে পৃথক করেছে।

সম্পাদিত সংস্করণের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—মূল স্মৃতিকথার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক টীকাকরণ, জীবনীপঞ্জি ও কর্মপঞ্জি যুক্ত করা হয়েছে। ফলে পাঠক শুধু উত্তমকুমারের নিজের বয়ানই পান না, তাঁর জীবন ও কর্মের একটি বৃহত্তর কালানুক্রমিক পরিপ্রেক্ষিতও পান।

‘হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর’ তাই বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীর জন্য যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস, জনপ্রিয় সংস্কৃতি এবং তারকা-ব্যক্তিত্বের নির্মাণ নিয়ে আগ্রহী পাঠকের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। এর সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো চমকপ্রদ তথ্য নয়; বরং একজন কিংবদন্তি শিল্পীর নিজের ভাষায় তাঁর হয়ে ওঠার প্রাথমিক পথটি দেখতে পাওয়া। আর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো—রচনাটি অসম্পূর্ণ এবং উত্তমকুমারের জীবনের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো এতে নেই।

সবশেষে বলা যায়, ‘হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর’ মহানায়ক উত্তমকুমারের পূর্ণ জীবনচরিত নয়; এটি তাঁর হয়ে ওঠার গল্পের একটি মূল্যবান, ব্যক্তিগত ও অসম্পূর্ণ অংশ। সেই অসম্পূর্ণতার মধ্যেই এর বিশেষ আবেদন। কারণ পর্দার মহানায়ককে নিয়ে অসংখ্য স্মৃতি, মূল্যায়ন ও জীবনী লেখা হলেও নিজের কলমে তাঁর শৈশব, সংগ্রাম ও শিল্পীজীবনের সূচনাপর্বের কথা বলার সুযোগ খুবই সীমিত। সেই কারণে গ্রন্থটি উত্তমকুমার-চর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক দলিল হিসেবে দীর্ঘদিন পাঠযোগ্য থাকবে।

প্রসঙ্গ : উত্তমকুমারের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর; রচনায় তাহের আলমাহদী