এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় রচিত ‘গোঁসাইবাগানের ভূত’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘গোঁসাইবাগানের ভূত’ অদ্ভুতুড়ে সিরিজের এমন একটি কিশোর উপন্যাস, যেখানে ভূতের গল্পের আড়ালে উঠে এসেছে একটি সংবেদনশীল কিশোর মনের অভিমান, অপমান, কল্পনা ও আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার কাহিনি। অঙ্কে মাত্র তেরো নম্বর পাওয়ায় বুরুনকে পরিবারের প্রায় সকলের অবহেলা ও তিরস্কার সহ্য করতে হয়। এই ঘটনায় তার মনে যে অভিমান জমে ওঠে, তা তাকে পরিচিত জগৎ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায় গোঁসাইবাগানের পোড়ো বাগানে। সেখানেই তার আলাপ হয় ভূত নিধিরাম সর্দারের সঙ্গে। এই অদ্ভুত বন্ধুত্ব থেকেই শুরু হয় এক মজার, রহস্যময় ও কল্পনায় ভরা অভিযাত্রা।
বুরুনের জীবনে নিধিরামের আবির্ভাব নিছক ভূতের গল্পকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। নিধিরাম ভয় দেখানোর চেয়ে বুরুনের বন্ধু হয়ে ওঠে বেশি। তার নানা কাণ্ডকারখানা, ভূতেদের বিচিত্র জগৎ এবং বুরুনের দৈনন্দিন জীবনে তাদের হস্তক্ষেপ কাহিনিকে একদিকে যেমন হাস্যরসে ভরিয়ে তোলে, অন্যদিকে তেমনই তৈরি করে একের পর এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখা এখানে বারবার মুছে যায়; পাঠকও বুরুনের সঙ্গে সেই আশ্চর্য জগতে প্রবেশ করে।
তবে উপন্যাসটিকে শুধু ভূতুড়ে মজার কাহিনি বলে মনে করলে এর মূল সুরটি ধরা পড়বে না। বুরুনের অঙ্কে খারাপ ফলের জন্য তাকে যেভাবে অপমানিত ও একঘরে করা হয়, তা একটি শিশুর মনে কতখানি আঘাত করতে পারে, লেখক তা অত্যন্ত সহজ অথচ গভীরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বড়দের শাসন, প্রত্যাশা ও অবজ্ঞা শিশুমনের ওপর কী প্রভাব ফেলে, সেই প্রশ্নও কাহিনির মধ্যে থেকে যায়। বুরুনের রাগ, অভিমান এবং কল্পনার জগতে আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা তাই নিছক হাসির উপাদান নয়; এর মধ্যে রয়েছে শিশুমনকে বোঝার এক গুরুত্বপূর্ণ দিক।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য তাঁর সহজ, সাবলীল ভাষা, অদ্ভুত কল্পনাশক্তি এবং হাস্যরসের আড়ালে জীবনের গভীর কথা বলার ক্ষমতা। ‘গোঁসাইবাগানের ভূত’-এও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। নিধিরাম ও অন্যান্য ভূতেদের ঘিরে তৈরি ঘটনাগুলি যেমন পাঠককে আনন্দ দেয়, তেমনই বুরুনের অভিজ্ঞতা তাকে নিজের মতো করে ভাবতে শেখায়। কাহিনির কোথাও ভৌতিক আবহ, কোথাও হাস্যরস, আবার কোথাও কিশোর মনের নিঃসঙ্গতা—সব মিলিয়ে উপন্যাসটি পায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।
‘গোঁসাইবাগানের ভূত’ ছোটদের জন্য লেখা হলেও এর আবেদন কেবল কিশোর পাঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বড়রাও এই উপন্যাস পড়তে পড়তে বুঝতে পারবেন, একটি শিশুর আচরণের আড়ালে কতখানি অভিমান বা না-বলা কষ্ট লুকিয়ে থাকতে পারে। নিধিরামের সঙ্গে বুরুনের বন্ধুত্ব কল্পনার আনন্দ জোগায়, আর বুরুনের অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়—শিশুকে শুধরে দেওয়ার আগে তাকে বোঝা এবং তার পাশে দাঁড়ানোও জরুরি। রহস্য, হাসি, ভূতুড়ে কাণ্ডকারখানা ও মানবিক অনুভূতির এমন সুন্দর মেলবন্ধনের জন্য ‘গোঁসাইবাগানের ভূত’ বাংলা কিশোর সাহিত্যের একটি স্মরণীয় সৃষ্টি।